সাম্রাজ্যবাদ ও নজরুল ইসলাম


শাহাবুদ্দীন আহমদ

নজরুল ইসলামের গোটা সাহিত্য জীবনের শব-ব্যবচ্ছেদ করলে সম্ভবত: আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাব যে, তিনি পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য সাম্রাজ্যবাদকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য পণ করে বা প্রতিজ্ঞা করে কলম ধরেছিলেন। এ বিষয়ে তাঁর বহু প্রচলিত দু’টি উক্তি প্রথমেই উদ্ধৃত করা যেতে পারে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তিনি উপসংহারে উচ্চারণ করেছেন

মহা- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হবো শান্ত।

আর ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় উপসংহারে বলেছেন

প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!


প্রায় চোখে আঙুল দিয়ে এই দুটি উক্তি ব’লে দেয় নজরুল ইসলাম কি করতে চেয়েছিলেন। নজরুল ইসলামের অভিপ্রায়ের কথা কমরেড মুজফফর আহ্মদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে লিখেছেন। মুজফফর আহমদ বলেছেনÑ

‘আমি নজরুল ইসলামের নিকটে জানতে চাইলাম সে রাজনীতিতে যোগ দেবে কি না! জওয়াবে নজরুল বললে, ‘তাই যদি না দেব তবে ফৌজে গিয়েছিলাম কিসের জন্য?’

আসলে নজরুলকে পড়তে পড়তে মনে হয় তিনি ঘোষণা করে যুদ্ধে নেমেছেন এবং গদ্যে ও কবিতায় অগুœ্যদ্গীরণ ক’রে চলেছেন। ৪৯নং বাঙ্গালী পল্টনে যোগ দেওয়ার পিছনে তাঁর যে ভবিষ্যতের মানসিক প্রস্ততি ছিল সেটা ‘রিক্তের বেদন’ গ্রন্থেই প্রথম প্রকাশ পেয়েছে। তিনি লিখেছেনÑ

‘জননী জন্মভূমির মঙ্গলের জন্য সে কোন্ অদেখা দেশের আগুনে প্রাণ আহুতি দিতে একি অগাধ অসীম উৎসাহ নিয়ে ছুটেছে তরুণ বাঙালীরা; আমার ভাইরা।’

আর যুদ্ধ ময়দান থেকে ফিরে ‘নবযুগে’র সম্পাদকীয় কলামে লিখছেন

‘আবার দূরে সেই সর্বনাশা বাঁশীর সুর বাজিয়া উঠিল। রাশিয়া বলিল, ‘মারো অত্যাচারীকে! ওড়াও স্বাধীনতা বিরোধীর শির! ভাঙো দাসত্বের নিগড়! এ বিশ্বে সবাই স্বাধীন! মুক্ত আকাশের এই মুক্ত মাঠে দাঁড়াইয়া কে কাহার অধীনতা স্বীকার করিবে? এই ‘খোদার উপর খোদকারী’ শক্তিকে দলিত কর। এই স্বার্থের শয়তানকে শাসন কর।’ ‘আল্লাহু আক্বর’ বলিয়া তুর্কী সাড়া দিল। তাহার শূন্য নত শিরে আবার অর্ধচন্দ্রলাঞ্ছিত কৃষ্ণশিখ ফেজের রক্ত রাগ স্বাধীনতাপহারীর অন্তরে মহাভীতির সঞ্চার করিল! শিথিল মুষ্টির ভূলুন্ঠিত রবার আবার আষ্ফালন করিয়া উঠিল। আইরিশ উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলল, ‘যুদ্ধ শেষ হয় নাই। এখনো বিশ্বের দানব শক্তির বজ্রমুষ্টি আমাদের টুঁটি টিপিয়া ধরিয়া রইয়াছে। এ অসুর শক্তি ধ্বংস না হইলে দেবতা বাঁচিবে না।’

নজরুল ইসলামের কবিতায় এই যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল প্রথমে ‘মোসলেম ভারত’-এ প্রকাশিত তাঁর ‘শাত-ইল-আরব’ কবিতায়। সেখানে নজরুল লিখলেন

শাতিল আরব! শাতিল আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।
শহীদের লোহু, দিলীরের খুন ঢেলেছে যেখানে আরব-বীর।
যুঝেছে এখানে তুর্ক-সেনানী,
য়ুনানী, মিস্রী আরবী কেনানী;Ñ
লুটেছে এখানে মুক্ত আজাদ বেদুঈনদের চাঙ্গা শির!
নাঙ্গা-শিরÑ
শম্শের হাতে আঁসু-আঁখে হেথা মূর্তি দেখেছি বীর-নারীর!
শাতিল আরব! শাতিল আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর!

