ইসলামী সংস্কৃতি : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

ড. মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

সংস্কৃতি হচ্ছে বহতা নদীর মতো। মুসলমানগণ যেভাবে তাঁদের জীবন গড়ে তোলেন ইসলামী সংস্কৃতি ঠিক তেমনিভাবে আতœপ্রকাশ করে। তবে ইসলামী সংস্কৃতির সবচেয়ে অনুকূল দিকটি হচ্ছে, তার একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বব্যাপী একক চেহারা আছে। এর কারণ তার সুস্পষ্ট ও অপরিবর্তনীয় বিধান। এ বিধানের মধ্যে মতবিরোধের হাজার সুযোগ ও ক্ষেত্র থাকলেও তা মূলগতভাবে এক কেন্দ্রে একীভূত। ইসলমী সংস্কৃতির এ-পৃথক ধারাটি মদীনাতুর রাসূল সা. থেকে উৎসারিত হয়ে রাসূলুল্লাহ সা. এর ইন্তিকালের পর তা গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। মুসলমানগণ যেখানেই যান সেখানেই ইসলামী সংস্কৃতির ধারা প্রবাহিত হয়। মুসলমানগণ বিভিন্ন দেশে গিয়ে ইসলাম প্রচার করেন এবং পারিবারিক জীবন ধারা গড়ে তোলেন। বিভিন্ন দেশের স্থানীয় সংস্কৃতিতে তাঁর প্রভাব বিস্তার করেন। এবং তাঁদের সাংস্কৃতিক জীবন থেকেও তাঁরা অনেক কিছু গ্রহণ করেন। কিন্তু চৌদ্দ’শ বছর পরেও একটা বিষয় সুস্পষ্ট যে, দুনিয়ার কোন দেশে মুসলমানরা স্থানীয় সংস্কৃতি থেকে শিরকীয় আকীদাহ ও হারাম ভিত্তিক কোন কিছু গ্রহণ করে তার ওপর সন্তুষ্ট ও নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। নিজেদের সাংস্কৃতিক জীবনে শিরকীয় ও হারাম বিষয়ক কোন আচরণ ও কর্মকান্ডের অনুপ্রবেশের পর মুসলমানরা সবসময় অস্থির ও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়েছে। একদল মুসলমান সবসময় তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে।

বর্তমান বিশ্বে আমরা দেখি ইসলাম গ্রহণের পর একজন নওমুসলিম সবচেয়ে বেশী তৎপর হয় ইসলামী জীবন যাপনের জন্য। অর্থাৎ ইসলাম এমন একটা জীবন বিধান যা একটি পৃথক সাংস্কৃকি জীবণধারার জন্ম দেয়। বিগত চৌদ্দ’শ বছর ধরে ইসলাম সারা বিশ্বে তার এ সংস্কৃতির প্রসার ঘটিয়েছে। আজও এ-ধারা অব্যাহত আছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি ও অগ্রগতির সাথে জীবন উপকরণের মধ্যে অনেক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। অনেক নতুন নতুন উপকরণ সেখানে সংযোজিত হচ্ছে। পুরনো অনেক কিছু বাদ যাচ্ছে। ইসলাম সেখানে পিছিয়ে থাকছে না। তার তাওহীদ বিশ্বাস ও হালাল-হারামের মানদন্ডের ভিত্তিতে যাচাই করে সে গ্রহণীয়গুলোকে গ্রহণ করছে এবং বর্জনীয়গুলোকে বর্জন করে চলছে। এর পরও অনেক বিতর্কের উদ্ভব হচ্ছে হয়তো এ বিতর্কের পেছনে রয়েছে আরো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করার দাবী। অথবা এখনও নতুন বিষয়গুলোকে সঠিকভাবে উপদ্ধিও বিশ্লেষণ করা হয়নি। এ কারণে এ বিতর্ক। তবে একথা সুস্পষ্ট যে, মুসলিম মিল্লাত কখনো একযোগে প্রকাশ্য শিরক ও বিদআতে লিপ্ত হবে না।

ইতোপূর্বে আমরা ইসলামী সংস্কৃতির সংজ্ঞা,স্বরূপ, প্রকৃতি, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ, বাংলার প্রাচীন যুগের সাংস্কৃতিক অবস্থা, মধ্যযুগের মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করেছি। এখন বাংলাদেশের আধুনিক সংস্কৃতি প্রসংগে আলোচনা করার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ।

আধুনিক সংস্কৃতি ও বাংলাদেশ
সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলশ্র“তি স্বরূপ বাংলাদেশের জনগণ আধুনিক সংস্কৃতির নামে যে অপসংস্কৃতি চিত্তবিনোদন হিসেবে উপভোগ করছে তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র এখানে তুলে ধরা হলো:

সিনেমা বা চলচ্চিত্র সংস্কৃতি
ইসলাম মানুষের চিত্তবিনোদনের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করেনি। বরং নির্দোষ হাস্যরস, আনন্দ-স্ফুর্তি ও কৌতুক ইসলাম অনুমোদন করে। তবে এ ক্ষেত্রেও ভারসাম্য রক্ষা করে চলার নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহর যিক্র থেকে গফিল হয়ে মানুষ কেবল আনন্দ-ফুর্তিতে মশগুল হয়ে থাকবে এবং ভালো-মন্দ নির্বেশেষে সর্বপ্রকারের চিত্তবিনোদনে জীবনের মহামূল্য সময় অতিবাহিত করবে, ইসলাম তা মোটেই পছন্দ করে না।

চলচ্চিত্র একটি বিরাট প্রচার মাধ্যম, একে যদি আমরা ইতিবাচক কাজে লাগাতে সক্ষম হই, তা হলে এর মাধ্যমে মানব সমাজের প্রভূত কল্যাণ সাধন করা সম্ভব। এই প্রচার মাধ্যমটিকে যথাযথ ভাবে কাজে লাগাতে পারলে আমরা অল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার নিরক্ষর মানুষকে শুধু অক্ষর জ্ঞান সম্পন্নই নয়, অশিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত মানুষকেও উচ্চতর আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করা সম্ভব। এর মাধ্যমে বিভিন্ন জাতির জীবনের অসংখ্য দিক, তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্যকে আমরা তুলে ধরতে পারি। সৌরজগতের বিস্ময়কর আবিষ্কার ও পর্যালোচনাগুলো এমন আকর্ষণীয় পদ্ধিতিতে তুলে ধরা যায়, যা দেখার পর লোকেরা অশ্লীল ছবির কথা ভুলে যাবে। আবার এই ছবিগুলোকে এতখানি শিক্ষনীয় করা যেতে পারে, যার ফলে মানুষ তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি বিশ্বাসী হবে এবং শিরক থেকে দূরে থাকবে। এ-ছাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ, যুদ্ধবিদ্যা এবং নাগরিক দায়-দায়িত্ব ইত্যকার বিষয়েও শিক্ষা দেয়া যায় অত্যন্ত আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে চলচ্চিত্রকে যে কত চমৎকারভাবে সৃজনশীল ও গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করা যায়, ইসলামী বিপ্লবোত্তর ইরানী চলচ্চিত্রই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কিন্তু আমাদের দেশের এই শক্তিশালী গণমাধ্যমকে বর্তমানে যে অন্যায় ও অশোভন পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা কোন ভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। এ মাধ্যমটি বর্তমানে চরম অশ্লীল, নির্লজ্জ ও নৈতিকতা বিবর্জিত দৃশ্যাবালীর প্রদর্শনীর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। কোলকাতা ও মুম্বাইয়ের অনুকরণে এতে যে কাহিনী বা গল্প চিত্রায়িত হয়, তা অবৈধ ভালোবাসা ও প্রণয়াশক্তির বিচিত্র গতি-প্রকৃতি ও রোমান্টিক ঘটনা-পরম্পরার আবর্তনে উদ্বেলিত। তা দর্শকদের, বিশেষত তরুণ-তরুণীদের মন-মগজ ও চরিত্রের ওপর অত্যন্ত খারাপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। রূপালী পর্দায় আলো ছায়ার বিচিত্র ও রহস্যময় খেলায় যা কিছু দেখানো হয়, হুবহু তারই প্রতিফলন ঘটে দর্শকদের চরিত্রে। যা থাকে ধরা-ছোয়ার বাইরে, তাকেই ধরতে-ছুঁতে ও কল্পনাকে বাস্তবে রূপদান করার জন্য পাগলপারা হয়ে ওঠে দর্শকবৃন্দ। নায়ক-নায়িকাদের অবাধ মেলামেশা, নগ্নতা-উচ্ছৃংখলতা এবং নির্লজ্জ অঙ্গভঙ্গি দর্শকদের মধ্যে যৌন উন্মাদনা সৃষ্টি করে। আধুনিক সংস্কৃতির নামে তথাকথিত হিন্দি-বাংলা(অবর্ণনীয় নগ্ন) ছায়া ছবির কুপ্রভাবে আমাদের যুব সমাজের চরিত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সমাজ জীবনের সর্বত্র খুন-খারাবী, কৌমার্য, ধর্ষণ-গণধর্ষণ, ফিল্মি স্টাইলে ছিনতাই ইত্যাদি অহরহ সংঘঠিত হচ্ছে। এসব অশ্লীল, গর্হিত ক্রিয়াকর্ম ইসলাম আদৌ সমর্থন করে না। কোন সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন ও রুচিবান মানুষ তা বরদাশত করতে পারে না। এগুলো যে মনুষ্যত্বের চরম লাঞ্ছনা ও অবমাননা তা কি বলার অপেক্ষা রাখে ? কিন্তু এজন্য দায়ী কে ? আমাদের আলিম সমাজ তো এগুলোকে হারাম-গর্হিতকাজ বলে ঘোষণা করে দিয়েছেন।

টেলিভিশন সংস্কৃতি
টেলিভিশন বিশ্বব্যাপী একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম। এটি বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর অবদান। বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের সচিত্র সংবাদ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান মুহূর্তের মধ্যে ঘরে বসে আমরা চোখের সামনে দেখতে পাই। বিজ্ঞানের আশীর্বাদের ফলে গোটা বিশ্ব আজ আমাদের হাতের মুঠোয়। জাতির ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা, নীতি-নৈতিকতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে গঠনমূলক পরিবর্তন সাধন করতে এই টেলিভিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই শক্তিশালী প্রচার মাধ্যমটি হতে পারতো জাতীয় আশা-আকাংখার প্রতীক। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে, দেশের জনসাধারণের ট্যাক্সে পরিচালিত এই টেলিভিশন জাতির গঠনমূলক কাজে ব্যবহৃত না হয়ে, সত্য ও ন্যায়ের প্রচার মাধ্যম না হয়ে, পরিণত হয়েছে চরিত্র বিনাশের এক শক্তিশালী হাতিয়ারে। সৃজনশীল তেমন কিছু করতে না পারলেও উঠতি বয়সের যুবক-যুবতীসহ বিভিন্ন বয়সী টিভি দর্শকদের অর্ধনগ্ন করে তাদের হায়া-শরমকে বিদায় করতে সক্ষম হয়েছে। সুকৌশলে ইসলামী সংস্কৃতির ওপরে নগ্ন হামলা করা হচ্ছে নাটকের বিভিন্ন সংলাপের মাধ্যমে। এ প্রসংগে জনপ্রিয় সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিবিদ হুমায়ূন আহমদের ‘সবুজছায়া’ নামক ধারাবাহিক নাটকের একটি সংলাপ উল্লেখ করা যায় ‘দেখ শরীফা, লজ্জা এক সময় নারীর ভূষণ ছিল। এখন নারী-পুরুষ কারোই ভূষণ নয়’।১ অথচ হাদীসে বলা হয়েছে: ‘আল-হায়াউ শু’বাতুম মিনাল ঈমান’ হায়া বা লজ্জা ঈমানের অংশ (সহীহ আল বুখারী)। প্রিয় সচেতন পাঠক পাঠিকা এ সংলাপটির মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে যে, আবহমানকাল থেকে মানুষের মাধ্যে বিশেষ করে নরীদের মধ্যে লজ্জাশীলতার যে ব্যাপারটি কাজ করে আসছে তা একটি কুসংস্কার মাত্র। তা হলে আধুনিক সংস্কৃতির বাহক টেলিভিশনের মাধ্যমে আমরা কি সংস্কৃতি পাচ্ছি ? একথা তো স্পষ্ট যে, বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাব, অশালীন পোশাক এবং অশ্লীল বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে টেলিভিশন আমাদের যুব সমাজের নীতি-নৈতিকতা ও চরিত্রকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ফলে সমাজে সন্ত্রাস, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, চুরি-ডাকাতি, হাইজ্যাক, ছিনতাই, দূর্নীতি ইত্যাদি গর্হিত কাজগুলো দিন দিন বেড়েই চলছে। অশ্লীলতার ক্ষেত্রে বেসরকারী চ্যানেলগুলোও পিছিয়ে নেই। তারাও সমান তালে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলছে। এর সাথে যোগ হচ্ছে পার্শবর্তী রাষ্ট্রের ৬৭টি চ্যানেল থেকে প্রচারিত চরম অশালীন ও নির্লজ্জ হিন্দি ও বাংলা ছায়াছবি। উদ্দেশ্যমূলকভাবেই তারা নিজেদের টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ককে আমাদের ভূখন্ডের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদের উন্নত প্রযুক্তির হাইফ্রিকোয়েন্সীর টিভি চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে। অবশ্য টেলিভিশনের সকল অনুষ্ঠানই খারাপ ও ক্ষতিকর সে কথা বলছি না। মাঝে-মধ্যে কিছু ভালো ও গঠনমূলক অনুষ্ঠানও প্রচারিত হয়। তবে এসব ইসলামী অনুষ্ঠান চাহিদার তুলনায় নেহায়েতই কম হওয়ার কারণে জনমনে তেমন কোন প্রভাব ফেলতে পারে না। টেলিসংস্কৃতির লাভ-ক্ষতি দুটি দিকই আছে। তবে এর ক্ষতির দিকটিই বেশী কার্যকর। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সময় অপচয় প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিশিষ্ট গবেষক ও ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব শাহ আবদুল হান্নানের এক পর্যালোচনা থেকে দেখা যায় যে, কিশোর থেকে যুবক শ্রেণী পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের ২৪ ঘন্টার মধ্যে অনেকেরই ৬/৭ ঘন্টা টেলিভিশনের পেছনে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। এতে তাদের লেখা-পড়ার বিরাট ক্ষতি হচ্ছে। তিনি তার সমীক্ষায় আরো বলেন, আমাদের দেশে সরকারী, বেসরকারী টিভি চ্যানেলের পাশাপাশি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো ওপেন। এসব চ্যানেলের বিভিন্ন বৈশিষ্টর মধ্যে অন্যতম প্রধান দিকটি হলো খবর। এর পরই দেখা যায় নাচ, গান আর সিনেমা। এই নাচ, গান, সিনেমাই টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ৫০ থেকে ৬০ ভাগ সময় জুড়ে রয়েছে। সেখানে খেলাধুলার প্রোগ্রামও রয়েছে। আর কার্টুন তো আছেই। ডিসেম্বর ২০০৩ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত ‘টিভি কম দেখুন: সময়কে কাজে লাগান’ নামক নিবন্ধে তিনি এতথ্য প্রকাশ করেন। তিনি গোটা জাতির কাছে এ আহবান জানিয়েছেন। আমরাও তার এ আহবানের সাথে সম্পূর্ণ একমত। আমরা টেলিভিশন কম দেখবো এবং বেচে যাওয়া সময়কে জাতির কল্যাণে ও গঠনমূলক কাজে ব্যাবহার করবো। এর সাথে সাথে টিভির অশালীন প্রোগ্রাম বন্ধ করার জন্য জনমত গড়ার চেষ্টাও অব্যাহত রাখবো।

আসলে টেলিভিশন হচ্ছে একটি প্রাইমারি স্কুলের মত। সে স্কুলের চৌহদ্দির মধ্যে গোটা বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত। প্রত্যেক নাগরিকই এ স্কুলের ছাত্র। রোজ রোজ যারা টেলিভিশন দেখেন, তারা নিয়মিত ছাত্র। আর যারা মাঝে মধ্যে দেখেন তারা অনিয়মিত ছাত্র। টেলিভিশনের শিক্ষা কারিকুলাম অদ্ভূত রকমের বৈচিত্রপূর্ণ। একদিকে কুরআন-হাদীসের তালীম দিচ্ছে এবং নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিরোধের আহবান জানাচ্ছে, অপরদিকে সংস্কৃতির নামে ছেলেবুড়ো সকলের নৈতিক অবক্ষয়ের যাবতীয় প্রোগ্রাম প্রতিদিন আঞ্জাম দিচ্ছে। এখানকার শিক্ষকতার দায়িত্ব যারা পালন করছেন, তারা ব্রাহ্মণ্য ও পশ্চিমা সংস্কৃতির সিলেবাস অনুযায়ী আমাদের তরুণ সমাজকে নানাভাবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

স্যাটেলাইট সংস্কৃতি
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের ধারাবাহিকতার আশীর্বাদে আমরা নবযুগের নিত্য নতুন তথ্যসমৃদ্ধ পৃথিবীর প্রগতির আলোয় আধুনিক জীবনের ছোঁয়া পেয়েছি। প্রগতির উৎকর্ষতা জীবনে এনেছে যাবতিয় সমৃদ্ধপূর্ণ বিনোদন। কিন্তু আমরা কি বিশ্লেষণ করে দেখেছি এ স্যাটেলাইট কানেকশন লব্ধ ডিশএন্টেনা আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের কি পরিবর্তন এনেছে ?

সুক্ষ বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডিশএন্টেনার কালচার বা সংস্কৃতি প্রকারান্তরে আমাদের অকল্যাণই বয়ে আনছে। ডিশএন্টেনার রিমোট আমার হাতে। সুচ টিপে আমি ঠিকই ইচ্ছে মত চ্যানেল পর্দায় আনয়ন করছি। কিন্তু পর্দার স্কীনে প্রদর্শিত দৃশ্য-ঘটনা আমার মন-মেজাজ, চিন্তা-বুদ্ধিকে যথাযথভাবে উপর্যুপরি ধোলাই করে আমারই দ্বীনের স্বকীয়তা, ঐতিহ্য ও আদর্শ বিরোধপূর্ণ মোক্ষম হাতিয়ার স্বরূপ কাজ করছে।

আধুনিক সংস্কৃতির ডামাডোলে নিক্ষেপ করে পশ্চিমা জগত মুসলিম জাতিকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য অশ্লীলতা, নগ্নতা, ধর্মীয় বিকৃত কালচার ও বেহায়াপনাপূর্ণ বিভিন্ন কর্ম উপস্থাপনা করে সারা বিশ্বে নানাভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে সুকৌশলে।

ডিশএন্টোনার বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত যে বিষয়াবলী দেখানো হয় তা হচ্ছে: উদ্ভট, অকল্পনীয়, অবাস্তব সিরিজ, সেমিনগ্ন, অর্ধনগ্ন, পূর্ণনগ্ন মডেল ও অভিনেত্রীর দেহায়বব এবং নাচ ও গান, যৌন চর্চার বাহারী স্টাইলের নিত্য-নতুন অসংখ্য পদ্ধতি, লোমহর্ষক খুন, কিডন্যাপ, ব্যক্তি ও সমাজ বিধ্বংসী কাহিনীর প্রশিক্ষণমূলক ছবি, নারী-পুরুষের বিভেদহীন জীবনাচরণ যাতে মারাতœক ক্ষতিকর প্রভাব, বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডসহ অসংখ্য দৃশ্য। যার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে আমাদের সমাজের কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, তাদের সুন্দর উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে বিনষ্ট করে অকল্যাণমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তবে এর পাশাপাশি আর্ন্তজাতিক খবরাখবরসহ বিদেশের অনেক কিছুই ডিশএন্টেনার বদৌলতে দেখা সম্ভব।২ এক তথ্য থেকে জানা যায়, ঢাকা শহরে শতকরা ৩৭ ভাগ টেলিভিশনের মালিক স্যাটেলাইট সংযোগ নিয়েছে ৬০ থেকে ৬৩ ভাগ খুব শীঘ্রই নিতে যাচ্ছে। ৩ ভাগ মাত্র বলেছে তারা স্যাটেলাইট সংযোগ নেবেন।৩ ডিশ এর উপকারীতা যাই হোক এর মাধ্যমে যে আমাদের যুব সমাজের চরিত্র ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বিনিষ্ট হচ্ছে এবং সময়, অর্থ ও পড়াশুনার ব্যাঘাত ঘটছে তা এক বাস্তব সত্য। আধুনিক টেকনোলজীর প্রেক্ষাপট বিচার করে অনেক দেশই স্যাটেলাইট টিভি দেখার অনুমতি দেয়নি। এর মধ্যে ইরান, সিঙ্গাপুর, চীন ও মালয়েশিয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। ইদানিং বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলও ভারতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তা হলে ৯০ ভাগ মুসলমানের প্রিয় মাতৃভূমি এই বাংলাদেশে নৈতিকমূল্যবোধ বিনষ্টকারী সকল স্যাটেলাইট চ্যানেলই কি ওপেন রাখা খুবই প্রয়োজন ?

সুন্দরী প্রতিযোগিতা ও মডেলিং সংস্কৃতি
আশ্চর্য ধরনের বিনোদন চলছে বর্তমানে সুন্দরী প্রতিযোগিতা ও মডেলিং এর নামে। রূপ সৌন্দর্যের নিআমত আল্লাহপাক দান করেছেন একমাত্র স্বামীর ভোগের জন্য আর এ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ইযযাত ও সম্মানের সাথে সম্পন্ন হয়ে থাকে। সম্মানজনক এই বিনোদন উপেক্ষা করে নারী হচ্ছে আজ গণভোগ ও বিনোদনের মাধ্যম। রাষ্ট্রীয় সুন্দরী প্রতিযোগিতা ও বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতার নামে যে বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা প্রদর্শিত হয় তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। মহা সুন্দরী লীলাবতী ললনা, রূপ যৌবনের রাণী, সুন্দরী যুবতীরা হাজার হাজার লক্ষ কোটি দর্শকের সামনে তাদের স্পর্শকাতর স্থানগুলোকে উম্মুক্ত করে দেয় দর্শনের জন্য, মাপার জন্য, স্পর্শ করার জন্য। এমনকি মুসলমান নামধারীণী যুবতীরা পর্যন্ত সুন্দরী প্রতিযোগিতা নামক এই বেহায়াপনায় অংশ গ্রহণ করে।

সাবান, ব্লেড, আলকাতরা, সিমেন্ট, কনডোম, মায়াবড়ি, শাড়ী, ইট, চেয়ার, লবন, পোশাক, পাউডার, তেল ইত্যাদি পণ্যে সুন্দরী মডেল কন্যারা তাদের দেহের রূপের পসরা খুলে লোভনীয় চাহনী মেলে উন্মুক্ত বাহু, এলোকেশ বিভিন্ন স্পর্শকাতর অঙ্গ-ভঙ্গি করে কন্ঠস্বর, øিগ্ধ আকর্ষণীয় চাউনি, দেহসর্বস্ব স্টাইলে হেলেদুলে পণ্যের সুনাম গেয়ে দর্শকদের মাতিয়ে, মনভুলিয়ে থাকেন। এতে পণ্যের গুণাবলীতে মুগ্ধ না হলেও মডেল কন্যার রূপে, দেহের প্রদর্শনীতে দর্শকগণ বিমুগ্ধ হয়ে থাকেন। মডেল কন্যাদের এই দেহসর্বস্ব মডেলিং বিজ্ঞাপন প্রয়োগে রূপের অনিবার্য সৌন্দর্য-সৌকর্য যুবসমাজকে মহান কিছুতে প্রেরণা যোগানের বিপরীতে গুন্ডা, বদমায়েশ, মস্তান, নারী অপহরণকারী বানায় এর নাম কি নারী স্বাধীনতা! নারী আজ সৃষ্টির সেরা থেকে বাজারের পণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রাকৃতিক বিধান, আল্লাহর আইন যারা অমান্য করে তারা এভাবেই নিজের অজান্তে নিজেদের পশুর স্তরে নামিয়ে আনে। বরং পশুর চেয়ে অধমে পরিণত হয়। এ ধরণের সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করা, মডেলিং এ অবতীর্ণ হওয়া, ইসলামী শরীআতের সুস্পষ্ট লংঘন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আপনি মু’মিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিনত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হিফাযাত করে’৪

অশ্লীল পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিন সংস্কৃতি
বর্তমান যুগে বিকৃত বিনোদনের আর একটি ব্যাপক মাধ্যম হচ্ছে অশ্লীল পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন, কুরুচিপূর্ণ উপন্যাস বই-পত্র ইত্যাদি। কুরুচিপূর্ণ ছবি ও প্রবন্ধ-নিবন্ধ, প্রতিবেদন ইত্যাদি ছেপে গোটা সমাজকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। নগ্নতা, অবৈধ প্রেম, রাষ্ট্র-দ্রোহীতা, ধর্মদ্রোহীতা ইত্যাদির হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় যেন এসবে। এক প্রেমিকার ২২ প্রেমিক, যুবক-যুবতীর হটলাইন, সমকামিতা, হস্তমৈথুন ইত্যাদি অশ্লীল বিষয় এরূপ রসালোভাবে পেশ করা হয় যে যুবক-যুবতীরা হটকেকের মতো এগুলো কিনে নিতে বাধ্য হয়। কখনো কখনো এসব অশ্লীল বই-পুস্তকের কভারে লেখা থাকে অবিবাহিতদের জন্য পড়া নিষেধ। ফলে দেখা যায় অবিবাহিতরাই এগুলো পড়ে থাকে বেশী। নগ্নতা ও অশ্লীলতা প্রচারের ক্ষেত্রে এসব ম্যাগাজিন ও বই-পুস্তকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অথচ কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে, ‘যারা পছন্দ করে যে ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতা ও যিনা প্রসার লাভ করুক তাদের জন্য রয়েছে ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি।’৫

পার্লার সংস্কৃতি
পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণে আমাদের দেশে ব্যাঙের ছাতার ন্যায় অসংখ্য বিউটি পার্লার গজিয়ে উঠেছে। শরীআত বিরোধী বিভিন্ন প্রকার রূপচর্চার মাধ্যমে নাকি মহিলারা বিনোদন লাভ করে। যুবতীদের শ্রীবৃদ্ধির লক্ষে আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন করে ভ্র’র পশম উপরে ফেলা হয় এবং সেখানে কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয়। অথবা কিছু ভ্র“ উপড়ে চিকন করে ভ্র“ রাখা হয়। এমনিভাবে খোপার মধ্যে অন্যের চুল (পরচুলা) ব্যবহার করে সুকেশী সাজে কিংবা দাঁত সরু করে। হাতে বা শরীরের কোন অঙ্গে প্রেমিক-প্রেমিকার নাম সুঁচালো জিনিস দ্বারা অংকিত করে। এ-গুলো সবই ইসলামী শরীআতের পরিপন্থী কাজ। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা লাআনত করেছেন সেসব রমণীর ওপর যারা অপরের দেহে উলকী করে এবং যারা নিজেদের দেহে উলকি করায়। আর যারা ভ্র“’র পশম উপরে ফেলে এবং যারা সৌন্দর্যের উদ্দেশ্যে দাঁত সরু করে আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন সাধণ করে।৬ ইব্নে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত অপর এক হাদীসে বলা হয়েছে, ‘সে মহিলার প্রতি অভিসম্পাত করা হয়েছে, যে অন্যের মাথায় কারো চুল (পরচুলা) লাগায়, যে নিজের মাথায় অন্যের দ্বারা চুল লাগায়, যে অন্য নারীর ভ্র“র পশম উপড়ায় এবং যে নিজের ভ্র“র পশম উপড়ায়।৭ অপর এক রিওয়াতে নবী করীম সা. মহিলাদের মাথা ন্যাড়া করতে নিষেধ করেছেন।৮

এসব বিউটি পার্লারে উপরোক্ত কর্ম-কান্ডতো হয়ই, এছাড়া মেয়েরা চুল কেটে দিচ্ছে যুবকদের, ক্রিম মাখোনো ব্রাস ঘসছে মুখে। এ পর্যন্ত অগ্রর হয়ে তারা থামেনি। দাড়ি শেভ আর চুল কাটা শুধু নয়, মেয়েরা বোতাম খুলে দিচ্ছে শার্টের। খোলা শার্ট ঝুলিয়ে রাখছে হ্যাঙ্গারে। তোয়ালে দিয়ে ঢেকে ম্যাসেজ করে দিচ্ছে পুরুষের সারা শরীর। এটুকুই শুধু নয়। প্রকৃত ঘটনা এর চেয়েও বেশী আরোও কিছু। এসব যে ঘটছে নগরীরর প্রাণকেন্দ্রে বা বিশেষ এলাকায় শুধু তাই নয়- সর্বত্র ঘটছে, সারা দেশে ঘটছে।৯ এভাবে অসামাজিক কার্যকলাপ ও যিনা-ব্যভিচারে সারা দেশ ভরে যাচ্ছে। অথচ সরকার এ ব্যাপারে নিরব ভূমিকা পালন করছে।
সাহিত্য সংস্কৃতি
সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাব সৃষ্টিকারী বাহন হচ্ছে সাহিত্য। দেশের কবি-সাহিত্যিকগণ সেই সাহিত্যের ধারক-বাহক এবং সৃজনশীল উদ্ভাবক। আমাদের কবি সাহিত্যিকগণ তথাকথিত আধুনিক সাহিত্য চর্চায় নিবেদিত প্রাণ হিসেবে অগ্রজ ভূমিকা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু কথা হলো, এই আধুনিক সাহিত্য কতটা সৃজনশীল, স্বকীয় ঐতিহ্য-চেতনায় সমৃদ্ধ! আধুনিকতার আড়ালে আমরা কি ক্রমান্বয়ে পশ্চিমা কালচার তথা অপসংস্কৃতির দিকে অগ্রসর হচ্ছি না ? প্রচীন কাব্য-সাহিত্যের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁরা সাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে কখনো মূল ধারার থেকে সরে যাননি। নীতি বিরুদ্ধ পথে চালিত হননি। বরং যে ধর্ম মানুষের নৈতিক তথা সাংস্কৃতিক জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করে, অনুপ্রেরণা যোগায় তাঁরা সেদিকেই কাব্য-সাহিত্যের চর্চার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নির্মাণে নিয়োজিত থেকেছেন। তাঁদের নিকট ধর্মচর্চা ও সংস্কৃতিচর্চা এক ও অভিন্ন।

এবার আসুন, বাংলাদেশের আধুনিক কবি সাহিত্যিকগণ তাদের আধুনিক কাব্য সাহিত্যে কি ধরনের সাহিত্য চর্চা করে জাতির খেদমতে নিয়োজিত আছেন তা দেখি।

১ বৈশাখ ১৯৮৯ তারিখে একখানি প্রথম শ্রেণীর দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতায় একজন বিখ্যাত কবি তার বাড়ীর যুবতী কাজের মেয়েটির শারীরিক গঠণ বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘সে যে ডাগর পেপে গাছ হয়ে আছে একজোড়া পাকা গোলগাল বেশ বড়সড়ো শাসে রসে ভরপুর, কাঞ্চণ বরণী গাড় লালিমায়। এর মাত্র আড়াই মাস পরে ঐ ১২ আষাঢ় আর একজন বিখ্যাত কবি ঐ একই পত্রিকায় গেয়ে উঠলেন, (যেন বলে উঠলেন) আরে শুধু কি তাই ? ‘নিভৃত শরীর দেখলাম নগ্নতায় উদ্ভাসিত এবং তোমার উরু স্ফীত যৌনকুপ/ সতেজ ঘাসের স্পর্শ মাটির আঘ্রাণ পেতে চায়/ স্তুনচূড়া, নাভীমূল, শিহরিত আরণ্যকে সুরে।’

বর্তমান বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি, জাতির সাহিত্য-সংস্কৃতির কর্ণধার হিসেবে গণ্য কবি শামসুর রাহমান তার ‘শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ এর ৬ষ্ঠ সংস্করণের ১১৮ পৃষ্ঠায় ‘ওডেলিক্স’ নামক অশালীন কবিতায় বেশ্যা বা তার দেহের সাথে মুসলিমদের ইবাদতগাহ মসজিদের সাথে তুলনা করে লিখেছেন এভাবে, ‘সে রাতে তুমিই ছিলে ঘরের অন্ধকারে বা মিয়ানো বিছানায় উন্মোচিত। তোমার বিশদ ডাগের নগ্নতা আমি আকুল আঁজলা ভরে পান করে বারবার মৃত্যুকেও তফাৎ যাও বলবার দীপ্ত অহংকার অর্জন করে ছিলাম। নিপোশাক তোমার শরীর জোসনা ধোয়া মসজিদের মতো ব¯ত্তত আমার চোখের নিচে। স্তনচাল্লি জ্বলে…….।’ আযান সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘মুয়াজ্জিনের ধ্বনি যেনো ক্যানভাসের একটানা অলজ্জিত বেশ্যাবৃত্তি অলিগলিতে। কারা যেন বাস্তবিক কুলকুচি করে ফেলে দেয়া স্বপ্ন, স্মৃতি,মেদ, মজ্জা-সুন্দরের…….।’

স¤প্রতি এসব বুদ্ধিজীবীরই সৃষ্ট ‘ফ্রাঙ্কেস্টাইন দানবী’ তসলিমা নাসরিন তার সদ্য প্রকাশিত বই ‘ক’-এ তার গুরুদের জঘ্যণ্য চরিত্র নিয়ে যে সব ঘৃণ্য তথ্য প্রকাশ করেছেন তা পড়ে সভ্য সুশীল মানুষ ধিক্কার দেয়ার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছে।

কবি ও সাহিত্যিকগণ হলেন জাতির বিবেক। তাদের কাব্য ও সাহিত্যের ভেতর দিয়েই জাতির চিন্তা-চেতনা ও নৈতিক মূল্যবোধ ফুটে ওঠে। আর আমাদের আধুনিক শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকদের রচনার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে থাকে যদি অশ্লীলতা, যৌনতা ও নোংরামী, তা হলে জাতির জন্য গঠনমূলক মহৎ কাব্য-সাহিত্য আমারা তাঁদের থেকে কিভাবে আশা করতে পারি ?

অগ্নি সংস্কৃতি
বাংলাদেশে একদল লোক মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে শুভকাজ উদ্বোধনের রেওয়াজ চালু করেছেন। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গ্যাস চুল্লি জ্বালিয়ে বলা হচ্ছে মঙ্গলময় ‘শিখা চিরন্তন’। স্বাধীনতার পরপরই এ ধরণের একটি শিখা জ্বালানো হয়েছিল ঢাকা সেনানীবাসে ‘শিখা অনির্বাণ’ নামে। যাই হোক, এই ‘শিখা কালচার’ বা অগ্নি সংস্কৃতি নিয়ে দেশময় প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। এ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা ‘শিখা চিরন্তন‘ কে শিরক বলে প্রত্যাখ্যান করে ঐ গ্যাস চুল্লি নিভিয়ে ফেলার দাবি জানিয়েছেন। অপর পক্ষে তৎকালীন সরকার এবং তাদের সমর্থনপুষ্ট কিছু বুদ্ধিজীবী এই অগ্নি কালচারকে ‘বাঙালী সংস্কৃতির অঙ্গ’ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করে, বিরুদ্ধচারীদের দেশদ্রোহী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, রাজাকার, পাকিস্তানপন্থী ইত্যাদি ভাষায় গালমন্দ করেছেন। আমাদের ভেবে দেখতে হবে, এই অগ্নি কালচারের সূত্র-উৎস কোথায় ?

অগ্নী কালচারের সূত্র-উৎসের সন্ধান করলে দেখা যায়, উপমহাদেশের হিন্দু স¤প্রদায়ের কাছে অগ্নী প্রত্যক্ষ দেবতা রূপী ভগবান। তাদের ধর্মগ্রন্থ ঋগে¦দে বলা হয়েছে অগ্নী পার্থিব দেবতাদের মধ্যে প্রধান। অগ্নী দেবতা ও মানবের মধ্যস্থতাকারী। অগ্নী যজ্ঞ সারথি। ইনি নিজের রথে দেবতাদের বহন করে যজ্ঞস্থলে বা শুভকার্য স্থলে নিয়ে আসেন। হিন্দু স¤প্রদায় বিশ্বাস করেন অগ্নী ব্যতীত কোন দেবতা শুভকাজে উপস্থিত হতে পারেন না। সে জন্য তারা অগ্নীকে যজ্ঞ পুরহিত বলেন। এই বিশ্বাসের দরুন হিন্দু স¤প্রদায়ের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, পূজা, পার্বণসহ সকল কাজেই অগ্নির ব্যবহার দেখা যায়। তারা বিশ্বাস করেন, অগ্নির রথে চড়ে দেবতা শুভ কাজে আবির্ভূত হবেন এবং তিনিই কাজটিতে মঙ্গল দান করবেন। গান্ধীজীর সমাধি মন্দিরে অগ্নি শিখা জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে ঠিক ঐ একই বিশ্বাসে।১২ কিন্তু মুসলমানরা অগ্নি দেবতায় বিশ্বাস করে না। তাঁরা এক আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। মুসলমানরা যখন কোন শুভ কাজ শুরু করেন তখন অগ্নি দেবতার শরনাপন্ন হন না। তাঁরা মহান আল্লাহর নাম নিয়ে সকল শুভ কাজ শুরু করেন। মুসলমানরা ক্ষণস্থায়ী অগ্নি শিখাকে চিরন্তন মনে করতে পারেন না। তাঁদের কাছে একমাত্র আল্লাহর অস্তিত্বই চিরন্তন।

অতএব সার্বিক বিচারে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে ‘শিখা অনির্বাণ’ ও ‘শিখা চিরন্তনের’ চিন্তাধারা সম্পূর্ণরূপে ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী, পৌত্তলিক চিন্তা-সঞ্জাত এবং ভারতীয় অগ্নিকালচার থেকে আহরিত পরাশ্রয়ী চিন্তা-প্রসূত এই কালচারের সাথে এ দেশের মাটি ও মানুষের কোন সংস্রব নেই।

পয়লা বৈশাখ সংস্কৃতি
প্রতিবছর মহাধুমধামের সাথে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পালিত হয় বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসব বা মেলা। বাঙালীরা পূর্ব থেকে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করছে। অথচ অতীতের নববর্ষ উদযাপন ও আজকের নববর্ষ উদযাপনের মাঝে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। সেকালে হিন্দু-মুসলমান উভয়েই বাংলা নববর্ষ পালন করতো। মোগল সম্রাট আকবরের নির্দেশে আমীর ফতে উল্লাহ সিরাজী হিজরী ৯৬৩ সালে ফসলী সন হিসেবে বাংলা সন প্রবর্তন করেন। কেউ কারো ধর্মীয় রীতি-নীতির বশীভূত হতো না। সকলেই নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতো। হিন্দুরা ধূতি পরতো, মুসলমানেরা পরতো লুঙ্গি বা পাজামা-পাঞ্জাবী। হিন্দু মেয়েরা মাথায় ঘোমটা না দিলেও মুসলমান বাড়ির মেয়েরা পর্দা সহকারেই মেলায় আসত। হিন্দুদের সব অনুষ্ঠানেই পৌত্তলিকতা একটি অপরিহার্য বিষয়। সে সূত্রে পৌত্তলিকতার অংশ হিসেবে ধন-সম্পদ প্রাচুর্যের দেবী লক্ষীর পূজা, পূজার আনুষ্ঠানিক নৈবেদ্য হিসেবে ধান-দুর্বা, সন্ধা প্রদীপসহ শ্রীভ্রষ্ট নবান্ন উৎসব, তাদের বৈশাখী মেলা ইত্যাদি ছিল পয়লা বৈশাখ ও নববর্ষ উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। পক্ষান্তরে বাঙালী মুসলমানেরা নববর্ষ উপলক্ষে অশ্লীলতামুক্ত পবিত্র ভাব-গাম্ভীর্য পরিবেশে বিভিন্ন উৎসব পালন করতো। এবং মুসলমানদের নবান্নের অনুষ্ঠানও ছিল ভিন্ন ধরনের। নতুন আউশ ধানের চাল দিয়ে ভাত, পিঠে, মুড়ি-মুড়কি, খই বানিয়ে বাড়ির গাভীর দুধ, বাড়ির গাছের শবরি কলা, ঘরের মুরগী, পুকুরের মাছ রান্না করে মসজিদ-মাদরাসার আলিম-উলামাকে ডেকে প্রতিবেশী আতœীয় স্বজন মুরব্বীয়ানকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াত। কুরআন খতম ও দু’আ দরূদ পড়ে পবিত্র পরিবেশে নববর্ষ উদযাপন করতো। এভাবে হিন্দু-মুসলিম উভয় স¤প্রদায়ের নববর্ষ পালনের রীতি-নীতি পদ্ধতি ও আচার-প্রথা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। হিন্দুরা হিন্দুদের মতো আর মুসলমানরা মুসলমানদের মতো করে উপভোগ করতো এই দিবস।১৩

আগে এ উৎসব যে আঙ্গিকে গ্রাম বাংলায় পালিত হতো, তা ছিল তখনকার পরিবেশ-পরিস্থিতিও লোক সমাজের চাহিদার সাথে অনেকটা সঙ্গতিপূর্ণ। নৌকা বাইছ, গম্ভীরা, জারি, কবিতা, গ্রামীণ মেলা, খেলাধুলো ইত্যাদি অনুষ্ঠান এ উৎসবের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। বৃটিশ শাসনামলে ইংরেজদের নববর্ষ উদযাপনের যে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল তার বিরুদ্ধাচারণেও বাংলা নববর্ষ পালনে বিরাট ভূমিকা পালন করতো। এ উৎসবের আর্থ-সামাজিক কারণও ছিল। জমিদার মহাজন ও বণিক-ব্যবসায়ীদের পুন্যাহ, হালখাতা আর মেলার কেনাবেচা বিশেষভাবে বিবেচ্য ছিল। এ বাংলা নববর্ষে বৃটিশের বিরুেেদ্ধ যুব সমাজকে সংঘবদ্ধ করে বীরত্ব ও শক্তি সাহসের অনুশীলন করা হতো বিভিন্ন খেলাধুলোর মাধ্যমে।১৪

কিন্তু এখন অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন পয়লা বৈশাখ ও নববর্ষ উদযাপিত হয় সম্পূর্ণ হিন্দুয়ানী কায়দায়। এ-ব্যাপারে মুসলমান তরুণ-তরুণীদের উদ্বুদ্ধ করছে এদেশীয় তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা। তারাই এ-দেশের তরুণীদের শাঁখা-সিঁদুর পরতে ও উলুধ্বনি দিতে শিখিয়েছেন। এ-দেশের তরুণ-তরুণীদের বুঝিয়েছেন যে, এগুলো হচ্ছে বাঙালীর বাঙালীত্ব? এগুলো না করলে বাঙালী হওয়া যায় না। প্রতি বছর ‘ছায়ানট’ রমনার বটমূলে ১ বৈশাখের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এটিই ঢাকা তথা বাংলাদেশের ১ বৈশাখ উপলক্ষে সম্ভবত বড় অনুষ্ঠান। সূর্য ওঠার আগে পূর্ব নির্মিত স্টেজে ছায়ানটের শিল্পীরা সমবেত হয়। সেতার বাদনের সাথে ১ বৈশাখের নতুন সূর্যকে স্বাগত জানায়। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ছায়ানটের মূল অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে রবীন্দ্র, শ্যামা এবং অতুল প্রসাদের গীত পরিবেশন করা হয় কবিতা আবৃত্তি করা হয় ১ বৈশাখকে স্বাগত জানিয়ে। অথচ বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে আজীবন গবেষণা করেছেন, গান কবিতা লিখেছেন এমন অনেক কবি সাহিত্যিকদের গান সেখানে থাকে অনুপস্থিত। ১ বৈশাখ উপলক্ষে রমনার বটমূলে পান্তা আর ইলিশের ভোজন পর্ব চলে। মাটির সানকিতে পান্তা আর ইলিশ নিয়ে মহা ধুমধামে খাওয়া হয়। কিন্তু ১বৈশাখ উপলক্ষে পান্তা ইলিশ ভোজনের মাধ্যমে গ্রাম বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষের নিত্য দিনের খাবার পান্তা ইলিশ নিয়ে যারা বিদ্রুপ করেন, তারা কারা ? তারা হলেন ঐসব লোক যারা জীবনে কোন দিন পান্তা ইলিশের ধারে কাছেও আসেন না।

১ বৈশাখ উপলক্ষে প্রতিবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে একটি ন্যাক্কার জনক মিছিলও বের করা হয়। চারুকলার ছাত্র-ছাত্রীরা কুকুর, বানর, হনুমান, শেয়াল, বাঘ, ময়ূর, ড্রাগন ইত্যাদির মুখোশ পরে মিছিলে অংশ গ্রহণ করে। রাস্তার চারপাশে অপেক্ষমান বিপুল সংখ্যক দর্শক এসব শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের কীর্তিকলাপ দেখে হাত তালি দেয়। পরের দিন পত্রিকায়ও ফলাও করে এসব দৃশ্যাবলী ছাপা হয়। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে এসব কুকুর, বানর, শেয়াল উৎসবের সাথে আমাদের উৎসবের মিল কোথায় ?১৫

এখানেই এর শেষ নয়। ১ বৈশাখে রমনার বটমূলে, বাংলা একাডেমী চত্বরে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে যা কিছু ঘটে সে সব দৃশ্য যদি কেউ না দেখে থাকে, তা হলে ভাষায় প্রকাশ করা খুবই কষ্টকর। সূর্যোদয়ের পর থেকেই শুরু হয় বর্বর যুগের ন্যায় বিভিন্ন বয়সী ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশা। সে যেন রাধা-কৃষ্ণের রঙ্গলীলা অনুষ্ঠিত হয়। টিএসসি মোড়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্ক এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে। নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে থাকে না কোন রকম বাছ-বিচার। যে যেভাবে পারে সে সেভাবে একে অপরকে ভোগ করে। এ-যেন স্বেচ্ছায় দেয়া-নেয়ার এক পাইকারী বাজার। বিকেল তিনটে থেকে চারটে পর্যন্ত যারা ২০০১- এর পয়লা বৈশাখের বৃষ্টির দৃশ্য দেখেছেন তারা স্পষ্ট ভাবেই বলেছেন যে, ভারতীয় উলঙ্গ সিনেমাও ঢাকার এ দৃশ্যের কাছে হারমানায়। পিপড়ের মত নারী-পুরুষের ভিড়। বখাটেরা যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছে। আর এ সুযোগে তারা তাদের দুটো হাতকেই কাজে লাগিয়েছে। তার পরেও তরুণ-তরুণীরা ঘুরেছে অনেক রাত পর্যন্ত। সন্ধার পর থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু এলাকা নিষিদ্ধ পল্লীর পরিবেশকেও হার মানিয়েছে। ঘটেছে অসংখ্য অপ্রীতিকর ঘটনা। অনেক মেয়ের বুকের ওড়না হারিয়ে গেছে। ভিড়ের মধ্যে বখাটেরা সে ওড়না টেনে নিয়ে গেছে। এরূপ বিকৃত বিনোদনের পয়লা বৈশাখ পালিত হচ্ছে এমন একটি দেশে যার ৯০ ভাগ লোক মুসলমান। বর্তমানে পয়লা বৈশাখের এসব দৃশ্য দেখে মনে হয় না এই হতভাগ্য দেশটিতে মানবতাবাদী ইসলাম কোন দিন সৎ জীবন যাপনের শিক্ষা, আদর্শ ও মূল্যবোধের বাণী বহন করে এনেছিল। কাজেই আমাদের আজ নতুন করে শপথ নিতে হবে যে, আমরা মুসলমান। আমাদের পরিচয় আমরা রাসূলের সা. উম্মত। কুরআন, সূন্নাহ আমাদের আদর্শ। ইসলামের শাশ্বত কালচারের ওপর কুঠারাঘাত আসবে আর আমরা কাপুরুষষের মত দু’চোখ মেলে তাকিয়ে থাকবো তা কখনো হতে পারে না। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন ও লেখনির মাধ্যমে।

দিবস পালন সংস্কৃতি
বর্তমানে আমাদের দেশে বিভিন্ন দিবস পালন একটি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন জন্ম দিবস, বিবাহ দিবস, ভালোবাসা দিবস ইত্যাদি। এসব দিবসে আমোদ-প্রমোদ ও খাওয়ার বিশেষ এন্তেজাম করা হয়। অন্যদেরকে দাওয়াত দেয়া হয় নামী-দামী বিভিন্ন উপহার উপঢৌকন পাওয়ার জন্য। অনেকে উপহার দেয়ার ভয়ে এতে উপস্থিত হন না। উপহার না নিয়ে গেলে বলবে ছোটলোক তাই। এসব অনুষ্ঠানে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা ছাড়াও ছবি তোলা হয়, ভিডিওতে ছবি ধারণ করা হয়। এবং অশ্লীল গান বাজনা শোনা হয়। বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাবেই এসব অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছে। ইসলামে এসব দিবস পালনের কোন ভিত্তি নেই। রাসূলুল্লাহ সা. সাহাবায়ে কিরাম এবং তার পরবর্তী উত্তম যুগ সমূহেও এসব দিবস পালিত হয়নি। বরং রাসূলুল্লাহ সা. মুসলমানদেরকে বিজাতীয় সংস্কৃতির কুপ্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য বহু নির্দেশ দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির তাশারূহ (সাদৃশ্য) ধারণ করলো সে তাদেরই দলভুক্ত হলো। (সুনান আবী দাউদ ও মাসনাদে আহমাদ)

ইব্নে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত অপর এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘তিন প্রকারের লোক আল্লাহর কাছে সর্বাধিক ঘৃণিত। হারাম শরীফের পবিত্রতা বিনিষ্টকারী, ইসলামে বিজাতীয় রীতি-নীতর প্রচলনকারী এবং কোন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্য করার জন্য প্রচেষ্টাকারী। (সহীহ আল-বুখারী)

এ-ছাড়া আরো বেশ কিছু হাদীসে রাসূলল্লাহ সা. বিজাতীয় রীতিনীতি তথা অপসংস্কৃতির অনুসরণ ও অনুকরণ করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং কোন মুমিনের জন্য জন্ম দিবস, মৃত্যু দিবস, বিবাহ দিবস ইত্যাদি পালন করা সমীচীন নয়। এসব দিবস পালন ইসলাম সমর্থন করে না।

ভালোবাসা দিবস
প্রেম ভালোবাসা হৃদয়ের টান-আকর্ষণ একটি মধুময় শব্দ। ইদানিং এ প্রেম-ভালোবাসার জন্য আমাদের দেশেও বিশেষ দিবস পালন করা হচ্ছে। অনেকে প্রেম-ভালোবাসার কথা শুনলেই নাক সিটকান, তীর্যক উক্তি করেন। কিন্তু এটা ঠিক নয়। প্রেম-ভালোবাসা আল্লাহর মহাদান। ভালোবাসা ছাড়া দুনিয়া-আখিরাত সবই অচল। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর কুদরতের অন্যতম একটি নিদর্শন হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন। যাতে তোমরা তাদের নিকট থেকে প্রশান্তি লাভ করতে পারো। আর তোমাদের মধ্যে প্রেম ভালোবাসা ও মায়া মমতা সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে আল্লাহর কুদরাতের নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল লোকদের জন্য।১৬

হাদীসে এসেছে ভালোবাসা আল্লাহর একটি সৃষ্টি। একে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তা’আলা এর ১০০ ভাগের ৯৯ ভাগ নিজের জন্য রেখে বাকী ১ভাগ গোটা মাখলূকের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন। এই এক ভাগের বিনিময়ে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা, সন্তানের জন্য মায়ের ভালোবাসা, জীবজন্তুর মধ্যে মায়া মহব্বত পরিলক্ষিত হয়।

কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে, এ-বৈধ ও নির্মল প্রেম-ভালোবাসা বাদ দিয়ে আমাদের দেশে অশ্লীল ও অবৈধ প্রেম প্রীতি ভালোবাসা দিবস পালন করা হচ্ছে। প্রতি বছর ১৪ ফেব্র“য়ারিকে ভ্যালেন্টাইন ডে বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। পাশ্চাত্যে এ-দিবস জাকজমক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন শুরু হয়েছে ষোড়শ শতাব্দী থেকে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় কলডিয়াসের সময় থেকে।

এ-দিনটি পালনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোমানরা বাক্্েরর ভেতর নাম রেখে লটারী করে তাদের সুইটহার্ট নির্বাচন করতো। ১৭০০ সালের দিকে ইংরেজ রমণীরা কাগজে তাদের পরিচিত পুরুষদের নাম লিখে পানিতে ছুড়ে মারতো কাদা মাটি মিশিয়ে। যার নাম ভেসে আসতো সেই হতো প্রকৃত প্রেমিক। ষোড়শ শতাব্দী থেকে কাগজের কার্ড বিনিময় শুরু হয়। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে-ভাবে ভ্যালেন্টাইন ডে পালিত হচ্ছে তার প্রসার ঘটে আশির দশকে কার্ড ব্যবসায়ীগণের মাধ্যমে। কেননা শুধু বৃটেনেই ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষে দু’কোটি কার্ড বিক্রি হয়। বর্তমানে মা-বাবাসহ বিভিন্নজনের ভালোবাসার নামে কার্ড দেয়া-নেয়ার প্রথা চালু হওয়াতেই ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে কার্ড বিক্রি করে তারা সারা বছরই ব্যবসাকে চাঙ্গা রাখে। তবে এখানে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনীতি বিবর্জিত হওয়ায় ইসলাম বিদ্বেষীরা পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষের কোমল অনুভূতির ওপর নির্ভর করে সুকৌশলে যুব সমাজকে বিপথগামী করছে। ইউরোপে যারা প্রিয় ব্যক্তিকে ফুল পাঠাতে চায় তারা টেলিফ্লোরা বা ইন্টার ফ্লোরার সাহায্য নেয়।। এরা প্রিয় মানুষের ঠিকানায় ফুল পৌঁছে দেয়। আমাদের দেশেও ফুল দেয়ার প্রথা গড়ে ওঠেছে। কাঙিখত ব্যক্তির ঠিকানায় ফুল পাঠানো হয়।

১৯৯৩ সন হতে আমাদের দেশে এ-দিবসটি পালিত হচ্ছে। নাস্তিক্য ভাবাপন্ন একটি পত্রিকা প্রথম ভালোবাসা দিবসকে রঙ রস দিয়ে প্রচার শুরু করে। অত:পর বর্তমানে বহু সাপ্তাহিক-সাময়িকীতে নানা ধরণের প্রেমের উত্তেজনাকর লেখা-লেখি চলছে। এ কাজে উৎসাহিত ও সম্পৃক্ত করার জন্য নামকরা সম্পাদক-সাহিত্যিকরা যা লিখছেন তা দ্বারা যুবক যুবতীরা নিজেকে একে অপরের জন্য বিলিয়ে দেবে অন্ধভাবে।১৭

ভ্যালেন্টাইন ডে’র সাথে আমাদের দেশের মানুষের পরিচয় অতি অল্প সময়ের। অথচ খুব দ্রুত এ-দিনটি আমাদের তরুণ সমাজে নেশা ধরিয়ে দিয়েছে। এ দিবসটা এখন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে যে ভালোবাসা দিবস পালিত হচ্ছে তা কোন ক্রমেই ইসলামী শরীআতের দৃষ্টিতে বৈধ হতে পারে না। এখন ভালোবাসার মানে যেন তরুণ-তরুণী ও যুবক-যুবতীর অবাধ মেলামেশা, দৈহিক নষ্টামী ও নোংরামী। এটা আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি, মান-ইজ্জাত, ঈমান-আকীদাহ ও নীতি নৈতিকতা ধ্বংস করে মারাতœক অশান্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করছে। অতএব সমাজের প্রতিটি মানুষেকে এ বিষয়ে এখনি ভাবতে হবে।

গায়ে হলুদ সংস্কৃতি
বিবাহ অনুষ্ঠানে আনন্দ ও উৎসবের প্রকাশ মনের প্রকৃতির স্বাভাবিক অভিব্যক্তি। শরীআত সমর্থিত পন্থায় স্বীয় সাধ্য সামর্থ অনুসারে বিয়েতে আনন্দ ও উৎসবের প্রকাশকে শরীআতে অনুমোদন ও উৎসাহিত করা হয়েছে। হাদীসে এ অনুমোদনের সমর্থন পাওয়া যায়। আয়েশা রা. কর্তৃক এক আনসারীর কন্যাকে বিয়ে প্রদান ও স্বামীগৃহে প্রেরণের খবর শুনে প্রিয় নবী সা. আয়িশা রা. কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমি কি এই মেয়েটির বিয়েতে কোন আনন্দ উৎসবের ব্যবস্থা করেছেলে ? আয়িশা রা. এর উত্তরে বললেন হ্যাঁ রাসূলুল্লাহ সা. আবার প্রশ্ন করলেন, তুমি কি উক্ত কনের সাথে আনন্দ-ফুর্তি করার জন্য কিছু সুমধুরকন্ঠী বালিকা প্রেরণ করেছ ? যারা প্রশংসা গীত, আগমন বার্তা ও মুবারকবাদ জানাতো, দম্পতিরে কল্যাণ কামনা করে গান গাইতো। (সুনান ইব্ন মাজাহ)

উপরোক্ত হাদীস দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, বিবাহ অনুষ্ঠানে সুমধুর সুরে ও ছন্দময় গীতির ভাষায় উপদেশমূলক গান গাওয়া, এমন ছোট ছোট বালিকা দ্বরা যাদের ওপর পর্দা করা ফরজ হয়নি তা দূষণীয় নয়। এমন ভাবোদ্দীপক প্রাণ স্পর্শী হৃদয় গ্রাহী উপদেশের ভাষায় কবিতা, গান, আবৃত্তি করানো অনেক ক্ষেত্রে কল্যাণজনক। কেননা চেতনা উদ্দীপক উপদেশ মূলক গান মানুষকে সত্য কল্যাণের পথে অভিযাত্রায় উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে। হাদীসে এসেছে, ‘কবিতার মধ্যে নসীহত ও বক্তৃতার মধ্যে জাদুর মতো প্রভাব রয়েছে।১৮

কিন্তু বর্তমানে বিয়েতে গায়ে হলুদ নামে আমাদের সমাজে যে অপসংস্কৃতির রেওয়াজ চালু হয়েছে তা কোন ক্রমেই ইসলাম সমর্থন করতে পারে না। কেননা গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের পুরোটা জুড়েই থাকে অশ্লীল গান-বাজনা ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, ছবি তোলা, ভিডিওতে ছবি ধারণ করা ইত্যাদি। এ-ছাড়া এসব অনুষ্ঠানে বেগানা পুরুষেরা কনের গায়ে এবং নারীরা বরের গায়ে হলুদ দিয়ে থাকে। এরূপ অশ্লীল ও বিজাতীয় কালচার ইসলাম কখনো সমর্থন করতে পারে না। সুতরাং বিয়ের ক্ষেত্রে এ-জাতীয় বাহুল্য অনুষ্ঠান ও অপচয় বর্জন করে আমাদের আল্লাহর রাসূল ও সাহাবায়ে কিরামের সুন্নাত অনুসরণে করা উচিৎ।

এ-ছাড়াও আমাদের সমাজে আধুনিক সংস্কৃতির নামে এমন কতগুলো বিষয় পালন করা হয়ে থাকে, ইসলামের দৃষ্টিতে যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। মদ, জুয়া, লটারী, যৌতুক, নারীপূজা, কবর পূজা, কদমবুসী, সুদ-ঘুষ, কুলখানি, চেহলাম, গীবত, ১ মিনিট নিরবতা পালন, শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ, ভাস্কর্য নির্মাণ, জাতীয় সংসদ ও আদালতে মাথানত করা, এপ্রিলফুল দিবস পালন ইত্যাদি। ইসলামের দৃষ্টিতে উপরোক্ত বিষয়গুলো সংস্কৃতি নয়, বরং অপসংস্কৃতি। এগুলো আমাদের বর্জন করা উচিৎ।

তথ্যসূত্র

১. ২০০০ সালে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমদের রচিত ও পরিচালিত ‘সবুজ ছায়া’ নামক ধারাবাহিক নাটকের ‘৬ষ্ঠ পর্ব’ থেকে এ সংলাপটি নেয়া হয়েছে।
২. মহিউদ্দীন খান সম্পাদিত ‘মাসিক মদীনা’, আধুনিক সংস্কৃতি: একটি সমীক্ষা(প্রবন্ধ), ৩৯ বর্ষ, ৯ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০০৩, পৃ.২৪
৩. সাপ্তাহিক বিক্রম, ১০ বর্ষ, ৩০ সংখ্যা, ২২-২৮ জুলাই, ১৯৯৭
৪. আল কুরআন, সূরা আন নূর:৩০-৩১
৫. আল কুরআন, সূরা আন নূর: ১৯
৬. সহীহ বুখারী ও মুসলিম
৭. সুনান আবু দাউদ
৮. সুনান নাসাঈ
৯. জহুরী, অপসংস্কৃতির বিভীষিকা, দেওয়ান প্রকাশন, ঢাকা, ৩য় খ, ১ম সং, ২০০৩, পৃ-৫০
১০. মাসিক মদীনা, প্রগুক্ত, পৃ. ২২
১১. আরিফুল হক, প্রগুক্ত, পৃ. ২৩
১২. নোমান আহমদ, মাওলানা, ইসলামে খেলাধুলা ও চিত্ত বিনোদন, শিবলী প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০২, পৃ. ৫৩-৫৪
১৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৪
১৪. এস.এম.এ রাজ্জাক, বেহায়পনার সাংস্কৃতিক স্টাইল, খন্দকার প্রকাশনী, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃ.৪০-৪৩
১৫. আল কুরআন, সূরা আর রূম:২১
১৬. নোমান আহমদ, প্রাগুক্ত, পৃ.৫৮-৬১
১৭. সাম্ভলী, মুহাম্মদ বুরহানুদ্দীন, পারিবারিক সংকট নিরসনে ইসলাম (মাও. আবুল কাসেম মুহাম্মদ ছিফাতুল্লাহ অনুদিত), ইফাবা, ঢাকা, ১ম সং, ২০০৩, পৃ.৬৬।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

নিব

:উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তনের একটি শোভন ছড়াপত্র

বাঙলা

আফসার নিজাম সম্পাদিত : চিন্তাশীল পাঠকের মননশীল সৃজন

%d bloggers like this: