....এর জন্য সংগ্রহশালা (আর্কাইভ) ‘গল্প’

অক্টোবর 10, 2011

সূর্য ওঠার শব্দ

আহসানুল ইসলাম

বেদনায় পাথর হলো অভিমানী মুখ। বাঁচার সাধ কর্পূরের মতো নিঃশেষ হলো। তবুও মাধ্যাকর্ষণ প্রেম বারবার পৃথিবীর কারুকার্যময় সবুজের স্বাদ ও গন্ধ নিতে বাধ্য করে। কামার-শালার হাপরের মতো ফুসফুস বাতাস গ্রহণ করছে, বর্জন করছে। অনীহা ও করুণ কষ্টের একটি চিত্র শরীরের প্রতিটি রগে পষ্ট হয়ে জানান দিচ্ছে তার অপারগতা।
শেষ বারের মতো তার কয়েকটি ইচ্ছে টুনটুনি পাখির মতো ছটফট করে ওঠে। একবার মাকে দেখতে ইচ্ছে করে। মা যদি একটু হাত বুলিয়ে দিতো, গেঁথে যাওয়া বুলেটের ক্ষতে! অদ্ভূত আরেকটি ইচ্ছে মাথাচাড়া দেয়। ইচ্ছে হয় বাথরুমে ঢুকে বেশ দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করতে। আজ তিন দিন গোসল করা যায় নি শরীর কেমন কাদা-কাদা ভুটকা গন্ধে ভরে আছে। অবাক লাগে গত দুই দিনে একবারও খাবার গ্রহণ করার বিষয়টি মাথায় আসেনি।
যারা ধরে এনেছে তাদের কথা … ? তাদের ব্যবহারে প্রকৃত মানুষের কোন আচরণ ছিল না, মানুষের প্রতি তাদের কোন দায়বদ্ধতাও ছিল না, মানুষকে হত্যা করার মধ্যেও একটি ভব্যতা প্রাচিন কালে ছিল। মানুষকে ফাঁসির মঞ্চে নেবার আগে মানবিক বেদনাবোধের গাম্ভীর্যতা দেখানো হয়। অথচ আমার সাথে আইনের বর্মপরা ঐ লোকগুলো নেকড়ের চেয়ে অধিক অশ্লীল-হিংস্র আচরণ করেছে। অথচ আমি জানি, আমি এমন আচরণ পাবার যোগ্য নই। আমি মৃত মানুষ! আমার কথায় কারো কিছু আসবে যাবে না। আমার কথা প্রচলিত আইনকে উপেক্ষা করলেও কারো ক্ষতি হবে না। উপকার না ও হতে পারে, তবুও বলি …।
আমি …, মানে আমি, তার কথার মধ্যে ঢুকে যাই বিনা অনুমতিতে। কারণ মৃত মানুষটি এখন অন্য জগতের। আমার জগতের মানুষকে এভাবে মূল্যায়ন করায় স্বার্থপর হয়ে উঠি। একটি সুচালো খেদ আমার ভেতরে জেগে ওঠে।
যারা আপনাকে ধরে আনলো। তারা কি সবাই সীমার? আপনাকে খেতেও দিল না? সে আমার কথার উত্তর না দিয়ে শরীরের ধুলো ঝড়ে। গালে লেগে থানা মাটি মোছে। এবং আমার প্রশ্নের কাছাকাছি এসে অন্যভাবে উত্তর দেয়।
হ্যা, সবাই সীমার Ñ তবে সীমার হলেও সিমার চাইতে ভালো!
তার দৃষ্টির প্রেক্ষনে উদাস ও বিচ্ছিন্নতা। ঘৃণা এবং তিক্ততা ঝড়ে পড়ছে সিমার প্রতি। আমি আবারো প্রশ্ন করি। আপনি যাকে জীবনের চাইতে বেশী ভালোবাসতেন। তাকে, মানে সিমাকে, সীমারের চাইতে বেশি খারাপ ভাবছেন? অথচ তার জন্য অর্থাৎ সিমার জন্য আপনি আপনজনদের কাছ থেকে নিগৃহীত হয়েছেন কোটি টাকা খরচ করেছেন, রাজনৈতিক ভবিষ্যত …
সে হঠাৎ ধ্যানমগ্ন সাধকের মতো ডানহাত উঁচু করে আমাকে থামিয়ে দেয়। আমি থেমে যাই। আমি থেমে যেতেই রাতের মেজাজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাতের একটি বিশেষ গন্ধ আছে, যা আমার নাকে লাগছে। রাতের আলাদা শব্দ আছে, সে শব্দ কথা বলছে ফিসফিস করেÑ এবং রাত আমার দিকে তাকিয়ে আছেÑ যেভাবে তাকালে অস্বস্তি লাগে। আমার অস্বস্থি লাগছে। আমি ধ্যানমগ্ন সাধকের দিকে তাকাই। যেভাবে তাকালে দৃষ্টি কথা বলে, সেভাবে।
সে মাথা নাচায়, কষ্ট ফুটে ওঠে কপালের দুপাশের রগে। অতিরিক্ত রক্তের চাপে রাগ ফুলে উঠছেÑ এতে মুখমণ্ডল রক্তজবার মতো লাল হয়ে ওঠে ক্রমেই।
সে কথা বলে।
হ্যা, মহিলার মিথ্যে কথার বিষ বুলেটের তপ্ত শিশার চেয়ে অধিক বেদনাদায়ক। আহা মানুষ কি করে যে এতটা মিথ্যে বলে? মানুষ কথা বলতে পারে এটাই যেন মানুষের দুর্ভাগ্য।
সিমাকে সিমা বলতেও লজ্জা হয়। মহিলার চোখে মুখে, হাতে নখে ঠোঁটে মিথ্যে বলার তুলি। নিখুঁত শিল্পীর মতো সরল ক্যানভাসে সে মিথ্যে আঁকে। বলে আমি নাকি তাকে জোর করে ধরে এনে…।
এরপর আর তার কথা বেরোয় না, মুক হয়ে যাওয়া মুখে মেঘ জমে ওঠে। শীতে কাঁপা শিশুর মতো তার ঠোঁট কাঁপে, কাপা ঠোঁটের প্রতিটি কথার বুকে পিঠে কষ্টের দারুণ পদ্ম উথলে ওঠে।
… পরপর ছয়টি গুলি! আমি বেদনায় কাতরাতে থাকি। কাতরানোর মধ্যেও সিমার ঐ কথাটি আমাকে চাবুক পেটাচ্ছিল Ñ সে, মানে ঐ মহিলা নির্জলা মিথ্যে বলছিল। সত্য বললেও পরিণতি এমনই হতে পারতো। কারণ, আমার মরণ নিয়ে দাম-দস্তুর হচ্ছিল, শেষপর্যন্ত ক্রেতারা সফলও হলো- কিন্তু ঐ যে মিথ্যেটা…। তপ্ত-গুলি যখন আমার দেহে ঢুকে তখন অব্যক্ত বেদনার মধ্যেও একটি ইচ্ছে জাগে। গেঁথে যাওয়া ক্ষতে একটু হাত বুলিয়ে নিতে ইচ্ছে করে, কিন্তু আমার হাত পেছন দিক হতে বাঁধা।
ইচ্ছে করছিল রাতের চেহারা মোবারক একটু দেখি, কিন্তু আমার চোঁখ বাঁধা। শক্ত করে চোখ বেঁধে রাখায় অন্য একটি কালো অন্ধকার আমার চোখে সওয়ার হয়ে আছে। আমার চোখ টাটায়! কুরবানির জবাই করা পশুর মতো ছট্ফট্ করি, কাতরাতে থাকি। মাটির সাথে চোয়াল ঘষে ঘষে যন্ত্রণা প্রশমীত করার চেষ্টা করি। দারুণ স্নেহে মাটি আমাকে বুকে তুলে নেয়। প্রবল সোহাগ ও যতেœ তার খুব ভিতরে নিয়ে নেয়।
যারা আমাকে গুলি করেছিল সে পাপিষ্ঠ লোভি লোকগুলো … না লোক নয়, বিপথগামী ডিবি পুলিশেরা, ভীতুমুখে আমার কাতরানোর দৃশ্য দেখে। আমার মাথায় তখন অদ্ভুত একটি চিন্তা পাগলা চেলা মাছের মতো খলবল করে নেচে ওঠে। কি আনন্দ ওদের। আমি মারা যাবার পর ওদের মধ্যে পনেরো লাখ টাকা ভাগাভাগি হবে। আচ্ছা, ওরা কি এখন টাকার কথা ভাবছে? নাকি শুধু মাত্র টাকার লোভে আমাকে হত্যা করে মানবিক কষ্ট অনুভব করছে? ওরা, মানে ঐ লোকগুলো, না লোকগুলো নয় ডিবি পুলিশ।
আমি মারা যাবার আগে এসি আকরাম নামে এক নরাধম পাপিষ্ঠ নোংরা পুলিশ আমার উপর অত্যাচার করেছিল। আমাকে ঝালযুক্ত মরিচের গুলানো পানি পান করতে বাধ্য করেছিল। এবং বারবার প্রস্রাব হবে এমন একটি ঔষধ আমাকে খাইয়ে দেয়। আমি বারবার পেশাব করি আর জ্বলে-পুড়ে যাবার বেদনায় পশুর মতো হাহাকার করেছিলাম। আমি সে দিন রোজা ছিলামÑ রোজা মুখে অভিসম্পাত করেছিলামÑ এবং কিছুদিন পর রুবেল হত্যার আসামী হয়ে এসি আকরাম নামক নোংরা পুলিশটার পতিত হওয়া আমি নিজের চোখে দেখেছি।
আজ যে লোভীরা আমাকে হত্যা করলো ওদের প্রতি আমার অভিশাপ। ওদের পরবর্তী প্রজন্ম পঙ্গু, নেশাখোর, পশুপ্রকৃতির হবে। ওদের ঘরে, ওদের মনে কোন সুখ থাকবে না। ওরা রক্ষক হয়ে ভক্ষণ করে। সরকারি পোশাক পরে নীরব চাঁদাবাজী-মাগিবাজী-হাইজ্যাকÑ নিম্ন ও উচ্চংগের সব অপরাধ করে। এই খারাপ লোকেরাই আমাকে হত্যা করলোÑ এটাই বেদনার।
হঠাৎ করে থেমে, আমার, মানে আমার চোখের দিকে তাকায়। তার চোখে তৃপ্তিকর ঘৃণাবোধ। সে আমার কানের কাছে মুখ এনে বলেÑ
আমার খুনির চেয়েও আমি সিমাকে অধিক ঘৃণা করি, মহিলা মিথ্যে বলার পতঙ্গ। সেলিম ভাই হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে ফেলে আমাকে প্রশ্ন করে।
আচ্ছা নিম্নীর খবর কি ?
আমি চমকে ওঠে তার দিকে তাকাই।
সে কি যেন মনে করে হাসে দারুণ হাসির ঝলকে গাকেঁ ওঠে। ঠিক সে সময়ে তার উপরের ঠোঁটের ডানপাশে লুকিয়ে থাকা গ্যাজ দাঁতটি বেরিয়ে উজ্জ্বল বিভা ছড়ায়, সৌন্দর্য্য আছড়ে পড়ে আমার বিছানায়। আমরা পাশাপাশি শুয়ে পড়ি। এক মৃতের সাথে শুয়ে আছি, তার সাথে সাচ্ছন্দে কথা বলছি। তার ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে। সে রক্ত আমার শরীরে লাগছে এবং একটু পরে সে রক্ত আমার শরীরের সাথে মিশে যাচ্ছে। এ অলৌকিক রক্ত মিশে যাবার বিষয়টি আমার ভাবনার কেন্দ্রকে উত্তেজিত করতে পারছে না। খুব স্বাভাবিকভাবে মেনে নিচ্ছে।
অথচ আমার চোখ ফেটে অসহায় অশ্র“ ঝরে পড়ছে। আমার কান্না দেখে সে আবারো হেসে ওঠে। তার মৃত্যু যেন কোন বেদনার বিষয় নয়। তাই আমার কান্না তার কাছে হাস্যকর।
তার এখনকার এই দীর্ঘ হাসিটি অন্যরকম। যে হাসি রাতকে গাঢ় করে তোলে ঘনকালো নিঝুম করে তোলে। আমি ভয়ের কোন কারণ দেখি না। তাই ভয় পাবার বিশেষ সেলগুলো স্বাভাবিক শান্ত থাকে। আমি মৃত সেলিম ভাইয়ের সাথে বেশ স্বাচ্ছন্দ্বে কথা বলছি।
আমার ভেতরে একটি ধারণা নড়ে-চড়ে, কথা বলে। বলে, দেখো জীবিত মানুষের চেয়ে মৃত মানুষ কত নিরাপদ, কতটা সরল নির্লোভ। দেখ মানুষের জন্য মানুষই হলো সব চাইতে রড় আপদ এবং ভয়ের কারণ দেখ, রাতের ঢাকা শহরে তোমার জন্য শুধুমাত্র মানুষই ভয়ের কারণ।
আমার ভাবনায় হঠাৎই সেলিম ভাই আছড়ে পড়ে। আমি অনাক্ষরিক শব্দে কোঁকিয়ে উঠি। সে লতানো ভালবাসায় তার বুকে টেনে নেয়। তার ক্ষত থেকে তখনো রক্ত ঝরছেÑ রক্তের লাল বেদনা আমার বুকে লাগে। হৃদয়ে দারুণ কান্না তোলপাড় করে। বাতাসে কাশবন কেঁপে ওঠার মত থরথর কাঁপতে থাকি। বিরল একটি কষ্ট আমার বুক বেয়ে ওপরে ওঠেÑ আবার নিচে নামে। সেলিম ভাইকে হারানোর বেদনায় আমি যে কষ্ট পাই, সে বোধ কি তার আছে? মৃত মানুষের বোধ নিয়ে আরেকটি ভাবনায় পড়ে যাই।
মৃত সেলিম ভাই আবার কথা বলে, সে আবার তার পূর্বের প্রশ্নে ফিরে যায়।
আচ্ছা ভাবির খবর কি?
আমি বুঝেও না বোঝার ভান করি। বলি কার কথা?
কেন নিম্নী ভাবির কথা।
আমি আহত অনুরোধ করি। তার কথা এখন থাক। আপনি গুলিবিদ্ধÑ গুলি গেঁথে যাওয়া ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে।
সে শরীর নাচিয়ে জীবিত মানুষের মতো হেসে ওঠে। তার দায়িত্বহীন হাসি আমার ভাল লাগে না। তার হাসির ঠমকে কেমন প্রশান্তি এবং সুখের সরল রেখা বেশ স্পষ্ট। তবে কি আমার হিংসা ফুঁসে উঠছে। আমার কপাল কুঞ্চিত হয়। আমি তাকে হাসি থামাতে বলি। সে আরো উৎসাহী হাসির উচ্ছলতায় রাতকে ভয়ানক গভীর করে তোলে। আমার ভয়ের ক্রিয়া সচল হয় আবার স্থবির হয়। আমি তাকে করুন নিবেদনের মতো একটি খবর বলি।
জানেন আপনার মৃত্যু আপনার মা মেনে নিতে পারছে না।
মৃত্যু মেনে না নিতে পারা জীবিত মানুষের আল্লাহ প্রদত্ত দুর্বলতা। সেলিম ভাইয়ের এমন দার্শনিক উত্তরে আমার মনে হয় এ বিষয়ে আর কথা না বলাই শ্রেয়। এমন উত্তর না দিলে সাহানা আপার কথাও বলতাম, ভাইয়ের মৃত্যু তাকে কতটা আহত করেছে তা সে জানতে পারতো।
আমার দৃষ্টি আবার তার বুকের বাম পাশে গেঁথে যাওয়া ক্ষতটার কাছে আটকে যায়। সেখান থেকে রক্ত বেরুচ্ছে। আমি প্রভুর প্রতি অনুযোগে ঠোঁট ফোলাই। ভাল মন্দ সবার রক্তের রংই এক, এটা কি রকম? ধোকাবাজ স্বার্থপর মানুষ এবং ভাল মানুষের রক্তের রং আলাদা হওয়া উচিৎ ছিল।
আমি এবার সেলিম ভাইয়ের ঠোঁটের দিকে তাকাই। ঠোঁটের কোনায় রক্ত শুকিয়ে আছে। সেও আমার চোখের দিকেÑ হঠাৎই আমার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। ভয়ের একটি শীতল আমার মেরুদন্ড বেয়ে উপরে উঠতে চায়। আমি পাত্তা দেই না। মনে মনে একটি দার্শনিক ভঙ্গিমায় অহংকারী হয়ে উঠি। বলি, ভয় পাওয়া হলো জীবিত মানুষের দুর্বলতাÑ আমি দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলি।
আমি মৃত সেলিম ভায়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। আর ইচ্ছে সে সিমার কথা অকপটে বলুক। আমার ধারণা সে আজ সত্য কথা বলবে। মৃত মানুষের মিথ্যা বলে লাভ নেই। মৃতরা লোভ ও লাভের উর্ধ্বে। ভোগ ও স্বার্থের বাইরে।
জানো?
আমি সেলিম ভাইয়ের প্রশ্নে হচকিৎ হয়ে উঠি, কারণ আমি জানি না। জানি না বলেই হয়ত। তার দিকে সমগ্র একাগ্রতা ঢেলে তাকিয়ে থাকি। সেলিম ভাই আমার একাগ্রতায় সন্তুষ্ট। সে বেশ স্বাচ্ছন্দে তার কথা শুরু করে।
সে, মানে সিমা। আমাকে সেই দিন। সেই দিন মানে। আমি মারা যাবার পনেরো দিন আগে, আমাকে ফোন করে। ফোন করে আদেশের সুরে বলে। সেলিম তুমি এক্ষুনি আমাকে নিয়ে যাও। আমি মেঘ না চাইতে বৃষ্টি পেয়ে থমকে যাই। হঠাৎ করেই মনে হয়। দুটি সন্তান আছে সিমার …। ঐ দুটি সন্তানের কথা মনে করে নিজের দাওয়াকে বিসর্জন দিতে চাই। কিন্তু সরাসরি না করে দিলে সিমা কষ্ট পাবে। তাকে কষ্টও দিতে চাই না। তাই ইচ্ছেকে আড়াল করি। তাকে বুঝাতে চাই। বলি সিমা তুমি আরো একশো বার ভাবো।
আমি তাকে, তাকে মানে সিমাকে ভাবতে বলায় সে দারুণ রেগে যায়। উত্তেজনার ঝাঁঝ তার কণ্ঠের আওয়াজকে বারুদ করে তোলে। ও তুমি আসবে না?
আমি বললাম, না সিমা, সে কথা নয়। তোমার দুটি সন্তান
কেন এতোদিন কি জানতে, একটি সন্তানের কথা জানতে?
না সে কথা নয়।
তা হলে কি কথা? আমি তোমাকে এতো দিন বলেছি যে আমি কুমারী নিঃসন্তান
না আসলে সে কথা নয়।
তা হলে কি কথা ?
সিমা চিৎকার করে মোবাইলে গলা-ফাটায়। তার অধৈর্য্য ছটফাটানি আমাকে ভাবিয়ে তোলে।
আমি কোন পথে আগাবো ভেবে হয়রান হই। সিমা আমারে ধরে চিৎকার করে ভেঙে পড়ে এবং পাঁচতলা থেকে লাফিয়ে পড়বে বললে আমি সম্পূর্ণ জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ি। আমি তাকে আশ্বস্ত করি ট্যাক্সিক্যাব নিয়ে এক্ষুনি আসছি বলে।
আমি তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে গভীর ছলনার পাশা খেলায় হেরে যাই। মায়ার জালে আটকে আমি বাঁচার জন্য যতই দাপাদাপি করি ততোই আরো ভয়ানক ভাবে ফেঁসে যাই।
সেলিম ভাই হঠাৎই থেমে যায়। সে আবারো আমার প্রসঙ্গে ফিরে আসতে চায়। আমার হঠাৎই তার প্রতি সন্দেহের একটি বীজ দ্রুত অঙ্কুরিত হয়ে পুস্পিত হওয়া শুরু করে। সেকি সিমার সাথে আমার স্ত্রী নিম্নীর উপসংহার টানতে চায়? আমার ভেতরে স্বার্থের একটি বিষঁ ফনা তোলেÑ আমি মনে মনে প্রবল প্রতিবাদ করি। আপনার সিমা এবং আমার নিম্নী এক জিনিস নয়।
সে, মানে সেলিম ভাই সত্যি সত্যিই আবার আমাকে প্রশ্ন করে। আচ্ছা নিমনী ভাবির কথা বলো।
আমি কি বলবো, কিছুই বুঝে ওঠতে পারিনা।
সেলিম ভাই স্বাভাবিক হাসির রেখা টেনে আমার স্মৃতির পুকুর হাতরে কিছু উদ্ধার করতে চায়। আবিস্কারের নেশা যেন তাকে পেয়ে বসেছে। সে রুমের ছাদ ভেদ করে আকাশের দিকে দৃষ্টি উড়িয়ে কথা বলে। অনন্ত কথা যেন তার বুকের খাঁচায়। অথচ তার বুকের বাম পাশে একটি ছিদ্রÑ বুলেটে গেথে যাওয়া চিহ্নটি গোলাকার। সেখান থেকে আবার রক্ত বেরুচ্ছে, লাল রক্ত। রাতের গভীরতা আরো ঝেকে বসেছে। রাতের শ্বাসপ্রয়াসের মিহি শব্দরাজী বেশ শোনা যায়।
সেলিম ভাই আবারো আমার প্রসঙ্গে আগ্রহী হয়। নিমমী এবং তুমি আমার ড্রইং-রুমে সারারাত জেগে কথা বললেÑ দুজনে মধ্যরাতে নামাজ পড়লে তোমাদের দু’জনার জুটি এতোটা প্রানবন্ত নির্লোভ বেগোনাহ লাগছিল যে আমার চোখে পানি চলে আসছিল এবং আমি দোয়া করছিলাম তোমরা বিবাহিত হও …।
আমি হঠাৎ যবাব দিই। আমি তো বিয়ে করেছি। সে ধ্যানির মতো উত্তর দেন। আমি জানি। কিন্তু…। আমি মাথা নিচু করি এবং প্রসঙ্গ বদলের রাস্তা বের করি, বলি ছি: সেলিম ভাই আপনার কাছে অবৈধ অশ্র পেল পুলিশ?
সে হো হো করে হেসে ওঠে বলে, তাই নাকি? অশ্র পাওয়া গেছে? আসলে চোখ বাধা থাকার কারণে আমি দেখতে পাইনি। আচ্ছা এক কাজ করো, পত্রিকা আনো আমি দেখি। দেখি আমার লাশের পাশে পরে থাকা অশ্রের ছবি।
দেখি কেমন মানিয়েছি, সব বস্তুরই একটা মানানসই বলে কথা আছে …। পুলিশের ক্রোশফায়ারে মৃত ব্যক্তির পাশে পরে থাকা অস্ত্র ও গুলির দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি। পত্রিকার খবরও আমাদের দৃষ্টি কারে। হাত বাধা, চোখ বাধা অবস্থায় নাকি পালাতে গিয়ে …।
আমরা পত্রিকার খবর এবং পরে থাকা সেলিম ভাইয়ের লাশের দিকে এবং অস্ত্র ও গুলির দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি। আমাদের দু’জনের দৃষ্টিতে দু’রকম বিশ্বাস ফুটে উঠে। কারণ, সেলিম ভাই মৃত। তার বিশ্বাস এক রকম। এবং আমার বিশ্বাস অন্য রকম।
আমাদের বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের দন্দ্বে মধ্যরাতের গভীরতা এবং কালোর ঘনত্ব ফিকে হয়ে ওঠে ক্রমেই।
আমি সকাল হবার জন্য অপেক্ষা করি। আর মনের সংরক্ষিত কোঠড়ে আত্মীয়ের বিচ্ছিন্ন হবার বেদনা পুষে রাখি।
বিচ্ছিন্ন হবার মানবীক দূর্বলতা জীবিত মানুষের থাকতে হয়। আমি সূর্য ওঠার একটি অপরিচিত শব্দে বিছানা ছেড়ে জেগে ওঠি।

সেপ্টেম্বর 22, 2011

শয়তানের সাথে এক রাত

স্টিফেন ভিনসেন্ট বেনেট
মাহমুদ বিন হফিজ

লেখক Stephen Vincent Benet এমন একটি পরিবারে জন্মেছেন যারা আমেরিকার ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচিত। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৮ সালে। সতের বছর বয়স থেকে Stephen একজন স্বীকৃত কবি। আর দশজন তরুণ লেখকের মত না হয়ে অচিরেই তিনি প্রমাণ করে দিলেন, তার সাহিত্যকর্ম বাস্তব ও আসল। তাঁর অসামান্য প্রতিভা বিকশিত হয়েছে তাঁর গল্পে, উপন্যাসে যেমন The Beginning of The Wisdom Ges Spanish Bayonet বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থে এবং শেষে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপিত Civil War এর মহাকাব্যে- একটা বিজয়ন্মত্ব নিখুঁত কাব্যিক বর্ণনা, শক্তিশালী অনুভূতিশীলতা, আবেগঘন গতিময়তা- Jon Brown’s Body.
The Devil and Daniel Webster প্রথম প্রকাশিত হয় Saturday Evening Post নামক মেগাজিনে। তখনই এটি একটি অসামান্য কৃর্তীরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ গল্পের জন্য তিনি O. Henry Memorial Award Committee কর্তৃক বছরের প্রথম পুরষ্কার লাভ করেন। ইতমধ্যে এটি আমেরিকার একটি উপকথারূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটিকে নির্ভর করে All That Money Can Buy নামে একটা আবেগঘন চলচিত্র নির্মিত হয়েছে।
মানবীয় কল্প-বিশ্বাসপূর্ণ এ রসঘন উপকথা যে দানিয়েল ওয়েবস্টারের চিত্রের যোগান দেয় তা প্রকৃত সত্য থেকে বেশী দূরে নয়। তার সময়ে তার মত শক্তিশালী বক্তা একজনও ছিল না। তার চেহারা ও শরীর সবার মনে ত্যাজ®কৃয়তা ছড়াত যেন। ইংরেজ ব্যক্তি Carlyle লিখেছিলেন তাঁর বন্ধুকে, “বেশীদিন হয়নি, নাস্তার টেবিলে একদিন দেখেছি বিখ্যাতদের বিখ্যাত ব্যাক্তি দানিয়েল ওয়েবস্টারকে। আসলেই তিনি স্মরণকালের উদাহরণ। সমগ্র বিশ্বকে বলতে পার, এই আমাদের ইয়াংকি ইংলিশম্যান, এরকম বাহুই আমরা ইয়াংকির মাটিতে তৈরী করি। (সংকলকের ভূমিকা থেকে)

১.
সীমান্ত অঞ্চলে, যেখানে মেসাচ্যুসেট নিউ হ্যাম্পশায়ারের সাথে মিলিত হয়েছে সেখানে সবাই গল্পটা বলে। দানিয়েল ওয়েবস্টার ইহলোক ত্যাগ করলেন। তারা তাকে সমাহিত করল। কিন্তু মার্শফিল্ডের চারদিকে ঝড়োহাওয়া বয়। তারা বলে, আকাশের মধ্যে তাঁর কাঁপা কাঁপা কণ্ঠ শোনা যায়। তারা আরও বলে, যদি কেউ তার কবরস্থানে পরিষ্কার কণ্ঠে চিৎকার করে ডাকে, “দানিয়েল ওয়েবস্টার! দানিয়েল ওয়েবস্টার!!” তখন ভূমি কাঁপতে শুরু করে, গাছগাছালী অর্ধবৃত্তাকারে দুলতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে একটা গম্ভীর কণ্ঠকে বলতে শোনা যায়, “প্রতিবেশী! ইউনিয়নের কী অবস্থা?” তখন সুন্দরতম উত্তরটা হল, “ইউনিয়ন তেমনই আছে যেমন পূর্বে ছিল। তামার পাতের মত কঠিন ভিত্তির ওপর এক এবং অবিভাজ্য।”
তিনি দেশের একজন মহান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি কখনো রাস্ট্রপতি হতে পারেননি। তবুও তিনি মহাপুরুষ ছিলেন। হাজার হাজার মানুষ খোদার সার্বোভৌমত্বের পর তাঁর প্রতি অনুগত ছিল। তারা তাঁর সম্পর্কে এবং তাঁর সম্পর্কিত সব কিছু নিয়ে গল্প করত যেভাবে মানুষ গল্প করে প্রাচীন নেতা যেমন ইব্রাহীম, ইসহাক এঁদের নিয়ে। তারা বলত তিনি যখন কথা বলার জন্য দাঁড়াতেন, আকাশের তারকারা তখন বাইরে বেরিয়ে আসত। তিনি একবার একটা নদীকে ময়লার নর্দমা বানিয়ে দিয়েছিলেন। তারা গল্প করত, তিনি যখন তাঁর মাছ ধরার ছিপ নিয়ে বের হতেন জলাশয়ের পাশ দিয়ে, তখন মাছেরা তাঁর থলির মধ্যে নিজে নিজেই লাফিয়ে উঠে আসত। কারণ তারা জানত তাঁর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা বৃথা। তিনি যখন কোন মামলা লড়তেন তখন দেবতাদের সুর এমনকি ভূমিকম্পকেও পরিবর্তন করে দিতে পারতেন। তিনি একজন দয়ালু মানুষ ছিলেন। মার্শফিল্ড ছিল তাঁর কাছে খুবই প্রিয় স্থান। তিনি যে মুরগীর মাংস উৎপাদন করতেন সেগুলো পায়ের গোড়ালীতক খাঁটি ছিল। আপন
সন্তানের মত গরুগুলোকে পালতেন। তাঁর একটা বড় মেষ ছিল। তিনি ডাকতেন গোলিয়েথ, শিংগুলো সকালের ধুসর আঙ্গুর গাছের মত পাকানো। সে লোহার কপাট গুতিয়ে ছিদ্র করতে পারত। দানিয়েল ওয়েবস্টার আর দশজনের মত এক কৃষকই ছিলেন না। তিনি মাটির গন্ধ বিষয়েও অবগত ছিলেন। তিনি রাতে মোম হাতে ঘুরে ফিরে দেখতেন করার মত কোন কাজ আছে কিনা। দানিয়েল ওয়েবস্টার ছিলেন দক্ষ ঘ্রাণেন্দ্রিয় সম্পন্ন। পাহাড়ের মত উঁচা কপাল ছিল তার, চোখ ছিল যেন জ্বলন্ত কয়লা। সবছে বড় যে মামলা তিনি লড়েছেন সেটি কোন আইনের কিতাবে লেখা ছিল না। কারণ এটা তিনি লড়েছেন শয়তানের বিরুদ্ধে। মামলাটি কোন আদালতে উঠেনি আর তা ছিল অলৌকিক। গল্পটা ছিল এরকম:

লোকটা নিউ হ্যাম্পশায়ারের ক্রসকর্নারে বাস করত। নাম জাবেজ স্টোন। শুরু থেকেই লোকটা খারাপ ছিল না কিন্তু দুর্ভাগা। তার বোনা ফসলগুলো সবসময় রোগ বালাইতে নষ্ট হয়ে যেত। যেমন তার মোটা আর সবল হাঁটুওয়ালা ঘোড়াটাই হয়তো মারাত্মকভাবে পাগল হয়ে যেত আর সেটি দিয়ে দিতে হত বিনে পয়সায় প্রতিবেশীকে। এরকম সুযোগ সুবিধা ভোগ করার মত লোকেরও অভাব ছিল না। এমন করতে করতেই একসময় জাবেজ স্টোনের দুর্ভাগ্য চুড়ান্ত আকার নিল। সেদিন সে সকাল থেকেই জমি চাষ করছিল আর হঠাৎ করেই একটা বড় পাথরে লেগে তার লাঙলের ফলা ভেঙ্গে গেল। গতকালও সে পাথরটা এখানে দেখতে পায়নি। আর যখন সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লাঙলের ফলা দেখছিল তখনই ডান পাশের ঘোড়াটা কাশতে শুরু করল; আঠার মত কাশি, যার অর্থ অসুস্থতা তারপর ঘোড়ার ডাক্তার। দু’টি শিশু হামে আক্রান্ত, বউ অসুস্থ আর তার নিজের আঙ্গুলে ক্ষত। এ যেন তার জন্য সবরের শেষ সীমানা। “খোদার কসম!” দিশাহীন হতাশ চোখে একবার চারদিকে তাকাল, “খোদার কসম! নিজের আত্মাকে শয়তানের কাছে বিক্রি করে দেয়ার জন্য এই যথেষ্ট। দু’সেন্টের জন্য হলেও আমি তা করতাম!”
কথা শেষ হলে সে অনুভব করল, একটা অদ্ভুত আচ্ছন্নতা তাকে ঘিরে ধরেছে। স্বাভাবিকত সে একজন নিউ হ্যাম্পশায়ার তাই এমন শপথ তার ফিরিয়ে নেয়ার কোন ক্ষমতাই ছিল না। কিন্তু তৎসত্বেও যখন সন্ধা হয়ে গেল, তার কাছে যতদূর মনে হল, মানসিকভাবে সে স্বস্তিই অনুভব করল। অথচ সে কোন সতর্কতাই গ্রহণ করেনি। সে ছিল একজন ধর্মপরায়ন। সতর্কতা সাধারণত সব সময়ই গ্রহণ করা হয়, আগে বা পরে, যেমন কোন পবিত্র কিতাবে উপদেশ হিসাবে লেখা থাকে।
ঠিক পরের দিন প্রায় রাতের খাবারের সময়, মৃদুভাষী, কালো পোশাক পরে এক বিদেশী সম্ভ্রান্ত ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে এসে জাবেজ স্টোনকে খোঁজ করল।
জাবেজ স্টোন তার পরিবারবর্গকে জানাল, লোকটি একজন আইনজীবী, তার উত্তরাধিকার সম্পত্তির বিষয়ে কথাবার্তা বলতে এসেছে। কিন্তু সেই জানত লোকটি কে। সে লোকটির দৃষ্টিকে একেবারেই পছন্দ করত না, তার দাঁত দেখানো হাসিকেও না। তার দাঁত খুবই শাদা আর প্রচুর। তার কাছে খারাপ লাগল যখন তার কুকুরটা লোকটিকে একবার মাত্র দেখে দু’পায়ের মাঝখানে লেজ গুটিয়ে চিৎকার করতে করতে চলে গেল। তাদের কথা কম বেশী কেউ শুনে ফেলবে ভেবে তারা গোলাঘরের পিছনে চলে গেল। তারা যুক্তি-পরামর্শ করে চুক্তিতে আবদ্ধ হল। জাবেজ স্টোন তার আঙ্গুল ইশারা করল সাক্ষর করার জন্য। লোকটি তাকে একটি রূপার কলম দিল। তার ক্ষত ভোজবাজির মত শুকিয়ে গেল। শুধু একটু শাদা দাগ থেকে গেল।

২.
তারপর হঠাৎ করেই জাবেজ স্টোনের সবকিছুর জৌলুশ এসে গেল এবং তার সবকিছুতে উন্নতি হতে থাকল। তার গরু-বাচুর মোটা তাজা হতে থাকল। ঘোড়াগুলো চকচকে হল। তার জমির ফসলাদি দেখে প্রতিবেশীরা হিংসায় মরে যেতে থাকল। বজ্রপাত গোটা উপত্যকাকে খতম করে দিলেও তার গোলাঘর বহাল তবিয়তে থাকত। খুব তাড়াতাড়ি সে হয়ে গেল দেশের গন্যমান্য সনামধন্যদের একজন। লোকজন তাকে ইলেকশনে দাঁড়াতে বললে সে দাঁড়াল; তাকে স্টেট সিনেট সদস্য বানানোর কথা হচ্ছিল। সর্বসাকুল্যে বলতে গেলে স্টোন ফেমেলী গোয়াল ঘরের বেড়ালের মত সুখি হয়ে গেল। অন্তত জাবেজ স্টোন ছাড়া সবাই।
প্রথম কয়েকটা বছর সে যথেষ্ঠ পরিতৃপ্ত ছিল। যখন বিপদ ঘুরে আসে তখন সেটা বিশাল হয়ে আসে। চিন্তার বাইরে আরো অনেককিছু তাড়িয়ে নিয়ে আসে। সত্যসত্যই, যখন তখন বিশেষ করে ঝড় বৃষ্টির দিনে আঙ্গুলের শাদা ক্ষতটা তাকে যথেষ্ঠ কষ্ট দিতে থাকল। আর প্রতিবছর ঘড়ির সময়ানুবর্তিতার মত যথাসময়ে একটা ঘোড়ার গাড়ি চড়ে চলে আসত সেই বিদেশী। এভাবে ষষ্ঠ বছরেও বিদেশীর উদয় হল আর এ বছরটা শেষ হলেই তার সাথে জাবেজ স্টোনের চুক্তি শেষ হবার কথা।
বিদেশী নীচু জমির ওপর দিয়ে জাবেজ স্টোনের বাড়িতে উঠে আসছিল তার হাতের লাঠির সাথে সমতালে বুট পরা পা দু’টি ছুড়তে ছুড়তে। কালো বুট জোড়া খুবই চমৎকার ছিল দেখতে জাবেজ স্টোন সেগুলোর দিকে তাকাতে ঘৃণাবোধ করত বিশেষ করে আঙ্গুলের ডগার দিকে। দিনের আলো থেকে সূর্য বিদায় নিলে বিদেশীর সাথে জাবেজ স্টোনের কথা হল। বিদেশী বলল, “মি. স্টোন, আপনি ভাগ্যবান, একটা বিরাট প্রপার্টির মালিক হয়ে গেলেন।”
“জি, কারো কাছে খুব প্রিয় আর কারো কাছে খুব অপ্রিয়।” জাবেজ স্টোন বলল যেভাবে একজন নিউ হ্যাম্পশায়ার বলে থাকে।
“আপনার পরিশ্রমকে ছোট করে দেখার কোন প্রয়োজন নেই” বিদেশী খুব সহজভাবে বলল। স্লাইট হাসিতে তার দাঁতগুলো ঝলসে উঠল। “সর্বপরি আমরাতো সবই জানি, সবকিছুইতো চুক্তি অনুসারে হয়েছে। সুতরাং যখন আগামী বছর চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে তখন আপনার আপত্তি যেন না থাকে।”
“বন্ধকীর কথা বলছেন মিস্টার?” জাবেজ স্টোন অসহায়ভাবে একবার আসমান-জমিনের চারদিকে তাকাল। “শুরু থেকেই এ ব্যপারে আমার দু’একটি সন্দেহ ছিল। ”
“সন্দেহ!” বিদেশী মনক্ষুন্ন হয়ে বলল।
“জি, কেননাÑ” জাবেজ স্টোন বলল, “এটা ইউ এস এ, আর আমি সবসময়ই একজন ধার্মিক লোক।” সে তার গলা পরিষ্কার করল একটু সাহস সঞ্চার করার জন্য। “শুরু থেকেই সেই চুক্তির ব্যপারটা কোর্টে উঠানোর বিষয়ে আমার কিছু চিন্তা-ভাবনা ছিল।”
“কোর্ট, কোর্ট শুধু কোর্ট!” দাঁতে দাঁত ঘষে বিদেশী বিড়বিড় করল, এখনও আমরা অর্জিনাল ডকুমেন্টটা দেখে নিতে পারি।” লোকটি একটা কালো পকেট বই তার পকেট থেকে বের করল আর সেটি কাগজে পরিপূর্ণ। “শেয়ার উইন, স্লেটার, স্টিভেন, স্টোন” সে বিড় বিড় করল, “আমি-জাবেজ স্টোন, সাত বছর মেয়াদীÑ একেবারে যথাযথÑ আমি মনে করি।”
কালো পকেট বই থেকে কিছু একটা লাফিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখল জাবেজ স্টোন। তাই সে লোকটার কোন কথাই শুনতে পায়নি। সেটা দেখতে কিছুটা মথের মত কিন্তু কোন পতঙ্গ নয়। সে স্থির দৃষ্টিতে দেখছিল যখন, তার মনে হল তা তাকে তীক্ষè ছোট স্বরে কিছু একটা বলতে চাচ্ছে, ভয়ঙ্কর ছোট, ভয়ঙ্কর চিকন কিন্তু অত্যন্ত মানবিক।
সেটি চিঁ চিঁ করে ডাকল, “প্রতিবেশী স্টোন, প্রতিবেশী স্টোন, আমাকে সাহায্য করুন, খোদার দোহাই, আমাকে সাহায্য করুন।” কিন্তু জাবেজ স্টোন তার হাত পা নড়াচড়া করার আগেই লোকটা গলায় বাঁধা একটা রুমাল বের করল। প্রাণীটাকে তার ভেতর বন্দী করল ঠিক একটা প্রজাপতির মত। তারপর সে রুমালের কোনাগুলো গিট দিয়ে দিল।
“বিরতি হওয়ার জন্য দুঃখিত” লোকটা বলল, “যা বলছিলামÑ”
কিন্তু জাবেজ স্টোন কাঁপছিল থরথর করে ক্ষতরোগী ঘোড়ার মত। সে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, “এটা মি. স্টিভেনের কণ্ঠ! আপনি তাকে রুমালের ভিতর বন্দী করলেন!!”
বিদেশী কিছুটা হতবুদ্ধির মত তাকাল। “জি, প্রকৃতপক্ষে আমার উচিৎ ছিল তাকে আগেই কালেক্টিং বক্সে স্থানান্তর করা।” সে বোকার মত হেসে বলল, “আসলে সেখানে কিছু অপ্রয়োজনীয় নমুনা প্রাণী রয়েছে, আমি চাইনি তাদের বিড়ম্বনা হোক। ভাল, ভাল, এরকম ছোটখাট কিছু অপ্রিতিকর ঘটনা ঘটবেই।”
“আমি বুঝি না, আপনি ছোট খাট ঘটনা বলতে কী বোঝাচ্ছেন” জাবেজ স্টোন বলল, “কিন্তু এটাতো স্টিভেনের কণ্ঠ! আর সে মৃত! এটা হতে পারে না। সে মৃত! তাকে ঠিক মঙ্গলবারেও দেখেছি এতটা প্রাণ চঞ্চল, এতটা জঘন্যÑ ”
“জীবনের মাঝখানেÑ শুনুনÑ ” বিদেশী কিছুটা আন্তরিক হয়ে বলল। জাবেজ স্টোন শুনতে পেল উপত্যকার ওপর একটা ঘণ্টাধ্বনি কেঁপে কেঁপে বাজছে। একটা ভয় তার মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ল কারণ সে বুঝতে পারল, এ ঘণ্টাধ্বনি স্টিভেনের মৃত্যু সংবাদই প্রচার করছে।
“এসব জীবনের দীর্ঘতর হিসাব” বিদেশী একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “আসলেই সবাই এদের সান্নিধ্য ঘৃণা করে কিন্তু ব্যবসা তো ব্যবসাই।”
“রুমালটা তখনো তার হাতেই ছিল আর সেটি খুব নড়ছিল। জাবেজ স্টোন দেখে খুব অস্বস্তি বোধ করল।
“সবাই কি এরই মত ছোট?”
“ছোট? দেখি আপনার ধারণা কি? যেহেতু তারা অনেক।” সে জাবেজ স্টোনকে মেপে নিল আর দাঁত দেখিয়ে একটু হাসল, “চিন্তা করবেন না মি. স্টোন, আপনাকে সম্মানজনকভাবেই নেয়া হবে। আমি আপনাকে কখনো কালেক্টিং বক্সের বাহিরে রাখব না। যাক সে কথা, এখন, দানিয়েল ওয়েবস্টারের মত একজন… … ভাল কথা, আমাদেরকে তার জন্য একটা স্পেশাল বক্স তৈরী করতে হবে এখনই। আমার বিশ্বাস তার শক্তি আপনাকে হতবাক করে দেবে। সে আসলেই একটা জিনিস। আমার ধারণা, তার ব্যপারে আমাদের রাস্তা পরিষ্কার। আপনার ব্যপারে বলছিলামÑ”
“রুমালটা ফেলে দিন” জাবেজ স্টোন বলল। তারপর অনেক অনুনয় বিনয় করে সে সর্বোচ্চ যা পেল, নানারকম শর্তসহ অতিরিক্ত আরো তিন বছর।
কিন্তু যে যাই বলুক না কেন চারটা বছর কত দ্রুত চলে যেতে পারে সে ব্যপারে হয় তো কেউ ধারণা করতে পারে না। এ সময়ের শেষদিকে জাবেজ স্টোন সমস্ত দেশে পরিচিত হয়ে গেল। তখন তাকে গভর্নর বানানোর কথা হচ্ছিলÑ কিন্তু সবকিছুই তার কাছে ছাই-পাসের মত। প্রতিদিন সে যখন ঘুম থেকে উঠত, ভাবতো আরো একটা রাত চলে গেল আর প্রতি রাতে সে যখন শুতে যেত, সেই কালো পকেট বই আর মি. স্টিভেনের আত্মার কথা ভাবত। এসব চিন্তা তার মনকে ক্রমশ অসুস্থ করে ফেলত। শেষমেষ সে এসব নিয়ে আর ভাবতে পারত না। শেষবছরের প্রান্তের দিকে সে একদিন দানিয়েল ওয়েবস্টারের খোঁজ করার জন্য তার গাড়িতে ঘোড়া জুড়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। দানিয়েল ওয়েবস্টার নিউ হ্যাম্পশায়ারে জন্মেছিলেন, ক্রসকর্নার হতে কয়েক মাইল মাত্র। সবাই ভালভাবেই জানত যে, তিনি প্রত্যেক প্রতিবেশীর জন্য কোমল হৃদয়ের লোক।

৩.
জাবেজ স্টোন যখন মার্শফিল্ডে পৌঁছল তখন প্রায় ঊষালগ্ন। কিন্তু দানিয়েল ওয়েবস্টার তখন উপরে চলে গিয়েছিলেন। তিনি কিছু সময় ফার্মের শ্রমিকদের সাথে ল্যাটিন বললেন, মেষ গোলিয়েথের সাথে কুস্তি লড়লেন কিছুক্ষণ, একটা পাগলা ঘোড়াকে বশে আনতে চেষ্টা করলেন এবং শেষে জন সি কেলানের সাথে তর্ক করছিলেন। যেই তিনি শুনলেন একজন নিউ হ্যাম্পশায়ার তার সাথে দেখা করতে এসেছে তৎক্ষণাত সব কিছু ফেলে তিনি চলে এলেন। কারণ এটাই তার নিয়ম ছিল। তিনি জাবেজ স্টোনকে নাস্তা-পানি দিলেন যা আর দশজন পায় না। তারপর তিনি ক্রসকর্নারের খোঁজ-খবর নিলেন। সবশেষে তার আসার কারণ জানতে চাইলেন।
জাবেজ স্টোন তাকে জানাল, একটা বন্ধকী মামলা নিয়ে সে এসেছে।
“জি, আমি অনেক দিন কোন বন্ধকী মামলা নিয়ে কাজ করিনি। আর এখন তো সুপ্রিম কোর্টের মামলা ছাড়া ওকালতিই করি না” দানিয়েল বললেন, “কিন্তু আমি আপনাকে সাহায্য করব।”
“গত দশ বছরের মধ্যে প্রথমবার আশাকরে আমি আপনার দ্বরস্থ হয়েছি।” জাবেজ স্টোন তার কাছে সবকিছু খুলে বলল।
দানিয়েল পায়চারি করলেন যতক্ষণ তিনি জাবেজ স্টোনের কথা শুনলেন। হাত দু’টি তার পিছনে বাঁধা, মাঝে মধ্যে দু’একটি প্রশ্ন, মাঝে মধ্যে তার দু’চোখ মেঝেকে তুরপুনের মত বিদ্ধ করত। জাবেজ স্টোন শেষ করলে তিনি কয়েকবার জোরে জোরে মুখদিয়ে গালভর্তি বাতাস ছাড়লেন। তারপর যখন তিনি জাবেজ স্টোনের দিকে ফিরলেন, একটা নির্মল হাসি তাঁর মুখমণ্ডলে ভেঙ্গেচুরে পড়ল যেন মোনাডলোকের উপর সূর্য উদিত হল।
“মি. স্টোন, আপনি তো নিজেকে পুরোপুরি নরকের ইবলিসের কাছে বেচে দিয়েছেন। তবুও আমি আপনার মামলা গ্রহণ করলাম।”
“আপনি এ মামলা নিবেন? এ যে বিশ্বাস করা দুঃসাহস।”
“নেব, আমার হাতে প্রায় পঁচাত্তরটা কাজ আছে, তবুও আমি আজ আপনার মামলা নেব। কারণ আজ যদি দু’জন নিউ হ্যাম্পশায়ার শয়তানের বিরুদ্ধে এক না হয় তবে সহজেই ইন্ডিয়ানদের দেশ ফিরিয়ে দিতে হবে।”
তারপর তিনি জাবেজ স্টোনের কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকি দিলেন। বললেন, “আপনি কি অতিসত্তর এখানে আবার আসতে পারবেন?”
“জি, আমি সময় করে নেব, আমি কথা দিলাম।”
“আগে আপনি ফিরে যান” দানিয়েল বললেন। তিনি তার গাড়িতে ঘোড়া যুত দিতে বললেন। ঘোড়া দু’টির ধুসর বর্ণের ভিতর একটির সাদা পা বেশ মানাত। তারা দৌড়াত যখন ঘোড়াটির সামনের সেই সাদা পা’টি বিজলির মত চমকাতো।
পুরো স্টোন পরিবার কতটা আনন্দিত ও উত্তেজিত ছিল মহান দানিয়েল ওয়েবস্টারকে মেহমান হিসাবে পেয়ে তা বলে বোঝান সম্ভব নয়। জাবেজ স্টোন তার টুপি হারিয়ে ফেলল রাস্তায় দ্রুতগতিতে বাতাসকে অতিক্রম করতে গিয়ে কিন্তু তা সে হিসেবেই নিল না। রাতের খাবারের পর সে তার পরিবার বর্গকে বিছানায় পাঠিয়ে দিল তার সাথে মি. ওয়েবস্টারের নির্দিষ্ট কাজ থাকায়। মিসেস স্টোন চাইলেন তারা বারান্দায় বসুক কিন্তু দানিয়েল ওয়েবস্টার রান্নাঘরকেই উপযুক্ত মনে করলেন। তাদের সামনে টেবিলের ওপর একটা পানিয়ের জগ আর চুলার ভিতর উজ্জ্বল শিখার আগুন নিয়ে তাঁরা বিদেশীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন। পূর্বকথা মত মধ্যরাতে তার আসার কথা ছিল।
কোন লোকই দানিয়েল আর এরূপ পানিয়ের জগের চাইতে ভাল কিছু কল্পনা করতে পারে না সঙ্গী হিসাবে। কিন্তু ঘড়ির কাঁটার প্রতিটি টিক টিক শব্দের সাথে ক্রমশ জাবেজ স্টোন বিষিয়ে উঠতে থাকল ভয়ে। তার দৃষ্টি চারদিকে ঘুরছিল। জগের দিকে সে তাকিয়ে আছে মনে হলেও তার দৃষ্টি সে ব্যপারে আগ্রহী ছিল না। অবশেষে সাড়ে এগারটার দিকে সে পুরোটাই ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। সে দানিয়েলের দু’বাহু জড়িয়ে ধরল।
“মি. ওয়েবস্টার! মি.ওয়েবস্টার!!” তার কণ্ঠ কাঁপছিল ভয়ে, উত্তেজনা আর হতাশাব্যঞ্জক সাহসে। “আল্লার কসম মি. ওয়েবস্টার, যত দ্রুত পারেন আপনার ঘোড়া নিয়ে এখান থেকে পালিয়ে যান।”
“বন্ধু, আপনি আমাকে এত দূর নিয়ে এসেছেন একথা বলার জন্য যে আমার সঙ্গ আপনার অপছন্দ” দানিয়েল শান্ত স্বরে বললেন জগটা টানতে টানতে।
“আমি যে চরম দুর্ভাগা!” জাবেজ স্টোন আর্তনাদ করে উঠল। “আমি আপনাকে শয়তানের পথে নিয়ে এসেছি আর আমার বোকামী দেখছি। তার ইচ্ছা যখন আমাকে নিয়ে যেতে দিন। আমি আর বাঁচার লোভ করব না। আমি সব সইতে পারব। আপনি হলেন ইউনিয়নের একমাত্র সহায় আর নিউ হ্যাম্পশায়ারের গর্ব। সে আপনার নাগাল কখনো পেতে পারে না। সে আপনাকে কখনো পেতে পারে না।”
দানিয়েল একবার দিশেহারা লোকটার দিকে তাকালেন। আগুনের আলোতে সবকিছু কাঁপছিল আর ধূসর দেখাচ্ছিল। তিনি তার একটা হাত জাবেজ স্টেনের কাঁধে রাখলেন।
“আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ মি. স্টোন,” তিনি ভদ্রতার সাথে বললেন, “দয়া করে একবার ভাবুন তো, টেবিলের ওপর একটা জগ আর হাতে একটা মামলা। আমার জীবনে এ মামলা আর কোন অর্ধসমাপ্ত মামলা রেখে যাইনি।”
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় করাঘাতের শব্দ হল।
“আপনার ঘড়িটা নিশ্চয়ই কিছুটা পিছিয়ে” দানিয়েল বললেন খুব নিু কণ্ঠে। তিনি উঠে গিয়ে কপাট খুলে দিয়ে বললেন, “আসুন, ভেতরে আসুন।”
বিদেশী ভেতরে এল। লম্বা আর আগুনের আলোতে মনে হল কালো, বিমর্ষ। সে তার বাহু বেস্টন করে একটা বাক্স বহন করছিলÑ কাল, উজ্জ্বল, বার্ণিশ করা একটা বাক্স। বাক্সের ওপর বায়ু চলাচলের জন্য একটা ছিদ্র। বাক্সটা দেখেই জাবেজ স্টোন একটা আর্তনাদ করে উঠল। সে রুমের এক কোনায় গিয়ে জড়সড় হয়ে বসে থাকল।
“আমি নিশ্চিৎ আপনি মি. ওয়েবস্টার” বলল লোকটা বেশ সম্মানের সাথে। কিন্তু তার চোখ জ্বলছিল গভীর বনের ধূর্ত শেয়ালের মত।
“জাবেজ স্টোনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের উকিল” দানিয়েল বললেন। তার চোখ দু’টিও জ্বলছিল। “আমি কি আপনার নাম জানতে পারি?”
“আমি এমন অনেক পার করে এসেছি” বিদেশী তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “সম্ভবত এসব জীবন-সন্ধার আয়োজন। সাধারণত এরূপ অবস্থায় আমার ডাক পড়ে।”
তারপর সে টেবিলে বসল, জগ থেকে পানীয় ঢেলে পান করতে থাকল। জগের পানীয় ছিল খুব ঠাণ্ডা কিন্তু গ্লাস থেকে ধোঁয়া উঠছিল।
বিদেশী দাঁত দেখিয়ে হাসল, বলল, “আপনাকে ডাকতাম একজন আইন অনুগত নাগরিক হিসাবে আমার সম্পত্তিগুলো পাওয়ার জন্য।”
এভাবে তাদের বিতর্ক শুরু হল। তর্ক ক্রমশ গরম হয়ে উঠল আর গভীর থেকে গভীরতর হল। শুরুতে জাবেজ স্টোনের মনে একটা কম্পমান আশার আলো ছিল যেটা মিটমিট জ্বলছিল কিন্তু যখন দেখল দানিয়েল ওয়েবস্টার যুক্তির পেছনে যুক্তি দিতে গিয়ে পিছিয়ে পড়ছেন সে তখন শুধু কেবল কোণায় বসে হতাশায় মোড়ামুড়ি করতে থাকল। তার দৃষ্টি সেই কালো বার্নিশ করা বাক্সটার ওপর নিবন্ধ ছিল। আসলে দলিল-দস্তাবেজের মধ্যে কোন ফাঁক ছিল নাÑ সেটাই ছিল তার দুর্ভাগ্য। দানিয়েল ওয়েবস্টার বিষয়টাকে অনেক পেঁচালেন, ঘোরালেন, টেবিলের ওপর মুষ্ঠাঘাত করলেন কিন্তু তিনি বেশী দূর এগোতে পারলেন না। তিনি লোকটাকে একটা আপোস মীমাংসায় আসতে অনুরোধ করলেন কিন্তু সে তাতে কর্ণপাত করল না। সে বরং প্রপার্টির মূল্যমানের ওপর ইঙ্গিত করল আর বোঝাতে চাইল, একজন স্টেট সিনেটের দাম বেশী হওয়া উচিৎ। বিদেশীকে আইনের প্রতি বেশ শ্রদ্ধাশীল মনে হল। তাকে মনে হল বড় মাপের আইনজীবী। দানিয়েল ওয়েস্টারও। কিন্তু সেরা কে? মনে হল যেন প্রথম বারের মত দানিয়েল তাঁর যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বির মুখোমুখি হয়েছেন।
বিদেশী ছোট একটা হাই তুলল। “আপনার মক্কেলের সমর্থনে এরূপ সতেজ শক্তি প্রয়োগ আপনাকে আস্থাবান করে মি. ওয়েবস্টার। যদি আপনার সামনে এগুবার মত বিষয় না থাকে তাহলে আমার বরং সময় কম।” বিদেশীর বক্তব্য শুনে জাবেজ স্টোন কিছুটা কেঁপে উঠল।
দানিয়েলের মুখমণ্ডলকে মনে হল বজ্রমেঘের মত কালো। “সময় থাক আর না থাক আপনি এ লোকটাকে পাচ্ছেন না।” তিনি বজ্রকণ্ঠে চিৎকার করে বললেন, “মি. স্টোন একজন আমেরিকান নাগরিক আর কোন আমেরিকানের ওপর কোন বিদেশী রাজাও শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। আমরা বার সালে এর জন্য ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লড়েছি। দরকার হলে আমরা সকল নারকীয় শয়তানের বিরুদ্ধে লড়ব।”
“বিদেশী!” লোকটি বলল, “কে আমাকে বিদেশী বলে?”
“আমি কখনো শুনিনি শয়.. .. আপনার অদ্ভুত আমেরিকান হওয়ার কথা” দানিয়েল অবাক হয়ে বললেন।
“কার কথা বেশী সত্য?” বিদেশী বলল, একটা ভয়ঙ্কর রকম হাসি দিল সে। “যখন প্রথম ইন্ডিয়ানের উপর জুলুম হল, আমি ছিলাম সেখানে। যখন প্রথম দাস বহনকারী জাহাজ কঙ্গোর পথে রওয়ানা দেয়, আমি ছিলাম তার ডেকের ওপর। আপনার বইতে, গল্পে, আপনার বিশ্বাসে, প্রথম থেকেই কোথায় আমি নেই? ইংল্যান্ডের প্রতিটি গির্জায় আমি আলোচিত হই না? একথা সত্য, আমাকে উত্তর দাবী করে দক্ষিনের জন্য আর দক্ষিন দাবী করে উত্তরের জন্য কিন্তু আমি নির্দিষ্ট করে করোরই নই। আমি প্রকৃতপক্ষে আপনার মতই একজন সৎ আমেরিকান নাগরিক। উত্তম আলোচনার জন্য, সত্য বলার জন্য, মি. ওয়েবস্টার, যদিও আমি বলা পছন্দ করিনা, আমার নাম এ দেশে আপনার চেয়েও পুরোনো।”
“আহা!” তিনি ভাগ্যের কাছে পরাজয় স্বীকার না করে স্বদম্ভে বললেন, “তবুও আমি নিয়ম মেনে চলি। আমি আমার মক্কেলের জন্য একটা বিচার সভা দাবী করি।”
“এ মামলা একটা সাধারণ কোর্টের জন্য কঠিন” চোখ দুলিয়ে লোকটা বলল, “আর প্রকৃতপক্ষে সময়ের অপচয়।”
“যে কোন কোর্ট হতে পারে, তবে অবশ্যই আমেরিকান জর্জ ও আমেরিকান জুরিবোর্ড হতে হবে।” দানিয়েল গর্বের সাথে বললেন, “তা জীবীত কিংবা মৃত যাই হোক না কেন আমি মেনে নেব।”
“আপনি যা চান” বিদেশী তার আঙ্গুল দরজার দিকে নির্দেশ করল। এবং সেই সাথে সম্পূর্ণ হঠাৎ করেই বাইরে একটা ঝড় বাতাস উঠল আর অনেকগুলো পদ-শব্দ শোনা গেল। তারা রাতের ভিতর দিয়ে আসল, সুস্পষ্ট এবং স্বাতন্ত্র। কিন্তু তাদের পদ-শব্দ জীবন্ত মানুষের মত ছিল না।
“হায় খোদা, এত রাতে আবার কারা আসল” জাবেজ স্টোন তীব্র ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল।
“মি. ওয়েবস্টার বিচারকমণ্ডলী দাবী করেছেন” বিদেশী বলল তার তপ্ত গ্লাসে চুমুক দিয়ে। “তাদের দু’একজনের খারাপ ব্যবহার অগ্রাহ্য করতে হবে; তারা অনেক দূর হতে আসবে।”

৪.
দরজাটি খুলে গেল আর একে একে বারজন লোক ভিতরে প্রবেশ করল। আগুন নীল হয়ে জ্বলছিল তখন।
যদি জাবেজ স্টোন এতক্ষণে ভয়ে অসুস্থ হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে এখন ভয়ে তার অন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কারণ সেখানে ওয়াল্টার বাটলার ছিল, একজন আইনজীবী, বিপ্লবের সময় যে ম্যানহোয়াক উপত্যকায় আগুন ছড়িয়ে দিয়েছিল এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। সেখানে ছিল সিমন গ্রিটি, স্ব-ধর্মত্যাগী, খুঁটির সাথে বাঁধা সাদা মানুষদের পুড়তে দেখেছিল আর অট্ট হাসিতে ফেটে পড়েছিল যখন রেড ইন্ডিয়ানরা পুড়ে মরছিল। তার চোখ বুনো বিড়ালের মত সবুজ ছিল। তার ছেঁড়া শার্টের দাগ কোন ভেড়ার রক্ত থেকে আসেনি। সেখানে ছিল কিং ফিলিপ যে কিনা জীবীত থাকাকালে বুনো আর অহংকারী ছিল। সেই মহান থেতলানো আঘাত তখনো বর্তমান ছিল যা তার মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল। আরো ছিল গভর্নর ডেল, মানুষদের সে চাকায় পিষ্ট করত। ছিল মরটন অব মেরী মাউন্ট, যে তার জ্বলজ্বলে, ঢিলে, সুদর্শন চেহারা আর প্রভূত্বকারী টুপি দিয়ে প্লেমাউথ কলনীর সবাইকে অত্যাধিক জ্বালিয়ে মেরেছিল। সেখানে ছিল টীক, রক্ত পিপাসু জলদস্যু, তার বুকে কোকড়ানো কালো পশম। আরো এসেছিল দ্যা বেভারেন্ট জন স্মিথ, তার শ্বাসরোধকারী হাত দুটি নিয়ে আর তার মন্ত্রির কালো আচ্ছাদনসহ। এমন সুকুমার ছন্দে হাঁটছিল যেন তাকে ফাঁসির আদেশ দিতে হবে। ফাঁসি-রজ্জুর লাল দাগ এখনো তার গলায় আঁকা কিন্তু সে একহাতে একটা সুগন্ধি রুমাল বহন করছিল। নরকের আগুনের গন্ধসহ প্রত্যেকে কামরায় প্রবেশ করল। বিদেশী তাদের প্রত্যেকের নাম আর কর্মকাণ্ডের পরিচয় দিচ্ছিল। সে সত্য কথাই বলছিল। তারা প্রত্যেকেই আমেরিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
“আপনি কি জুরিদের নিয়ে সন্তুষ্ট?” বিদ্রুপাত্মক সুরে বলল লোকটা। ততক্ষণে আগুন্তুকগণ নিজ নিজ আসন গ্রহণ করছিলেন।
“বেশ সন্তুষ্ট, যদিও আমি জেনারেল আর্নল্ডের সঙ্গ হতে বঞ্চিত হলাম” বললেন দানিয়েল।
“ভিনডিক্ট আর্নল্ড অন্য একটা কাজে জড়িত আছেন” বিদেশী বলল একটু ভ্র“কুটি করে, “ওহ! আপনি সম্ভবত একজন বিচারকের কথা বলছেন।”
সে পূনরায় আঙ্গুল দরজার দিকে নির্দেশ করল। লম্বা, গুরুগম্ভীর পারশিয়ান পোষাক পরিহিত একজন লোক প্রবেশ করল। অতিশয় গোঁড়া মানুষের দৃষ্টি তার চোখে। সে বিচারকের আসনে বসে পড়ল।
বৃদ্ধবিচারক নির্দেশ দিল “আর দেরী নয়, সবকিছু উপস্থাপন করুন, সবকিছু।” এবং সে এমনভাবে বিড়বিড় করল যে জাবেজ স্টোনের অন্তরাত্মায় বরফ জমে গেল।
বিচারকার্য শুরু হল। সাধারণত যেরূপ আশা করা হয়, সেখানে তেমন আত্মরক্ষার কোন পথই ছিল না। জাবেজ স্টোনের সপক্ষে কোন সাক্ষ্য পাওয়া গেল না। সে একবার শিমন গ্রিটির দিকে চাইল এবং একটা তীক্ষè চিৎকার করে মুর্ছিত হয়ে গেল। তারা তাকে ঘরের এককোণে তাদের পেছনে রেখে দিল।
বিচার কার্য মুলতবি করা হয়নি যেমন সাধারণত করা হয়। সভা অব্যাহত থাকল। দানিয়েল ওয়েবস্টার তাঁর জীবনে অনেক কঠোর জুরিবোর্ডের মুখোমুখি হয়েছেন এবং অনেক জর্জের সামনে মামলা উপস্থাপন করেছেন কিন্তু কখনো এমন কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হননি। আর তিনি সফলও বটে। উপস্থিত সকলে তাদের জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে বসে আছেন। বিদেশীর নরম কণ্ঠ বেজে চলছিল।
প্রত্যেকবার যখন সে আপত্তি উত্থাপন করত, বলা হত ‘অবজেকশন সাসটেইন’ কিন্তু দানিয়েল ওয়েবস্টার যখন করতেন, বলা হত ‘অবজেকশন ডিনাইড’। আসলে মি. স্কেচ এর মত লোকদের পক্ষ হতে খাঁটি বিচার আশা করা যায় না।
শেষে দানিয়েলও তাই আরম্ভ করলেন। যখন তিনি দাঁড়ালেন তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করার জন্য তিনি আইনের প্রচলিত ধারায় বিদেশী, জুরিবর্গ এবং জর্জের সমালোচনা করলেন। তিনি আদালত অবমাননার ওপর কর্ণপাত করলেন না। তিনি কি বলবেন ভাবতে গিয়ে তিনি যেন পাগল হয়ে যাচ্ছিলেন। এমনকি তিনি যত ভাবছিলেন ততই যেন সব মনের ভিতর গুলিয়ে ফেলছিলেন।
তখনপর্যন্ত, শেষবারের মত, সেটাই ছিল তাঁর নিজ পায়ের ওপর দাঁড়াবার সময়। তিনি ভয়-ভীতি ধমক দিয়ে দমন করার চেষ্টা করলেন কিন্তু শুরু করার আগে তাঁর অভ্যাস মত বিচারক ও জুরিবোর্ডের ওপর মুহূর্তের জন্য নজর বুলিয়ে নিলেন। তিনি লক্ষ করলেন তাদের চোখ আগের চেয়ে দৃঢ়তায় জ্বলজ্বল করছে এবং সবাই সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। তাদের তখন রক্ত-পিপাসু কুকুরের মত মনে হল ঠিক একটু আগে যেমন শেয়ালের মত মনে হয়েছিল। ঘরের ভিতর নীল শয়তানের ধোঁয়ায় আরও আচ্ছন্ন হয়ে উঠল। তিনি একটুখানি তার করনীয় নিয়ে ভাবলেন। তিনি একটু মাথা ঝাঁকালেন যেন তিনি কোন উপায় খুঁজে পেয়েছেন যেরূপ কোন লোক অন্ধকারে গর্তে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়ে করে থাকে। আসলে তারা শুধু জাবেজ স্টোনের জন্যই আসেনি তাঁর জন্যও এসেছিল। তিনি তাদের উজ্জ্বল চোখের ভাষায় সবকিছু পড়ে ফেললেন এবং বিদেশী একসময় তার হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। যদি তিনি তাদের অস্ত্র দিয়ে তাদের সাথে লড়ে যেতেন তবে তিনি তাদের শক্তির ভিতর বিলীন হয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি জানতেন না সেটি কিভাবে হতো। আসলে তাদের চোখেমুখে বিরাজ করছিল তাঁরই নিজস্ব ক্রোধ আর আতঙ্ক। তাঁর কাজ ছিল, হয় সেই উজ্জ্বলতা ও ক্রোধ নিভিয়ে ফেলা নয়তো মামলা হেরে যাওয়া। তিনি মুহূর্তের জন্য দাঁড়ালেন। তার চোখদু’টি জ্বলন্ত অঙ্গারের মত জ্বলছিল। তিনি শুরু করলেন তাঁর কথা।
তিনি শুরু করলেন একেবারে সাধারণ বিষয় দিয়ে যা প্রত্যেক মানুষ জানে এবং সহজে অনুধাবন করেÑ “সকাল বেলার সুন্দর সতেজতা যখন আপনি যুবক, খাবারের স্বাদ যখন আপনি ক্ষুধার্ত, একটা নতুন দিন যা প্রত্যেক দিনের জন্য প্রযোজ্য যখন আপনি শিশু”। তিনি এসব বিষয় তাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। এসব প্রত্যেকের জন্যই ভালো জিনিস। কিন্তু স্বাধীনতা ছাড়া এসবকিছুই অর্থহীন। যখন তিনি এসব পরাধীন লোকজন আর তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা বর্ণনা করলেন তখন তাঁর কণ্ঠ বড় বড় ঘণ্টা-ধ্বনির মত কেঁপে কেঁপে উঠল। তিনি আমেরিকার প্রথম দিনগুলির কথা স্মরণ করলেন। বললেন সেসব লোকদের কথা যারা সেই দিনগুলো উপহার দিয়েছিলেন। এগুলো কোন উড়ন্ত ঈগলের দেখা গল্প নয়। এসব সবাই দেখেছে। তিনি সেসব ভুলের কথাও বললেন যেগুলো তখনকার লোকেরা করেছিল। এভাবে তিনি তুলে ধরলেন ভুল-নির্ভুল, ক্ষুধা-দুর্ভোগ আরো অনেক নতুন বিষয়। আর উপস্থিত সবাই এতে অংশগ্রহণ করল এমনকি বিশ্বাসঘাতকেরাও।
তিনি জাবেজ স্টোনের দিকে ফিরলেন। বললেন সে কেমন ছিলÑ একজন সাধারণ মানুষ যার ভাগ্য ছিল সবসময়ে খারাপ। সে তার ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে চাইল। তাই এখন তার সমস্ত কৃতভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে যাচ্ছিল। তারপরেও জাবেজ স্টোনের অনেক ভাল গুণ ছিল যার পরিচয় সে দিয়েছে। সে দরিদ্র ছিল। কোন কোন ব্যপারে খুব কঠোর ছিল। তদুপরি সে একজন মানুষ। তার জন্য মানুষ হওয়া খুব দুঃখের বিষয় কিন্তু গর্বের বিষয়ও। আর সে যে তা প্রমাণ করল সেটি অবশ্যই সবাই স্বীকার করবেন। এমনকি একজন নরকবাসীও তা স্বীকার করে নেবে যদি সে সত্যিকার মানুষ হয়ে থাকে। জাবেজ স্টোন কখনো কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেনি যদিও তার কণ্ঠ একটা করুণ বেহালার মত বাজত সব সময়। তিনি সফলতার কথা বললেন, ব্যর্থতার কথা বললেন, বললেন মানুষের শেষযাত্রার কথাÑ তারা প্রতারিত হত, ফাঁদে পড়ত, বোকা বনত কিন্তু তার পরেও সেটা মহান যাত্রা। আর এমন কোন প্রেতাত্মা ছিল না যে গাধার বাচ্ছার মত এর সারমর্ম বুঝতে পারেনি।

৫.
চুল্লির মধ্যে আগুন প্রায় নিবু নিবু। বাহিরে ভোরের বাতাস বইছিল। ঘরের ভিতর আলো ধুসর রঙ ধারণ করল যখন দানিয়েল ওয়েবস্টার তার কথা শেষ করলেন। তার কথা যেন ভেসে আসছিল নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে। এমন একটা স্থান হতে, ভূমির ওপর যে স্থানটাকে সবমানুষ ভালবাসে। তিনি তার একটা চিত্র আঁকলেন এবং প্রত্যেক জুরি ও জর্জকে বললেন তাদের দীর্ঘ বিস্মৃতির কথা। তিনি সবার হৃদয় স্পর্শ করতে পারলেন যা তাঁর জন্য ছিল তাঁর শক্তিমত্তার পুরষ্কার। তাঁর কণ্ঠ কারো কাছে ছিল অরণ্য ও তার রহস্যের মত আর কারো কাছে ছিল সাগর ও তার গর্জনের মত। এর মধ্যে কেউ দেখে তার জাতীর কান্না আর কেউ দেখে খুব ছোটখাট ক্ষতিকর দৃশ্য যা কখনো স্মরণ করার মত নয়। কিন্তু প্রত্যেকেই কিছু না কিছু দেখে। যখন দানিয়েল ওয়েবস্টার শেষ করলেন তখনো তিনি বুঝতে পারেননি জাবেজ স্টোনের জন্য তিনি কিছু করতে পেরেছেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তিনি একটা ভেলকি দেখিয়ে দিয়েছেন। তাদের চোখের সে উজ্জ্বলতা আর থাকল না। মুহূর্তের জন্য তারা আবার যেন মানুষ হয়ে গেল।
“আত্মপক্ষ সমর্থন শেষ” দানিয়েল বললেন। তিনি পর্বতের মত দাঁড়িয়ে থাকলেন। তাঁর কানে এখনো তাঁর কথাগুলো বেজে চলছে। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত যেন কিছুই শোনেননি যতক্ষণে জর্জ হেথর্ন বলল, “জুরিবর্গকে মামলার রায় বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করছি।”
ওয়াল্টার বাটলার তার জায়গায় উঠে দাঁড়াল। তার মুখমণ্ডল অন্ধকার। তবুও গর্বের আভাস সেখানে। “জুরিবর্গ এ মামলার রায় বিবেচনা করেছেন” পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে বিদেশীর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা জাবেজ স্টোনের মুক্তি প্রস্তাব করছি।”
সেই সাথে বিদেশীর মুখের হাসি উবে গেল কিন্তু ওয়াল্টার বাটলার থামেনি। “সম্ভবত এরায় প্রমাণের সাথে যথাযথ সামঞ্জস্যশীল নয় তবুও মি. ওয়েবস্টারের বাক পটুতাকে নরকবাসী সম্মান করে।”
মোরগের ডাক সকালের ধুসর আকাশটাকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিল। জর্জ ও জুরিবর্গ কামরা থেকে বের হয়ে গেল একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মত যেন তারা কখনো এখানে ছিল না। বিদেশী দানিয়েল ওয়েবস্টারের দিকে ফিরল এবং একটুকরো বিকৃত হাসি হেসে বলল, “মেজর বাটলার একজন ধৃষ্ট লোক। আমি ভাবিনি সে এতটা ধৃষ্ট হতে পারে। যাহোক, আপনার প্রতি আমার অভিনন্দন, যেরকম দু’জন ভদ্র লোকের মধ্যে হওয়া উচিৎ।”
“যদি কিছু মনে না করেন” দানিয়েল বললেন, “প্রথমত কাগজটা চাইব।” তিনি চুক্তিপত্রটা নিয়ে চার টুকরো করে ফেললেন। “আর এখন আপনাকে দরকার।” তাঁর একটা হাত ভাল্লুকের মত বিদেশীর একটা বাহুকে আঁকড়ে ধরল।
বিদেশী হাত মুচড়িয়ে ছুটতে চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। “উহ্ মি. ওয়েবস্টার ছাড়–ন। অর্থস্বল্পতা হাস্যকর। যদি আপনার সমস্যা হয় তবে ব্যয়ভার আমিই বহন করব। তাহলে আমিও গর্ববোধ করতাম।”
“অবশ্যই আপনিই বহন করবেন” দানিয়েল বললেন, “আপনি বসুন, এইমর্মে একটা প্রমাণপত্র করে দিয়ে যান যে, আর কখনো জাবেজ স্টোনকে বিরক্ত করবেন না এমনকি তার চুলটিকেও না। আর কেয়ামত পর্যন্ত অন্য কোন নিউ হ্যাম্পশায়ারকেও নয়। যে কোন নরক আমরা আমাদের রাজ্য থেকে উপড়ে ফেলে দেব। কোন বিদেশীর সাহায্য ছাড়াই আমরা তা পারব।”
“উহ্! তারা কখনো সফল হবে না। কিন্তুÑ উহ্ Ñ আমি মেনে নিলাম।”
বিদেশী বসল এবং একটা দলিল করে দিল। কিন্তু দানিয়েল ওয়েবস্টার তার কলার ধরে রাখলেন।
“এখন আমি যেতে পারি?” লোকটি বলল নরম কণ্ঠে। দানিয়েল ওয়েবস্টার দেখে নিলেন দলিলটা যথযথ কিনা।
“যাবেন?” দানিয়েল তাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বললেন, “আমি ভাবছি আপনার সাথে আমার কিরূপ ব্যবহার করা উচিৎ কারণ আপনি লেনদেনটা মীমাংসা করে দিলেও আমার সাথে আপনার কোন মীমাংসা হয়নি। আমি ভাবছি আপনাকে মার্শফিল্ডে নিয়ে যাব।” একটু ভেবে আবার বললেন, “সেখানে গোলিয়েথ নামের একটা মেষ আছে। গুতিয়ে লোহার দরজা ছিদ্র করতে পারে। আমি আপনাকে তার সামনে ছেড়ে দিয়ে দেখতে চাই সে আপনাকে নিয়ে কি করতে পারে।”
এরপর বিদেশী অনুনয় বিনয় শুরু করল। এতটা নরম হয়ে লোকটা অনুনয় করতে থাকল যে দানিয়েল ওয়েবস্টারÑ সত্যিকারের একজন নরম দিলের মানুষ, শেষে তাকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। বিদেশীকে প্রচণ্ড কৃতজ্ঞ মনে হল। বন্ধুসুলভ মনোভাব দেখিয়ে সে দানিয়েল ওয়েবস্টারের ভাগ্য গণনা করতে চাইল। তিনি রাজি হলেন যদিও এর আগে কখনো ভাগ্য গণনা করেননি।
তাঁর কাছে বিদেশীকে কিছুটা অন্যরকম মনে হল। সে গর্বিত চিত্তে দানিয়েলের হাতের রেখাগুলো দেখতে থাকল। সে অনেকগুলো লক্ষণীয় ঘটনার কথা বলল কিন্তু সবই অতীতের ঘটনা।
“সবই তো অতীতের কথা এবং সত্যই বটে। ভবিষ্যতের কথা বলুন।”
বিদেশী খুশি হয়ে পুনরায় হস্তরেখা পাঠ করতে থাকল। “ভবিষ্যত আপনি যেরূপ ভাবছেন সেরূপ নয়। কিছুটা অন্ধকার। আপনার একটা বিরাট উচ্চাকঙ্খা আছে মি. ওয়েবস্টার।”
“হ্যাঁ, আছে” দানিয়েল সহজভাবে বললেন। সবাই জানত তিনি প্রেসিডেন্ট হতে চাইতেন।
“মনে হচ্ছে আপনার আয়ত্বের ভিতরে কিন্তু অর্জন করতে পারবেন না। সবলোক তো আর প্রেসিডেন্ট হতে পারে না আর আপনিও তা এড়িয়ে যাবেন।”
“যখন আমি প্রেসিডেন্ট হতে পারব তখনও দানিয়েল ওয়েবস্টারই থাকব। বলে যান”
“আপনার দু’জন সামর্থবান সন্তান থাকবে, ছেলে।” বিদেশী বলল তার মাথা দুলিয়ে, কিন্তু দু’জনেই যুদ্ধে মারা যাবে।”
“বেঁচে থাকুক আর মারা যাক তারা সব সময়ই আমার সন্তান।”
“আপনি অনেক মহান বানী বলেছেন। এরকম আরো বলবেন।”
“আহ! বলে যান।”
“কিন্তু শেষে এ মহান বানীগুলো আপনার বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে। তারা আপনাকে ‘আইকেবোর্ড’ (কোথায় গর্ব) বলে ডাকবে। তারা আপনাকে আরও অন্যান্য নামেও ডাকবে। এমনকি নিউ ইংল্যান্ডের কিছু লোক বলবে, আপনি বিশ্বাস ঘাতকতা করে নিজের দেশকে বেচে দিয়েছেন। আর আপনার মৃত্যুর পর তাদের কণ্ঠ আরও শক্তিশালী হবে।”
“সুতরাং বানীটি নির্ভুল, মানুষ কি বলল সেটা কোন ব্যপার নয়” দানিয়েল বললেন। তারপর তিনি বিদেশীর দিকে তাকালেন পলকহীনভাবে।
“একটা প্রশ্ন” বললেন তিনি, “আমি সারাজীবন ইউনিয়নের জন্য লড়েছি। আমি কি তাদের বিরুদ্ধে বিজয় দেখে যেতে পারব যারা এটিকে ভাঙ্গার জন্য চেষ্টা করছে?”
“যতদিন আপনি জীবীত আছেন ততদিন নয়” বিদেশী বলল মুখটা কালো করে, “কিন্তু এটা বিজয় লাভ করবে। আপনার মৃত্যুর পর হাজার হাজার লোক এর জন্য লড়াই করবে।”
“কারণ তুমি তখন দীর্ঘস্থায়ী বন্ধি, কুচকানো গাল ভাগ্যগণনাকারী।” দানিয়েল ওয়েবস্টার উচ্চ হাসিতে ফেটে পড়লেন। বললেন, “থামো, তোমাকে আগে মূল্যায়ন করার স্থানটা ঠিক করে নেই! কারণ মাত্র তেরটি কলনী নিয়ে আমি ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করব।”
তিনি নিজের একটা পা পিছনের দিকে টেনে নিয়ে গেলেন তাকে একটা লাথি মারার জন্য। কিন্তু লোকটি তার কালেক্টিং বক্স নিয়ে উড়াল দেয়ার মত করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
“তারপর, দেখি জগে কি আছে। সারারাত কথা বলার মত শুকনা কাজ করেছি” জাবেজ স্টোনকে অচেতন অবস্থা থেকে জাগতে দেখে তিনি বললেন, “মি. স্টোন, মনে হয় নাস্তা করার মত কিছু পিঠা আছে।”

সবাই বলে যে, যখনই শয়তান মার্শফিল্ডের নিকটে আসে, সবসময় তাকে এড়িয়ে চলে। তারপর হতে আজ পর্যন্ত তাকে নিউ হ্যাম্পশায়ারের এ তল্লাটে দেখা যায়নি। অবশ্য মেসাচ্যুসেট কিংবা ভারমন্টের কথা আলাদা।

অগাষ্ট 7, 2011

সাহস এবঙ জলপাইড্রাগন

স্বৈরশাসনের বিপক্ষে অবস্থানকারী ছাত্রদের জন্য

আফসার নিজাম

আমরা অনুভব করতে পারছি একটি সাহস ক্যাটওয়াক করে ধীরে ধীরে উঠে আসছে আমাদের মাঝে। সূর্যালোকের রোদে যেমন করে গাছের ছায়া মাটিতে লম্বা হতে থাকে ঠিক তেমনি আমাদের ভেতরে সাহস বড় হয়ে প্রবেশ করতে থাকে হৃদয়ের ভেতর। সাহটা পায়ের কাছ থেকে উঠে এসে বুকের মধ্যখানে আসন নেয়। তারপর আরো শক্তি অর্জন করে আমাদের ঘাড়ের শাহীরগের মাঝে সঞ্চালিত হয় আর ‘চির উন্নত মম শির’ বলে বুক টান করে দাঁড়ায়। সাহস দাঁড়িয়ে গেলে সকল ভয় উবে গিয়ে ধু ধু প্রান্তর ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। চোখের প্রিজমে তখন খেলা করে মুক্তির নেশা।

অগাষ্ট 7, 2011

লালরঙ মাটির শরীর

মাহমুদ বিন হাফিজ

সাতটা চলমান জমাট অন্ধকার স্থির হয়ে গেলে হঠাৎ মনে হয় অনেক্ষণ থেকে একটা সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। আমার ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে সমর্থন দানের জন্য আমি বন্ধুদের জিজ্ঞেস করি, “একটা চমৎকার গন্ধ পাচ্ছি, তোমরা পাচ্ছ?”
অন্ধকারের নড়াচড়া দেখে আমি বুঝে নেই সবাই পলকের জন্য আমাকে দেখে নিয়েছে। ঘুটঘুটে আঁধারে সবকিছু জমানো অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নয়। ঠিক কাকের ডানা থেকে নিংড়ে অন্ধকার বানানো। চেহারা দেখা যায় না যদিও, আমার মনে হয় সব বন্ধুরা আমার কথা শুনে শিউরে উঠেছে যা তাদের নিরবতা প্রমাণ করে। একটা অন্ধকার আমার দিকে এগিয়ে এলে আমি বুঝতে পারি কে সে। তবুও নিশ্চিত হতে প্রশ্ন করি, “কে? জাফর? কিছু বলবে?

জুন 3, 2011

দুটি শব্দের ব্যাসার্ধ এবং আবর্তন


মাহমুদ বিন হাফিজ

উপমার মুখের দিকে তাকাতেই দেখি আমার বুকে বিশাল গর্ত। বিশুষ্ক সেই গর্তটা গভীর হচ্ছিল আর পরিপার্শ্বকে সাপেক্ষ করে বিশাল থেকে বিশালতর হচ্ছিল যেন খোদ আটলান্টিক পানিশূন্য কিংবা শূন্যতা আটলান্টিকের মত। শৈশবের তিরতিরে ধারা আর বর্তমানের সমস্ত নির্ঝরণী বাহিত বস্তুপুঞ্জ একিভূত হয়ে বিশালাকৃতি তলদেশে সুউচ্চ ভিসুভিয়াসের জন্ম দিল। সরলরৈখিক সময়ের এক নির্ধারিত ব্যবধানের পরÑ না, আমার সময় ছিল বক্ররেখা, সমতলের মধ্যে, কখনো কখনো গভীর জলাভূমির তলদেশে নেমেছিল, তারই এক তাৎক্ষণিক মুহূর্তে যখন আজ উপমার সামনে বসেছিলাম, সুপ্ত ভিসুভিয়াসে এক নিরব অগ্নুৎপাত ঘটে গেল। শীতল, গরল আর তরল লাভায় গর্তটা ভরে গেল নিমিষে, আমার গন্ডদেশ উপচে আমারই সামনে ঢেকে গেল উপমার জলজ্যান্ত যৌবন, শীতল জোসনায়ীত চোখ, কারুকার্র্যময় মানচিত্র আর দোলায়ীত নিতম্ব।
অসহ্যের সীমারেখা আমার কণ্ঠনালীকে ফাটিয়ে দিতে যাচ্ছিল যখন, দেখি আমার সামনে উপমার ছায়াশরীর কিংবা উপমা স্বয়ং। আমি ছুঁয়ে দেখলাম! উহ! কি ভয়ংকর বাস্তবতায় গড়া উপমার শরীর! এ বাস্তবতার এমনি আবেশ যা সমস্ত বাস্তবতাকে অবাস্তব করে দেয়।
তখনÑ হ্যাঁ, তখন হঠাৎ প্রশ্ন জাগে, উপমা কে? আমার কাছে তার পরিচয় কি? আত্মার সাথে তার কোন শ্রেণীর সম্পর্ক? জবাবগুলি মিলাতে গিয়ে দেখি উত্তর বিভিন্ন রকম! মাল্টিফিল চয়েজ কোয়েশ্চেন! জবাব খুঁজতে গিয়ে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লেও আমার সামনে উপমা নির্বাক। উহ! কি অসহ্যের ছিল সে মুহূর্তগুলি!

জুন 3, 2011

তুষার কন্যা


রেহনুবা নিজাম

সে অনেক দিন আগের কথা। তুষার আবৃত্ত এক রাজ্যে বাস করতো রাজা আর রাণী। তাদের কোনো সন্তান হয় না বলে প্রজারা তাদের এড়িয়ে চলতো। পাছে তাদের দেখলে যাত্রাভঙ্গ হয়। সন্তান হয় না বলে তাদের মনেও রাজ্যের ব্যথা এসে ভর করে। তাই রাজা মনের দুখে রাজ্য ছেড়ে হিমালয়ে চলে যায়। হিমালয় পাহাড়ের কোল ধরে হাঁটতে হাঁটতে এক দরবেশের দেখা পেয়ে রাজা তাঁকে জিজ্ঞেস করে। ‘আপনি কি বলতে পারবেন আমার সন্তান হবে কি না।’ দরবেশ বলল, ‘বাবা হতাশ হচ্ছো কোনো। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো। সে সব পাড়ে। তুমি রাজ্যে ফিরে যাও। দেখো আল্লাহ কি করেন।’ রাজা দেশে ফিরে এসে দেখে রাণী অন্তসত্বা, মা হবে। রাজা আনন্দে রাজ্যের প্রজাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করে। এভাবে চলতে থাকে এক মাস নয় দুই মাস নয় পাঁচ পাঁচ মাস।

সেদিন বাইরে অনেক ঠান্ডা। আকাশ থেকে পড়ছে তুষার। রাণী তখন জানালার সামনে বসে অনাগত সন্তানের জন্য কাঁথা সেলাই করছে। হঠাৎ তার হাতের আঙুলে সুঁই ফোটে এক ফোঁটা রক্ত বের হয়। বাইরে থেকে একফালি তুষার এসে কাঁটাস্থানে পড়ে। রাণী এ দৃশ্য দেখে ব্যথা ভুলে যায় আর মনে মনে ভাবে; আমার যদি রক্তের মতো লাল ঠোঁট, তুষারের মতো শাদা একটি মেয়ে হতো। ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়ে।

জুন 1, 2011

শিয়াল রাজা

সুমাইয়া বরকতউল্লাহ্

 

এক বনে ছিল এক শিয়াল। তার কেন জানি ইচ্ছা হলো সে রাজা হবে। তাই সে ভাবতে থাকে কিভাবে বনের রাজা হওয়া যায়।

শিয়ালের আছে এক বউ। সে বলল, বউ আমার রাজা হওয়ার খুব ইচ্ছে। বল তো আমি এই বনের রাজা হতে পারি কিভাবে।

শিয়ালনী বলে, ইশ, রাজা হওয়া এতো সোজা না। বুঝেছ এবার?

শিয়াল বলে, আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি এ বনের রাজা হয়ে গেছি। কিন্তু কিভাবে যে বনের রাজা হবো, সেটাইতো বুঝতে পারছি না। আচ্ছা শিয়ালনী তোমার না সাতছালা বুদ্ধি আছে? আমাকে একছালা বুদ্ধি ধার দাও। আমি কোনোমতে রাজা হয়ে যেতে পারলে পরে তোমার বুদ্ধি তোমাকে ফেরৎ দিয়ে দেব। বুঝেছ?

শিয়ালনী তার কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসে। শিয়ালনী বলে, তুমি তো আমাকেই ঠিকমতো খাওয়াতে পার না। তো বনের রাজা হলে পরে এতো এতো প্রজাদের তুমি চালাবে কিভাবে, হেহ্?

শিয়াল বলে, একবার রাজা হয়ে গেলে পরে সেটা দেখা যাবে নে। এখন আমাকে রাজা হওয়ার বুদ্ধি দাও তুমি।

শিয়ালনী বলে, আচ্ছা তোমাকে বুদ্ধি দিয়ে রাজা বানালে পরে তুমি রাজ্যটা চালাতে পারবে কি না সেটা আমার পরীক্ষা করে দেখতে হবে। তুমি রাজি?

শিয়াল বলে, দেখো, বনের রাজা হওয়ার জন্য আমি অনেক কিছুই করতে পারব। বলো, কী করতে হবে আমার।

শিয়ালনী বলে, ওই যে একটা গ্রাম দেখা যায়, ওই গ্রাম থেকে যদি তরতাজা হাঁস আর মুরগী এনে খাওয়াতে পার তবেই বুঝব যে তুমি রাজা হতে পারবে।

শিয়াল ওই গ্রামের দিকে তাকিয়ে বলে, যা থাকবে কপালে। আমি আজই হাঁস আর মুরগী নিয়ে আসব। আচ্ছা?

শিয়াল গেল গ্রামে। গভীর রাত। সবাই আছে ঘুমিয়ে। চুপি চুপি মুরগীর খোপের কাছে গেল শিয়াল। সে অনেক কায়দা করে খোপের একটা ডালা ফাঁক করে ঢুকে পড়ল। একটা মুরগী খপ করে ধরে দিল এক দৌড়। অমনি টের পেয়ে গেল কয়েকটা কুকুর। তারা ঘেউ ঘেউ করে ছুটল শিয়ালের পিছে। কুকুরের সাথে আর পেরে উঠছে না শিয়াল।

কুকুরেরা কামড়ে ধরল শিয়ালকে।শিয়ালের আছে বুদ্ধি। তাই শিয়াল বুদ্ধি করে বলে, দেখো, এভাবে কামড়াকামড়ি করে তোমাদেরও লাভ নেই, আর্মাও লাভ নেই। এরচেয়ে ভাল তোমাদের একটু মাংস দেই, তাই মজা করে খাও। এ কথা শুনে কুকুরের জিহ্বায় পানি এসে গেল। কুকুর সুরুৎ করে পানি গিলে বলে, আচ্ছা তাই করো, দেও, দেও খাই। শিয়াল বলল, একটু না, পুরোটাই নেও। এই বলে শিয়াল পুরো মুরগীটাই দিয়ে দিল কুকুরকে। কুকুরেরা খুশি হয়ে বলে, তুমি তো পাকা শিকারী। তুমি চুরি করবে আর আমাদের ভাগ দিবে। আমরা তোমাকে বাধা দিব না। কুকুরেরা টানাটানি করে মুরগীটা খাচ্ছে। এইফাঁকে শিয়াল চলে গেল গিরস্থের বাড়ি। সে এবার একটা মুরগী আর একটা হাঁস চুরি করে নিয়ে গেল বনে।

শিয়ালনী তো মহা খুশি! শিয়ালনী সবকিছু শুনল। সে বনের সকল শিয়ালকে খাওয়াল দাওয়াত করে। সবাই পেটভরে খেয়ে খুশি হয়ে গেল।

শিয়ালনী সবাইকে বলল, আমার স্বামী অনেক সাহসী আর বুদ্ধিমান। আজ তোমরা মজা করে যে তাজা হাঁস-মুরগীর মাংস খেলে তা কোথা থেকে এলো আর কে এনেছে, কীভাবে এনেছে, জানো?

সবাই চোখ বড় করে বলল, না, আমরা এর কিছুই জানি না।

শিয়ালনী গর্ব করে শিয়ালকে দেখিয়ে বলে, এগুলো এনেছে আমার স্বামী এই শিয়াল। পাশের যে গ্রামে তোমরা পাগলা কুকুরের ভয়ে ঢুকতেই পার না, সে সেই গ্রাম থেকে এনেছে এই হাঁস আর মুরগী। শুধু তাই নয়, এ বনে যখন খাদ্য সমস্যা দেখা দেয় তখন তোমাদের খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে এই সাহসী শিয়াল। বুঝেছ তোমরা?

সবার মুখ তখন আনন্দে চিকচিক করে উঠল। তারা বলল, আমরা এই সাহসী শিয়ালকে ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানাই।

শিয়ালনী বলে, শুধু ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা দিলেই তো হবে না। এই সাহসী আর বুদ্ধিমান শিয়ালকে উপযুক্ত সম্মানও দিতে হবে। কি বলো তোমরা?

ওরা বলল, ঠিক বলেছ তুমি, সম্মানও দিতে হবে।

শিয়ালনী বলে, এই সাহসী আর বুদ্ধিমান শিয়ালের সেবা পেতে চাই। আমরা নিরাপদে থাকতে চাই। আর তাই এই শিয়ালকে বানাতে পারি আমাদের রাজা। তখন তিনি এ বনের সকল শিয়ালের বিপদে কাজে লাগবেন। আর প্রয়োজনে ওই গ্রাম থেকে তাজা হাঁস-মুরগী এনে আমাদের মজা করে খাওয়াতেও পারবেন। কী বলো তোমরা?

সবাই রাজি হয়ে গেল। তারা বলল, এখন থেকে আমরা তাঁকে রাজা মানলাম।

শিয়ালেরা আনন্দে নেচে নেচে ”আমার রাজা-তোমার রাজা, শিয়াল রাজা-শিয়াল রাজা” শ্লোগান দিতে দিতে চলে গেল যার যার বাসায়।

জুন 1, 2011

মৌলভি আবদুল হালিম মাষ্টারের অনুজীবনী

মাহমুদ বিন হাফিজ

আদি বৃত্তান্ত

পিতৃদত্ত নাম আবদুল হালিম। চাঁদপুর জিলার ফরিদগঞ্জ থানাধীন ঝাউকাঠালী গ্রামের বিখ্যাত ব্যাপারী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বংশানুসারে তার নাম হয় আবদুল হালিম ব্যাপারী। পিতার নাম আবদুর রহিম ব্যাপারী, মাতার নাম রসিমন বিবি। অনেক আগেই এ মহামূল্যবান মনিষির জীবনী গ্রন্থাকারে প্রকাশ হওয়ার প্রয়োজন ছিলো। কালান্তরে অনেক মূল্যবান বিষয়াদি সময়ের গভীরতা থেকে উদ্ধার করা সহজ হবে বলে মনে হয় না। আমাদের পণ্ডিতগণের অবহেলার দরুণ গ্রাম-গ্রামান্তরের কত মূল্যবান মনিষির মহামূল্যবান কত কত আদর্শময় জীবনীগ্রন্থ হতে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম বঞ্চিত হচ্ছে। এর জন্য তারা অবশ্যই আল্লাতালার কাছে দায়ী থাকবেন। আমরা আপাতত তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী ও তাঁর বিশেষ বিশেষ চিন্তা চেতনার কিছু কথা উল্লেখ করেই ক্ষান্ত দিবো।

 

শিশুকাল থেকে যৌবনকাল ও পড়াশোনা

তাঁর শিশুকাল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়নি। জন্মের সময় তাঁর মুখখান ছিলো চাঁদের মতোন। শৈশবে তিনি পিতা-মাতা ও ভাই-বোনদের খুব আদর পেতেন। অনেকে মনে করেন তিনি ছোট ছিলেন বলে সাবাই তাঁকে এত আদর করতো। তাঁর পিতার খুব নাম ডাক ছিল এলাকার মধ্যে। সেই সূত্র ধরে তিনি পাড়া-প্রতিবেশীরও আদরের পাত্র ছিলেন। সবচে বেশী আদর করতেন তাঁর দাদাজান। তিনি বড় হয়েও তাঁর দাদাজানকে ভুলতে পারেননি। (তাঁর দাদাজানের নামটি লেখক এমুহূর্তে স্মরণ করতে পারছেন না বলে দুঃখিত)। তিনি সবসময়ই সেসব আদর আপ্পায়নের জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। লোকে বলে তিনি চার বছর বয়সে বর্ণমালা শিখতে সমর্থ হয়েছিলেন আর পাঁচ বছর বয়সে আমসিপারা শেষ করেছিলেন। এখান থেকে তার অসাধারণ মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। ছয় বছর বয়স থেকে তিনি কিছু কিছু দুষ্টুমি করা শুরু করেন। তিনি কোন পাখির বাসা ভাংতেন কিনা তা জানা যায়নি। তবে শৈশব হতেই তিনি যে খেলাধুলায় মনোযোগী ছিলেন তার পারিচয় মেলে। তিনি দাবি করতেন, ছোটকালে তিনি কারো কোন কিছুতে বিনা অনুমতিতে হাত দিতেন না। এর জন্য তিনি সবসয়ই সাক্ষী হিসাবে এলাকাবাসীদের সম্মানের সাথে স্মরণ করতেন। অবশ্য এবিষয়ে কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করা বাঞ্ছনিয় মনে করেনি।

 

পল্লীর আর সব ধার্মিক পিতা-মাতার মত তাঁর পিতা-মাতাও চেয়েছিলেন তাদের পুত্রসকল টাইটেল পাশ করে বড় বড় আলেম হবেন। শর্শিনার পীর হুজুর কিবলা বলেছিলেন, আওলাদ যদি ধার্মিক ও আলেম হয় তবে পিতা-মাতার বেহেস্ত নসীব হয়। তাঁদের পুত্রসকলের বদৌলতে যদি তাঁদের বড়-ছোট গুনাহখাতা ক্ষমা হয়ে যায়, তাদের বেহেস্তে যাওয়া সহজ হবে। তারা তাঁদের কবরের আজাব মাপের জন্য দোয়া করতে পারবে। তাই তাঁরা তাঁদের পুত্রসকলকে একে একে মাদরাসায় ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু খোদাতালা সবাইকে দিয়ে আশা পূর্ণ করেন না। তাই চোখ-কান ফোটার পর পরই বড়, মেঝো ও সেঝো ছেলে এলেমের রাস্তা ছেড়ে দিয়ে বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী ‘ব্যাপারী’ পেশা ধরলো। আর তাঁদের সকল আশা-ভরসা পুঁঞ্জিভূত হলো তাঁদের ছোট ছেলের উপর। তাঁদের দোয়া, আশা-ভালোবাসার জোরে তিনি আলিয়া মাদ্রাসায় ফাজিল পর্যন্ত পড়তে পারলেন। এভাবে তিনি মৌলভি হলেন। তাঁর নামটির সাথে তখন থেকে মৌলভি যুক্ত হলো। তিনি হলেন মৌলভি আবদুল হালিম। যেহেতু তিনি মৌলভী হলেন তাই তিনি নাম হতে ‘ব্যাপারী’ শব্দটি মুছে দিলেন। তার ভায়রা ভাইয়ের ছেলে তার বিষয়ে জানালেন, “তিনি শপথ করে বলতেন, তিনি কখনো তার আগের ক্লাশের বই বিক্রি করে চকলেট কিংবা চা-দোকানে চা খাননি। কিংবা সে বই বিক্রি করে নতুন বই কেনেননি। পুরনো বই তিনি আল্লার ওয়াস্তে দিয়ে দিতেন কোন গরীব তালেবে এলেমকে। তিনি তাঁর ছেলে-মেয়েদের বইও কখনো বিক্রি করেননি।” বলতেই হয় এটা তার একটা মহৎ গুণ। যৌবনকালে তিনি কোন প্রকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন না। তাঁর এসময়ের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো ফাজিল পাশ করা। তাই এ পর্যায়ে তাঁর বিবাহ ছাড়া আর অন্য কোন বিষয়ে প্যাঁচাল পারা ঠিক হবে না।

 

বিবাহ ও তৎসংলগ্ন সময়

বিবাহপূর্ব সময় হতে তিনি ফরিদগঞ্জ বাজারের অল্পদূরে মতিপুর গ্রামে লজিং থাকতেন। তখনকার সময়ে এখনকার মতোন পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে মাদরাসা ছিলো না। এমনকি সকল থানা শহরেও ছিল না। এ ব্যাপারে ফরিদগঞ্জ থানাকে ভাগ্যবান বলতে হয়। সঙ্গত কারণে তখন মাদরাসা পড়–য়া ছাত্রদেরকে দূর-দূরান্তে পড়তে যেতে এবং লজিং থাকতে হতো। মৌলভি আবদুল হালিম মতিপুর গ্রামে লজিং থাকতেন কিনা সে বিষয়ে পণ্ডিতগণের মতবিরোধ আছে। তবে তার বৈবাহিক জীবন এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ড হিসাব-নিকাশ করলে এটা প্রমাণ মেলে যে তিনি এ গ্রামেই লজিং ছিলেন। তিনি এ গ্রামের কোন্ বাড়িতে লজিং থাকতেন তা নিয়েও ছয়জনের মধ্যে নানা রকম মতবিরোধ আছে। প্রমাণাদি বিশ্লেষণ করে এ লেখক স্থির হতে পেরেছেন যে তিনি পশ্চিম তরপদার বাড়ির দক্ষিনে, পাটওয়ারী বাড়ির উত্তরে, ডাকাতিয়া নদীর পুর্বপাড়ে অবস্থিত মসজিদওলা বিখ্যাত মুন্সিগাজীর বাড়িতে লজিং ছিলেন। এবাড়ির একজন বাসিন্দা স্বনামধন্য মুন্সি মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম গাজী যিনি এখন অবস্থান করছেন মৃত্যুর ওপারে। এ মুন্সিগাজী পরিবারের সাথে গভীর সম্পর্ক বিরাজ করছিলো তরপদার বাড়ির মাওলানা আবু নাসের মুহাম্মদ ঈসা খাঁ সাহেবের পরিবারের সাথে। স্বাভাবিক ভাবেই এ দুপরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক যাওয়া-আসা ছিলো। এখান থেকেই মাওলানা ঈসা খাঁ সাহেবের বড় মেয়েকে দেখে পছন্দ করে ফেলেন মৌলভি আবদুল হালিম। এরপর প্রস্তাব তারপর মঞ্জুর অবশেষে বিয়ে। কিছু দিন পর তার ফাজিল পরীক্ষার ফলাফল বের হলে তাকে পড়ালেখা শেষ করতে হলো, কারণ এখন আর তিনি একা নন। তাঁর এখন একটি পরিবার আছে। তার ভোরন-পোষন তাঁকে করতে হবে। ইতিমধ্যে তাঁর একটা চাকরিও হয়ে গেলো। একটা সম্মানজনক চাকরি। নিজ গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের সাধারণ শিক্ষক হিসাবে নিয়োগকৃত হলেন। এ মহান পেশায় আত্মনিয়োগ করতে পেরে তিনি খোদার কাছে শোকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য দুরাকাত নামাজ পড়েছেন কিনা তা জানা যায়নি। তবে এ চাকরীর কথা উঠলেই তিনি একবার আলহামদুলিল্লাহ পড়তেন অত্যন্ত আবেগ ভরে। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মাস্টার হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। তখন থেকেই তিনি হয়ে গেলেন মৌলভি আবদুল হালিম মাস্টার।

বলছিলাম তাঁর পরিবারের কথা। সহজ-সরল-পরিশ্রমী হাসনা বেগমকে সঙ্গি করে তাঁর সাংসারিক জীবন অতিব সুখের সাথে অতিবাহিত হতে থাকলো। তাঁরা দুটি সন্তানের বাবা-মা হলেন। বড়টি মেয়ে এবং ছোটটি ছেলে। মেয়েটি একেবারে পরীর মত  খুবসুরত আর ছেলেটি সন্দেহাতীত রাজপুত্তুর। এ সময় কিম্বা তার কিছু আগে বা পরে তাঁর ডান হাতটি অকেজো হয়ে যায়। তাঁর ছোট ভাইয়ের সাক্ষাতকার হতে জানা যায়, তিনি যখন খেরের পালা দিচ্ছিলেন তখন প্রায় দুহাত উপর হতে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে ফেললেন। হাতটি পরে কাঠির মত চিকন হয়ে গেলো এবং হাঁটলে সরল দোলকের মত সরল ছন্দিত স্পন্দনে ঝুলতে থাকতো। এটি দিয়ে তিনি কিছুই করতে পারতেন না। তারপর হতে তিনি বাম হাতে লেখতে শেখেন। তাঁর বাম হাতের লেখা তার ডান হাতের লেখার চেয়ে কঠিন রকম সুন্দর। তিনি খেতেনও বাম হাতে। তাঁর একটা হাত ভাঙা থাকলেও হাসনা বেগম পাশে থাকায় তিনি হাতটির অভাব বোধ করেননি কখনো।

 

প্রথম বউয়ের মৃত্যু ও দ্বিতীয় বিয়ে

তাঁর সুখ বেশি দিন টিকলো না। তিনি ঠিক বুঝতে পারেননি যে খুব সামনেই তাঁর জন্য বিরাট একটা পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। আল্লাতায়ালা হাসনা বেগমকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য মনোনিত করলেন। তাই অল্প কয়দিন হাসনা বেগম কোন অজ্ঞাত রোগে ভুগে পরপারে আল্লাতায়ালার কাছে গমন করলেন। দুই শিশু সন্তান নিয়ে মৌলভী আবদুল হালিম মাষ্টার অকুল পাথারে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। এ শিশু সন্তান দুটিকে পেলে পুষে বড় করতে হবে। এটাতো তাঁর কাম নয়। এটা একজন মায়ের কাম। তা ছাড়া তিনি তখনো একজন কমবয়েসী যুবক মাত্র। একটা বউ ছাড়াতো তাঁর চলতে পারে না। এদিকে সন্তান দুটির দিকে তাকিয়ে যেন তেন একটা মেয়েকে বউ করে নিয়ে আসবেন, সেটাইবা কি করে পারেন। তাছাড়া দ্বিতীয় বিয়েতে সলিড মেয়েতো আর কেউ দিতে চায় না। চিন্তায় যখন তিনি খাবি খাচ্ছিলেন তখন হঠাৎ তাঁর মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। তাঁর একটি খুবসুরত শ্যালিকা আছে। যদি তাকে বিয়ে করা যায় তবে সাপও মরে লাঠিও ভাঙে না। সে নিশ্চয়ই আপন বোনের ছেলে-মেয়েকে নিজের মনে করে লালন-পালন করবে। তার উপরে বোনাস হিসাবে সে কুমারী। যেই মত ভাবা সেই মত কাজ। তিনি নিজে গিয়ে নানাভাবে কৌশল করে তার শাশুড়িকে বোঝাতে সমর্থ হলেন। তার শাশুড়ি সুচতুর এবং উঁচু মানের একজন উদার মেয়েমানুষ ছিলেন। তিনি বাস্তবতা বুঝতে পেরে ইতিবাচক রায় দিলেন। সুতরাং তের কি চৌদ্দ বছর বয়সের সুরাইয়া বেগমকে তিনি বউ করে ঘরে উঠালেন। এ বিয়েতে সুরাইয়া বেগমের মতামত কিংবা চিন্তা-ভাবনা কি ছিলো তা এখানে অপ্রাসঙ্গিক বিধায় বিস্তারিত আলোচনা করা সঙ্গত নয়। তবে লেখক যখন সুরাইয়া বেগমের সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন, “আমি তাদের (বোনের ছেলে-মেয়ে) জন্য সোনার যৌবন কালি করছি”। এ থেকে বোঝা যায় ওরা না থাকলে তিনি কখনো এ বিয়ের পিড়িতে বসতেন না। অবশ্য এটাও বিবেচনার বিষয় যে তের-চৌদ্দ বছরের একটি কিশোরী কতটুকুইবা বোঝে। তখন গ্রাম-বাংলার মেয়েরা বাবা-মায়েদের কাছে এ ব্যাপারে একেবারেই অসহায় ছিলো। তাদের পছন্দ-অপছন্দের কোন গুরুত্বই ছিলো না। তা ছাড়া এতো অল্প বয়সে তাদের বিয়ে দেয়া হতো যে তাদের কি পছন্দ করা উচিৎ আর কি উচিৎ নয় তাই বুঝতো না। এখনো যে এ অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে তা নয়। তবে অবস্থার উন্নতি হয়েছে এটা সত্য। সুরাইয়া বেগম তার সংসারে লক্ষি হয়ে প্রবেশ করেন। তাঁর সংসারে অর্থনৈতিক উন্নতির ধারা বয়ে যেতে থাকে। জমিতে বেশি বেশি ফসল ফলতে থাকে। আঙ্গিনায় অধিক পরিমাণে তরিতরকারি উৎপাদন হতে থাকে। ফলফলাদির গাছ তরতর করে বড় হতে থাকে এবং তাতে বেশি বেশি ফল ধরতে থাকে। কালাধিক্রমে মৌলভি আবদুল হালিমের মাস্টারের বেতন-ভাতাও বাড়তে থাকে। তার দোচালা বাঁশের ঘরটি চৌচালা শূন্যঘরে (খুটি মাটিতে পোঁতা নেই এমন বড় ঘর) পরিণত হয়। তাঁর সাংসারিক সুখ গুণত্তর প্রগমনের মত অসীম ধারায় বইতে থাকে যা এখন পর্যন্ত তাঁর উত্তর পুরুষেও সমানভাবে বহমান। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে তাঁর আরও চার সন্তান আছে যার মধ্যে দুজন ছেলে আর দুজন মেয়ে। সবচে বড়টি আর সবচে ছোটটি মেয়ে। তাঁর সবকটি মেয়েকেই তিনি শরিয়তের বিধি মোতাবেক চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন। শরিয়তের বিষয়ে তিনি কোন প্রকার ক¤প্রমাইজ করতে রাজি নন যদিও ইসলাম সমর্থিত কোন রাজনৈতিক দলকে তিনি দুচক্ষেও দেখতে পারতেন না। সর্বপরি তিনি একজন আলেম মানুষ। টাইটেল পাশ করলে এবং তৎপরে জ্ঞান অর্জন অব্যহত রাখলেই যে আলেম হবে এ ধারণা তাঁর মতে ঠিক নয়। ফাজিল পাশ করলেই তাকে আলেম বলা উচিৎ। কিতাব পড়েই আলেম হতে হবে এমনটা কোন্ কিতাবে আছে? বড় বড় আলেদের কথা শুনেওতো আলেম হওয়া যায়। তিনি ফুরফুরার হুজুর কিবলার একজন ভক্ত ছিলেন। ফুরফুরার হুজুরের কোন ওয়াজের জলসা তিনি যেহেতু বাদ দেন না সেহেতু ধরতে হয় তার জ্ঞান চর্চা অব্যহত আছে। সেই হিসাবে তিনি অবশ্যই একজন আলেম ছিলেন। তাঁর এ ধারণার দার্শনিক মূল্য অনেকেই দিতে চান না। দেশের আইনে আছে মেয়েদের আঠারো বছর আর ছেলেদের বিশ বছর হলেই কেবল তাদের বিয়ে দেয়া যাবে। কিন্তু অন্য অনেক আইনের মত এ আইনের বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কোন প্রকার পদক্ষেপ নেই। তিনি অনৈসলামিক সরকারকে মনে মনে অনেক ধন্যবাদ জানাতেন এ ধরণের বাজে আইন বাস্তবায়নের কোন প্রকার পদক্ষেপ না নেয়ার জন্য। এসব সরকারের জন্যই দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে স্ব-স্ব ধর্ম পালন করতে পারছে। তিনি বলতেন, “ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো বুঝতে চাইতেছে না যে, এখন আর রাস্ট্রিয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা যাইবোনা।”

 

অধিক সন্তান সম্পর্কে তার ভাবনা

আল্লার অশেষ মেহেরবানিতে তাঁর ছয় সন্তান। আরো দুটি সন্তান হলে তাঁর আপত্তি থাকতো না। সন্তান-সন্ততি হলো খোদার অন্যসব নেয়ামতের মত একটি নেয়ামত। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবকিছুই আল্লার হাতে। তিনি বলতেন “আল্লাতালা পূর্বেই সব আদম সন্তানের রূহ বানাইয়া ফালাইছেন। রূহ যহন আছে, দুনিয়ায় তার অবস্থান যদি না থাহে তাইলে এ রূহ থাহোনেরতো কোন মানিই অয় না। দুনিয়াতে কে কহন আইবো তাও আল্লাহ ঠিক করইয়া রাখছেন। তাইলে আমরা চাই আর না চাই যে আইবার হে আইবোই। হে যদি আমার ঘরে আইবার কথা থাহে তবে আমার ঘরেই আইবো, আপনার ঘরে কহনো আইবো না। আর আপনার ঘরে যে আইবার কথা হে কহনো আমার ঘরে আইবো না। যে আইবার হেরে আপনি হাজারবার জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খাইয়াও বাধা দিয়া রাখতে পারতেন না। যারে ঠেহাইতে পারতাছেন না তার জন্য খামাখা ট্যাহা পয়সা খরচ করাডাই অপচয়। যারা এসব জাইন্নাও জন্মনিয়ন্ত্রণ নেয় হেরা যে কাফের কোন সন্দহ নাই।”

তাঁকে একবার প্রশ্নকরা হয়েছিলো কে প্রশ্ন করেছিলেন তা জানা যায় নি  প্রশ্ন করা হয়েছিলো, “দেশে জমির পরিমাণ তো কম। এই হারে মানুষ বাড়তে থাকলে তাদের থাকার জায়গা অইবো কুন্ডায়? তাদের খাবার জন্য ফসল উৎপাদন করবো কুন্ডায়? বছরে একত্রিশ লাখ লোক বাড়ে। দশ বছরে বাড়ে সাড়ে তিন কুটি। দুই হাজার বিশ সালে মোট জনসংখ্যা অইবো সাড়ে একুইশ কুটি। এইডা ভয়াবহ ব্যাপার না মাস্টর সাব?”

মৌলভী আবদুল হালিম মাস্টার তখন বিচক্ষণতার সাথে জবাব দিয়েছিলেন, “আপনার মিয়া ইমানে দুর্বলতা আছে। আল্লার উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখেন। আল্লায় মানুষ পাঠাইবো আর হেইতাগো থাহনের জায়গা দিব না; এতটা অবিবেচক আল্লারে কেমনে ভাবলেন। বঙ্গোপসাগরে তিনডা বাংলাদেশের সমান একটা দ্বিপ গইড়া দিতে তার কতক্ষণ লাগে।”

তাঁর প্রাক্তন ছাত্র বিজ্ঞানমনা আবদুস সালাম বললেন, “স্যার, পৃথিবীতে পানির পরিমান নির্দিষ্ট। যে পরিমাণ ভূমি জাগবে সে পরিমাণ নিচু ভূমি পানিতে ডুবে যাবে। এর মধ্যে আমাদের বাংলাদেশও আছে। তার উপর মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে। পৃথিবীর জমা বরফ গলে যাচ্ছে। সুতরাং গড়ে তো কোন লাভ হবে না।”

মাস্টার সাব প্রথমে থমকে গেলেন প্রশ্ন শুনে। পরে অবশ্য তাঁর জ্ঞানের পরিচয় মিললো উত্তর শুনে। তিনি বললেন, “আল্লাহ হইলেন অপার ক্ষমতার অধিকারী। তিনিতো কিছূ পানিকে স্থায়ীভাবে অক্সিজেন আর হাইড্রেজেন বান্ইয়া দিতে পারেন।” তিনি সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন, “কি মিয়ারা, তিনি পারেন না?” উপস্থিত সবাই মাথা নাড়লেন।

এভাবে তিনি প্রতিদিন চা দোকানে, রাস্তাঘাটে, পারিবারিক আড্ডায়, যেখানে সুযোগ পান সেখানেই মানুষের ইমানের পাল্লা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করতেন। তার কথা শুনে অনেক লোকই অধিক সন্তান পয়দা করে পৃথিবীতে ইমানদার মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধির মহান পূন্যময় কাজে আত্মনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি মাঝে মাঝে মানুষজনকে বোঝানের চেষ্টা করেন অধিক সন্তান নেয়ার সুদুর প্রসারী ফজিলত। বর্তমানে আমাদের দেশ হতে যে হারে মানুষ পৃথিবীর নানা দেশে যাচ্ছে তাতে একসময় ঐসব দেশে আমাদের দেশের মুসলমান ছাড়া অন্য দেশের মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইউরোপ-আমেরিকায় এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার মাইনাস অবস্থায় আছে। সুতরাং ঐসব দেশে একসময় তাদের জাতির লোক একেবারে কমে যাবে। আর ঐ স্থান দখল করে নিবে আমাদের দেশের লোক। এখনই রাস্তার ঝাড়–দার হতে শুরু করে রাস্ট্রদুত কিংবা পার্লামেন্টের সদস্য পর্যন্ত ইউরোপের নানা গুরুত্বপূর্ন পদে আমাদের দেশের লোক ঢুকে গেছে। ভবিষ্যতে যে কি হবে তা কল্পনা করা যায় না। আমরা এক সময় ইংরাজের মত সারা বিশ্বে আমাদের শাসন কায়েম করতে পারবো। আমরাও হয়ে উঠবো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি। চুরি করে ইউরোপ-আমেরিকা যাওয়ার সময় দু-একজন সাগরে ডুবে কিংবা না খেয়ে মরে গেলে তাতে আর কতটুকুইবা ক্ষতি হয়। সর্বপরি বাঁচন-মরন হলো আল্লার হাতে। বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে যারা এরূপ আদম ব্যবসায় নিয়োজিত আছে তাদের দোষারোপ না করে সর্বাত্মক সাহায্য করা উচিত। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় অতিশয় বুদ্ধিমান মানুষ ছাড়া এরূপ চিন্তা করা প্রায় অসম্ভব। এখান হতে প্রমাণিত হয় মৌলভি আবদুল হালিম মাস্টার কত ধীশক্তি ও স্বচ্ছ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিলেন।

মে 2, 2011

অপরিহার্য রক্ত

মাহমুদ বিন হাফিজ

বাজ পড়ার মতই কাজটা তার মাথায় এসে পড়ল। তার কাঁধে এ কাজটা না এসে মাথায় একটা বাজ পড়লেও এর চেয়ে ভাল হত। কাজটা অবশ্যই তাকে করতে হবে। আকষ্মিক এ পরীক্ষার পিছনে খোদার কি উদ্দেশ্য খোদ তিনিই জানেন। ইসহাকের বিক্ষিপ্ত চিন্তার এক অসহায় অংশ এটা। শাহেদ যদি তার মুখমণ্ডলের তীব্র পর্যবেক্ষণ করত তাহলে সে বুঝতে পারত, প্রশান্ত মহাসাগরে ভয়ঙ্কর এক নিুচাপের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ইসহাকের মুখাবয়ব তাকে শাহেদের কাছে স্বাভাবিক রাখে। তারা একজন আরেক জনের হাত ধরে পাশাপাশি হাঁটছে বেড়ি-বাঁধের উপর দিয়ে।
আচমকা শাহেদ দাঁড়িয়ে পড়ে। কিছু একটা দেখছে সে। একটা গুল্মের ওপর একটা ঘাস-ফড়িং বসে আছে। তার মুখে আরেকটা ঘাস-ফড়িং। দেখতে একই রকম কিন্তু আকারে ছোট। বড়টি ছোটটিকে খেয়েই চলছে।
“যখন ছোট ছিলাম” শাহেদ বলল, “একই রকম ফড়িং ধরে একটা আরেকটাকে খাওয়াতাম। খুব আনন্দ পেতাম। আজ সে জিনিসটা দেখে অবাক হলাম।”
“রহস্যময় সৃষ্টির জন্য স্রষ্টার এক অমোঘ বিধান।” ইসহাক বলল, “তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিই চিন্তায় হতবাক করে দেয়।”
“কিন্তু আমি হতবাক হয়েছি এই ভেবে, আমার সামনে Survival of the Fittest এর কত বড় প্রমাণ! এখানে টিকে থাকে সেই যে শক্তিশালী আর যে অভিযোজিত হতে পারে।”
ইসহাকের মুখে কথা এসেও থেমে যায়। খামাখা একটা তর্কের সৃষ্টি করে লাভ কি। তর্ক করে কে নিশ্চিত করে বলতে পেরেছে যে সে জিতেছে? এটা বিজ্ঞান নয় যে চাক্ষুস প্রমাণ দেখিয়ে জিতে যাবে। এটা দর্শন। এর যেমন পক্ষের জবাব আছে তেমনি বিপক্ষেও জবাব আছে। প্রত্যেকের যুক্তিই নিজের দৃষ্টিতে সঠিক। এখানে তাই ইসহাক ঝোপ বোঝার আগে কোপ মারে না।
কিন্তু প্রকৃত ব্যপার যেটা, চরম টেনশন ইসহাককে প্রায় মাতাল করে রেখেছে। কোন রকমে সে নিজেকে সামাল দিচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে তারা প্রায় এক কিলোমিটার চলে এসেছে। এখানে তেমন লোকজনের ভীড় নেই। গার্ডেনের এদিকটায় বাঁধের উপর বিকেল বেলা অনেকে বেড়াতে আসে। ছুটির দিনে তো একেবারে ভিড় লেগে যায়। ছুটির দিন নয় বলে আজ তেমন একটা ভিড় নেই। ইসহাক শাহেদকে নিয়ে পশ্চিমমুখী হয়ে বসে পড়ে।
তাদের সামনে বিশাল প্রান্তর পানিতে টইটুম্বুর। পানির ওপর দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক হতে প্রবল বাতাস ধেয়ে এসে তাদের দেহে ঝাপটা মারছে। দু’কানের পাশে অনবরত শো শো শব্দে কে যেন বাঁশি বাজিয়েই চলছে। পানির বিশাল বিশাল ঢেউগুলো একটা কোণে তীরে এসে ঘুরতে ঘুরতে পাথরের পাটাতনের ওপর কাঁচভাঙ্গা শব্দে আছড়ে পড়ছে। অন্যসময় হলে ইসহাক এ ঢেউয়ের চঞ্চলতায় হারিয়ে যেত। অশান্ত বাতাস তাকে মাতাল করে তুলত। সৌন্দর্যের মোহমায়া একসময় তাকে অদৃশ্যের মায়াবী পদতলে নুয়ে ফেলত। কিন্তু আজ তার মন সমস্ত সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে বিষাদের মহাশূন্যে জমিন হাতড়ে বেড়াচ্ছে। কুণ্ডলী পাকানো ঢেউগুলোর ওপর ইসহাকের চোখদু’টি নিবদ্ধ কিন্তু আদৌ তার দৃষ্টি পানির ওপর নেই। তার দৃষ্টি এখন কাজ করছে না। যদিও তার চোখদু’টি খোলা। সমস্ত মস্তিষ্কই একযোগে বিক্ষিপ্ত চিন্তায় মগ্ন। একসময় চোখজোড়া শাহেদের ওপর নিবদ্ধ হয়।
শাহেদ যেন আজ নিরবতায় সংক্রমিত। পশ্চিমাকাশের অপার সৌন্দর্য দেখায় সে ব্যস্ত। ফালি ফালি পাতলা মেঘের নিচে সূর্যটি ঢাকা পড়ে আছে। মহাসাগরের ওপর কাছাকাছি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপের মত মেঘের খণ্ডগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদের কোনটি সাদা, কোনটি আবার কালচে। শাহেদ এগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে চিত্র-শিল্পীর মত। নেশায় অভ্যস্ত তার লাল চোখদু’টিকে মনে হয় আটলান্টিকের মত গভীর।
শাহেদের এ লাল চোখদু’টি রুমমেটদের কাছে তার মন মেজাজের পরিচয় দেয়। যেদিন তার চোখ টকটকে লাল ও উ™£ান্ত থাকত সেদিন তার সাথে আর কেউ কথা বলত না। চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি খাওয়ার সম্ভবনা কেউ ইচ্ছা করে ঘাড়ে তুলে নিত না। মাঝে মধ্যে রাতে রুমে ঢুকার সময় হাতে থাকত দামী মদের বোতল। দেখা যেত একটি বোতলের অর্ধেক কিংবা পুরোটাই খালি। তখন কিছু বলার অধিকার থাকত কেবল ইসহাকের। কখনো কখনো সে অবশিষ্ট পানিটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিত। শাহেদ কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত।
কখনো কখনো কড়া পানীয় অতিরিক্ত গিলে ফেলত। ফলে পেটে সইত না। টয়লেটে গিয়ে সব উগলে দিত। নেশায় ভারী শরীরটা নিয়ে আর উঠে আসতে পারত না। ইসহাক উঠিয়ে এনে শুইয়ে দিত। মশারিটা টানিয়ে দিত। টয়লেটটাও পরিষ্কার করে দিতে সে কার্পণ্য করত না। ভাইয়ের মতই যতœ করত বন্ধুটির।
এ সম্পর্ক একদিনের নয়। তারা উচ্চবিদ্যালয়ের পাঁচটা বছর একসাথে ছিল। একসাথে এস এস সি পাশ করে ইসহাক সরকারি কলেজে এইচ এস সি শেষ করে। শাহেদের বাবা ধনীলোক। ছেলেকে বেসরকারি কলেজে পড়িয়েছে বেশি খরচ দিয়ে। আবার ভাগ্য তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এক করে দেয়। কিন্তু দু’বছর পর ইসহাক আর বাল্যকালের বন্ধুকে খুঁজে পায় না। কোন শিল্পী যেন শাহেদের ইচ্ছেমত সংস্কার সাধন করেছেন। বাইরের খোলসটাকে ঠিক রেখে ভিতরের সমস্ত অস্তিত্বকে একটা নতুন সত্তায় দ্রবীভূত করে দিয়েছেন। সেই দ্রবণের প্রতিক্রিয়ায় খোলসের মাত্র রঙ পরিবর্তন হয়েছে। এককালের সহজ সরল ধার্মিক সেই খোলসের ভিতর থেকে এখন উৎপন্ন হয় ভারি ভারি পাথর যা গড়িয়ে পড়ার সময় গতিপথের সব সত্তাকে আন্দোলিত করে দিয়ে যায়। একটা নতুন নিয়মে বেড়ে ওঠার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করে। তাদের এক ভিন্নদৃষ্টি দিয়ে যায় জগৎকে ভিন্নভাবে দেখার জন্য। আর কথিত আগাছাগুলো সে বার্তা পেয়ে সকল অদৃশ্য অস্তিত্বে লাথি মেরে বাস্তবতার অস্তিত্বে তর তর করে বেড়ে ওঠে।
বরাবরই শাহেদ প্রকৃতির মনোযোগী দর্শক। সে যেন প্রতিটি সুন্দরকে তীক্ষèভাবে পর্যবেক্ষণ করে। সে কি শুধু মনোযোগের সাথে সুন্দরকেই দেখে নাকি এর মধ্যে অন্যকিছু খোঁজ করে তা কেবল সেই জানে। দেখলে মনে হবে সে যেন সকল অপরূপ শিল্পকর্মের এক সফল শিল্পীকে খুঁজছে যার তুলির ছোঁয়ায় প্রতিটি রঙ পেয়েছে তার আপন সত্তায় জীবন্ত বাস্তবতা।
“দেখ ইসহাক” বিস্ময়াভিভূত কণ্ঠে বলে, “পশ্চিমাকাশে একটা অপরূপ চিত্র ফুটে উঠেছে!”
ততক্ষণে পশ্চিমাকাশের সূর্যটা দিগন্তের মাঝে লুকিয়ে গেছে। কিন্তু তারই বিচ্ছুরিত লাল আভা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মেঘের ওপর পড়েছে। কোন বিক্ষিপ্ত আঁচড়ে যেন একটা চার রঙা ইমেজ ফুটে উঠেছে।
“এত সুন্দর যে শিল্পীর চিত্রকর্ম” ইসহাক প্রতিউত্তরে বলল, “সে শিল্পির তুলি কত মসৃণ এবং তার রঙ কত খাঁটি! কত বিস্ময়কর তার স্বপ্ন-কল্পনা!”
ইসহাক উঠে যায়। একটা ব্লকের ওপর বসে ঢেউয়ের পানিতে ওযু করে। তারপর ঘাসের ওপর নামাজ পড়তে দাঁড়ায়। নামাজে সে মনকে স্থির রাখতে পরে না। ভুল হয়ে যায়। দু’রাকাত পড়েই সে সালাম ফেরায়। পুনরায় সে নামাযে দাঁড়ায়। শুধু কেবল ফরজ তিন রাকাত পড়ে। এরূপ বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে নামাজ পড়া যায় না। সুন্নত না পড়েই ফিরে আসে।
“কিরে সুন্নত পড়লি না যে!” শাহেদ বিস্ময় প্রকাশ করল।
“না এমনি। নামাজে মন বসাতে পারছিলাম না। ভুল হচ্ছিল বারবার। মনোযোগ না থাকলে নামাজ পড়ে লাভ কি।”
ইসহাক কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায়। একবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নেয়। তখনো রাতের অন্ধকার পুরোটা নামেনি। বাঁধের ওপর কিছু লোক এখনো এখানে সেখানে বসে আছে। তবে পুরো অন্ধকার নামলে এখানে কেউ আর থাকবে না। এ বিজন এলাকায় একমাত্র প্রাণের মায়া না থাকলেই কেউ থাকতে সাহস করে। শহরতলীর এসব যায়গা সবসময়ই খারাপ।
রাত তার নিজের গতিতে নেমে এলেও ইসহাকের মনে হয় সময়ের চাকা কে যেন জ্যাম করে রেখেছে। সময় যতই যাচ্ছে তার বুকের ভিতরে কারো দুরমুশ পিটানোর শব্দ ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তপ্ত ইস্পাতের ওপর একের পর এক ঘা পড়ছে। কঠিন ইস্পাত ক্রমশ পাতলা হচ্ছে। ইস্পাত খণ্ডটিকে বার বার গরম করতে হচ্ছে না। কোন অদৃশ্য অগ্নিকুণ্ডে সেটি তপ্ত হচ্ছে। আর সেটির ওপর সশব্দে আঘাত পড়ছে। জোরালো ঘায়ের শব্দগুলো ইসহাক খুব স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছে। একটা নির্দিষ্ট তালে বেজে চলছে তার বুকের ভেতর। তার মনে হয় শাহেদ যেন হাতুড়ি পিটানোর শব্দগুলো শুনতে পাচ্ছে।
শাহেদের দিকে ইসহাক একবার তাকিয়ে দেখে। তার চেহারা সে স্পষ্ট দেখতে পায়। সেখানে কোন ভাবান্তর নেই।
“শাহেদ, একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছিস? দ্রিম দ্রিম! একটানা! শুনতে পাচ্ছিস?”
“কই না তো, আমি কেবল ঢেউ ভাঙ্গার শব্দ শুনতে পাচ্ছি।”
“তাইতো তোর তো শুনতে পাওয়ার কথাও না। কারো বুকের শব্দ কি কেউ শুনতে পায়? সে যত জোরেই বাজুক।”
“তোর কি হয়েছে বলত। খারাপ লাগছে কোন।”
“না না, খারাপ লাগছে না। এমন সুন্দর জায়গায় কি খারাপ লাগতে পারে? অসম্ভব সুন্দর লাগছে স্থানটা। সামনে তাকিয়ে দেখ, বিশাল প্রান্তর, মনে হচ্ছে কেউ ছাই রঙের চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। অপর প্রান্ত থেকে কেউ যেন এর উপর বাতাস বহাচ্ছে আর চাদরটিতে ঢেউ খেলে যাচ্ছে।”
শাহেদের চোখে ইসহাক একটা কল্পনা ধরিয়ে দিলেও আসলে কি তার কাছে এ সন্ধাটি অতটা সুন্দর? আজকের সন্ধার সৌন্দর্য উপলব্ধি করার তার ফুরসত কোথায়? সময়ের চাকা বেয়ে অন্ধকার যতই নামছে ততই ইসহাকের মনের ভিতর একটা টেনশন তীব্রতর হচ্ছে। এই সময় তার মাথার ডান দিকে একটা চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়। সময় যতই যেতে থাকে ততই ব্যথা তীব্রতর হতে থাকে।
স্থানটি প্রচন্ড নিরব হলে তার আজ ভাল লাগত। কোন কৃত্রিম শব্দ না থাকলেও স্থানটি সম্পূর্ণ নিরব নয়। ঢেউগুলো অনবরত তীরে এসে আছড়ে পড়ছে। বেশ জোরালো শব্দে ঢেউভাঙ্গা পানি কলকল করছে। অসহ্য লাগছে ইসহাকের কাছে এসব। মনে হচ্ছে প্রতিটি ঢেউ ভাঙ্গার শব্দ কানের কাছে কাঁচভাঙ্গার শব্দ। মাঝে মাঝে অকারণে চমকে ওঠে। অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। কিন্তু যতটা অন্ধকার হওয়ার কথা ততটা নয়। যদিও রাতটি অমাবস্যার রাত। শহরের মানুষ অমবস্যা-পূর্ণিমার হিসাব রাখে না। তবুও কখনো কখনো কারো চোখে পড়ে যায়। ইসহাক হিসাব করে দেখে আজ অমাবস্যার রাত। কিন্তু অন্ধকার কোথায়? একশো মিটার দূরের সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঐতো দু’জন লোক এখনো বসে আছে। কিন্তু ইসহাকের আজ খুব অন্ধকারের প্রয়োজন। যে অন্ধকারে সে নিজের রক্ত রঞ্জিত হাতকে দেখতে পাবে না। দেখতে পাবে না কোন যন্ত্রণা কাতর মুখাকৃতি। এখন ঢাকা শহরের আলো তার কাছে অনাবশ্যক হয়ে যায়। শুধু অনাবশ্যকই নয়, এখন আলোই তার একমাত্র শত্র“। চারদিকটা দেখার জন্য ইসহাক আবার উঠে দাঁড়ায়। লোক দু’জনের এখনো উঠার নাম গন্ধ নেই। তাদের তো আর জোর করে উঠিয়ে দেয়া যায় না। উ™£ান্তের মত ডান হাতের আঙ্গুলগুলো একবার মাথার চুলের ভিতর চালান করে।
“কিরে, উঠবি এখনই।” শাহেদ জানতে চায়।
চমকে উঠে ইসহাক, “না না আমার অত তাড়া নেই।”
“আমার আসলে উঠতে ইচ্ছে করছে না। খুব ভালো লাগছে। আমি সারারাত এখানে কাটিয়ে দিতে পরব। আরো কিছুক্ষণ থাকি কি বলিস?”
“ঠিক আছে আমার কোন আপত্তি নেই। আমিও তাই চাচ্ছি।”
ইসহাক বসে পড়ে আবার। লোকদু’টি তখনো উঠেনি। ধৈর্যের একটা সীমা থাকে। তার ইচ্ছে করে এখান থেকে পালিয়ে যেতে। কিন্তু সে পারে না। কর্তব্যের বঁাঁধনে সে আষ্টে-পৃষ্টে বাঁধা। শাহেদের দিকে একবার তাকায় সে। আবছা অন্ধকারে তার মুখ মোটামুটি দেখা যাচ্ছে। শাহেদের মুখে কোন ভাবলেশ নেই। অতটা ভাবলেশহীন তাকে সাধারণত দেখা যায় না। শাহেদ যা করে তা সবাই জানে। শুধু এটা জানে না যে, সে কত বড় খুনি। জানলেও কেউ রা করে না। ইসহাকও জানে এবং তা ভাল করেই জানে। কর্তব্যের খাতিরে তাকে সব জানতে হয়। কোন এক অদৃশ্য হাতের ছোঁয়ায় সে আইনের কাছে সবসময় নির্দোষ। তার বিরুদ্ধে মামলাকারী স্বয়ং খুনের আসামী হয়ে যায় কোন এক যাদুবলে। খুন করে শাহেদ হঠাৎ করে খুব শান্ত হয়ে যায়। এমন কি মদও স্পর্শ করে না কিছুদিন।
সময় অতিক্রমণের সাথে সাথে ইসহাকের শরীর ঘামতে থাকে আরো বেশী করে। সে ক্রমাগত গোসল করে যাচ্ছে ঘামের সাগরে। এখন সম্পূর্ণ জনশূন্য এলাকা। ঘড়ির দিকে তাকায় সে। রাত পৌনে ন’টা।
তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা লাশ। রক্তে লাল হয়ে যাওয়া একটা লাশ। গলাটি তার ধড়ের সাথে ঝুলে আছে। নির্মমভাবে আঁকা তার শরীর ব্লেড দিয়ে। চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠেছিল সবাই। সেদিনই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, খুনের বদল খুন।
“শাহেদ” ইসহাক মৃদু উচ্চারণে ডাকে।
“হু।”
“একটা প্রশ্নের জবাব দিবি?”
“বল।”
“খুন করার পূর্বমুহূর্তে খুনির কাছে কেমন মনে হয়?”
না, শাহেদ চমকে উঠেনি বরং আনমনে তাকিয়ে আছে পানির দিকে। কোন কিছু তাকে আবিষ্ট করে রেখেছে। অনেক্ষণ পর  সম্মোহীত কণ্ঠ ভেসে এল যেন অনেক দূর থেকে, “জানি না”।
“কিন্তু আমি জানি।”
ইসহাকের দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে শাহেদ। সামনে দাঁড়ানো ইসহাকের কঠোরতা সে উপলব্ধি করতে পারে না। বলল, “ঠিক আছে তুই বল”।
“কষ্ট, প্রচণ্ড কষ্ট, হারানোর কষ্টের মত।”
হো হো করে হেসে ওঠে শাহেদ। হাসির প্রচণ্ড ধমকে নিরবতা খান খান ভেঙ্গে যায়। সে শব্দকে ছাপিয়ে একটা কর্কশ যান্ত্রিক উচ্চশব্দ ক্ষণিকের জন্য বেজে ওঠে। তারপর সব নিরব।
ইসহাক ধীরে ধীরে হেঁটে আসে। বাতাসের তীব্রতার সারা শরীর থেকে থেকে কাঁটা দিয়ে ওঠে। হঠাৎ পৃথিবী নিকষ অন্ধকারে ঢেকে যায়। তারপর আবার আবছা আলোতে ভরে যায়। চোখ খুলে দেখে একটা ছায়াপুরুষ দাঁড়িয়ে। তার হাত ধরে ইসহাক উঠে দাঁড়ায়।

এপ্রিল 16, 2011

অফুরন্ত ভালবাসা

তীর্যক রহমান

প্রথম দিন।তোমার মনে আছে?তুমি দোতালা বাড়ির দক্ষিন মুখি বারান্দায় লাল পারের ওরনা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিলে।শরতের মাঝামাঝি সময়।তোমার খোলা চুল ছড়িয়ে পরে ছিল পুরো বারান্দা ময়।তোমায় আমি সে দিনই প্রথম দেখে ছিলাম।দেখে ছিলাম তোমার উরো চুল গুলো।শরতে প্রচন্ড বাতাসে তুমি তোমার চুল গুলো সামলে নেয়ার চেষ্টা করেছিলে।চেষ্টা করেছিলে কাপর সামলে নেয়ার।যা ঐ দুরন্ত বাতাস তোমার সাথে খেলা করছিল।হয়ে পরে ছিলে বেসামাল।

    তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে আর তোমার চুল ছিল কোমর বরাবর।এখনো তাই আছে।যা দেখে যে কোন যুবকের হ্রদয় কেরে নেয়ার জন্য যতেষ্ট।তুমি খোপা বাধলে।খুলে গেল।আবার বাধলে, আবার খুলে গেল।অবশেষে এক প্রকার যোর করে বেধে নিলে মাথার পেছনে।আমার চোখ আটকে যাচ্ছিল।চোখ আটকে যাচ্ছিল তোমার অপরুপ দৃষ্টি দেখে।চোখে ছিল না কোন মাসকারা।ছিলনা কোন বারতি সাজ।তবুও দেখতে ভাল লাগ ছিল।তোমার আনমনা মুচকি হাসি আমার হ্রদয়ে দোলা লাগছিল একটু একটু করে।

    সামান্য সময় পর তোমার ছোট বোন এসে পাশে দাড়ালো।তোমার ঘোড় কাটলো।তুমি অন্তরঙ্গ ভাবে কি নিয়ে যেন কথা বলছিলে আর হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে কি যেন দেখাচ্ছিলে।আমি চেয়েই রইলাম তোমার চোখ এবং মুখ বরাবর।তোমার দৃষ্টি তখনো আমার প্রতি পরেনি।

    মনে আছে? সে দিন আকাশে ছিলনা কোন কালো মেধ।ছোট ছোট সাদা মেঘ খেলা করছিল দুরন্ত গতিতে।তুমি দেখলে ঝকঝকে আকাশে দুরন্ত গতিতে একটি ঘুরি উরছে।বারবার সেটা ওঠা নামা করছিল।মনে হচ্ছিল এই বুঝি পরে গেল আবার ঠিক তখনই সেটি উঠে দাঁড়িয়ে গেল যেভাবে ঘুরি ওরে।কে ঘুরি ওরাচ্ছে খোজার চেষ্টা করলে।আমি তাই চেষ্টা করলাম।খুজে তুমিও পেলেনা আমিও পেলাম না।একই জায়গা থেকে আর একটি ঘুরি উরলো।এটা আরো বড় এবং রঙ্গীন।তুমি বেশ আনন্দ পাচ্ছিলে তা দেখে এবং তোমার বোনকে দেখাচ্চিলে।আমি এমনটা দেখে মুচকি হেসে ছিলাম।

    মনে আছে এরপর তুমি ছুটে গেলে ছাদে ঘুরির মালিককে খুজতে।পুরো ছাঁদ ভরে গেল তোমার উপস্তিতিতে।আলোময় ঝরনা ছড়িয়ে পরলো অনেক দূর পর্যন্দ।এবার আমি তোমায় পুরো পুরি দেখলাম।দেখলাম তুমি সারে পাচ ফিটের মত লম্বা।তোমার পরনে নাল রঙ্গের পাজামা ঠিক ওরনার আচলের সাথে মিলিয়ে।শরিরে ছেলোয়ার কামিজ জরিয়ে ডেকে রেখেছ।চিকন এবং লম্বা হওয়া সত্ত্যেও খারাপ লাহছে না।মনে হচ্ছে, নাহ! ঠিকই তো আছে।নায়িকারা এমনই হয়।

    পশ্চিম আকাশে সুর্যের আলো তখনো ডের রয়ে গেছে।বিকেলের হালকা আলোয় তোমার পুরো দেহ ঝ্বলঝ্বল করছিল।সন্ধে নামার আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলে।

    বসে পরার আগে হাটলে পুরো ছাদে।দৌ্রালে।মাঝে মাঝে মত্ত হলে ছোট বোনের সাথে খেলায়।আমার মনে হচ্ছে তোমার এতো বেশি ছোটা ছুটি তোমার ঠিক হচ্ছে না।যে কোন সময় পরে যতে পারো।যতবার তুমি ছাদের কীনারায় যাচ্ছিলে তত বার মনের মধ্য খোচা মার ছিল।মনে হচ্ছে এই বুঝি পরে পরে গেলে।ছাদের কোন রেলিং নেই।মনে হচ্ছে আমি দৌ্রে ছাদে চলে যাই এবং তোমায় বলি এভাবে না করতে।অথবা তোমায় উদ্ধার করে সগর্ভে বির সেনার মত ফিরে আসি।আমার নিষেধের প্রতি উত্তর করলে বলতাম তোমার এই দুরন্তপনা কাউকে কাউকে কষ্ট দিচ্ছে তা কি তুমি বোঝ? তুমি হয়তো নিষেধ শুনতে না।আমি ছাদেই থেকে যেতাম ছাদের বান্ডুরি হয়ে এবং থাকতাম যতক্ষন না তুমি নিচে নেমে আসো।

    মনে আছে?সামান্য ছোটা ছুটির পরে আমাদের দিকে ফিরে তাকালে।ফিরে তাকালে তোমার বাড়ির সামনের সু-বিশাল মাঠটার দিকে।

    তোমার বাড়ির সামনে একটি রাস্তা আর রাস্তার পরে মাঠ।মাঠটা বেশ বর।চার কৌনা।তৈরি কর হয়েছিল ফুটবল খেলার জন্য।বাড়ির সামনে একটা বকুল গাছ।খুব বড় নয়।একটা পাশ হালকা নিচু।একে বারে মাঝ বরাবর ছিল তুলনা মুলক উচু।বৃষ্টি হলে নিমিষেই পানি গড়িয়ে যেতে পারে অন্য কোথাও।তবু ক্রীকেট খেলা যায় না তাতে।ছোট ছোট ঘাসের সবুজ আভা পুরো মাঠ যুরে।মাঠ পার হলেই সুবিশাল আম গাছ এবং তার পাশে ছোট আকারের একটা শহিদ মিনার।আমি যেথানেই দাঁড়িয়ে।তার পেছনে স্কুল।গাছের হালকা ছায়া শহিদ মিনারের সিরির উপর পরছিল।বাকি দু দিকের এক দিকে প্রচুর গাছ।বাগানের মত।মনে হয় গাছ দিয়ে দেয়াল নির্মান করা হয়েছে।বাগান পার হলে কলেজ।বাকি দিকটায় ছোট আকারের প্রাইমারি।কিছু গাছ।আর একটা টং দোকান।

    এরপর তুমি বসে পরলে একেবার পদ্মাশন হয়ে।পাশে বসলো তোমার ছোট বোনটি।এবার তুমি ঘুড়ির কথা একদম ভুলে গেলে।মনযোক বারলো আমাদের পান্ডো গুলোর দিকে।আমি বসে পরলাম শহীদ মিনারে উঠতে যে সিরি তার উপর।তোমার দোতলা বাড়িটা আমি যেথায় বসে আছি তা থেকে প্রায় সত্তুর গজের মত প্রস্থ।আমাদের দল তখনো ভারি হয় নি।অপেক্ষায় রইলাম।সকলে আসবে বলে।দুরত্ব যাই হোক তুমি ঠিক আমার মুক্ষ মুখি অবস্থানে।দুর অবস্থান থেকে অস্পস্ট দেখছিলাম তুমি মিষ্টি করে হাসছো।আমাদের প্রত্যেকের সাথে ক্রীকেট খেলার সামগ্রী।কারো হাতে ব্যট, কারো হাতে বল, কারো হাতে স্টাম্প।

    মাঠটা কবে তৈরি হয়ে ছিল আমি তা জানতাম না।শুনেছি মাত্র।প্রত্যেক স্কুল মাঠে থাকা প্রয়োজন তাই ছিল।তৈরি হয়েছিল আমার জন্মের বেশ আগে।যখন ফুট বুলের রমরমা অবস্থা।ক্রীকেটের ভীরে ফুট বল মরতে বসেছে বলা যায়।আগের মত এই খেলার প্রতি কার তেমন আগ্রহ নেই।ফুটবল নিয়ে এদেশের মানুষ খুব বেশি আর সপ্ন দেখতে চায় না।যতোটা দেখে ক্রীকেট ঘীরে।দেশের জন্য অনেক বেশি সম্ভাবনা ময়।ভাল খেললে জাতীয় দলে চাঞ্ছ পাওয়া সহজ।এবং নিয়মিত আন্তজার্তিক পযায় খেলা যায়।তখন সারাপ্রতিবীর মানুষ চেনে।যা ফুটবল দিয়ে আপাতত সম্ভব নয়।

    একে একে আমাদের লোক সংখ্যা বারছে।তোমার কৌতহলী চোখ আমাদের পানে।মনে হল ক্রীকেটের প্রতি তোমার আগ্রহ আছে।মনে হল তুমি আমাদের খেলা আরাম্ব হওয়ার অপেক্ষায় আছো।তুমি বসেই রইলে।আমি মাঝে মাঝে আর চোখে তাকাচ্ছিলাম।এতো দূর থেকে আমার চোখ এবং তোমার চোখ একই সরল রেখায় একত্রিত হওয়া সম্ভব ছিল না।

    সুর্যে তেজ কমে এসেছে বেশ।মোট বিশ পান্ডো একত্রিত হয়েছি।খেলতে হলে আরো দুজন প্রয়োজন।কিন্তু আসার কোন সম্ভাবনা দেখলাম না।তাই এই বিশ জনকে দুটি অংশে ভাগ করে দিলাম।পুরো প্রক্রিয়াটি আমাকেই শেষ করতে হয়েছে।তা তুমি দেখলে।আমি ঠিক করছিলাম কে কোন দলে খেলবে আর মাঝে মাঝে আমার বেয়ারা চোখ তোমার প্রতি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিল।দুটি দল হল।একটি দলের নেত্রিত্ব আমার উপর।এমন কি পুরো বিশ জনের দ্বায়িত্বও আমার।কারন আমিই এদের মধ্য সবার বড়।বাকি দলটির আপাতত ভার গেল আমারই ঘনিষ্ট এক জনের উপর।

    দেখলাম, কে একজন ছাদে চলে এলো বেশ মেজাজি চেহারা করে।মুখ গম্ভির করে সে তোমাকে কি যে বলল।তোমার মুখটা দেখলাম ভার হয়ে গেল।তুমি তাকে কি যেন বুঝাতে চাইলে।পরে বুঝলাম উনি ছিলেন তোমার মা।হয়তো সারা বাড়ি তোমায় খুজে ছিল।অবশেষে ছাদে পেয়ে রাগ কিছুটা ঝারল।এরপর তিনি চলে গেলেন।তুমি আবার আমাদের খেলার প্রতি মনযোগী হলে।টচ হল।আমি জিতলাম।এবং তা অবিশাস্য।জানো সেদিনই আমি প্রথন কোন টস জিতলাম।মনে হল তোমায় দেখার পর থেকে ভাগ্য বদলাতে শুরু করেছে।বদলেছেও অনেক।

    সে দিনের ম্যসটা হয়ে ছিলা বারো ওভাবের।আমার ঠিক মনে আছে।আমি আমাদের দলের আমাদের দুজন ব্যটস ম্যান মাঠে পাটিয়ে দিয়ে আবার বসে রইলাম সেখানে।আজই প্রথম আমি ওপেন করিনি।প্রথম ওভারের শেষ বলে আমাদের উইকেট পরলো।তুমি উল্লসিত হলে।আমার কষ্ট লাগলো।মনে হল এ মুহুর্তে তুমি আমার বিপক্ষে।এরপর আর একজন ব্যটস ম্যান পাঠালাম।আমি বসেই রলাম।আমার চোখ সেই বরাবর যেখানে তুমি বসে আছো।আমার খেলার প্রতি কোন মন জোগ নেই।শুধু চেয়েই আছি, চেয়েই আছি।

    দ্বিতীয় ব্যটস ম্যন নেমেই চার মেরে দিলে।এবারও তুমি উল্লসিত।তা দেখে আমার ভাল লাগলো।তুমি হাততালি দিচ্ছিলে।সেই উইকেট যুটি ভাংতে প্রতি পক্ষ দলের বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে।তারা খেলে গেল সাত ওভার।যখন দ্বিতীয় উইকেট পরলো তখন আমাদের স্কর দুই উইকেটে সাতান্ন।এবার আমার নামার পালা।ইতস্তত হচ্চিল।মনে হচ্ছিল আজ কি না নামলেই নয়? মনে হচ্ছিল যদি শুন্য রানে আউট হয়ে যাই কি লজ্জাই না পাবো।কি আর করা যাবে।নামতেই যে হবে।হাতে ব্যাট।মনে হচ্ছে এই মুহুর্তে শরিরে কোন শক্তি নেই।একেবারে হাওয়ায় ভাসছি।প্রথমেই ছোট একটা ইটের সাথে হোচট খেলাম।অন্য সময় হলে কি হত জানিনা তবে আমি পরে গেলাম একেবারে মাটিতে। ধপাস করে।আমার পীঠ উপরে আর বুক নিচের দিকে।এরপরও এক পলক চেয়ে দেখলাম তোমায়।আমার  মুখে তখনো হাসি।কোন ব্যথা অনুভব হচ্ছে না।হাসি মুখে উঠে দাড়ালাম আর তখনই টের পেলেলাম শরিরের কোণ একটা অংশ বেশ যখম হয়েছে।তারপরও এগুতে লাগলাম সামনের দিকে।যেন পেছন ফেরার অবকাশ নেই।সত্যি বলছি তখনো শরিরে কোন শক্তি পাচ্ছিলাম না।তবুও গিয়ে দাড়ালাম উকেটের সামনে।এবার তুমি আমায় ভাল করে দেখলে।ব্যাথায় শরির টনটন করছে।প্রথম বলটা শরিসা ফুল দেখে ঠেমালাম কোন মতে।পরের বল চলে গেল উইকেটের বেশ বাইরে দিয়ে তারপরও যেভাবে ব্যট চালালাম তাতে মনে হয়েছিল উইকেট বরাবর এলে কিনা হত?পরের বল আর টিকতে পারলাম না।দেখলাম তুমি উত্যজিত দর্শকের মত মুখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলে।চোখে মুখে বিসাধের ছাপ।বুঝলাম এটা তুমি আশা করনি।কষ্ট পেয়েছ।আমারুও কষ্ট লাগছে।ব্যাথার জন্য নয়, উইকেট পরার জন্য  নয়।খেলতে পারলাম না সে জন্য নয়।লজ্জা পেয়েছি সে জন্য নয়।শুন্য হাতে ফিরতে হবে সে জন্য নয়।তোমার বারাক্রান্ত চেহারা দেখে।আমি ভাবতেও পারিনি তুমি এতোটা কষ্ট পাবে।জানো সে দিন তোমার থেকে আমারই বেশি কষ্ট লেগেছিল তুমি হতাশ হয়েছো বলে।আবার সেই নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে বসলাম।তোমার কষ্ট লাগা আমার ভাল লাগেনি।সে মুহুর্তে সিদ্ধান্ত নিলাম আরো ভাল ভাবে শিখতে হবে।আরো ভাল ভাবে খেলতে হবে।

 

    সময় গড়িয়ে যাচ্ছে।বিশন্ন চেহারায় বসে রইলাম ইনিংস শেষ হওয়ার অপেক্ষায়।একটু খুশি হলাম যখন দেখি আমাসের স্কর একশর উপরে।সে দিনের স্কর আমি আজও মনে রেখেছি যান? রান হয়ে ছিল একশত সোল।এবার ফিল্ডিং করার পালা।দাড়িয়ে পরলাম সবাই।আমি উঠুতে গিয়ে উনুভব করলাম শরির টনটন করছে।ব্যাথা বোধ ভালই লেগেছে।তবু এগিয়ে গেলাম মাঠের দিকে।কেন জেন তোমার দিকে দিকে তাকাতে পারছিলাম না।তারপরোও লুকিয়ে দেখে নিলাম একবার।

 

    দেখে নিলাম তুমি তেমনি দাঁড়িয়ে আছো।আমি দাড়ালাম তোমাদের বাড়িটা সামনে রেখে।যাতে মাঝে মাঝে তোমার অনুভুতি লক্ষ করা যায়।প্রথম ওভারে কোন উইকেট পরলো না।বলিং করতে গেলাম আমি নিজেই।পরপর দুটি বল ওয়াড করার পরে বল সঠিক হল।হাপ ছেরে বাচলাম।তখনো কেন যেন শরিরে শক্তি পাচ্ছিলাম না।আমি সাধারনত যে গতিতে বল করি তা আজ হছিনা একদমই।পরের বল আবার ওয়াইট।আবার লাইন ছারা।ওভার শেষহল মোট দশ বল করার পর।আর বলিঙ্গয়ে গেলাম না।ফিল্ডিংএ চলে এলাম সেই যায়গায়।ব্যাথাটা এখনো আছে।নড়তে একটু কষ্ট হচ্ছিল।সুজকটা কাজে লাগালো একটি বল।প্রচন্ড গতিতে চলে গেল হাতের পাশ দিয়ে।এতো কিছুর পরও জিতে ছিলাম আমরা।

    যখন সন্ধ্যা ছুই ছুই তখন আমাদের খেলা শেষ হয়।অন্যান্য দিন খেলা শেষে সাথে সাথেই রওয়ানা হই বাড়ির উদ্দেশ্যে।আজ কেন যেন যেতে ইচ্ছে করছিল না।দেখালাম তুমিও দাঁড়িয়ে আছো।আপছা আলোয় যতক্ষন তোমায় দেখা যাচ্ছিল ততক্ষন মনের মধ্য একটা শিতল দির্ঘস্বাস এপিট ওপিট করছিল।আমি আজ আর যেতাম না যদি না তোমার মা এসে তোমায় নামিয়ে না নিয়ে যেত।

 

    পর দিন আমি আমার অন্যান্ন্য কাজবাদ দিয়ে চলে এলাম সেই কলাজ মাঠে।এক পরিচিত ছেলের সাথে আলাপ করে যানতে পারি তোমার বাবা সদ্য ট্রাঞ্ছফার হয়ে আমাদের সরকারি কলেজে এসেছে।তোমার বাবাকে তখনো আমি চিনি না।দেখার আগ্রহ সামলাতে পারলাম না।এগিয়ে গেলাম কলেজের দিকে।

    আমি যদিও এ কলেজ থেকেই পাশ করে ভর্তি হয়েছিলাম একটু দূরে ডিগ্রি কলেজে।যেতে যেতে ভাবছিলা মাত্র ক বছর আগেও ছিলাম এ কলেজের ছাত্র।তোমার বাবা ছারা বাকি সব স্যারাই আমাকে চেনে এবং বেশ পছন্দ করে একজন ভাল ক্রিকেটার হিসেবে।সে সময় কতনা মজার ছিল।নিয়মিত বিকেলে খেলতাম বন্ধুদের সাথে।গুড়ি ওরাতাম আকাশে, গতকাল যে ভাবে উড়িয়েছে অন্য কোন মানুষ।তখন আমার বন্ধু ছিল প্রচুর।নিয়মিত আড্ডা হত এই শহিদ মিনারের বেড়িতে।তখন বারিতে ফিরতাম বেশ রাত করে।একটু দূরে যে চায়ের টং দোকানটা আছে সেটি খোলা রাখা হত আমাদের জন্যই যতক্ষন না আমরা বিদায় নিতাম।সেই সব বন্ধড়া এখন ঢাকায়।কেউ এখনো পরা শুনা করছে, কেউ চাকরি করছে, কেউ চাকড়ি খুচ্ছে।আমি অধম ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয়ে ফেসে গেলাম।ঢাতে আর যাওয়া হলনা।

    কেন ঢাকা যাই নি যানো? জানবে কি করে তোমার সাথে তো বলাই হয়নি।আমি মাকে খুব বালবাসি।কত বেশি ভাল বাসি বলতে পারবো না।মাকে ছেরে আমি কোথাও যানি।দুরে কোথাও গিয়ে সান্তি পাবনা এটা নিশ্চিত ছিল।মনে হত দূরে গেলে মাকে দেখতে পাবো না।এক মুহুর্ত মাকে না দেখে আমি থাকবো কি কিরে।যে খানেই যাই না কেন ফিরে এসে মায়ের মুখ দেখার পরে ভুলে যাই সব কিছু।বুলে যাই কিছুক্ষন আগেও যদি কারো সাথে প্রচুর বিদ্দেশ থাকে।তখনো মা মাঝে মাঝে খাইয়ে দিত।এখনো দেয় যখন মায়ের কাছে ফিরে যাই।ভাবতাম দূরে গেলে কে আমাকে এতো আদর করে মুখ ভাত তুলে দিবে।কে বেড়ে দিবে প্লেটের উপর খাবার? তাই রয়ে গেলাম মায়ের আচোলের তলায়।মা এখনো তেমনি বালবাসে।একবাপের দিতীয় সন্তান আমি।তাই ভালবাসাটা একটু বেশি।তাও আবার আমিই বড়।

    ছোট যে বোনটা আছে তার সাথে তখনো একটা বিষয় ছারা সব কিছুতে মিল খেত।সে আমার ফেলা পছন্দ করতে একদমই।বলতো তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।এভাবে ফেললে কোন ভবিৎত নেই।যদিও সে কথা গুলো বলতো না বুঝে।কারন তখনো সে ক্রীকেট খেলা তেমন ভাল বোঝে না।আমি পাত্তা দেই না।সে বোনটাকে আজও তুমি দেখনি।মিষ্টি চেহারা।অন্তত আমার কাছে।বছর খানিক হয় বিয়ে    দিয়ে দিয়েছি ধুম ধাম করে।অতনেক মানুষ এসেছিল সে বিয়েতে।এসেছিল অনেক নামি দামি ব্যক্তিরা।

    আমার বাবাকে বোধ হয় চিনতে।তিনি ছিলেন কলেজেরই ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি।যদিও বাবা নিয়মিত আসতেনা।বাবা তার ব্যাবসা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতেন।বাজারে যে বড় চালের আরোদ ছিল সেটি আমাদেরি।আমার কখন সে খানে বসা হত না।ব্যাসা বানিজ্য তখনো বুঝতাম না, এখনও বুঝি না।খেলাটাই আমার সাথে মানায়।জান? বাবাকে তখনো যেমন ভয় পেতাম এখনো তেমনি ভয় পাই।

    ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চললাম।প্রথমে আমাদের ফিজিক্সের স্যারের সাথে দেখা।যখন কলেজে পরতাম ওনার ভয়ে আমি একবার স্কুলে আসা বন্ধ করেছিলাম।স্যার কখনো মারেন নি।তবে ওনার চোখের মধ্য কি আছে আমার জানা নেই।যে কোন ছেলেকেই কব্জা করে ফেলতে পারেন চাহনি দিয়ে।অবষেশে বিচার যায় আমার বাবার কাছে যে আমি বেশ কদিন ধরে ক্লাসে যাচ্ছি না।অবষেশে বাবা এক দিন সবার সামনে কান ধরে নিয়ে গিয়েছিল কলেজে।এমন তরুন বয়সে কান ধরে কলেজে নেয়াটা বেশ বাজে ব্যাপার তাই না!কি করা যাবে যেহেতু বাবাকে ভয় পাই তাই বাধ্য হয়েই সব মেনে নিতে হয়ে ছিল।স্যার আমার দিকে হেসে বলল, কিরে বাছা খেলা-দুলা নিয়েই আছিস? আমি বলি, না স্যার।ডিগ্রী শেষ করেছি।কিছু একটা করবো ভাবছি।স্যার বলেছিল, তাই চেষ্টা কর।এতো খেলা করে কি হবে।এভাবে জীবন নষ্ট করলে পরে পস্তাবে বলছি।আমি মুচকি হেসে বলি, দেখা যাক কি করা যায়।স্যারকে আর কিছু বলি নি।

আর একটু এগিয়ে যেতে বাংলা স্যারের সাথে দেখা।স্যাকে আমার বরাবরই ভাল লাগে।স্যার যখন বাংলা পরান আর যদি তা কোন উপন্যাস হয় তো কথাই নেই।নিজে অভিনয় করে বুঝিয়ে দিতেন প্রতিটা চরিত্র।কোন চরিত্র বুঝতে না পারলে স্যারের উপস্তাপনায় বুঝে যেতাম এক নিমিশেই।স্যার বাংলা উচ্চরন করেন বেশ সাবলিল ভাষায়।তাতেই বোঝা যায় উনিই বাংলার টিচার।ওনার অসাধারন ব্যাবহার ভুলিয়ে দিতে পারে যেকোন দুঃখ।স্যারকেই বললাম আমাদের কলেজে নাকি নতুন স্যার এসেছে? স্যার বলল, হ্যা এসছে।একটু দূরে কাচা পাকা চুলের একজন মানুষ দেখিয়ে বললেন, উনিই নতুন এসেছে।তোমার বাবার দিকে চোখ পরতে পিলে চমকালো।অদ্ভুৎ রাগি একটা চেহারা।এক নজর তাকিয়ে আর চোখ রাখতে পারলাম না।আমার মনে হল এমন বাবার ঘরে অমন মেয়ে জন্মায় কি ভাবে? যতটা স্বাভাবিক চেহারা আসা করে ছিলাম তেমনটা না হওয়ায় মনের মধ্য একটা দুঃখ দুঃখ ভাব নিয়ে বেড়িয়ে এলাম সেখান থেকে।আসতে পথে তোমার চেহারাই বার বার মনে পরছিল।কেন? তা জানি না।

    দুপুর হয়ে এলো।গোসল শেষ করে দেড়িয়ে পরলাম সব পান্ডাদের উদ্দেশ্য।আজ সিদ্ধান্ত নিয়েছি আরো সকাল সকাল খেলা শুরু করতে হবে যাতে আরো বেশি সময় ধরে তোমায় দেখা যায়।কয়েক জন ছারা বাকি সবাই রাজি হয়ে গেল।সবাইকে জানাতে জানাতেই প্রায় তিনটে।সিদ্ধান্ত হয়েছে ঠিক সারে তিনটের সময় খেলা শুরু হবে।আমিই সবার আগে পৌছে গেলাম।আর কেউ আসেনি আপতত।এই তপ্ত রোদের মধ্যও বসে রইলাম শহিদ মীনারে বেরিতে সেই বারান্দাটার মুখ চেয়ে।গাছটার ছায়া এসে পৌছে নি।অপেক্ষায় আছি তুমি আসবে।এলেনা।আমার চোখ তবু নরে না।চোখে সেখানেই আছে।অপলক দৃশঠি সেখান বরাবর।তুমি এলে না।একে একে আসতে শুরু করেছে সবাই।ওরা যর হওয়ার পর একটা হৈ-চৈ শুরু হইয়ে গেল।সে শব্দ তোমার কান এরোলোনা না।

    দেখলাম সেই হাসি মুখে এগিয়ে এলে সেই বারান্দায়।পরনে কালো রংএর ফ্রক।এতে তোমায় অনেক বেশি কিশোরী লাগছিল।যা তোমাকে মানায় না।তবুও লাগছিল অন্যরকম।সূর্যের রশ্মি পরছিল বারান্দার একটি অংশে যা তোমাকে হালকা স্পর্শ করছিল।রোদে কাল রং আরো ঝমকালো লাগছিল।তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে রেলিং এর উপর ভর করে অনেক বেশি যুকে।যা দেখে আমার ভয় হচ্ছিল।

    এতো রোদে খেলা শুরু করা যাচ্ছিল না।বসে রইলাম।শুরু হল গল্প।একজন বলল, রোদে না বসে সেই আম গাছটার নিচে বসতে।এদের মধ্য আমি সিনিয়র।তারা সবাই আমাকে ভাই ভাই করে ডাকে।তাই যা কিছু বলি একটু চিন্তা করে, হিসেব করে বলতে হয়।বললাম, প্রস্থাবটা মন্দ নয়।নিজে প্রেম জ্বরে ভুগতে পারি, উন্য কাউকে ভোগানো উচিত হবে? আমি যতটাই বেখেয়ালি হই না কেন এটি ঠিক বুঝতে পারছি।য়ামার সাথে থাকা কারো চোখ তোমার দিকে পরেনি তাই কিছুটা সস্থিতে আছি।ওরা গল্প করেই যাচ্ছে।আমি তোমার দিকে চেয়ে শুয়ে পরলাম একটা ছোট ভাইয়ের কোলের উপর।তারা যা নিয়ে কথা বলছে তাতে আমার তেমন মন নেই।আমার পুর মনযোক তোমার উপর।কিভাবে কি করছো? কোন দিকে তাকাচ্ছো।চোখ কি বলছে।দেখলাম তুমি কিছূটা বিরক্ত আমরা খেলা শুরু করছি না বলে।তোমি তখন একদমই বোঝনি এতো খর তাপে খেলা করা যায় না।

    খেলা শুরু হল ঘন্টা খানিক পরে।আজও টচে জিতলাম।গত কালের মত আজও অবাক।টচে জিতার সাথে সাথে এক নজর দেখে নিলাম তোমায়।পরপর দুদিন অধিনাকত্ব করায় আজ তোমার নজরে এলাম ভাল ভাবে।সিদ্ধান্ত নিলাম ফিল্ডিং করার।দাড়ালাম তোমার বারান্দার ঠিক কাছা কাছি।যখন বারান্দার দিক এগিয়ে যাচ্ছিলাম তখন তোমার চোখ আমার চোখ একই সরল রেখায় একত্রিত হয়েছে সামান্য সময়ের জন্য।তোমার মুখ ভঙ্গি দেখে আনমনে হেসে ছিলাম।অদ্ভুত করে মুখটাকে বাকালে।কেউ দেখে নি।আচ্ছা সে দিন প্রথম চোখে চোখ পরায় নিশ্চয়ী লজ্জা পেয়ে ছিলে? তার জন্যই বোধ হয় এমন করলে? আমিও কিন্তু কম নয়।তারপর মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকালে।আমি আর বিরক্ত করার চেষ্টা করিনি।দারালাম বকুল গাছটার ছায়ায়।হয়তো অনেকে ভেবেছিল আমি সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছি।আসলে কিন্তু তা নয়।শুধুই তোমার জন্য এই স্বার্থপরততা।

    খেলা শুরু হল।আজ বোধ হয় আর বল করতে পারবো না।গত কালের ব্যথাটা জেকে বসেছে।শরির কতটা ব্যথা হয়ে আছে আগে বুঝিনি।যখন খালি হাতে যাম্প করে একটা বল করলাম তখন টের পেলাম শিরদার কত নাজুক হয়ে আছে।গোমরা মুক্ষ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।বলিং এ পাঠালাম অন্য একজকে।যে কিনা আমাদের মধ্য সব চেয়ে দ্রত বল করে।ঘোমরা মুখ হওয়ার কারন আমি তোমায় দেখতে পাচ্ছিলাম না।কারন তোমার বারান্দা আমার পেছনে।তাকাতে হলে পুরো শরির, মুখ ঘুড়িয়ে তাকাতে হবে।আমার লজ্জা বোধের কারনে যা পারছিলাম না।তাছারা তোমার ওদিকে সুন্দর একটা মুখ ছারা কৌতহলি হইয়ে বারবার দেখার মত কিছুই নেই।ভুলক্রমে একবার তাকানো যায়।এর বেশি তো আর নয়।ফিরতে যাচ্ছি আর কিসে যেন মনের মধ্য বাধা দিচ্ছে।যত বার প্রান পন চেষ্টা করে যাচ্ছি তত কোন একটা অদৃশ্য শক্তি আমায় ফিরিয়ে নিচ্ছে।অবশেষে তাকালাম।দেখি তুমি নেই।কিছুটা স্বস্থি কিছুটা হতাশ।স্বাস্থি কারন আপতত পেছনে তাকাতে আর কোন বাধা নেই।আতাশ তুমি নেই বলে।প্রথম দু-ওভারে উইকেট পরলো না।রান হল বিশের মত।ব্যাটারা আমার অমনযোগের সুজকে পিটিয়েছে বেশ করে।এবার আমার আর পিচুটান নেই।কারন অদৃশ্য মায়া জাল আমার পেছন থেকে সরে গেছে।আপতত মুক্তি।নতুন বলার পাঠালাম।প্রতিটা বল বলে দিলাম কি ভাবে করতে হবে।কোন যায়গায় ফেলতে হবে।ছেলেটা আমার কথা অনুসারে কাজ করতে পেরেছে।যার দরুন এক ওভারে মাত্র দু-রান দিয়েছে।আমার সাথে ইয়ার্কি।দু ওভারে বিশ রান!দেখাচ্ছি মজা।আবার নতুন বলার নিয়ে এলাম।প্রথম বল ঢট।পরের বলে উইকেট।প্রচন্ড যোরে সবার চিৎকার।জর হয়েছি মাঠের ঠিক মাঝখানে।দেখলাম আমাদের ধনি শুনে মুখে হাসি নিয়ে আবার এলে বারান্দায়।মনের মধ্য ছোট্ট একটা খোচা লেগে গেল।আবার কেমন যেন ইতস্তত লাগছে।আবার খেলার প্রতি খেল হারিয়ে ফেলছি কিনা ভেবে নিলাম।মন কে শক্ত করার বৃথা চেষ্টা চলল।আবার হেটে চললাম সেই জায়গার উদ্দেশ্যে।হাটতে হিয়ে আবার হোচট।এবার আর পরিনি।কোন মতে সামলে নিলাম নিজেকে।তবে সত্যিই শক্তি পাচ্ছিনা।মনে হচ্ছে গতকালের মত হাওয়ায় ভাসছি।আবার চোখে চোখ পরলো।দেখলাম সাথে সাথে তোমার মুখ বেশ গম্ভির হয়ে গেল।ভাবলাম আমাকে কি তোমার খারাপ লাগছে কি? তবে তোমার চোখ সরছে না আমার দিক থেকে।বুঝে নিলাম আমাকে খারাপ লাগলে এবাবে তাকিয়ে থাকতে না।এরপর আবার চোখ সরে গেল।একটু কষ্ট পেলাম।তবে হাল ছারি নি।আমি তাকিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি সে দিকে।য়ার একবার তুমি তাকিয়ে আবার মুখ আরো কালো করে চলে গেলে ভিতরে।এবার বুঝলাম আমাকে তোমার ভাল লাগে নি।

    আবার উইকেট পরার উল্লাস।তবে এবার তোমার পাত্তা নেই।আবার কষ্ট পেলাম।এবার আমি আশা করেছিলাম তুমি আসবে।আগের বার যেটা আশা করি নি।তারপরও তুমি এসেছিলে।একটু খারাপ লাগলো।খারাপ লাগলো আমার ভেহায়া পনার কথা ভেবে।এভাবে না করলেই বোধ হয় ভাল ছিল।অন্তত মাঝে মাঝে লুকিয়ে তোমায় দেখা যেত।তাদের ইনিংস শেষ হল।রান করতে পারলো একাশি।আমাদের ব্যাটিং করার পালা।গিয়ে বসলাম সে সহিদ মীনারে।সুর্যের তেজ কমে এসেছে।শরির বেশ ক্লান্ত।মনে হচ্ছে আজ আর ব্যাটিং করতে পারবো না।তার উপর এক মুহুর্ত যাকে দেখে ছিল চোখ সে এখন আর নেই।ব্যাটিংয়ে পাঠালাম দুজনকে।প্রথম বলেই চার মেরে দিল।একটা হৈ-চৈ রব ভেসে উঠল প্রচন্ড চিৎকারে।এবার তুমি এলে তবে মুখে সেই হাসি নেই।খুব আস্তে আস্তে করে ভিতর থেকে এসে দারালে আগের জায়গাতেই।দূর থেকে মনে হল এক নজর আমাকে দেখে নিলে।তারপর আবার চোখ ফিরিয়ে নিলে।তুমি আর সেখান থেকে নরলে না।অস্পস্ট দৃটিতে আমি চেয়েই আছি।

    আমার দল আজও যিতলো।আমার ব্যাট হাতে নামতে হয় নি।বেচে গেছি বলতে হয়।সির দ্বারে টান এখনো লাগছে।খেলা শেষ হল তবে সুর্য ডুবতে আরো কিছু সময় বাকি।পক্ষ এবং বি-পক্ষ উভয় দল মিলে বসলাম জরসর হয়ে গোল করে।ছোট খাট একটা মিটিং হবে।সবাই আমার মুখি।বলালম, কাল মাঠের এক কোনে নেট বসিয়ে প্রক্টিসের জায়গা তৈ্রি করতে হবে।যাতে সেখান নিয়মিত প্রক্টিস করা যায়ী।এভাবে খেললে কিছুই হবে না।আমাদের খেলায় প্রচুর ভুল আছে যেগুলো সংশোধন করা প্রোয়জন।ব্যাপারটাতে সবাই বেশ আগ্রহী হল।একজন বলল কোন দিকটায় করা যায়?আমি বলি, যে দিকটায় ছায়া আছে।তুমি তখনো দারিয়ে।আমার স্পষ্ট মনে আছে সে দিনের কথা।বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না তবু সবার চাপা চাপি তাদের সাথে যেতে হল।

    পুরো দলটা ছুটছে সামনের দিকে।সবার মাঝে আমিই।কেন যেন কারো সাথি কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না।মৃদু পায়ে এগিয়ে যাচ্ছি।যে যার   যার মত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মজা করছে।আমার একদম তাতে মন নেই।পিচডালা রাস্তা।এ দিয়ে বড় কোন জান চলে না।মাঝে মাঝে দু-একটা রিক্সা চলে।।তোমার কথা ভাবতে ভাবতে কোত্থেকে রিক্ষা এসে দারালো ঠিক পায়ের সামনে।পেছন থেকে কে যেন একটা প্রচন্ড ধাক্কা দিয়ে সারিয়ে নিল সেখান থেকে।কপাল ভাল ঠিক সময়ে রিক্ষাওয়ালা ব্রেক কসেছিল।আমার বেগতিক চলা দেখে একজন বলল, কি ভাই, কোন সমস্যা? আমি বলি নাহ! ঠিক আছি।একে একে জন সংখ্যা কমতে থাকে।আমার বাড়ি এ পারার শেষ সিমানায়।প্রতিদিন সবশেষে একাই যেতে হয়।এই সময়টা আমার বরবরই খারাপ লাগে।আজ আরো বেশি লাগছে।নিজের কাছে সেই বেহায়াপনা কুকরে খাচ্ছে।মন বারবার বলছে এভাবে তুমি করলে কেন? মেয়েটা প্রচুর লজ্জা এবং কষ্ট পেয়েছে নিশ্চয়ি।কেন জেন মনকে বোঝাতে পারছিলা না।মনে মনে বলাম এটা আমার ইচ্ছে কৃত ছিল না।তার প্রতি আমি অতি মুগ্ধ হয়ে আনমনে অপলক দৃষ্টিতে পাকিয়ে ছিলাম মাত্র।আমার কো্ন দোষ নে, আমার কোন দোষ নেই।

    বাড়ির মধ্য এসে পুকুর ঘাটে বসলাম।এ পারার প্রতিটা বাড়িতে এমন একটি করে পুকুর আছে।কলেজ থেকে একটু দূরে আছে বিখ্যত জল পুকুর।আস পাহসের এলাকায় এর সুনাম রয়েছে।পুকুরটা আসলেই বেশ বড়।নাম অদ্ভুত হওয়ার পেছনে কারন, কেউ দাবি করে এটি তৈরি করে ছিল হিন্দু কোন জমিদ্বার, অনেকে দাবি করে কেটে ছিল মুশলিম কোন ধনাট্য ব্যাক্তি।একসম্য় এলাকার লোক জন মিলে পানি এবং জল উভয় মিলিয়ে নাম রাখে জলপানি।আমাদের পুকুরটা তেমন বড় নয়।ঘাট বাধানো।য়ার বৈঠক খানাও তেমনি।সেখানেই বসে আছি।সন্ধের আবছা আলোয়  পুকুরের পানিতে ডেউ খেলে যাচ্ছে।সেই ডেউয়ে আমি একটি ডিল ছুরলাম।নরে চরে ঊঠলো পুরো পুকুরের পানি।একটা ব্যং লাফিয়ে পরলো পানিতে।শুরু হল ডেউয়ের উপর ডেউ।মৃদু বাতাস বৈছে।এতো পথ ধরে হেটে আসার ক্লান্তি কিছুটা নিঃসরিত হচ্ছে ধীরে ধীরে।আমি বসেই রইলাম।অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে।পুকুরের পার ঘেসে লুকিয়ে থাকা ব্যঙ্গ চিল্লচ্ছে বেগতিক ভাবে।

    তোমার কথাই ভাবছি।ভাবছি তোমার সে মুখ বাকানোর ভঙ্গী।তোমার চলে যাওয়া আর বার বার ফীরে আসা।ভাবছি তোমার দৃষতি।যা স্রষ্টার নিপুন হাতে সৃষ্টি।তোমার অদৃশ্য ছায়া কেমন জেন মায়া তৈ্রি করে ফেলেছে।আমি বসেই আছি।বাতাসের বেগ বাড়ছে।শরির এখন বেশ চাঙ্গা।মন কিছুটা ভাঙ্গা।অন্ধোকার ছেয়ে আছে চারপাশ।পোকা মাকরের ডাক ঠিক ব্যনহের মতই বাজে লাগছে।অন্ধোকারে নিজের শরিরও দেখা যাচ্ছে না।আস পাশ নিরব নিশ্তব্দ।আমি বসেই আছি।বসে আছি অজানা একটা ঘোরের মধ্য।রাত কত হল জানা নেই।বাড়ির মধ্য থেকে গরুর উচ্চস্বরে হাম্বা ডাকে ঘোর কাটে।মোবাইলের আলো দিয়ে পথ এগুচ্ছি।এরপর খেয়ে দেয়ে শোয়া হয়।ঘুম আসে শেষ রাতে।ঘুমানর পূর্ব মুহুর্তে তোমার মুখটা বার বার ভেসে আসছিল।অনেক বার চেষ্টা করেছি সেটা সরাতে।সত্যি বলছি, পারিনি।

    পরদিন খুব সকালে আমি সহ আরো কয়েক জনকে নিয়ে বেড়িয়ে পরি জাল বাধার জন্য।বাশ গেরে খুটি বসালাম।এক ঘন্টার মত সময় লেগেছে।যতক্ষন সেখানে ছিলাম ততক্ষন অপেক্ষায় ছিলাম তোমার আসার।আশা করে ছিলাম এক পলক তোমায় দেখবো।তুমি এলে না।তুমি এলেনা সূর্যের মত রস্মি ছড়িয়ে আলো করে।বার বার তাকাচ্ছিলাম।তা সাথে থাকা ওদের চোখ এরোলনা।এবার ধরা পরেই গেলাম।তারা এবার ঝেকে ধরে ব্যাপারটা জানার জন্য।আমি বরাবরা অস্বিকার করছি।কিন্তু তারা ছারেনা।অবশেষে বলি, কাজ শেষে বলা যাবে।সে আশায় তারা দ্রত কাজ শেষ করে।সুর্যের আলো এখন ছড়িয়ে পরেছ বেশ করে।সবুজ পাতা চিক চিক করছে আলো প্রতিফলিত হয়ে।আমারা গিয়ে বসলাল আম গাছটার ছায়া তলে।

    এবার তাদের বলতে হল তোমাকে আমার ভাল লেগেছে।তারা প্রস্তাব করলো আমায় সাহায্য করতে চায়।আমি বলি, সাহায্য বলতে শুধু তথ্য জানালেই হবে।এর বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই।তারা এ নিয়ে আমার সাথে বেশ রসিকতা করলো।আমি তাদের বলে ছিলাম এটা যেন আর কেউ না জানে।তারা আমায় অভয় দেয়।এরপর শুরু হয় আমাদের প্রক্টিস।একজন বল করছে আমি ব্যট করছি।ব্যাথাটা আজও পাচ্ছিলাম।তবে পাত্তা দিলাম না।ব্যট চালিয়ে গেলাম চরমে।একজন এসে আমার ভুল ধড়িয়ে দিল।চেষ্টা করলাম তা শুধরে নেইয়ার।ব্যর্থ হলাম না।যত বার চেষ্টা করছি তত ভাল পারছি।ভাল লাগলো।আকাশে মেগ করেছে এই সাত সকালে।বৃষ্টি নামতে পারে যেন সময়।তবু হতাশ হই না।রোদের তাপ না থাকায় ভ্যবসা গরম লাগছিল না তাই প্রাক্টিস ভালই হচ্ছে।কখন যেন তোমার কথা ভুলে বসে আছি।যখন খেলা থেকে মনযোক নষ্ট হল তখনই তাকিয়ে দেখি তুমি দাঁড়িয়ে আছ বিশন্ন মুখ করে।মনে হল মাত্র ঘুম থেকে ওঠা হয়েছে।চোখ চুলকাচ্ছো বারবার করে।এতো বেলা পর্যন্ত ঘুমানর কি আছে।আমি তো এতো রাত করে ঘুমানোর পরেও খুব সকাল উঠে কত কি দেখলা।তুমি অন্রক কিছু মিচ করেছোট? একটা হাই তুলে চলে গেলে ভিতরে।মনে অনেক বেলা হয়েছে আর খেলা যায় না।ছেলে পেলেরা ক্লাসে আসতে শুরু করবে।স্যারা আসবে।এলাকা প্রতিদিনের মত মুখরিত হবে।এতো খেললে লোকে কি ভাববে? আমি যেহেতু এদের সবার বড়।বড়রা বলবে ছেলে গুলোর মাথা আমিই খাচ্ছি।তাই সময় থাকতে কেটে পরাই উচিত।

    প্রতি দিনের মত আজ বিকেলে আর খেলে হয় নি।প্রচন্ড বৃষ্টিতে পুরো মাঠ ভিজে কাদা হয়ে আছে।আমরা আশ্রয় নিয়েছিম স্কুলের বারান্ডায়।এখান থেকেও তোমার বারান্দা দেখা যায়।যখন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল তখন তুমি এবং তোমার বোন ভিজছিলে।সেকি আনন্দো!বলার বত নয়।তোমার মা এসে না ধমকালে বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত থামতে কিনা সন্দেহ ছিল।দেখতে যেমন ভাল লাগছিল ততটা খারাপ লাগছিল।খারাপ লাগছিল ঠান্ড লাগবে এই কথা ভেবে।অথবা জর আসতে পারে।দু-দিন জর হলে আম্মার হবে চার দিন।প্রথম দু-দিন তোমার সাথে আর পরের দু-দিন তোমায় দেখতে না পেয়ে।আর ভাল লাগছিল একটু কেমন যেন রোমান্টিকতা চলে আসছিল মনের মধ্য।ভাবছিলাম এই মুহুর্তে তোমার পাশে থাকতে পারলে কত না ভাল লাগতো।বৃষ্টি পানি হাতে জমিয়ে ধরে ছড়িয়ে দিতেম তোমার গায়ে।আবার তুমিও একই কাজ করতে।ছন্দে দুজন হাত ধরা ধড়ি করে নেচে উঠতাম আধিম তালে।যে নাচের কোন কোরিওগ্রাফার নেই।তার কোন ভাষা নেই।আছে শুধু অদ্ভুত ভালচলাগা।কখনো মনে হচ্ছে আমি সত্যি তোমার পাশে হাত ধরে দাঁড়িয়ে ভিজছি।আর বলছি চলনা হাড়িয়ে যাই দূরে কোথাও।যেখানে থাকবে না কোন ভয়।কোন বিদ্দেশ।কোন অনিশ্চয়তা।কোন দুস্পন।কেমন যেন বার বার দুলে উঠছিল দেহ। সেই দিন নিজেকে সামলে নিয়েছি কোন মতে।

    বৃষ্টি শেষ হওয়ায় বেশ ঠান্ডা অনুভুত হচ্ছে।তবুও ফেরার কোন ইচ্ছে নেই।গাছের পাতা বেয়ে পানি গড়িয়ে পরছে টপটপ করে।বকুল গাছটাইয় যে ধুলা লেগেছিল তা ধুয়ে মুছে গোসল হয়ে গেল।এখন তার সবুজ আভা প্রস্পুটিত হচ্ছে।দুর থেকে দেখলাম টং দোকানটা তবুও খোলা।মেঘ সরে গেছে অনেক্টা।আকাশ আবার পরিষ্কার।

    দিদন্তে তাকিয়ে দেখি সুর্য ডুবতে এখনো অনেক বাকি।একটা কালো বিড়ালের ছানা কোথা থেকে যেন ভিজে টুপু টুপু হয়ে পাশে এসে ম্যাও ম্যাও করছে।শরিরে লোম দারিয়ে রয়েছে সজারুর মত।সে দিকটায় একবার তাকিয়ে তাকালাম বারান্দা বরাবর।কেউ নেই।নিশ্চয়ি ঘরে গিয়ে গরম কাপর পরেছো।কিন্তু আমার কল্পটা মিথ্যা।দেখলাম কাপর পালটিয়ে নেমে এসেছো নিচে।তোমার চোখ বকুল গাছটা দিকে।খুব আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছো।আমার কয়েক জন সহজোগী যোর করে পাঠিয়ে দিল সে দিকটায়।আমি সামনে যাচ্ছি আর তুমি এগিয়ে আসছো।একটু একটু দুরত্ব কমে আসছে। আমার নজর তোমার পানে।লাজুক দৃষ্টি।হাটতে সেদিনের মতই যোর পাচ্ছি না।দুরত্ব কমেই আসছে।তোমার গতির তুলনায় আমার গতি অনেক বেশি হওয়া এখন আমরা দুজনই গাছ থেকে সমান দুরত্বে।তুমি এক বার আমার পানে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলে।শরিরের মধ্য একটা চোট খেল।আস পাশ করছে বুকের ভেতর।আমি প্রায় গাছের কাছা কাছি।তুমিও একই দুরত্ব।এবার তোমার চোখ আমার চোখের দিকে।বার বার চোখ সরে যাচ্ছে আবার চেষ্টা করছো তা ফিরিয়ে নেবার।য়ামার মধ্য উথাল পাথাল ডেউ।ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে চুরে যাচ্ছে।আশ-পাশ করছে মন।হা হুতাশ ছরিয়ে পরছে বাতাসে।মনে হচ্ছে তুমি কিছু একটা বলবে।আমারও তেমন অনুভুতি।কিছু একটা বলা দরকার।যা মনে আসে তাই বলে দেব।মনের মধ্য কোন বাধা রাখবো না।কোন ভয় পাবো না।ভয় পেলে কোন সাধ্য সাধন করা যায় না।কি যেন বলবো এই মুহুর্তে ভুলে গেছি।কথা গলা থেকে ঠোট পর্যন্ত এসেছিল কিন্তু তা আর খুজে পেলাম না।দেখলাম তুমি কি যেন খুচ্ছিলে আর সে ভাবেই আমার দিকে তাকাচ্ছিল।আমার গতি একেবারে কম।প্রায় কাছা কাছা।তুমি কিছুটা ব্যাকুল।আবার অস্থির।আমি তোমার মত কিছু খোজার চেষ্টা করলাম না।মনে সাহস জোগাতে চেষ্টা করলাম।নাহ আমাকে বলতে হবে।কিন্তু সেই সাহস পাচ্ছিলাম না একদমই।হাত পা কাপছিল ধীরে ধীরে।তাই পাশ কাটিয়ে চলে যাই টং দোকানটির দিকে।

    পরদিন তোমার মনে আছে, সকালে আর প্রক্টিসে যাই নি।কারন মাঠ তখনও ভিজে রয়েছে।তুমি আমার অপেক্ষায় ছিলে কিনা জানিনা।দুপুর নাগাত জানতে পারি তুমি জল-পুকুরে গোসল করতে গিয়েছিলে।শুনে যান আমার দারুন কষ্ট লেগে ছিল।কষ্ট লেগেছিল কারন আমি তোমার সে দৃশ্য দেখতে পাই নি বলে।বিশ্বাস কর আমি সেখানে উপস্তিত হলে আমার মধ্য কোন খারাপ দৃষ্টি থাকতো না।তুমি সাতার কাটতে আর আমি উপরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোমায় দেখতাম।দেখাম আমার এই দৃষ্টি দেখে লাজুক ভঙ্গিতে কাপর সামলে নিতে চেষ্টা করছো।লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে থাকতো।মাঝে মাঝে আমার পানে ফিরে তাকাতে আবার তাকাতে নিজের শরিরের দিকে।কোন অংশ উদাম রয়েছে কিনা? আমি দেখতে পারিনি।নিশ্চয়ি অন্য কেউ দেখেছে।কেন অন্য তোমাকে দেখবে।তুমি শুদুই আমার জন্য, শুধুই আমার জন্য।আফসোস আর কষ্ট নিয়েই থাকতে হয়েছে।

    পর দিন আবার শুরু হয় খেলা।দেখালাম তোমার ছোট বোন নেমে যাচ্ছে টং দোকানের দিকে।আমিও পা বারালাম সে দিকে।পেয়ে গেলাম ঠিক দোকানের সামনে।তখন চমৎকার কথা বলে সে।

    আমি জিজ্ঞাসা করি তোমার নাম কি?

    সে বলে অপরিচিত কাউকে নাম বলতে নেই।

    আমি বলি নাম বলায় দোষের কি?

    সে বলে না দোষের কিছু নেই।

    আমি বলি, তাছারা তোমার যারা পরিচিত তারা তো তোমার নাম জানেই।তাদের তো আর বলার নাম প্রয়োজন নেই।তারা তো   জানেই।ঠিক না?

    বলল, অমৃতা।

    আমি বলি সুন্দর।কি কিনতে এসেছো?

    লজেঞ্জ।

    এখানে কে- কে- থাকে তোমার?

    বাবা, মা, আর আপু।

    বাবার নাম?

    মুহাম্মদ আপেল।

    এবার আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে বলি, আপুর নাম? প্রথমেই বলতে সাহস পাইনি।তাই তোমার বাবা কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম প্রথম।ইতস্তত বোধ হচ্ছিল।

    বলল, রুপতা।

    সে দিনই তোমার প্রথম নাম জানতে পারি।নামের মধ্যই মায়া আছে।আছে আমার নামের সাথে মিল।তুমি বোধ হয় তখন আমার নাম জানতে না।আমার নাম রুপস।অদ্ভুত মিল তাই না।শেষ দুট অক্ষরের মিল নেই।প্রথম দু-টর আছে দারুন।দুটি অক্ষরই একই।রুপ।এ নিয়ে অনেক ভেবেছিলাম যান? দেখ, শেষ দু-অক্ষর পাশা-পাশা সাজালে একবার হয় তাস।যা দিয়ে আজীবন মানুষ বাজি খেলে।আর অন্য ভাবে সাজালে হয়, সতা।আকার কেটে দিলে হয় সত।যার আজীবন জয়।

 

    এভাবেই চলল গোটা ছয় মাস ধরে।কষ্ট পেয়ে ছিলাম কখন যান? যখন জানতে পারি তুমি আর এ এলাকায় নেই।এখান ছেরে চলে গেছ নিজের এলাকায়।কি ব্যথাটা পেয়ে ছিলাম তা কাউকে বোঝানো যাবে না।কথাটা শুনে বুকের ভেতর থেকে একটা দির্ঘসাস ছড়িয়ে পরেছিল বাতাসে।সমুদ্রের দেউয়ের মত ব্যাথা আচরে পরছে হ্রদয়ের গহিনে।মনে হচ্ছিল প্রথিবির সব অক্সিজেন আজ কমে গিয়েছে।প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে।ঝরনা ধারার মত বেয়ে আসতে চাচ্ছিল কান্না।চেষ্টা করলাম চেপে ধরার।বেশি সময় পারলাম না।দু-হাত তুলে বেশ যোর গলায় বলেছিলাম আমি ব্যর্থ, আমি ব্যর্থ।আমি সাহসের কাছে ব্যর্থ।এতো সুজক পাওয়া সত্তেও তোমায় বলা হয়নি মনের মধ্য লুকিয়ে থাকা চাওয়া পাওয়া গুলো।

    যে কথা গুলো তুমি জাননা আজ তা বলছি।আসলে আমি ভেবে ছিলাম কোন একদিন তোমায় বলবো আমা ভাললাগার কথা, যে দিন আমার কোন যগ্যতা থাকবে।শুধু শুধু আগ বাড়িয়ে বলে যদি যোগ্যতার অভাবে তোমার কাছ থেকে প্রত্যাখিত হই তবে আমি আরো বেশি কষ্টা পাবো।তাছারা তোমার বাবাকে যেদিন প্রথম দেখি সেদিন থেকেই ভয় পেতে শুরু করি।কি পরিমান ভয় পেতাম তা বলার বাইরে।হঠাৎ এভাবে চলে যাবে ভাবতেও পারিনি।ভেবে ছিলাম অন্তত দুবছর আছো আমাদের এলাকায়।পরে শুনে ছিলাম তোমার বাবাকে রাজনৈ্তিক কারনে জন্য ট্রানফার করে এখানে পাঠানো হয়।শুনে ছিলাম তোমার বাবার সাথে নাকি স্থাথানীয় এক নেতার সাথে কি যেন হয়ে ছিল যার দরুন এ ব্যাবস্থা।অনেক দিনই থাকার কথা ছিল কিন্তু তোমার বাবা উপর মহলে চেষ্টা ততবির করে আবার ফিরে যায় নিজ এলাকায়।খনজন্মার মত হয়ে কেন যে আমাদের এলায় এসেছিলে বুঝতে পারি না।এলে যখন তখন কেনইবা চলে যাবে এভাবে।কেন মনের মধ্য কোন একটা পোকা প্রতি নিয়ত কিট কিট করে কামরে খাবে।কেন প্রতিনিয়ত পোরাবে আমার পুরো শরির।

তোমার চলে যাওয়ার পর তোমাদের ঠিকানা সংগ্রহ করি।তবে সাহস পাই নি সেখানে যাওয়ার।তাছারা তোমার সাথে আমার তেমন কোন সম্পর্ক গরে ওঠে নি।কি অধিকারে তোমার সামনে দিয়ে দাড়ায়।তাছারা তোমার বাবা যদি আমায় অপমান করে তাড়িয়ে দেয়।

     এরপর থেকে পুরো দমে লেগে যাই ক্রিকেটের পেছন।বছর খানিক প্রক্টিস করার পর ঢাকা গিয়ে ট্রাই করি একটা ক্লাবে।চাঞ্ছ পেয়ে যাই।শুরু হয় আমার নতুন জীবন।দু-বছর ধারা বাহিক ভাল পারফর্মেঞ্ছ থাকাতে ডুকে যাই জাতিয় দলে।এখনো তাই আছি।

                                                                                 ইতি

                                                                              রুপন্ন আহম্মদ

                                                                              ১১/০২/০৬

 

    ট্রেন স্টেশন।নাম ছরিয়ে পরার পর থেকে তেমন ডিলে ডালা ভাবে যেথায় সেথায় যাওয়া হয় না।ুনেক দি বাদে এখাবে ট্রেনে করে যাবে।চোখে চশমা পরেছে যাতে সহজে মানুষ চিনতে না পারে।তারোকা হওয়ার জালা আছে।সেষ্টন খুব বড় নয়।তবে প্রচুর মানুষ যাতায়াত করে।

।রুপতা তেমনি আছে।চেহারার উজ্জলতা আরো বেড়েছে।মুখের হাসিটা আরো বেশি মায়া ছরায়।পরনে কমলা রঙ্গয়ের শাড়ি।হাতে অনেক দূর পর্যন্ত বিভিন্ন কালারের চুরি।বলে, আমারও মনে হত তুমি আমায় ভালবাস। আমারও তোমায় ভাল লাগতো।আমি অপেক্ষা করতাম কিছু একটা বলবে বলে।অনেক বার কাছা কাছি আসার পরও যখন তুমি কিছু বলনি তখন ভাবতাম এটা আমার মনের ভুল।আমিও ভয় পেতাম।ভয় পেতাম প্রতাখ্যিত হওয়ার।ভয় পেতাম বাবাকে।যাকে আমি আজও ভয় পাই।তুমি যে শিহরনের কথা বললে তা আমারও হত।আমার ভিতর নিংরে যেত ভালবাসার ব্যাকুলতায়।আমার লাজুক চোখ তোমায় খুজতো।লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম, তখনকার বয়সে ভালবাসার আবেগ থাকে অনেক বেশি।কিন্তু সেই বয়ষে কেউ এতো সাহস দেখায় না।আমিও তাই পারিনি।

    যানো? আমার এখন অনেক সাহস।আমি প্রতিনিধিত্ব করি পুরো বাংলাদের।কাউকে পরিচয় দিতে হয় না।পরিচয় আমার পরিচয় দেয়।পুরো দেশের মানুষ আমায় ভালবাসে।সন্মান করে।কারো কারো ঘরে আমার ছবি টানানো।কোন কোন মেয়ে অপেক্ষায় আছে আমার জন্য।জান? আমি অনেক দিন ধরে মনে মনে তোমায় খুচ্ছি।একটানা খেলার কারনে তোমার সাথে দেখা করার সময় হয়নি।এবার একটু ছুটি।তাতেই যাবো ভাবছিলাম।কি কপাল বল এখানেই দেখা হয়ে গেল।আজও তোমার ঠিকানা আমার পকেটে থাকে।পকেট থেকে একটি পুরনো কাগজ বের করে বলে, এই দেখো, দেখো।কত যন্ত করে রেখেছি।

    রুপতা হাতে নিয়ে বলে, ঠিকানা তো ঠিকই আছে।

    হ্যা এটা সত্যি তোমার এখন অনেক নাম ডাক।সবাই তোমায় চেনে ভালবাসে।প্রায়ই দেখি টিভি পর্দায়।যে দিন প্রথম তোমার খেলা দেখি সেদিন থেকেই তোমার ভক্ত হয়ে যাই।আজ কাল যখন টিভিতে দেখি তখ খুব আপসোস হয়।আফসোস হয় তোমার সাথে তখনই যদি সম্পর্কটা হয়ে যেতো তবে আমিও তোমার ওখানে তাকতে পাওরতাম।দিতে পারতাম উৎসাহ।যখন ঐ দূর থেকে দেখি তখন খুব কষ্ট হয়।মনে হয় জোগাযোক করি।ক্রিকেট আমার বরাবরই পছন্দের।যদিও প্রথম সে দিনের পারফর্মেস ভাল ছিল না।আমি তোমার মধ্য নতুন কিছু আভাস পেতাম।মাঝে মাঝে তোময় ছুয়ে দেখার বাসনা হত।ইচ্ছে হত অনেক কথা বলতে।

    রুপস বলে, আমি এখন তোমার বাবার সামনে দারাতে পারব।বলতে পারবো আপনার মেয়েকে আমার ভাল লেগেছে অনেক দিন ধরে।য়ামিযত টুকু এগিয়ে তা আপনারই মেয়ের জন্য।তাকে বিয়ে কতে চাই যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে।আমার মনে হয় না তোমার বাবা আমায় ফিরিয়ে দিবে।তিনিও আমায় চেনেন।তিনিও জানেন আমি দেশের গর্ব।

    আচ্ছা, বকুল গাছটা এখনো কত বড় হয়েছে?

    সেটি আজ আর নেই।সময়ের দাবি মেটাতে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে সভ্যাতার মাঝে।নিজেকে সদর্পে লুটে দিয়েছে মানুষের কাছে।সেটা কেটে রাস্তা বড় করা হয়েছে।মাঠাও তেমন নেই।চার পাশ থেকে চাপাতে চাপাতে ছোট একটি মাঠে পরিনত হয়েছে।

আমার কত ভাল লাগছে তোমাকে বলে বোঝানো যাবেনা।কত বছর পর দেখা তাই না।চুলের স্টাইল পরিবরির্তন কর কেন? আগে তো ভালই ছিল।

    রুপস হেসে বলে, এই তো মাঝে মাঝে একটু এদিক সেদিক করে দেখি কি হয়।

    অনেক বড় হয়েছো।

    তুমিও কম নয়।

    পুকুরটার কি অবস্থা?

    মানুষের মনের মত তারও গভিরতা কমে গেছে অনেক খানি।কেউ যন্ত নেয় না।ধীরে ধীরে ঐতিহ্য কমে যাচ্ছে।জান তুমি আমাকে ফিরিয়ে দাওনি বলে বেশ ভাল লাগছে।আমারও কতটা ভাল লাগছে তোমাকে বলে বোঝানো যাবে না।আমি সর্গ পেয়ে গেছি।লাপাতে ইচ্ছে করছে ঠিক যেমন বাংলাদেশ টিমকে জিতাতে পারলে হয়।এতো বছরের অপেক্ষার অবসান।

    তুমি দেশের তারকা।অনেক বড় তারকা।তোমার মত একজন প্রতিষ্টিত মানুষ প্রস্তাব দিচ্ছে এবং তা সামনা সামনি।ভাবতে মনের মধ্য শিহরন আনে।শুধু আমি নই যে কাউকেই তুমি প্রস্থাব দিবে সে রাজি হয়ে যাবে অনায়াসে।

তোমার সাথে আজ অনেক না বলা কথা বলবো।যা শুধু একজনকেই বলা যায়।

    রুপতা একটু হাসে, উত্তর দেয় না।

    কিছু বললে না?

    তোমার মত এক জন দেশ বরন্য আমায় ভালবেসেছে এর চেয়ে বেশি কিছু নেই।এটা আমার সাত যনমের ভাগ্য।অনেক কথা হল।ট্রেনের হুইসাল শোনা যাচ্ছে।কেপে উঠছে চার পাশ।লোক জন ছোটা ছুই করছে বেশ পরিমানে।ভোদহয় এসে পরেছে খুব কাছাকাছি।রুপতা চোখের ভাষা নমনিও করে বলে, ও পাশে আমার স্বামী সন্তান দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় আছে আমার জন্য।আমাকে যেতে হবে।

    একই ভঙ্গীতে আবার বলে, তবে বোধ হয় আজ থেকে আমার প্রতি তোমার কোন একটা বিদ্দেশ তৈরি হবে।হয়তো ভাববে সেই সময় আমি আগ বাড়িয়ে বলিনি কেন? হয়তো প্রচন্ড একটা রাগ হবে আমার উপর।যদি কোণ নিদ্দ্যেশ অথাবা কোন রাগ আমার উপর থাকে তবে অনুরোধ সেই রাগটা তুমি খালার মাথে দেখাও।সেই রাগটা ঝার প্রতি পক্ষের উপর।ভাবো ঐ লাল অথবা সাদা বলটা আমি এবং আমায় দুবাহুতে প্রচন্ড শক্তি এনে মারো।বার বার মার।প্রচন্ড মার।মেরে বাইরে বের করে দাও বারবার।যাতে বাংলাদেশ বার বার হাসে।আর তোমার অফুরন্ত ভালভাসা যা এতো দিন ধরে জিয়িয়ে রেখেছো তা শুধু এক জনের জন্য নয় ছড়িয়ে দাও দেশের প্রতিটা মানুষের মধ্য।

নিব

:উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তনের একটি শোভন ছড়াপত্র

বাঙলা

আফসার নিজাম সম্পাদিত : চিন্তাশীল পাঠকের মননশীল সৃজন