‘বিদ্রোহী’ লেখার আগেই তাঁর যুদ্ধ শুরু হয় সাম্রজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে। তাঁর ‘মোহররম’, ‘কোরবানী’, ‘আনোয়ার’, ‘কামাল পাশা’, ‘রণভেরী’,Ñ তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নি-বীণা’র এই সব কবিতা যুদ্ধ-কবিতা। ‘শাত-ইল-আরব’ প্রকাশিত হয় ১৩২৭- এর জৈষ্ঠ্যে [১৯২০-এর মে’তে], ‘কোরবানী’ প্রকাশিত হয় ১৩২৭-এর ভাদ্রে [১৯২০-এর আগস্টে], ‘মোহররম’ প্রকাশিত হয় ১৩২৭-এর আশ্বিনে [১৯২০-এর সেপ্টেম্বরে] আর ‘বিদ্রোহী’ ছাপা হয় ১৩২৭-এর কার্তিকে ‘মোসলেম ভারত’-এ, প্রকৃতপক্ষে ১৩২৮-এর পৌষের ‘বিজলী’তে [১৯২১-এর জানুয়ারিতে]। মোহররম’-এ তিনি বলেছিলেনÑ

উষ্ণীষ কোরানের, হাতে তেগ আরবীর,
দুনিয়াতে নত নয় মুসলিম কারো শির,Ñ
তবে শোন ঐ শোন বাজে কোথা দামামা
শমশের হাতে নাও, বাঁধো শিরে আমামা!
বেজেছে নাকাড়া, হাঁকে নকীবের তূর্য্য,
হুঁশিয়ার ইসলাম , ডুবে তব সূর্য্য!
জাগো, ওঠো মুসলিম, হাঁকো হায়দরী হাঁক,
শহীদের দিনে সব লালে-লাল হ’য়ে যাক।
নওশার সাজ নাও খুন-খচা আস্তীন,
ময়দানে লুটাতে রে লাশ এই খাস্ দিন!

সতর্ক, চতুর সাম্রাজ্যবাদীরা এ-সব ক্ষেত্রে তাদের সুক্ষ্ম কৌশল ব্যবহার করতে দেরী করে না। ১৩২৭-এর শ্রাবণে [১৯২০-এর আগস্ট] প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র’-এ জনৈক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট তরিকুল আলম ‘আজ ঈদ’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখলেন

‘আজ এই আনন্দ উৎসব আনন্দের চেয়ে বিষাদের ভাগই মনের উপর চাপ দিচ্ছে বেশী করে। যেদিকে তাকাচ্ছি, সেই দিকেই কেবল নিষ্ঠুরতার অভিনয়। অতীত এবং বর্তমানের ইতিহাস চোখের সামনে অগণিত জীবের রক্তে ভিজে লাল হ’য়ে দেখা দিচ্ছে। এই লাল রক্ত আকাশে বাতাসে চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে যেন সমস্ত প্রকৃতি তার রক্তনেত্রের ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে পৃথিবীকে বিভীষিকা করে তুলেছে। প্রাণ একেবারে হাঁপিয়ে উঠছে।’

ক্ষুব্ধ নজুরুল ইসলাম ‘কোরবানী’ কবিতায় ত্বরিৎ এর জবাব দিয়ে লিখলেনÑ

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদবোধন
দুর্ব্বল ভীরু চুপ রহো, ওহো খাম্কা ক্ষুব্ধ মন।

বললেনÑ

আস্তানা সিধা রাস্তা নয়
‘আজাদী মেলে না পস্তানো’য়।
দস্তা নয় সে সস্তা নয়!

স্বাধীনতা সহজে আসে নাÑ স্বাধীনতা আসে রক্তপথে। আজ সে রক্তদান অন্যায়কে রুখবার জন্য ন্যায়ের পাথে শাহাদাৎবরণ। তিনি তাই নিজের চিন্তাদর্শনকে ব্যাখ্যা করে বললেন

এ তো নহে লোহু তরবারের
ঘাতক জালিম জোরবারের!
কোরবানের জোরজানের
খুন এ যে, এতে গোর্দ্দা ঢের রে, এ ত্যাগে ‘বুদ্ধ’ মন
এতে মা রাখে পুত্র পণ!
তাই জননী হাজেরা বেটারে পরালো বলির পূত বসন!

১৯২০-এর এই সব লেখার পূর্ণতা দিতে শুরু হ’লÑ ১৯২১-এর বছর। ১৯২১-এ প্রকাশিত দু’টি কবিতা সাম্রাজ্যবাদীদের বিচলিত করে তোলে। তার একটি ‘বিদ্রোহী’ অপরটি ‘কামাল পাশা’। যদিও ‘কামাল পাশা’য় ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মত প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ঘোষণা ছিল না তবু গ্রীসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিজয়ী কামাল পাশার স্তুতি গাইতে গিয়ে নজরুল স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিরোধী সংগ্রামরত সৈন্যদের উদ্বোধিত করতে এমন কিছু বক্তব্য পেশ করলেন যা বিদ্রোহী সত্তার সহমর্মী চিন্তার উদ্বোধন ছিল। কয়েকটি উদাহরণ

১. হিংসুটে ঐ জীবগুলো ভাই নাম ডুবালে সৈনিকের,
তাই তারা আজ নেস্ত-নাবুদ আমরা মোটেই হইনি জের,
পারের মুলুক লুট করে খায়, ডাকাত তারা ডাকাত
তাই তাদের তরে বরাদ্দ ভাই আঘাত শুধু আঘাত!

২. আসমানে ঐ ভাসমান যে মস্ত দুটো রং-এর তাল,
একটা নিবিড় নীলসিয়া আর একটা খুবই গভীর লালÑ
বুঝলে ভাই, ঐ নীল সিয়াটা শত্র“দের
দেখতে নারে কারুর ভালো,
তাইতো কালো রক্তধারার বইছে শিরায় স্রোত ওদের!
হিংস্র ওরা হিংস্র পশুর দল!
গৃধ্নু ওরা লুব্ধ ওদের লক্ষ্য অসুর বলÑ
হিংস্র ওরা হিংস্র পশুর দল!
জালিম ওরা অত্যাচারী!
সার জেনেছে সত্য যাহা হত্যা তারই!
জালিম ওরা অত্যাচারী
সৈনিকের এই গৈরিকে ভাইÑ
জোর অপমান করলে ওরাই,
তাই তো ওদের মুখ কালো আজ, খুন যেন নীল জল!

৩. মৃত্যু এরা জয় করেছে, কান্না কিসের?
আজ জম্জম্ আনলে এরা আপনি পিয়ে কলসী বিষের,
কে মরেছ? কান্না কিসের?
বেশ করেছে!
দেশ বাঁচাতে আপনারি জান্ শেষ করেছে!

উল্লেখ্য প্রথম মাহযুদ্ধ ১৯১৪ তে শুরু হয়। নজরুল ১৯১৭ তে ৪৯নং বাঙলী পল্টনে যোগ দেন। রাশিয়ায় বলশেভিকরা তখন জারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে। ১৯১৭ খ্রীস্টাব্দের মে মাসে মস্কোতে নিখিল রাশিয়া মুসলিম কংগ্রেসের বৈঠকে রাশিয়ায় মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর জন্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার দাবী করা হয়। জার সরকার এ দাবী মেনে নেয়নি। রাশিয়ায় বলশেভিকরা ক্ষমতা দখলের পরে নভেম্বরে মুসলমানদের দাবী মেনে

নেয়। সে সময় লেনিন ও স্টালিন ১৯১৭-এর ডিসেম্বর রাশিয়া ও পূর্ব দেশ সমূহের মুসলিমদের আহবান করে একটি ঘোষণা দেন। Appeal to the Muslim of Russia and the East bv‡g GKwU cÖPvic‡Î ejv nqÑ

In the face of those great events we turn to you, toilng and disinherited Muslim of Russia and the East.

Muslim of the East, Persians, Turki. Arab and Hindu, all those for whose lives and property, liberty and land, the greedy robbers of Europe have battered for centuries .

Throw off these ravishers and enslavers of your country, Now that war and desolation are tearing down the structure of the old world, When all the world is aflame with wrathful indignation against the imperialist plunderers, when every spark of revolt kindles into a mighty flame of revolution, when even the lndian muslim worn out and suffering under the foreign yoke are starting a rebellian against their oppressors- now it is impossible to be silent. Do not waste any time in throwing from your shoulders the age long enlsavers of your land. Do not permit them longer to rob you of your native homes. You yourselves must be the masters of your country …
Comrades! Brothers:
Firmly and decisively let us striue foruan honourable, democratic peace On our banners we prvcluing liberation of oppressed people of the world.
Moslems of Russia
Moslems of the East!
We await your sympathy and support in the cause of building a new world.
[James Bunyan & H.H Fisher, `the Bolshevik Revolution 1917-1918]

কতকটা ভিন্নভাবে কাব্যিক ছন্দে এরই প্রতিধ্বনি পাই নজরুলের ‘রণভেরী’ কবিতায়। ১৯২২-এর ১২ আগস্টে প্রকাশিত অর্ধসাপ্তাহিক ‘ধুমকেতু’তে ‘রণভেরী’ ছাপা হয়। কবিতাটির শীর্ষ টিকায় লেখা হয়Ñ ‘গ্রীসের বিরুদ্ধে আঙ্গোরা তুর্ক গভর্মেন্ট যে যুদ্ধ চালাইতেছিল, সেই যুদ্ধে কামাল পাশার সাহায্যের জন্য ভারতবর্ষ হইতে দশ হাজার স্বেচ্ছা সৈনিক প্রেরণের প্রস্তাব শুনিয়া লিখিত।’ ‘রণভেরী’ বহু পঠিত কবিতা হ’লেও প্রবন্ধের প্রয়োজনে এখানে তার অংশবিশেষ উদ্ধৃত হলÑ

ওরে আয়!
ঐ মহা-সিন্ধুর পার হ’তে ঘন রণ-ভেরী শোনা যায়Ñ
ওরে আয়!
ঐ ইসলাম ডুবে যায়!
যত শয়তান
সারা ময়দান
জুড়ি’ খুন তার পিয়ে হুঙ্কার দিয়ে জয়গান শোন্ গায়!
আজ শখ করে’
জুতি টক্করে
তোড়ে শহীদের খুলি দুশমন পায় পায়Ñ
ওরে আয়!
তোর জান যায় যাক, পৌরুষ তোর মান যেন নাহি যায়!
ধরি’ ঝঞ্ঝার ঝুঁটি দাপটিয়া শুধু মুসলিম পঞ্জায়!

সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্ত্য শক্তির বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের কারণ যে দস্যুশক্তি বা দৈত্যশক্তির লুটতরাজ সে কথাটাও কবিতাটিতে বলা হয়। বলা হয়Ñ

ওরে আয়!
তোর ভাই ম্লান চোখে চায়,
মরি লজ্জায়
ওরে সব যায়
তবু কব্জায় তোর শমশের নাহি কাঁপে আফসোসে হায়!

শুধু মুসলিমদের এই লুন্ঠনকারী শক্তির বিরুদ্ধে ডাক দিয়ে বা তাদের অংশগ্রহণ করতে অনুরোধ করে তিনি চুপ থাকেন নি। স্টালিন ও লেনিন যেমন পূর্বদেশের পারসী, তুর্কী, আরবী মুসলিমদের সঙ্গে ভারতীয় হিন্দুদের ডাক দিয়ে ছিলেন নজরুল তেমনি তাঁর ‘আগমনী’ ও ‘রক্তাম্বরধারিনী মা’ কবিতাতে হিন্দু জনশক্তিকে এই দানবনাশী যুদ্ধে আমন্ত্রণ জানান। ‘আগমনী’ কবিতায় তিনি বলেন

রণ-রঙ্গিনী জগৎমাতার দেখ মহারণ,
দশ দিকে তাঁর দশ হাতে বাজে দশ প্রহরণ!
পদতলে লুটে মহিষাসুর,
মহামাতা ঐ সিংহবাহিনী জানায় আজিকে বিশ্ববাসীকে
শাশ্বত নহে দানব শক্তি, পায়ে পিষে যায় শির পশুর!

আর ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতায় বলেন,

নি:শ্বাসে তব পেঁজা তুলো সম,
উড়ে যাক মা গো এই ভুবন,
অসুরে নাশিতে হউক বিষ্ণু-
চক্র মা তোর হেম কাঁকন।
টুঁটিটিপে মারো অত্যাচারে মা,
গলহার হোক নীল ফাঁসি,
নয়নে তোমার ধূমকেতু জ্বালা
উঠুক সরোষে উদ্ভাসি।’

‘কোরবানী’ কবিতায় যেমন তিনি বলেন রক্তদান ভিন্ন স্বাধীনতা লাভ সম্ভব নয় এই কবিতাতেও তিনি বলেন

রক্তাম্বর পর মা এবার
জ্বলে পুড়ে যাক শ্বেত বসন;
দেখি ঐ করে সাজে মা কেমন
বাজে তরবারি ঝন্ন-ঝন্।
সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেল মা গো,
জ্বালো সেথা জ্বাল কালচিতা।
তোমার খড়্গ রক্ত হউক
স্রষ্টার বুকে লাল ফিতা!

লুন্ঠনকারী শোষক দৈত্য-শক্তির বিরুদ্ধে নজরুল যুদ্ধ করেন। নজরুল জানতেন তিনি যে শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছেন তা সামান্য শক্তি বা দুর্বল শক্তি নয়।
পর্বত চূর্ণ করতে যেমন ডিনামাইট শক্তির প্রয়োজন হয় তেমনি বিপুল, বিশাল সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে উৎখাত করতে আণবিক শক্তির মত প্রচন্ড শক্তির প্রয়োজন। মানুষকে এই ধরণের শক্তিতে শক্তিমান করে তুলতে হ’লে তাকে শক্তিমন্ত্রে উজ্জীবিত করতে হয়। শক্তিমান বিরোধী শক্তি, পরদেশী শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে হ’লে যেমন অস্ত্র ও শস্ত্রে
পৃষ্ঠা-৬

সজ্জিত হওয়ার প্রয়োজন হয় ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতিকে তেমনি শক্তিশালী করতে তাদের তেমনি শক্তি-দর্শনে শিক্ষিত করে তুলতে হয়। ‘অগ্নি-বীণা’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘ভাঙার গান’, ‘সর্বহারা’, ‘ফণীমনষা’, ‘সন্ধ্যা’, ‘চন্দ্রবিন্দু’, ‘প্রলয়-শিখা’, জিঞ্জীর’Ñপ্রভিতি গ্রন্থগুলিতে নজরুল ক্রমাগত এই কাজটি করেছেন। অবিরাম শক্তিমন্ত্র জুগিয়েছেন।

নজরুলের ‘বিষের বাঁশী’, ‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয় শিখা’, ‘চন্দ্রবিন্দু’এই চারটি কাব্যগ্রন্থ ও গদ্যগ্রন্থ ‘যুগবাণী’ বৃটিশ সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আর নিষিদ্ধ না করে যে গ্রন্থগুলি নিষেধের সুপারিশে রাখে সেই ‘অগ্নিবীণা’, ‘সঞ্চিতা’, ‘ফণিমনসা’, ‘সর্বহারা’ ও ‘রুদ্র মঙ্গল’এই পাঁচটি গ্রন্থ সম্বন্ধে সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট বলে দেয় কী ভীষণ আনবিক বোমার উপাদান দিয়ে তাঁর কবিতাগুলি উৎপাদিত হ’য়েছিল। আমরা এখানে সে ধরনের দু-চারটি রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিতে উদ্বুদ্ধ হলাম। বৃটিশ সরকারের হোম ডিপার্টমেন্টের একটি ফাইল থেকে শিশির এই মন্তব্যটি উদ্ধার করেছেন

১. I have examined the book `Yugabani’ It breaths bitter racial hatred direceted mainly against the British, preaches revolt against the existing administration in the country and abuses in the very strong languages the `slave minded’ Indians who uphold the administration. the three articles on `Memorial to Dyer’, `Who were responsible for the Muslims Massacre?’ and `shooting the blakmen’ are speaiclhy objectinoable. I don’t think it would be aduisable to remove the ban on this book in the present crisis. On the whole it is dangerous book, forceful and vindictive.
২. ‘বিষের বাঁশী’ সম্পর্কে তৎকালীন বেঙ্গল লাইব্রেরীর লাইব্রেরীয়ান বাবু অক্ষয়কুমার দত্ত-গুপ্ত লিখেছিলেনÑ

The ideas, though often extremely vague, have clearly a dangerous intent, as the profusion of such words as blood, tyranny, death, fire, hell, demon and thunder will show.
৩. তৎকালীন পুলিশ কমিশনার টেগার্ট সাহেবও ‘বিষের বাঁশী’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিফ-স্রেক্রেটারী এ. এন. মবারলিকে অনুরোধ করেন। ১৯২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর টেগার্ট চিফ-সেক্রেটারীকে লেখেনÑ

The contents of the book, as would appear from the extracts of translation are dangerouosly objectionable and I recommend, the immediate proscription of the same.
৪. ‘প্রলয় শিখা’ সম্পর্কে তৎকালীন পাবলিক প্রসিকিউটর রায় বাহাদুর তারকনাথ সাধু বিরূপ মন্তব্য করেন। কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডেপুটি কমিশনারকে তিনি জনানÑ

I have carefully gone through the book `Pralay Shikha’ by Nazrul Islam, Which has recently come out of press. There are several passages in it which came under the mischeif of section 158 A and 124A of the Indian Penal Code, In the present case I would aduise the immediate proscription of the book under section 99 A of the criminal procedure code. The best interest of the Crown would be served by the immidiate proscription of the said book.
৫. পাবলিক প্রসিকউটরের পরামর্শের ভিত্তিতে পুলিশ কমিশনার টেগার্ট ১৯৩০-এর ১৫ সেপ্টেম্বর চিফ-সেক্রেটারীকে কেবল জরুরী চিঠি দেন না, নজরুলকে ফৌজদারী দন্ডবিধির ১৯৬ ধারা অনুসারে অভিযুক্ত করার সুপারিশ করেন। তাঁর সুপারিশ ছিল এমনি

The Public Prosecutor, Calcutta who was consulted the matter, is of opinion that it should be imemediately proscribed.

‘প্রলয় শিখা’র জন্য ভারতীয় দন্ডবিধির ১২৪ -এ ধারা অনুসারে নজরুল ইসলামকে অভিযুক্ত করে ৬ মাসের কারাদন্ড দেয়া হয়। ১৯৩১-এর ৪ মার্চ গান্ধী আরউইন চুক্তির কারণে অন্যান্য দন্ডিত মুক্তিপ্রাপ্ত আসামীর মত নজরুল মুক্তি পান, তাঁকে আর কারাদন্ড ভোগ করতে হয় না।

উপরে যেটা দেখানো হ’ল সেটার কারণ বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ যে নজরুল ইসলামের লেখার ভয়ে তটস্থ হয়ে উঠেছিল তাতে কোন সন্দেহ ছিল না। তখনকার দিনের আর কোন জীবিত লেখকের দ্বারা বৃটিশের বুকে এতটা আতঙ্ক ছড়ানো সম্ভব হয়নি। লক্ষ্য করার বিষয় নজরুল এই যুদ্ধ বিষয়টিকে একটি পরিকল্পিত সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংসের দর্শন হিসাবে সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিলেন।

তাঁর ‘বিষের বাঁশী’তেই তাঁর এই পরিকল্পিত চিন্তাদর্শন ধরা পড়ে। জাতিকে তিনি পরাশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বুদ্ধি ও মেধার অস্ত্রে প্রস্ততি গ্রহণ করতে শিক্ষা দিচ্ছিলেন। কোন জাতিকে অন্য জাতির আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে যে সব শক্তির প্রয়োজন হয় তা তার শিক্ষা-শক্তি, জ্ঞান-শক্তি, বুদ্ধি-শক্তি, মেধা ও অস্ত্র-শক্তি। নজরুল ইসলাম যে ছাত্রদলের গান, কৃষাণের গান, শ্রমিকের গান, ধীবরদের গান লিখেছেন, তিনি যে জীবন ও যৌবনের ¯ত্তুতি গেয়ে কবিতা ও গান লিখেছেন সার্বিকভাবে সেগুলো তাঁর যুদ্ধাস্ত্র। তিনি দেশেরে মধ্যে অধিষ্ঠিত বিভিন্ন জাতির মিলনের চেষ্টা করেছিলেন সেটাও ছিল সংহত শক্তি নির্মাণের পরিকল্পনা। এতে তিনি বৃটিশের ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তি গ’ড়ে তুলেছেন। একদিকে যেমন তিনি জাগরণমূলক ইসলামী গান লিখে মুসলিম শক্তিকে জাগাবার চেষ্টা করেছেন তেমনি শ্যামাসংগীত লিখে হিন্দু জাতির শক্তিবাদের দর্শনের অস্ত্রকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। দেখা যাবে নজরুল ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় যেমন আত্মশক্তিকে জাগিয়ে মানুষকে পুরুষোত্তম হতে আহবান করেছেন তেমনি জীবন থেকে মুত্যুভয় দূর করতে আহবান জানিয়েছেন ‘বিষের বাঁশী’তে। ‘সর্বহারা’য় যেমনি তিনি উপেক্ষিত অবহেলিত শক্তিকে জাগাবার চেষ্টা করেছেন তেমনি ‘সন্ধ্যা’ গ্রন্থে তিনি উদ্দীপ্ত করে তুলতে চেয়েছেন জীবন, তারুণ্য ও যৌবন শক্তিকে। ‘জিঞ্জীর’-এ আবার তাঁকে মুসলিম শক্তিকে জাগাবার প্রয়াস দেখা যায় তাঁর ‘সুব্হে উম্মিদ’, ‘খালেদ’, ‘উমর ফারুক’ কবিতায়। আর এ সবই যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর হাতিয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা তা বিশেষ করে তাঁর ‘খালেদ’ কবিতায় লক্ষ্য করা যায়। সেখানে তিনি বলেছেন

খালেদ! খালেদ! ফজর হ’ল যে, আজান দিতেছে কৌম্,
ঐ শোন শোনÑ ‘আস্সালাতু খায়র মিনান্নৌম!’
যত সে জালিম রাজা-বাদশারে মাটিতে করেছ গুম্
তাহাদেরি সেই খাকেতে খালেদ করিয়া তয়ম্মুম
বাহিরিয়া এস, হে রণ-ইমাম, জমায়েত আজ ভারি!
আরব, ইরান, তুর্ক, কাবুল দাঁড়ায়েছে সারি সারি!
আব-জম্জম্ উথলি’ উঠিছে তোমার ওজুর তরে,
সারা ইসলাম বিনা ইমামেতে আজিকে নামাজ পড়ে!
খালেদ! খালেদ! ফজরে এলে না, জোহর কাটানু কেঁদে,
আসরে ক্লান্ত ঢুলিয়াছি শুধু বৃথা তহ্রিমা বেঁধে’!
এবে কাফনের খেলকা পরিয়া চলিয়াছি বেলাশেষে,
মগরেবের আজ নামাজ পড়িব আসিয়া তোমার দেশে!
খালেদ! খালেদ! সত্য বলিব, ঢাকিব না আজ কিছু,
সফেদ দেও আজ বিশ্ববিজয়ী, আমরা হটেছি পিছু!
তোমার ঘোড়ার ক্ষুরের দাপটে মরেছে যে পিপীলিকা,
মোরা আজ দেখি জগৎ জুড়িয়া তাহাদেরি বিভীষিকা!
হটিতে হটিতে আসিয়া পড়েছি আখেরি গোরস্তানে,
মগরেব বাদে এশার নামাজ পাব কি না কে সে জানে!
খালেদ! খালেদ! বিবস্ত্র মোরা পরেছি কাফন শেষে,
হাতিয়ার-হারা দাঁড়ায়েছি তাই তহ্রিমা বেঁধে এসে!

উল্লেখ্য নজরুলের সার্বিক যুদ্ধটা ছিল সাম্রজ্যবাদী শক্তি এবং তাদের অপশক্তির বিরুদ্ধে। তাই তিনি শুধু ‘জাতের বজ্জাতি’ লিখে হিন্দু বর্ণবাদকে খতম করতে চাননি বা ‘জনগণে যারা জোঁকসম চষে তারে মহাজন কয়’ বলে জমিদারী প্রথার উচ্ছেদ করতে চাননি। তিনি শুধু তদনীন্তন ভারতবর্ষের তেত্রিশ কোটি মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে খাওয়া বৃটিশের সর্বনাশ কামনা করে বিশ্বের দানব-শক্তি, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে উৎখাত করতে চাননি; তিনি বিভেদ তৈরীর পরিকল্পনা চূর্ণ করে অভেদ শক্তির উত্থান। তিনি যখন লেখেনÑ

আমানুল্লারে করি বন্দনা, কাবুল রাজার গাহি না গান,
মোরা জানি ঐ রাজার আসন মানব জাতির অসম্মান
ঐ বাদশাহী তখ্তের নীচে দীন-ই-ইসলাম শরমে, হায়,
এজিদ হইতে শুরু ক’রে আজো কাঁদে আর শুধু মুখ লুকায়!

তখন বোঝা যায় সমস্ত বিশ্বের জালিম শক্তিকে তিনি খতম করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন। ‘আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার/নি:ক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব আনিব শান্তি শান্ত উদার!’ এ দম্ভ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চিন্তার দম্ভ। তাঁর ‘খালেদ’ তাই এক বৃটিশ রাজের ধ্বংস করে মাজারে ঘুমায় নাÑ ‘হাজার রাজার চামড়া বিছায়ে মাজারে’ নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমায়।

আর এক কথা। যদিও ‘খালেদ’ কবিতার উপসংহারে নজরুল ইসলাম লিখেছেনÑ ‘খোদার হাবিব বলিয়া গেছেন আসিবেন ঈসা ফের/ চাই না মেহেদী তুমি এস বীর হাতে নিয়ে শমসের! তবু তিনি শমসেরকে এক মাত্র শক্তি মনে করেন নি। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার শক্তিকে তিনি শনাক্ত করেছিলেন। ‘সাম্যবাদী’ কবিতার ‘চোর-ডাকাত’ ‘কুলি-মজুর’ এই উপশীর্ষ কবিতাতে তিনি যখন লেখেনÑ

রাজার প্রাসাদ উঠিছে প্রজার জমাট রক্ত ইঁটে
ডাকু ধনিকের কারখানা চলে লাশ করি কোটি ভিটে।
কিংবা
বেতন দিয়াছ? চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল!

তখন অর্থনীতির ব্যপারটা তাঁর যুদ্ধ-কৌশলের সীমানার অন্তর্গত ছিল বলে ধারণা করা যায়। নজরুল তাঁর এক অভিভাষণে বলেছিলেনÑ

‘হিন্দু মুসলমানের দিন রাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্ধেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মানুষের জীবনে একদিকে কঠোর দারিদ্র ঋণ, অভাবÑ অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা পাষাণ স্তুপের মত জমা হ’য়ে আছে। এই অসাম্য, এই ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম।’

তিনি ‘টাকাওয়ালা’ নামে একটা প্রশ্নবোধক কবিতাও লিখেছিলেন। সেখানে বলেছিলেনÑ

টাকাওয়ালাদের দেখে এই জ্ঞান হইয়াছে সঞ্চয়,
টাকাওয়ালাদের চেয়ে ঝাঁকাওয়ালা অনেক মহৎ হয়।
সোনা যারা পায় তাহারাই হয় সোনার পাথর বাটি,
আশরাফি পেয়ে আশরাফ হয় চালায়ে মদের ভাঁটি!
মানুষের রূপে এরা রাক্ষস রাবণ-বংশধর
পৃথিবীতে আজ বড় হইয়াছে যত ভোগী বর্বর!

কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে তাঁর সুক্ষ্মতর যুদ্ধ যেটা সেটা ছিল সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। ‘সাম্রাজ্যবাদ’ শব্দটির সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়ের সম্বন্ধ কি? এ জন্যে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ শব্দটির বিশিষ্টার্থক অর্থ আমাদের জানা প্রয়োজন। সাম্রাজ্যবাদকে একদা ‘বাণিজ্যবাদ’ বলে মনে করা হতো। আমাদের উপমহাদেশে এই বাণিজ্যের নামে ইংরেজ বণিকেরা এসে এদেশকে তাদের উপনিবেশে পরিণত করে। এর থেকে বোঝা যায় অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রই সাম্রাজ্যবাদীদের মূল লক্ষ্য। সেটা করতে আধুনিক কালে যা ঘটছে তা থেকে বোঝা যায় সাম্রাজ্যবাদীরা ‘অস্ত্র শক্তির মাধ্যমে দেশ জয় করে প্রভুত্ব কায়েম করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক শোষণ শুরু করে দেয়। কিন্তু এককভাবে অর্থনৈতিক বা অস্ত্রনৈতিক যুদ্ধ
পৃষ্ঠা-৯

দিয়ে সাময়িকভাবে সিদ্ধলাভ করলেও দীর্ঘকাল ধরে সে আধিপত্য টিকিয়ে রাখা যায় না। সে জন্যে পাশ্চাত্য জগৎ প্রাচ্যে শুধু অস্ত্রের শক্তির প্রতাপ দেখিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করেনি তারা ধর্ম-সংস্কৃতি, ভাষা-সংস্কৃতি, শিল্প ও সাহিত্য সংস্কৃতি এবং আচার সংস্কৃতিকেও প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। উপমহাদেশে মিশনারীদের ধর্মপ্রচার এবং বিশ্বে ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যের প্রচারও এর অন্যতম কারণ। যদিও ‘বাণিজ্যবাদ’ বা ‘পুঁজিবাদ’ সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্যের হাতিয়ার তবু ধর্ম, শিল্প, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রচারও তাদের উদ্দেশ্যের সহযোগী কর্ম। এটা নজরুল ইসলাম বুঝেছিলেন। কুটকৌশলী বৃটিশ যখন নজরুল ইসলামকে কারাবন্দী করেও সফল হয়নি তখন তাঁকে তারা হিজ মাস্টার ভয়েসের ‘সোনার খাঁচা’য় বন্দী করে। বৃটিশ-ফন্দীতে সৃষ্ট ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সংস্কৃতি মিশ্রিত বাংলার বিপরীতে নজরুল ইসলাম আরবী ফরাসী মিশ্রিত পুঁথির বাংলা ভাষাকে পুনরুজ্জীবিত করে সাংস্কৃতিক যুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের একটি ফ্রন্টে মারাত্মক আঘাত হানেন। হিজ মাস্টার ভয়েসের সোনার খাঁচায় থেকে তাঁর ইসলামী সংগীত ও শ্যামা সংগীত রচনায় অন্তত: পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আর একটি অসামান্য যুদ্ধ তিনি জাতিকে উপহান দেন। ইসলামিক দৃষ্টিতে তাঁর শ্যামা সংগীত ও বৈষ্ণব সংগীত রচনা প্রশ্নবোধক হ’তে পারে কিন্তু পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এটা নজরুল ইসলামের প্রাচ্য সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠার বিজয়। এ-জন্যে তাঁর শ্যামা সংগীত সম্বন্ধে কবি আবদুল কাদির যখন এই উক্তি করেনÑ

‘নজরুল ইসলাম বাঙলার মুসলিম রিনেসাঁসের প্রথম হুঙ্কারই শুধু নহেন, কাব্য-চর্চায় ইসলামের নিয়ম কঠোরতা উপেক্ষা করিয়া Neo-Pagan-এর সাহায্য গ্রহণেও তিনি অগ্রণী।’ আমার সেই লেখাটি গড়ে নজরুল ইসলাম দৃঢ়স্বরে মন্তব্য করেন যে, তাঁর কবিতায় ও গানে বাহ্যত: Neo-Pagan বলে যা আমাদের কাছে প্রতিভাত হ’চ্ছে, তা প্রকৃতপক্ষে Pseudo pagan। নজরুলের কোন কোন রচনায় বৈষ্ণবীয় লীলাবাদ ও শৈব শক্তি আরাধনা দেখে যাঁরা তাঁকে স্থূল কথায় প্রতীকপূজারী বলতে চান, তাঁদের কাছে কবির বক্তব্য যে তিনি কখনই প্যাগান বা নিও প্যাগান নন, তিনি কখনও কখনও কাব্য বিষয়ের অসুসরণ ও অন্তরের অনুপ্রাণিত ভাব প্রকাশের প্রয়োজনে পরেছেন Pseudo pagan-এর [নকল প্যাগানের] সাময়িক কবি বেশ।

বিষয়টা আমাদের কাছে তখন সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয়ে যায় যখন ১৯৪১-এ লেখা ‘আমার লীগ-কংগ্রেস’ প্রবন্ধে নজরুলকে লিখতে দেখিÑ

‘আল্লাহ আমার প্রভু, রসূলের আমি উম্মত, আল কোরান আমার পথ-প্রদর্শক। এ-ছাড়া আমার কেহ প্রভু নাই, শাফায়াত দাতা নাই, মুর্শিদ নাই।’

সুতরাং বোঝা যায় নজরুল তাঁর প্রকৃত লক্ষ্যে অবিচল থেকে সাম্রজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সকল বিভাগে অবিশ্রাম যুদ্ধ করে গেছেন। আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আমাদের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তাঁর কাব্য-সাহিত্য আমাদের সর্বাধুনিক অস্ত্র বলেই আমাদের বিশ্বাস।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

নিব

:উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তনের একটি শোভন ছড়াপত্র

বাঙলা

আফসার নিজাম সম্পাদিত : চিন্তাশীল পাঠকের মননশীল সৃজন

%d bloggers like this: