আলোকময়ী নারী বেগম রোকেয়া


কানিজ ফাতিমা

কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ও ধর্মীয় গোড়ামীপূর্ণ এক অন্ধকার সময়ে ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন বেগম রোকেয়া। ঐ সময়কার কুসংস্কারের বেশীর ভাগই ছিল নারী সমাজকে ঘিরে। নারীরা, বিশেষ করে মুসলিম নারীরা ছিলেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। পর্দা প্রথার নামে নারীদের ঘরে আবদ্ধ রাখা হত। এমনকি প্রয়োজনে নারীকে ঘর থেকে বের হওয়া এবং সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করাও ছিল নিষিদ্ধ। বেগম রোকেয়া এসব কুসংস্কার ও ধর্মীয় অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। ইসলাম প্রদত্ত নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি কাজ করে গেছেন আজীবন নিরলসভাবে। দু:খজনক হলেও সত্যি অনেকে মনে করেন বেগম রোকেয়া ইসলামী আদর্শ ও ইসলাম নির্দেশিত পর্দা প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। এর কারণ হল এক দল ব্যক্তি বেগম রোকেয়ার চরিত্রকে ওভাবেই চিত্রিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। তারা বেগম রোকেয়াকে ইসলামী পুন:র্জাগরন ও পর্দা বা হিজাব এর বিরুদ্ধে প্রতিক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। অথচ যারাই বেগম রোকেয়ার লেখা পড়েছেন এবং তার ব্যক্তিগত পত্রাবলী যা তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নজনকে দিয়েছেন, পড়েছেন তাদের মনে বিন্দু মাত্র সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই যে বেগম রোকেয়া ইসলামের বিরোধীতা করেননি; করেছেন ইসলামী অনুশাসনের অপব্যাখ্যা ও বাড়াবাড়ির বিরোধীতা; তিনি হিজাবের বিরোধীতা করেননি, করেছেন হিজাবের নামে অবরোধ প্রথার বিরোধীতা, যার সঙ্গে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নিজে হিজাব অনুশীলন করেছেন; তার লেখনীতেও বোরকার প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন; [তার একটি প্রবন্ধের নাম বোরকা] নিজ জীবনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেছেন; নিয়মিত কোরআন অধ্যয়ন করেছেন; [দেখুন বেগম রোকেয়ার জীবনী, শামছুন নাহার] এমনকি নিজের অসংখ্য লেখায় ইসলাম, কোরআন ও রাসুল সা. এর বন্দনা করেছেন। তিনি একাধারে ছিলেন সাহিত্যিক, কবি, প্রবন্ধকার, নারী শিক্ষা প্রসারের অগ্রদূত, ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের শক্ত সমর্থক, নারীমুক্তি আন্দোলনের অধিনায়ক, সমাজ সেবক, সর্বোপরী ইসলামী আদর্শে গভীরভাবে অনুরাগী এক আলোকময়ী মহিয়সী নারী।

নারী শিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়া:
বেগম রোকেয়া তৎকালীন বাঙালী মুসলিম সমাজে নারীদের দূরাবস্থা দেখে বুঝতে পেরেছিলেন শিক্ষা থেকে দূরে থাকাই তাদের এ-পশ্চাৎপদতার মূল কারণ। তাই তিনি তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন মুসলিম নারীদের দূরাবস্থা তার লেখায় ফুটে উঠেছে এভাবে, ‘স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন, স্ত্রী তখন একটা বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ সেলাই করিবার জন্য মাপেন। স্বামী যখন কল্পনাÑসাহায্যে সুদূর আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রমালাÑ বেষ্টিত সৌরজগতে বিচরণ করেন, সূর্য মন্ডলের ঘনফল তুলাদন্ডে ওজন করেন এবং ধুমকেতুর গতি নির্ণয় করেন, স্ত্রী তখন রন্ধনশালায় বিচরণ করেন, চাউল ডাল ওজন করেন এবং রাঁধুনীর গতি নির্ণয় করেন।’ সুশিক্ষার অভাবে নারীরা যোগ্য স্ত্রী হতে পারেন না। স্ত্রী হিসাবে ব্যর্থ হন। এ-সম্পর্কে বেগম রোকেয়া বলেছেন,
বর। জগৎ ছানিয়া, কি দিব, আনিয়া জীবন করি ক্ষয়?
তোমা তরে সখি, বল করিব কি?
কনে। আরো কুল পাড় গোটা ছয়।
* * *
বর। বিরহের বেলা কেমনে কাটিবে?
কনে। দেব পুতুলের বিয়ে।

বেগম রোকেয়া অন্যত্র বলেছেন, ‘প্রভুদের বিদ্যার গতির সীমা নাই, স্ত্রীদের বিদ্যার দৌড় সচরাচর ‘বোধোদয়’ পর্যন্ত।’

এ-দূরাবস্থা ঘোচাতে তিনি ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ স্থাপন করেন ১৯০৯ সালে ভাগলপুরে। সেখানে বিশেষ সুবিধা না হওয়ায় ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ কলকাতায় অলিউল্লা লেনের একটি ছোট বাড়ীতে আটজন ছাত্রী নিয়ে নতুন ভাবে স্কুল আরম্ভ করেন। স্কুলের ছাত্রী জোগাড় করেছেন তিনি বাড়ী বাড়ী ঘুরে। শত বাধা, তীব্র কটাক্ষ সব কিছুকে ভ্র“কুটি দেখিয়ে তিনি এগিয়ে গেছেন নারী শিক্ষার সুমহান ব্রতকে সামনে রেখে। তিনি এ-স্কুলটি নিয়ে কতটা পেরেশান থাকতেন তা তার লেখাতেই ফুটে উঠেছে।
‘আমি সর্বদা আপনাদের এই স্কুলের বিষয়ে নিয়ে বিরক্ত করে থাকি। এমনকি অনেকে আমাকে একটা হঁরংধহপব বিশেষ মনে করেন। আমি যদি পৌত্তলিক হতুম, আর আমার কোন দেবতা থাকতেন, তবে তিনিও নিশ্চয় বিরক্ত হয়ে বলতেন, প্রার্থনার সময়ে ‘ধনং দেহি, মানং দেহি’ এসব কিছু না বলে এ-মেয়েটা কেবল একঘরে ‘সকলের জন্য গৃহং দেহি, স্কুলের শ্রীবৃদ্ধি দেহি’ বলে। দাও বেটিকে লাথি মেরে তাড়িয়ে।’

আজ আমি আপনাদের নিকট খানিকটা সময় ভিক্ষা চাই যে, আপনারা দয়া করে ধৈর্যের সহিত আমার দুটি কথা শুনুন। আপনারা সকলেই জানেন যে, এই ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলটা না থাকলে আমি মরে যাব না। এমনটা নিশ্চয়ই হবে না যেÑ
ঘুঘু চড়বে আমার বাড়ী,
উনুনে উঠবে না হাঁড়ী,
বৈদ্যেতে পাবে নাড়ী
অন্তিম দশায় খাব খাবি।

এ-স্কুলটা না থাকলে আমার তিলমাত্র ক্ষতি নাই। তবে এ-স্কুলের উন্নতি কেন চাই? চাই নিজের সুখ্যাতি ঝাড়বার জন্য নয়; চাই স্বামীর স্মৃতি রক্ষার জন্য নয়; চাই বঙ্গীয় মুসলিম সমাজের জন্য।’

তার ব্যক্তিগত চিঠিতে তিনি লিখেছেন এই স্কুলের সব দিকেই তাকে নজর দিতে হতো। এমনকি ‘ঘোড়ার দলাই-মলাই’ হয়েছে কিনা তাও তাকেই দেখতে হত। তিনি তার লেখনীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ভাবে বঙ্গীয় মুসলিম নারীদের পশ্চাদপদতার কারণ হিসাবে দায়ী করেছেন শিক্ষার অনগ্রসরতাকে। ‘তবে কেবল শারীরিক বলের দোহাই দিয়া অদূরদর্শী ভ্রাতৃমহোদয়গণ যেন শ্রেষ্ঠত্ব দাবী না করেন। আমরা পুরুষের ন্যায় সুশিক্ষা অনুশীলনের সম্যক সুবিধা না পাওয়ায় পশ্চাতে পড়িয়া আছি।’ [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ: ৪৩]

তিনি আরো বলেন, ‘প্রকৃত সুশিক্ষার অভাবেই আমরা এমন নিস্তেজ, সঙ্কীর্ণমনা ও ভীতু হইয়া পড়িয়াছি, ইহা অবরোধে থাকার জন্য হয় নাই। … … যতদিন আমরা আধুনিক জগতে পুরুষদের সমকক্ষ না হই, ততদিন পর্যন্ত উন্নতি আশরা দুরাশা মাত্র। আমাদিগকে সকল প্রকার জ্ঞানচর্চা করিতে হইবে।’ [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ. ৬১]

তিনি অন্যত্র লিখেছেনÑ ‘ফলকথা, উপরোক্ত দূরাবস্থার একমাত্র ঔষুধ একটি আদর্শ মোসলেম বালিকা বিদ্যালয়, যেখানে আমাদের মেয়েরা আধুনিক জগতের অন্যান্য স¤প্রদায় এবং প্রদেশের লোকের সঙ্গে তাল রেখে চলার মত উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারেন।’

বেগম রোকেয়ার ‘স্কুলে তাফসীর সহ কোরান পাঠ থেকে আরম্ভ করে ইংরেজী, বাংলা, উর্দু, পার্শী, হোম নার্সিং, ফার্ষ্ট এইড, রন্ধন, সেলাই ইত্যাদি মেয়েদের অত্যাবশ্যকীয় বিষয় সমস্তই শিক্ষা দেয়া হত। [এম. ফাতেমা খানম, ‘সপ্তর্ষি’, সেলিনা চৌধুরী কর্তৃক প্রকাশিত, ঢাকা ’৬৪ ইং]

তখনকার সমাজে পুরুষরা নারী শিক্ষার বিরোধীতা করতো, এর প্রতিবাদে তিনি লিখেছন,
“গধু বি পযধষষবহমব ংঁপয মৎধহফভধঃযবৎং, ভধঃযবৎং, ড়ৎ ঁহপষবং ঃড় ংযড়ি ঃযব ধঁঃযড়ৎরঃু ড়হ যিরপয ঃযবু ঢ়ৎবাবহঃ ঃযবরৎ মরৎষং ভৎড়স ধপয়ঁরৎরহম বফঁপধঃরড়হ? ঈধহ ঃযবু য়ঁড়ঃব ভৎড়স ঃযব ঐড়ষু ছঁৎধহ ড়ৎ ঐধফরং ধহু রহলঁহপঃরড়হ ঢ়ৎড়যরনরঃরহম ড়িসবহ ভৎড়স ড়নঃধরহরহম শহড়ষিবফমব?”
তিনি ক্ষোভের সঙ্গে আরো লিখেছেন যে, পুত্রের শিক্ষার জন্য হয়তো চারজন শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু কন্যার জন্য হয়তো দুইজন শিক্ষক ও নিযুক্ত করা হয় না। বালিকা বিদ্যালয় নেই বললেই চলে। তাই তিনি তীব্র ভাষায় বলেছেন, ‘যে স্থলে ভ্রাতা শমসÑউলÑউলামা সে স্থলে ভগিনী নজমÑউলÑউলামা হইয়াছেন কি? তাঁহাদের অন্তঃপুর গগণে অসংখ্য নজমন্নেসা শামসন্নেসা শোভা পাইতেছেন বটে। কিন্তু আমরা সাহিত্যÑগগণে নজমÑউলÑউলামা দেখিতে চাই’।

অবরোধ প্রথার প্রতিবাদে বেগম রোকেয়া:
তৎকালীন সময়ে পর্দা প্রথার নামে নারীদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল অবরোধ প্রথা। ধর্মের অপব্যাখ্যা ও বাড়াবাড়ি এতদূর পৌঁছে গিয়েছিল যে পাঁচ বছরের মেয়েকেও পড়শী নারী থেকেও নিজেকে লুকিয়ে রাখতে হত। বেগম রোকেয়া স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে, ‘সবে মাত্র ৫ বছর হইতে আমাকে স্ত্রী লোকদের হইতেও পর্দা করিতে হইত। ছাই কিছুই বুঝিতাম না যে কেন কাহারও সম্মুখে যাইতে নাই; অথচ পর্দা করিতে হইত। পুরুষের ত অন্ত:পুরে যাইতে নিষেধ। সুতরাং তাদের অত্যাচার আমাকে সহিতে হয় নাই। কিন্তু মেয়ে মানুষের অবাধ গতি অথচ তাহাদের দেখিতে না দেখিতে লুকাইতে হইবে। পাড়ার স্ত্রী লোকেরা হঠাৎ বেড়াইতে আসিত; অমনি বাড়ীর কোন লোক চক্ষুর ইসারা করিত। আমি যেন প্রাণভয়ে যত্রতত্র Ñ কখনও রান্নাঘরে ঝাঁপের অন্তরালে, কখনও কোন চাকরানীর গোল করিয়া জড়াইয়া রাখা পাটির অভ্যন্তরে, কখনও তক্তপোষের নীচে লুকাইতাম।’ [রোকেয়া রচরনাবলী, পৃ ৪৮৮Ñ৪৮৯]

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ন্যায় আমাদের নামগুলি পর্যন্ত পর্দানশীল। মেয়েদের নাম জানা যায়, কেবল তাহাদের বিবাহের কাবিন লিখিবার সময়।’ [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ: ৪৯১]

বেগম রোকেয়া ও অযৌক্তিক অবরোধ প্রথার প্রতিবাদে লিখেছেন, ‘সকল রকম অধিকার বঞ্চিতা হয়ে চার দেওয়ালের মাঝখানে বন্দিনী হয়ে থাকার নাম পর্দা নয়।’ [তিন কুড়ে, রোকেয়া রচনাবলী পৃ: ৫৩১]

‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসে তিনি অভিনেত্রীদের কথোপকথনে তুলে এনেছেন তার প্রতিবাদী চিন্তাÑ ‘… আর এই ‘অবরোধ’ প্রথার মস্তক চূর্ণ করিতে হইবেÑ এটাই যত অনিষ্টের মূল। লাথি ঝাঁটা হজম করিয়া ‘অবরোধ’ প্রথার সম্মান রক্ষা,Ñ আর নহে!’

‘ভ্রাতাÑভগ্নী গল্পে তিনি সিদ্দিকার মুখে তুলে এনেছেন এক দৃঢ় চ্যালেঞ্জ, ‘ঐ কৃত্রিম অন্তঃপুর বন্ধন মোচন হইলে সমাজে অবাধে স্ত্রী শিক্ষা প্রচলিত হইতে পারে। তখন এ শিক্ষার গতিরোধ করা অসম্ভব হইবে।’

‘অবরোধ বাসিনী’ নামক নিবন্ধে তিনি তখনকার সময়ে অবরোধ প্রথার সরূপ তুলে ধরতে গিয়ে ব্যক্তিগত কিছু ঘটনার উল্লেখ করেন মাসিক মোহাম্মদী তে। অবরোধের বাড়াবাড়ি সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সভ্যতার সহিত অবরোধ প্রথার বিরোধ নাই। তবে সকল নিয়মেরই একটা সীমা আছে। এদেশে আমাদের অবরোধ প্রথাটা বেশী কঠোর হইয়া পড়িয়াছে।’ [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ: ৫৯]

শালীনতার প্রতীক বেগম রোকেয়া:
বেগম রোকেয়া তার ‘বোরকা’ প্রবন্ধে অবরোধ প্রথার বিপক্ষে বলেছেন, কিন্তু শরিয়তী পর্দার পক্ষে সুদৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। ‘পর্দা অর্থেতো আমরা বুঝি গোপন হওয়া, বা শরীর ঢাকা ইত্যাদিÑ কেবল অন্ত:পুরের চারিÑপ্রাচীরের ভিতর থাকা নহে। এবং ভালমত শরীর আবৃত না করাকেই ‘বে-পর্দা’ বলি। যাঁহারা ঘরের ভিতর চাকরদের সম্মুখে অর্ধ-নগ্ন অবস্থায় থাকেন, তাহাদের অপেক্ষা যাহারা ভালমত পোশাক পরিয়া মাঠে বাজারে বাহির হন, তাঁহাদের পর্দা বেশী রক্ষা পায়।’ [বোরকা, রোকেয়া রচনাবলী, পৃ: ৫৭]।

‘স্ত্রী জাতির অবনতি, প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, ‘বরং এই বলি, কুমারের মস্তক শিরস্তানে সাজাইতে যতখানি যতœ ও ব্যয় করা হয়, কুমারীর মাথা ঢাকিবার ওড়নাখানা প্রস্তুতের নিমিত্তেও ততখানি যতœ ব্যয় করা হউক’ [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ: ৩০]

বোরকা প্রবন্ধে হিজাব বিরোধীদের যুক্তি খন্ডন করে তিনি বলেছেন, ‘কেহ বলিয়াছেন যে, ‘সুন্দর দেহকে বোরকাজাতীয় এক কদর্য ঘোমটা দিয়া আপাদমস্তক ঢাকিয়া এক কিম্ভুতকিমাকার জীব সাজা যে কি হাস্যকর যাঁহারা দেখিয়াছেন, তাঁহারাই বুঝিতে পারিয়াছেন’ ইত্যাদি। তাহা ঠিক! কিন্তু আমাদের বিশ্বাস যে, রেলওয়ে প্লাটফরমে দাঁড়াইয়া কোন সম্ভ্রান্ত মহিলাই ইচ্ছা করেন না যে, তাঁহার প্রতি দর্শকবৃন্দ আকৃষ্ট হয়। সুতরাং ঐরূপ কুৎসিত জীব সাজিয়া দর্শকের ঘৃণা উদ্রেক করিলে কোন ক্ষতি নাই। … রেলওয়ে ভ্রমণকালে সাধারণের দৃষ্টি হইতে রক্ষা পাইবার জন্য ঘোমটা কিম্বা বোরকার দরকার হয়।’

‘বোরকা’ প্রবন্ধে বোরকা বা হিজাবের সপক্ষে বলতি গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘উচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত ভগ্নীদের সহিত দেখা-সাক্ষাৎ হইলে তাঁহারা প্রায়ই আমাকে ‘বোরকা’ ছাড়িতে বলেন। বলি, উন্নতি জিনিসটা কি? তাহা কি কেবল বোরকার বাহিরেই থাকে? যদি তাই হয় তবে বুঝিবে যে জেলেনী, চামারনী, কি ডুমুনি প্রভৃতি স্ত্রীলোকেরা আমাদের অপেক্ষা অধিক উন্নতি লাভ করিয়াছে?’ [বোরকা, রোÑর, পৃ: ৫৬]

‘কেহ কেহ বোরকা ভারী বলিয়া আপত্তি করেন। কিন্তু তুলনায় দেখা গিয়াছে ইংরাজ মহিলাদের প্রকান্ড প্রকান্ড হ্যাট অপেক্ষা আমাদের বোরকা অধিক ভারী নহে।’ [রোÑর, পৃ: ৫৭]
তিনি এ-প্রসঙ্গে আর বলেন, ‘আমরা অন্যায় পর্দা ছাড়িয়া আবশ্যকীয় পর্দা রাখিব। প্রয়োজন হইলে অবগুণষ্ঠন [ওরফে বোরকা] সহ মাঠে বেড়াইতে আমাদের আপত্তি নাই। স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য শৈলবিহারে হইলেও বোরকা সঙ্গে থাকিতে পারে। বোরকা পরিয়া চলাফেরায় কোন অসুবিধা হয় না। তবে সে জন্য সামান্য রকমের একটু অভ্যাস চৎধপঃরপব চাই; বিনা অভ্যাসে কোন্ কাজটা হয়?’ [রোÑর, পৃ: ২৬০]

‘বোরকা’ প্রবন্ধের সর্বশেষে তিনি বলেন, ‘আশা করি, এখন আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রাপ্তা ভগ্নীগণ বুঝিতে পারিয়াছেন যে, বোরকা জিনিসটা মোটের উপর মন্দ নহে।’ [রোÑর, পৃ: ৬৩]

পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ ও নগ্নতার বিরোধীতায় রোকেয়া:
বেগম রোকেয়া পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ ও নগ্নতার কঠোর বিরোধীতা করেছেন তার লেখনীতে। রোকেয়া রচনাবলীর ১৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘যাহা হউক শিক্ষার অর্থ কোন স¤প্রদায় বা জাতি বিশেষের অন্ধ অনুকরণ নহে। ঈশ্বর যে স্বাভাবিক জ্ঞান বা ক্ষমতা ভধপঁষঃু দিয়াছেন সেই ক্ষমতাকে অনুশীলন দ্বারা বৃদ্ধি ফবাবষড়ঢ় করাই শিক্ষা।’

‘উন্নতির পথে’ রম্য রচনাটিতে তিনি অতি তীক্ষèভাবে নগ্নতার কটাক্ষ করেছেনÑ ‘যাক, আমাদের প্লেন বোঁ বোঁ করে রওয়ানা হলো। তাতে আরও অনেক যাত্রী ছিলÑ ইরানী, তুরানী, তুর্কী, আলবানিয়ান, ইরাকী, কাবুলী ইত্যাদি ইত্যাদি।’ উল্লেখ্য এখানে যাত্রীদের সবাই মুসলিম দেশের অধিবাসী। আর এদের মধ্যে “কেবল তরুণ নয়, তরুণীরাও ছিল। সবাই নওজোয়ান, বুড়ো [আমি ছাড়া আর] একটাও না। আমার মাথার ভিতর কেবলই গুঞ্জন করছিলÑ
‘নগ্ন শির, সজ্জা নাই, লজ্জা নাই ধড়ে,
কাছা কোঁচা শতবার খসে খসে পড়েÑ’
কখনও ঐ গানটাই উলটÑপালট হ’য়ে মনে ভেসে বেড়াচ্ছিল
‘পাগড়ী নাই, টুপি নাই, লজ্জা নাই ধড়েÑ ইত্যাদি।

ও বাবা! কতক্ষণ পরে দেখি কি, সত্য সত্যই তরুণদের কাঁছাÑকোঁচা একেবারে খসে পড়ে গেছে Ñ আরÑ
রোদ বৃষ্টি হিম হতে বাঁচাইতে কায়
একমাত্র হ্যাট তার রয়েছে মাথায়!

শেষে দেখি, সোবহান আল্লাহ্ তরুণীরাও অর্ধÑদিগম্বরী!!

যাক্ হ্যাট দিয়ে লজ্জা যদি নাÑও নিবারণ হয়, তবু রোদ বৃষ্টি হিম হতে মাথাটা বাঁচাবে। কিন্তু তরুণীদের মাথায় যে হ্যাটও নাই! আর চেপে থাকতে না পেরে ব’লে ফেললুমÑ ‘ভাই তরুণ, উন্নতির পথে চলেছ, তা উলঙ্গ হয়ে কেন?’

সে বললে, ‘আমরা এখন দেশোদ্ধার করতে চলেছিÑ আমাদের কি আর কাছা কোঁচা জ্ঞান আছে? তুচ্ছ বেশÑভূষা, তুচ্ছ বাসÑ সব বিসর্জন দাও স্বাধীনতা পাবার আশায়। আমরা চাই কেবল উন্নতি আর উন্নতি। … … বোঁ বোঁ করে প্লেন উন্নতির পথে ছুটেছে! এখন দেখি কি, সেই তরুণী তরুণের কথাই সত্য, অর্থাৎ প্লেনটা চক্রাকার পথে ঘুরে ক্রমে কালিদাসের বর্ণিত শকুন্তলার যুগেÑ যখন মুণি-কন্যারা গাছের বাকল পরতেন, তাও আবার সবসময় লম্বায় চওড়ায় যথেষ্ঠ হ’ত না ব’লে টেনে টেনে পরতে হ’তÑ সেই যুগে এসে পড়েছে। তরুণীদের দিকে আর চাওয়া যায় না। … আমি কাকুতি ক’রে বললুম, “দোহাই ভায়া তরুণ! আর না। আমি বুঝতে পেরেছি: তোমরা এখন আদি-মাতা হযরত হাওয়ার যুগে এসে পড়বে। আদি-পিতা অভিশপ্ত হ’য়ে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হ’য়ে গাছের তিনটা পাতা চেয়ে নিয়েÑ একটায় তহবন্দ, একটা দিয়ে জামা আর একটা দিয়ে মাথা ঢাকবার টুপী করেছিলেন। আর আদি-মাতা তাঁর লম্বা চুল খুলে দিয়ে সমস্ত গা ঢেকেছিলেন। কিন্তু এখনকার তরুণীদের মাথায় ত চুলও নেইÑ এরা কি দিয়ে গা ঢাকবে?’ [মাসিক মোহাম্মদীয়, পৌষ, ১৩৩৫]।

ডেলিশিয়া হত্যায় তিনি পশ্চিমা মেকী সভ্যতার কথা তুলে ধরেছেন। ‘ইংরাজ রমণীর জীবন কিরূপ? আমরা মনে করি, তাহারা স্বাধীন, বিদূষী, পুরুষের সমকক্ষা সমাজে আছৃতাÑ তাঁহাদের আরও কত কি সুখ সৌভাগ্যের চাকচিক্যময় মূর্তি মানস-নয়নে দেখি। কিন্তু একবার তাহাদের গৃহাভ্যন্তরে উঁকি মারিয়া দেখিতে পাইলে বুঝি সব ফাঁকা। দূরের ঢোল শুনিতে শ্র“তি মধুর।’ [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ: ১৫৩]

‘পদ্মরান’ উপন্যাসে তিনি বলেন, ‘এই ইংল্যান্ড এই পুঁতিগন্ধময় পচা ইংল্যান্ড আবার সভ্যতার দাবী করে।’
পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্ধ অনুকরণকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘কিন্তু এদেশের ভগ্নীরা বিলাতী সভ্যতার অনুকরণ করিতে যাইয়া পর্দা ছাড়িয়াছেন। তাঁহাদের না আছে ইউরোপীয়দের মত শয়নকক্ষের স্বাতন্ত্র ইবফ-ৎড়ড়স ঢ়ৎরপধপু, না আছে আমাদের মত বোরকা।’ [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ. ৫৮]

ইসলামী শিক্ষার প্রসার ও বেগম রোকেয়া:
দু:খ জনক হলেও সত্য অনেকেই বেগম রোকেয়ার চরিত্রকে ইসলাম বিদ্ধেষীরূপে অঙ্কিত করতে চান। যার ফলস্বরূপ অনেক ইসলাম পন্থী ও তার সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা পোষন করেন। অথচ বেগম রোকেয়া তার লেখনী ও বক্তব্যে ইসলামী শিক্ষা প্রসারের জন্য বার বার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি যারা অর্থ না বুঝে কোরআন পড়েন তাদেরকে নারকেলের উপরের কঠিন অংশ লেহন করেন বলে উপমা দিয়েছেন-

শৈশব হইতে আমাদিগকে কোরান মুখস্থ করানো হয়, কিন্তু শতকরা নিরানব্বই জন তাহার একবর্ণের ও অর্থ বলিতে পারে না। যাঁহারা অর্থ শিখিয়াছেন, তাঁহারাও শোচনীয়রুপে ভ্রান্ত। ইসলামে মর্ম তাঁহাদের কাছে এক বর্ণও ধরা পড়ে নাই, ইহার চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কি হইতে পারে? তিনি বলিতেন ‘নারিকেলের চমৎকার স্বাদ তাহার দুর্ভেদ্য আবরণের ভিতরে আবদ্ধ। অন্ধ মানুষ সেই কঠিন আবরণ ভেদ করিবার চেষ্টা না করিয়া সারাজীবন শুধু ত্বকের উপরিভাগটাই লেহন করিয়া মরিল।’ [রোকেয়া জীবনী, শামছুন নাহার পৃ.১২০]

বেগম রোকেয়ার খুব নিকটস্থ এক ছাত্রী শামছুন নাহার তার রচিত ‘রোকেয়া জীবনীতে’ লিখেছেন ‘উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে অশিক্ষা ও কুসংস্কারের ভিতর দিয়া আসিয়াছিল জাতির সবচেয়ে বড় অকল্যান। ইসলামের সত্যিকার শিক্ষা ভুলিয়া হৃতসর্বস্ব মুসলমান সেদিন হাবুডুবু খাইতেছিল কুসংস্কার আর গোঁড়ামির পাঁকে।’ বেগম রোকেয়াও নিজ লেখনীতে সব বিকৃতির মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন ধর্মহীন শিক্ষাকে, ‘এসব বিকৃত রুচির প্রধান কারণ বর্তমান ধর্মহীন শিক্ষা।’ আর এ-জন্যই ইসলামের সত্যিকার শিক্ষার আলোকে হাতে নিয়ে সমাজকে আলোকময় করতে চেয়েছেন তিনি।

ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তিনি বলেছেন ‘এই বিংশ শতাব্দী কালে যৎকালে অন্যান্য জাতি নিজেদের প্রাচীন প্রথাকে নানা রকমে সংস্কৃত, সংশোধিত ও সুমার্জিত করে আঁকড়ে ধরে আছেন, … … … … তৎকালে আমরা নিজেদের অতিসুন্দর ধর্ম, অতিসুন্দর সামাজিক আচার-প্রথা বিসর্জন দিয়ে এক অদ্ভুত জানোয়ার সাজতে বসেছি।’

কোরআন শিক্ষা সম্পর্কে বেগম রোকেয়া বলেছেন, ‘অন্যান্য সুসভ্য স¤প্রদায়ের এবং এই ভারতবর্ষেই অন্যান্য প্রদেশের মুসলমান মেয়েরা ডাক্তার, ব্যারিস্টার, কাউন্সিলার এবং গোল-টেবিল বৈঠকের সদস্য হচ্ছেন; আমাদের মেয়েরা কোন পাপে ঐসব সমৃদ্ধি থেকে বঞ্চিত থাকবে? আর্দশ মোসলেম নারী গঠিত হবে, যাদের সন্তান-সন্তুতি হবে হযরত ওমর ফারুক, হযরত ফাতেমা জোহরার মতো। এর জন্য কুরআন শরীফ শিক্ষার বহুল বিস্তার দরকার। কুরআন শরীফ অর্থাৎ তার উর্দু এবং বাংলা অনুবাদের বহুল প্রচার একান্ত আবশ্যক।

ছেলেবেলায় আমি মার মুখে শুনতুম, কুরআন শরীফ ঢাল হয়ে আমাদের রক্ষা করবে। সে কথা অতি সত্য। অবশ্য তার মানে এই নয় যে, খুব বড় আকারের সুন্দর জেলদ বাঁধা কুরআনখানা আমার পিঠে ঢালের মতো করে বেঁধে নিতে হবে। বরং আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে আমি এই বুঝি যে, কুরআন শরীফের সার্বজনীন শিক্ষা আমাদের নানা প্রকার কুসংস্কাররের বিপদ থেকে রক্ষা করবে। কুরআন শরীফের বিধান অনুযায়ী ধর্ম-কর্ম আমাদের নৈতিক ও সামাজিক অধ:পতন থেকে রক্ষা করবে।’

এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘মুসলমান বালিকাদের প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে কোরান শিক্ষাদান করা সর্বাপেক্ষা অধিক প্রয়োজন। কোরান শিক্ষা অর্থে শুধু টিয়া পাখীর মত আরবী শব্দ আবৃত্তি করা আমার উদ্দেশ্য নহে। বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষায় কোরানের অনুবাদ শিক্ষা দিতে হইবে। সম্ভবত: এ-জন্য গভর্নমেন্ট বাধ্যতামূলক আইন পাশ না করিলে আমাদের সমাজ মেয়েদের কোরন শিক্ষাও দিবে না। যদি কেহ ডাক্তার ডাকিয়া ব্যবস্থাপত্র চৎবংপৎরঢ়ঃরড়হ লয়, কিন্তু তাহাতে লিখিত ঔষধ-পথ্য ব্যবহার না করিয়া সে ব্যবস্থাপত্রখানাকে মাদুলী রূপে গলায় পরিয়া থাকে, আর দৈনিক তিনবার করিয়া পাঠ করে, তাহাতে কি সে উপকার পাইবে? আমরা পবিত্র কোরন শরীফের লিখিত ব্যবস্থা অনুযায়ী কোন কার্য করি না, শুধু তাহা পাখির মত পাঠ করি’ আর কাপড়ের থলিতে [জযুদানে] অতি যতেœ উচ্চস্থানে রাখি।’ [বঙ্গীয় নারী-শিক্ষা সমিতি, পৃ: ২৮২]

পরিশেষে তিনি বলেন, ‘আমার অমুসলমান ভগিনীগণ! আপনারা কেহ মনে করিবেন না যে, প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কোরান শিক্ষা দিতে বলিয়া আমি গোঁড়ামীর পরিচয় দিলাম। তাহা নহে, আমি গোঁড়ামী হইতে বহুদূরে । প্রকৃত কতা এই যে, প্রাথমিক শিক্ষা বলিতে যাহা কিছু শিক্ষা দেওয়া হয়, সে সমস্ত ব্যবস্থাই কোরানে পাওয়া যায়। আমাদের ধর্ম ও সমাজ অক্ষুন্ন রাখিবার জন্য কোরান শিক্ষা একান্ত প্রয়াজন।’ [ব.না.শি.স.লোপৃ:২৮২]

বেগম রোকেয়া মিসেস এ্যানি বেশন্তের ইসলাম শীর্ষক বক্তৃতাটি ‘নূর ইসলাম’ নামে অনুবাদ করেছেন। তিনি সেখানে বলেছেন, “প্রত্যেক দেশের জাতীয় উন্নতি, আধ্যত্মিক উন্নতি ও নৈতিক উন্নতির যাবতীয় কারণসমূহের মধ্যে প্রধান কারণ হইতেছে ধর্ম। ধর্ম ব্যতিরেকে মানুষ অধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নতি কিংবা সভ্যতা লাভ করিতে পারেনা।’ [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ:৮২]

কোরআনের শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে কাজে লাগাবার তাগিদ তিনি কিভাবে উপলব্ধি করতেন তা তার ছাত্রী লেখিকা শামসুন নাহার এর লেখা ‘রোকেয়া জীবনী’ থেকে জানা যায়Ñ ‘কিন্তু সমাজের চোখে আঙ্গুল দিয়া ধর্মের সত্যকার শিক্ষার দিকে বারে বারে তাহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। ইসলামের নির্দেশকে কোরানের পাতায় আবদ্ধ না রাখিয়া বাস্তব জীবনে কাজে লাগাইবার জন্য তিনি পাগল হইয়াছিলেন।’ [রোকেয়া জীবনী, শামসুন নাহার, পৃ:১২১-১২২ ]

নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে উচ্চকিত কণ্ঠস্বর বেগম রোকেয়া:
বিশিষ্ট সাহিত্যিক হাবিবুল্লাহ বাহার তার লেখায় বেগম রোকেয়াকে নারী মুক্তির অগ্রদূত হিসাবে এভাবে তুলে এনেছেন, ‘ঝযব (ইবমঁস জড়শবুধ) ধিং ধ ংযধযরফ রহ ঃযব নধঃঃষব ড়ভ বসধহপরঢ়ধঃরড়হ-বসধহপরঢ়ধঃরড়হ ড়ভ ড়িসবহ, বসধহপরঢ়ধঃরড়হ ড়ভ রফবধং, বসধহপরঢ়ধঃরড়হ ড়ভ রহঃবষষবপঃ.’ [ঞযব গঁংংধষসধহ, উবপ.১১, ১৯৩২, ঢ়-৯]

তখনকার নারীরা পৈত্রিক সম্পত্তিতে ইসলাম প্রদত্ত অধিকার থেকেও ছিল বঞ্চিত। এর প্রতিবাদে বেগম রোকেয়া বলেন, ‘হায় পিতা মোহাম্মদ দ. ! তুমি আমাদের উপকারের নিমিত্ত পিতৃসম্পত্তির অধিকারিনী করিয়াছ, কিন্তু তোমার সুচতুর শিষ্যগণ নানা উপায়ে কুলবালাদের সর্বনাশ করিতেছে। আহা! মহম্মদীয় আইন পুস্তকের মসি-রেখারূপে পুস্তকেই আবদ্ধ থাকে। টাকা যার, ক্ষমতা যার, আইন তাহারই। আইন আমাদের ন্যায় নিরক্ষর অবলাদের নহে।’ [গৃহ, রোকেয়া রচনাবলী, পৃ:৭২]

এতো গেল বৈষয়িক সম্পত্তির ব্যাপার। অবৈষয়িক তথা অপার্থিব সম্পত্তির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি এখন অপার্থিব সম্পত্তির কথা বলিব। পিতার øেহ, যতœ ইত্যাদি অপার্থিব সম্পত্তি। এখানেও পক্ষপাতিতার মাত্রা বেশী। ঐ যতœ, øেহ হিতৈষিতার অর্ধেকই আমরা পাই কই? যিনি পুত্রের সুশিক্ষার জন্য চারি জন শিক্ষক নিযুক্ত করেন, তিনি কন্যার জন্য দুইজন শিক্ষয়িত্রী নিযুক্ত করেন নি? যে স্থলে ভ্রাতা ‘শমস-উল-ওলামা’ সে স্থলে ভগিনী ‘নজম্-উল-ওলামা’ হইয়াছেন কি?’ [অর্ধাঙ্গী, রো-র, পৃ:৪১]

ইসলাম যে পুরুষকে নারীর প্রভু করে নাই বরং মানুষ হিসাবে নারী-পুরুষ যে একই মর্যাদায় অসীন সে সম্পর্কে বেগম রোকেয়া বলেন, ‘স্বীকার করি যে, শরীরিক দুর্বলতা বশত: নারীজাতি অপর জাতির সাহয্যে নির্ভর করে। তাই বলিয়া পুরুষ-‘প্রভু’ হইতে পারে না।’ [অর্ধাঙ্গী, রোকেয়া, রচনাবলী, পৃ:৪৩]

‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসে যৌতুকের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আর বিবাহ যেন সম্পত্তি ও অলংকারের জন্য না হয়। কন্যা পণ্য-দ্রব্য নহে যে, তাহায় সঙ্গে মোটর গাড়ী ও তেতালা বাড়ী ‘ফাউ’ দিতে হইবে।’ [রোকেয়া রচনাবলী, পৃষ্ঠা ৪৫২-৪৫৩]

তখনকার যুগে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্মের অপব্যবহারের মাধ্যমে নারী নির্যাতন সংঘটিত হত। এ ব্যাপারে বেগম রোকেয়া অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘এখন আমাদের আর ধর্মের নামে নত মস্তকে নরের অযথা প্রভুত্ব সহ্য করা উচিত নহে। যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ়, সেইখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক। প্রমাণ-সতীদাহ। যেখানে ধর্মবন্ধন শিথিল, সেখানে রমণী প্রায় পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থায় আছেন। এস্থলে ধর্মে অর্থে ধর্মের সামাজিক বিধান বুঝিতে হইবে।’

এ-প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘কেহ বলিতে পারেন যে, ‘তুমি সামজিক কথা বলিতে গিয়া ধর্ম লইয়া টানাটানি কর কেন?’ তদুত্তরে বলিতে হইবে, ‘ধর্ম’ শেষে আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে; ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমণীর উপর প্রভুত্ব করিতেছেন। তাই ‘ধর্ম’ লইয়া টানাটানি করিতে বাধ্য হইলাম। এ জন্য ধার্মিকগণ আমায় ক্ষমা করিতে পারেন।’ [নবনূর, ২য় বর্ষ, ৫ম সংখ্যা, পৃঃ ২১৮]

এখানে ধর্মীয় বন্ধন বলতে তিনি কোরন-হাদীসের বন্ধন বুঝাতে চাননি বরং ঈঙ্গিত করেছেন ধর্মীয় নেতৃবৃন্দদের নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে রচিত বাড়াবাড়িমূলক নিয়মসমূহের। মূলত: ধর্মের নামে তৎকালীন সমাজে যে ধর্ম চলছিল, তার কঠোরতা দূরীকরণে শিথিলতা তো অবশ্যই কাম্য। [বেগম রোকেয়া ও ইসলাম, রোকেয়া সন্ধানে, এ, এ, রহমান পৃ:৫৬]

বেগম রোকেয়া মেয়েদের শিক্ষার জন্য অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার পরে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠিত করেছেন যাতে নারী শিক্ষা গ্রহন করে নিজেদের নির্যাতন থেকে মুক্ত করতে পারে। এছাড়াও ১৯১৬ সালে নারীদের ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ নামে একটি মহিমা সমিতি স্থাপন করেন। তদুপরি দরিদ্র মেয়েদের কল্যানার্থে এবং পতিতাদের পুর্নবাসনের লক্ষ্যে ‘নারী তীর্থ’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।

নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতার ঘোষক বেগম রোকেয়া:
বেগম রোকেয়া নারী সত্ত্বাকে স্বাধীন ও পুরুষ সত্ত্বার সমকক্ষ বিবেচনা করেছেন। এড়ফ মরাব গধহ ৎড়নং প্রবন্ধে [দি মুসলমান পত্রিকায় প্রকাশিত, পৃ:২৩] তিনি বলেছেন, ‘ঞযবৎব রং ধ ংধুরহম, দগধহ ঢ়ৎড়ঢ়ড়ংবং, এড়ফ ফরংঢ়ড়ংবং, দনঁঃ সু নরঃঃবৎ বীঢ়বৎরবহপব ংযড়ংি ঃযধঃ এড়ফ মরাবং, সধহ ৎড়নং. ঞযধঃ রং, অষষধয যধং সধফব হড় ফরংঃরহপঃরড়হ ড়হ ঃযব মবহবৎধষ ষরভব ড়ভ সধষব ধহফ ভবসধষব-নড়ঃয ধৎব বয়ঁধষষু নড়ঁহফ ঃড় ংববশ ভড়ৎফ, ফৎরহশ, ংষববঢ়, বঃপ., হবপবংংধৎু ভড়ৎ ধহরসধষ ষরভব.ওংষধস ধষংড় ঃবধপযবং ঃযধঃ সধষব ধহফ ভবসধষব ধৎব বয়ঁধষষু নড়ঁহফ ঃড় ংধু ঃযবরৎ ফধরষু ঢ়ৎধুবৎং ভরাব ঃরসবং, ধহফ ংড় ড়হ.’

সুগৃহিনী প্রবন্ধে বেগম রোকেয়া স্বামী স্ত্রীকে একই শতকের দু’টি চক্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ‘নারী ও নর উভয়ে একই বস্তুর অঙ্গবিশেষ। যেমন একজননের দুইটি হাত কিংবা শকটের দুইট চক্র, সুতরাং উভয়ে সমতুল্য অথবা উভয়ে মিলিয়া একই বস্তু হয়। তাই একটিকে ছাড়িয়া অপরটি সম্পূর্ণ উন্নতি লাভ করিতে পারিবে না।’ [সুগৃহিণী, রো-র পৃ. ৪৫] তিনি আরো বলেন, ‘যে শকটের এক চক্র বড় [পতি] আর এক ছোট [পতœী] হয়, সে শকট অধিক দূরে অগ্রসর হইতে পারে না; …… সে কেবল একই স্থানে [গৃহ-কোণেই] সুসিতে থাকিবে। তাই ভরতবাসী উন্নতির পথে অগ্রসর হইতে পারিতেছে না।’ তাই একটিকে ছাড়িয়া অপরটি সম্পূর্ণ উন্নতি লাভ করিতে পারিতেছে না।’ [অর্ধাঙ্গী, রে-র পৃ. ৩৮]

স্বামী স্ত্রীর সম অস্তিত্বের প্রসঙ্গে ‘সৌরজগৎ’ উপন্যাসে তিনি গওহরের ভাষায় সমাজকে বলেছেন, “আমাদের ছাড়া তাহাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব কই? এবং তাহাদের ছাড়া আমাদেরও নিরপেক্ষ অস্তিত্ব কই?”

সৌরজগৎ প্রবন্ধে রোকেয়া সুন্দর উপমার মাধ্যমে নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রসঙ্গে টেনে আনেন। গ্রহমালা স্ব-স্ব কক্ষে থাকিয়া সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। এই প্রদক্ষিণ কার্যে গ্রহদের সাদৃশ্য ও একতা আছে অর্থাৎ সকলেই ঘুরে, এই হইল সাদৃশ্য। কিন্তু তাই বলিয়া যে সকল গ্রহই একই সঙ্গে উঠে, একই সঙ্গে বসে, তাহা নহে! তাহাদের আবার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আছে।

নারীদের মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে তিনি বলেছেন,“অবলাদের ও চক্ষুকর্ণ আছে, চিন্তাশক্তি আছে, উক্ত শক্তিজ্ঞালির অনুশীলন যথানিয়মে হওয়া উচিত। তাহাদের বাক্শক্তি কেবল আশাদের শিখান বুলি উচ্চারণ করিবার জন্য নহে।” (সৌরজগত, রোকেয়া রচনাবলী, পৃ:১৩১)

তিনি চেয়েছিলেন নারীদের ইসলাম পদত্ত স্বাধীনতা ‘পর্দার দোহাই দিয়ে, অনেক ভালো জিনিসে আমাদের বঞ্চিত করে রেখেছে, আর তা আমরা থাকবোনা … … আমারা চাই আমাদের ইসলাম দত্ত স্বাধীনতা, চাই ইসলাম দত্ত অধিকার … … কে আমাদের পথ রোধ করবে? সমাজরূপী শয়তান? কখনই পারবেনা।’ [পর্দা বনা প্রবঞ্চনা, সওগাত, ভাদ্র ১৩১৬, পৃ. ৬৯-৭১]

নারীকে জেগে ওঠার জন্য তিনি মতিচুর এ ডাক দিয়েছেন এভাবে
‘অতএব জাগ, জাগ গো ভগিনা’

‘প্রথমে জাগিয়া উঠা সহজ নহে, জানি, সমাজ মহাগোলযোগ বাধাইবে জানিঃ ভারতবাসী মুসলমান আমাদের জন্য ‘কৎল’Ñএর [অর্থাৎ প্রাণদন্ডের] বিধান দিবেন এবং হিন্দু চিতানল বা তুষানলের ব্যবস্থা দিবেন, জানি। [এবং ভাগ্নীদিগের ও জাগিবার ইচ্ছা নাই, জানি।] কিন্তু সমাজের কল্যাণের নিমিত্তে জাগিতে হইবেই। বলিয়াছিতো, কোন ভাল কাজ অনায়াসে করা যায় না। কারা মুক্ত হইয়াও গ্যালিলিও বলিয়াছিলেন, কিন্তু যাহাই হোক পৃথিবী ঘুরিতেছে ‘নঁঃ হবাবৎঃযবষবংং রঃ [ঊধৎঃয] ফড়বং সড়াব!’ আমাদিগকে ও এইরূপ বিবিধ নির্য্যতন সহ্য করিয়া জাগিতে হইবে।

উপসংহার:
একই সঙ্গে বেগম রোকেয়া বহুমূখী প্রতিভার অধিকারিনী ছিলেন। তিনি তার লেখনীতে যা লিখেছেন নিজ জীবনে তা বাস্তবে করেও দেখিয়েছেন। তিনি অবরোধ প্রথার কঠোর সমালোচক ছিলেন, আবার অপর পক্ষে পর্দা প্রথার ছিলেন নিবেদক সমর্থক। তিনি নারী স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু তিনি কখনওই পুরুষ বিদ্দেষী ছিলেন না। তিনি লিখেছেন, ‘পরস্পরে একতা থাকাও একান্ত আবশ্যক। কিন্তু এই ঐক্য যেন সত্যের উপর স্থাপিত হয়। একতার মূলে একটা মহৎ গুণ থাকা আবশ্যক’ [সৌরজগৎ, রোকেয়া রচনাবলী, পৃ:১৩১-১৩২]

অধ্যাপিকা হোসনে আরা কামাল লিখেছেন ‘বেগম রোকেয়া যুক্তিবাদী ছিলেন’ তিনি পুরুষদের বিরুদ্ধে নারীকে উত্তেজিত করতে চাননি। পতিœ বিদ্রোহের আয়োজন করা তার লক্ষ্য ছিল না। লক্ষ্য ছিল নারীকে সুশিক্ষিত করা ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা [আত্মশুদ্ধির সন্ধানে, অধ্যাপিকা হোসনেআরা কামাল, মুক্ত কন্ঠ, ১২ই ডিসেম্বর’ ৯৮]

বেগম রোকেয়া তার স্বামীর নামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি অনেক শুভাকাঙ্খি পুরুষের সহযোগীতায় স্কুলটা পরিচালনা করতেন এমনটি তিনি তার একটি উপন্যাস ও উৎসর্গ করেছেন তার ভাইকে। এতে প্রমাণিত হয়যে পুরুষের প্রতি বিদ্দেষ নয়, পুরুষের সমকক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যেই তিনি কাজ করতেন।

অন্ধকারাচ্ছন্ন, কুসংস্কার পরিপূর্ন এ সমাজে শিক্ষা ও সত্যের যে আলোকবর্তিকা তিনি জালিয়েছিলেন তা তার জন্য ছিল এক কঠিন কষ্ট সাধ্য অভিজ্ঞতা, তার নিজের ভাষায় তিনি বলেছিলেন; আমি কারসিয়ং ও মধুপুর বেড়াইতে গিয়া সুন্দর সু-দর্শন পাথর কুড়াইয়াছি উড়িষ্যা ও মাদ্রাজে সাগরতীরে বেড়াইতে গিয়া বিচিত্র বর্ণের বিবিধ আকারের জিনুক কুড়াইয়া আনিয়াছি। আর জীবনে ২৫ বছর ধরিয়া সমাজ সেবা করিয়া কাঠ মোল্লাদের অভিসম্পাত কুড়াইয়াছি।’ মহীয়সী, ত্যাগী, আলোকময়ী এ নারীর নিকট বঙ্গীয় মুসলিম নারী সমাজের রয়েছে বিশাল ঋন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

নিব

:উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তনের একটি শোভন ছড়াপত্র

বাঙলা

আফসার নিজাম সম্পাদিত : চিন্তাশীল পাঠকের মননশীল সৃজন

%d bloggers like this: