অন্তরঙ্গ আলোকে ঔপন্যাসিক জামেদ আলী

মাহমুদ হাফিজ

প্রশ্ন : আপনার জন্ম কত সালে, কোথায় এবং কবে থেকে লেখার অনুপ্রেরণা লাভ করেন?
উত্তর : আমার জন্ম ১৩৪৩ সালের ২৫ শে আষাঢ় মেহেরপুর জেলার আমঝুপী গ্রামে। সে সময় মেহেরপুর জেলা হিসেবে পরিচিত ছিল না। সেটা ছিল নদীয়া জেলার একটি মহকুমা শহর। আমাদের আসল বাড়ি ছিল নদীয়া জেলার করিমপুর থানার শিকারপুর গ্রামে। সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পর আমরা সপরিবারে ভারত ছেড়ে তদানিন্তন পাকিন্তানে চলে আসি।
লেখার অনুপ্রেরণা লাভের নিদির্ষ্ট মুহূর্তটি এখন মনে করা ভারি শক্ত। মনে পড়ে, আমাদের গ্রামের বািিটর উত্তরে ছিল খোলা একটি মাঠ। ছোট বেলায় দেখতাম সেই মাঠের ওপর দিগন্ত ছোয়া একখানি নীলাভ আকাশ হুমড়ি খেয়ে থাকত। নীচে দেখতাম সোনার পাতের মতো বিস্তৃত একটি চোখ জুড়ানো সরিষার ক্ষেত, তার ওপর উড়ে বেড়াত চঞ্চল মৌমাছি, উড়ে বেড়াত ডানায় ডানায় চিত্রল নকসী আঁকা হরেক রকম প্রজাপতি। ঐ সব দেখে আমার মনে তখন মুন্ধতার অন্ত থাকতো না। একরাজ্যের বিস্ময় ভরা চোখ নিয়ে সবে আমার পাঠশালে যাওয়া শুরু। যাওয়ার পথে প্রজাপতির চঞ্চল পাখার লুব্ধক আকর্ষণে ভুলেই যেতাম স্কুলের কথা। ওদের সাথেই মেতে উঠতাম খেলায়। আমার মনে পড়ে, যখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি, তখন একবার ওদেরই পাল্লায় পড়ে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি সেই কথাটি আমি বেমালুম ভুলে যাই। আর তাই জীবনে ঐ একটিবার আমি পরীক্ষায় ডাব্বা মারি। কিন্তু তাতে কি? ঐ আকাশ, জংলি ফুল, চঞ্চল প্রজাপতি আমার মনে তো চিরস্থায়ী দাগ কেটে যায়। অল্প কিছুদিন পরে আমার হাতে আসে শিশুতোষ একখানি বই(বইটির নাম আজ আর মনে নাই)। কি সুন্দর ঝলমলে সব ছবি। একটি ছবির বর্ণনা ছিল এ রকম: ছোট মজে যাওয়া একটি নদী। তার দুপাশের পানিতে ফুটে আছে টসটসে গোলাপী পদ্মফুল। পানির ওপর ভাসছে গাঢ় সবুজ গোল গোল পদ্ম পাতা। তীরে বসে আছে নাদুস নুদুস একটি টুকটুকে শিশু-হাতে তার ছিপ। সেই ছিপের একাংশে মস্ত বড় একটা ব্যাঙের মুখে। মাছও ধরছিল ছিপে কিন্তু সেটা আকাশে ্উঠেই ধরা পড়েছে উড়ন্ত এক চিলের থাবায়। ছবিটির নীচে লেখা আছে-
‘খোকন গেছে মাছ ধরতে ক্ষীর নদীর তীরে
ছিপ নিল তার কোলা ব্যাঙে, মাছ নিল তার চিলে।’
আজ মনে পড়ছে ঐ চিত্রটিই আমাকে অভিভূত করে। আর তখন থেকেই মনে একটা আগ্রহ জাগে ঐ রকম কিছু একটা লিখতে। সেইতো আজ গ্রামেরই ঘটনা সেটা।
প্রশ্ন : এ পর্যন্ত আপনার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা কয়টি? সেগুলো কি কি? আরও অপ্রকাশিত পাণ্ডলিপি তৈরী
আছে কি?
উত্তর : আমর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা চার। তার তিনটি উপন্যাস আর একটি ছোট গল্পের সংকলন। উপন্যাস
তিনটি ১. অরণ্যে অরুণোদয়, ২. লালশাড়ী, ৩. মুনীরা। ছোট গল্প-গোধুলিতে।
একটি উপন্যাসের পাণ্ডলিপি তৈরী আছে। বই আকারে বেরোয়নি। তবে অগ্রগথিক এ মেঘলামতীর দেশ নামে ধারাবাহিক ছাপা হয়েছিল। প্রকাশিত বেশ কিছু ছোট গল্প রয়েছে। সংকলন করলে গোটা দুই বই হতে পারে।
গোটা দুই উপন্যাসের পাণ্ডলিপি হাতে আছে। একটি রঙ বলদায় নামে একখানি পত্রিকায় ছাপার ব্যাপারে কথাবার্তা হয়েছে। অন্যটি অসম্পূর্ণ, সম্পূর্ণ হলে সে সম্পর্কে বলা যাবে।
প্রশ্ন : আপনার লেখায় ইসলামী মূল্যবোধ ও চেতনা থাকায় অনেকে আপনাকে সা¤প্রদায়িক বা প্রতিক্রিয়াশীল বলে থাকেন। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?
উত্তর : দেখুন, এ ব্যাপারে কোন একটা সদুত্তর দেয়া আমার পক্ষে ভারি কঠিন কাজ। আমি একজন লেখক, একটি বিশেষ সমাজে আমার জন্ম। পৃথিবীর আলো বাতাসে চোঁখ মেলবার পরে আমার চার পাশে আমি একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল দেখতে পেয়েছি। আমার লেখা যদি সে পরিমন্ডলে কথা শুনবার আশা সাংস্কৃতিক উজ্জীবনের আকাঙ্খা থাকে, তার জীবনে আশা সাহিত্য লালন-প্রত্যাসা থাকে, আর তা যদি সা¤প্রদায়িকতা হয় তবে আমি বলব পৃথিবীর কোন মহৎ সাহিত্য এই দোষ থেকে মুক্ত নয়। দুনিয়ার কোন সাহিত্যিক তার আদর্শিক চেতনাকে বাদ দিয়ে নিছক ইউটোপিয়া-ভিত্তিক সাহিত্য রচনা করে, সে সাহিত্যকে মহৎ, শিল্পীত এবং কালোত্তীর্ণ সাহিত্যে পরিণত করতে পেরেছেন? তবে আমি বলব মহৎ সাহিত্যের জন্ম হয় লোকের মজ্জাগত আদর্শ বোধের শিল্পীত উন্মোচন থেকে। আমার লেখায় সেই আদর্শ বোধের উস্থাপনার ব্যাপারে অক্ষম প্রচেষ্টা রয়েছে। তাঁকে সা¤প্রদায়িকতা বা প্রতিক্রিয়াশীলতা বলে যিনি গাল মন্দ করতে চান, তার সঙ্গে বিতর্ক করে কী লাভ? তবে আমি বলি, এই অসা¤প্রদায়ীক, অপ্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তিকে জিজ্ঞেসা করুন, আমাদের প্রতিবেশী দেশের হিন্দু ভাইদের সাহিত্য, তাদের জীবনাচরণ, ধর্ম বোধ, সংস্কৃতির রুপ চর্চা তার কাছে কেমন মনে হয়? তাদের সাহিত্যে আচার-আচরনের এই যে উজ্জীবন প্রচেষ্টা, এই যে অবক্ষয়ের সংস্কার প্রচেষ্টার আহবান, তা দেখে তো তিনি উন্নাসিক হন না। কেন?
আমার মনে আছে, আমি একবার একটি ছোট গল্প লিখেছিলাম- সে গল্পের নায়ক এক মছিবতে পড়েছে, একটি রেশন ডিলারীর কারবার নিয়ে ঘুষ না দেওয়ার কারণে তাকে নাকানি চোবানি খেয়ে অবশেষে কোন কূল কিনারা করতে না পেরে, সে ঘুষ দেওয়ারই মনস্থ করে। কিন্তু একসময় নামাজে বসে তাঁর আদর্শ সচেতন মন তাঁকে বিবেকের কষাঘাতে জর্জরিত করে ফেলে। তার ঘুষ দেওয়া আর হয়না। এই গল্পটি পড়ে আমার একজন বিদগ্ধ সাহিত্যিক বন্ধু বললেন, তোমার গল্পটি ভালই হয়েছে। কেবল ঐ ‘নামাজ’ শব্দটি বাদ দিলেই একটি উত্তীর্ন গল্প হতে পারত।
আমি বলব এটা হীনমন্যতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, তারাশংকর থেকে শুরু করে, হাল জামানার শীর্ষেন্দু-সুনিলের সাহিত্য পাঠের সময় মন্দির, মন্ডপ, পুজা- পারবন, দেব-দেবী ইত্যাকার শব্দের ছড়াছড়ি দেখেও যাদের শ্রবণেদ্রিয় কোন রুপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনা, তারাই আবার মুসলমান লেখকের নামাজ, রোজা, মসজিদ, যায়নামাজ প্রভৃতি দু-একটি শব্দ শুনে কানে ব্যাথা বোধ করেন। আমার মনে হয় এটা ঐ শব্দগুলির দোষ নয়, কানেরই দোষ। দীর্ঘদিন সাহিত্য সংস্কৃৃতির ব্যাপারে যারা উঞ্ছবৃত্তির উপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে সা¤প্রদায়িকতার কথা বেমালুম ভুলে গেছেন, তাদের আত্মসচেতনাই গেছে হারিয়ে। সেই সব মযূর পুচ্ছধারী কাকদের কটু সম্ভাষণ না পেলে কিভাবে বুঝব যে আমি ঠিক পথে আছি?
আর সা¤প্রদায়িকতার কথা বলছেন? সা¤প্রদায়িক কাকে বলে? বিশ্বের তাবৎ মানুষই তো আমার জ্ঞাতি। সকলের অরিজিন হচ্ছেন আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)। আমাদের সবারই স্রষ্টা এক এবং অদ্বিতীয় আল্লাহ। সমগ্র আদম সন্তানকে তো সেই এক আল্লাহর বিধান মেনে জীবন যাপন করা উচিত। বিভ্রান্তির কারণে সে অখন্ড মানব মন্ডলি আজ খন্ডে খন্ডে বিভক্ত হয়ে গেছে। তারা খোদার বিধি বিধান অমান্য করার কারনে আধ্যাত্মিক এবং বৈষিক ভাবে রোগ জর্জরিত হয়ে পড়েছে। এক জন রুগ্ন ভাই এর স্বাস্থ্যের জন্য কেউ যদি মুখে ওষুধ তুলে দিতে চায়, আর রুগ্ন মুখে সেই ওষুধটিকে যদি তিক্ত মনে হয়, তাহলেই কি যে ভাইটি স্বত:স্ফুর্ত হয়ে পীড়িত ভাই এর কল্যান কামনা করছে তাকে শক্র ভেবে বসতে হবে? সা¤প্রদায়িক তাকেই বলা যায় যে বলে মাই নেশন রাইট অর রঙ। তার ভালটা তো ভালই, মন্দটাও ভাল বলে সে অন্যের ঘাড়ে চাপতে চায়। তার হিংস্র নেকড়ে সমাজের অধিকারটাই এক মাত্র অধিকার বলে স্বীকৃত হতে হবে, অন্যেরটা নয়। আর এটা একটি খোদানুগত নিষ্ঠাবান জনগোষ্ঠির আচরনের সম্পুর্ন বিপরীত। আমার লেখার কি কোথাও অন্য স¤প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানোর মত ইঙ্গিত দেখা যায়? হতে পারে লেখার কোথাও কোথাও মানব গোষ্টির কোন মন্দ আচরনের সমালোচনা এসেছে, সেখানে তো হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান বলে কোন বিদ্বেষ প্রসুত বিভাগ করা হয়নি। সবারই দোষ ত্র“টি একই নিরিখে পরখ করা হয়েছে। আমার তো স্পষ্ট করে বলা উচিৎ আমি মানুষের এক মাত্র বিশ্ব জনীন আদর্শের অনুসারি। সমগ্র মানব মন্ডলির বেদনায় আমার প্রাণ কাঁদে। আমাকে কেন সা¤প্রদায়ীক বলা হবে?

প্রশ্ন ঃ অনেকে বলেন আপনি একজন নতুন ধারার কথা শিল্পী। এ সম্পর্কে আপনার অনুভুতি কি রকম?
উত্তর ঃ আমাকে কথা শিল্পী বলে আখ্যায়িত করার ব্যাপারে আমার একটি বিনীত আপত্তি আছে। আমার মনে হয় কথা শিল্পী মস্ত বড় একটি লকব। আমার মতন দু’কলম লিখিয়ের জন্য এটি বেশি রকমের বলা।
বলতে হয় এ মনিহার আমার নাহি সাজে। তার উপর আবার নতুন ধারা। সেটিতো আরও অনেক বড় ব্যাপার স্যাপার। কথা শিল্পীর এই ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদ তৈরী হচ্ছে আমাদের দেশ, আমাদের মাতৃভাষায়। সেই প্রাসাদ নির্মানে নানা দিক থেকে নানা রকম সাহিত্য সম্ভার এসে তাকে সৌন্দর্য মন্ডিত করছে নিত্য দিন। আমাকে সেখানে ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র একজন জোগালে হিসেবে যদি ধরতে চান তো সেখানে আমি আছি। খুব ছোট কাজ নিয়ে বড় রকমের হাক ডাক আমার ভালো লাগে না। সুতরাং এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি বড্ড বিপদে পড়ি। এটি আমার বিনয় নয় বরং নিছক সত্য ভাষণ। তবে আপনার প্রশ্নের জবাবে এতোটুকু আমি বলতে পারি, সাহিত্য মানব সমাজের দর্পণ। সাহিত্যে সামাজিক বিষয়ের সাথে মানুষের আশা-আকাঙ্খা, দুঃখ-বেদনার প্রতিচ্ছবিও ফুটে উঠতে পারে। আর তা মানুষের জন্য কল্যাণ ও অকল্যাণ উভয়েরই বাহন হতে পারে। যে সাহিত্য পড়ে মানুষ নিছক স্ফুর্তি লাভ করে এবং তা মানুষের জন্য অকল্যাণের দ্বার উন্মোচন করে দেয়, আমি তার পক্ষপাতি নই। আমি শুধু মাত্র কল্যাণের অভিসারী। ইউরোপিয় আধুনিকতার জোয়ারে আমাদের বর্তমান সাহিত্যের প্রায় সব টুকুই প্রভাবান্নিত হয়ে পড়েছে। সাহিত্য রুচির পরিবর্তে কুরুচি, শ্লীলতার পরিবর্তে অশ্লীলতা তুফানের আকার ধারণ করেছে। আমি বলব, এটা আমাদের কেন, কোন জাতির জন্য কল্যাণকর নয় আমি এধরনের সাহিত্যের সমর্থক নই।
দ্বিতীয় কথা এই যে, আমাদের কথাসাহিত্যে যা কিছু ঐতিহ্য রয়েছে তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশে আমাদের মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ্য গোচর হয়। এ রকম ক্ষেত্রে আমি কিন্তু একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করি। আমারটিকে আপনি মুসলিম সংস্কৃতির পরিবর্তে ইসলামী সংস্কৃতির ধারক বলতে পারেন। আমার মতে মুসলিম সংস্কৃতি এবং ইসলামী সংস্কৃতির মধ্যে জবর একটা পার্থক্য আছে। একজন নামে মাত্র মুসলমানের কার্যকলাপে ইসলামী কর্মকান্ডের অনুশীলন প্রায় অনুপস্থিত থাকে-কার্যতঃ সে ব্যাক্তি ইসলামকে না মেনেই মুসলিম সমাজের একজন হয়ে যে-সংস্কৃতির ধারক বাহক হয়ে দাড়ান, তাকে আমি বলব মুসলিম সংস্কৃতি। আর ইসলামী সংস্কৃতি হচ্ছে সেটি যাতে ইসলামের অনুমোদন আছে। যা ইসলামী জীবন ব্যবস্থার অর্ন্তগত, কেবল মাত্র নিষ্ঠাবান ব্যক্তি ছাড়া এ সংস্কৃতি ধারক বাহক হওয়া যায় না। এই দ্বিতীয় ধারাটি আমার পছন্দ। আমার লেখার মধ্যে তারই প্রতিফলন,তারই উজ্জীবন এবং লালনের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা আছে এবং এখানে আমাদের অতীত রচনাবলীর সাথে অমিল রয়েছে। এটাকে আপনি একটি নতুন ধারা বলবেন কি?

প্রশ্ন ঃ কথা সাহিত্যে বাংগালী মুসলমানদের পদচারণা অত্যন্ত ক্ষীণ এ ক্ষেত্রে আপনার সফলতা এসেছে কতটুকু?
উত্তর ঃ আপনি বলেছেন, কথা সাহিত্যে বাঙালী মুসলমানদের পদচারণা অত্যন্ত ক্ষীণ। আসলে তাই কি? বাংলা ভাষার সা¤প্রতিক কালে যারা কথা সাহিত্যের ওপর কাজ করছেন, আমি তো দেখেছি, তারা সংখ্যায় অত্যল্প নন, এবং তাদের সৃষ্টিও নিতান্ত অনুল্লেখযোগ্য নয়। উভয় বাংলার শক্তিশালী মুসলিম কথাশিল্পী রয়েছেন যাদের কাজ দেখে রীতিমত র্গবিত হওয়া চলে। কিন্তু একটি অসম্পুর্ণতা অবশ্যি লক্ষ যোগ্য, এবং তা হচ্ছে এই যে, তাঁদের নির্মিত সাহিত্যে তাঁদের স্বদেশ ও স্বজাতির বিকারটারই চিত্রায়ন দেখা যায়, উজ্জীবনের সন্ধান লাভ দুষ্কর। মুসলমান হিসেবে যদি আপনি সাহিত্য চর্চা করেন, তাহলে আপনার রচনায় বাঙালী মুসলমানের চিত্ত-চেতনার উদ্যোগ দেখা যাবেনা কেন? কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। তার ফলে হয়েছে কি জানেন, ঐ সাহিত্যের দ্বারা প্রভাবিত মানুষদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য প্রায়ই অবলুপ্ত হয়ে গেছে। আপনি ঢাকার রাজপথে হাটুন আর তার পথচারিদের লক্ষ্য করুন দেখবেন ওরা হিন্দু না মুসলমান বৌদ্ধ না খ্রিষ্টান বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই চিনে উঠতে পারবেন না। যারা নিজেদের হিন্দু-মুসলমান বৌদ্ধ-খৃষ্টান কিছুই মনে করেন না তাদের জন্য আলাদা, যারা মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিতে অপছন্দ করেন না, তাদেরও চোখে দেখে আপনি চিনে উঠতে পারবেন না। সাহিত্যের বেলায়ও তাই। আমাদের দেশের একজন সাহিত্যিকের সৃষ্ট নায়ক তার প্রতি বেশী দেশের একজন সাহিত্যিকের সৃষ্ট নায়কের চেহারায়, কাজে কামে, শিষ্টাচারে, মিথ্যাচারে, এমনকি আহারে-বিহারেও কোন পার্থক্য পাবেন না। পার্থক্য পাবেন শুধু নামে। একজনের নাম হয়ত আবদুল্লাহ আর একজনের নাম দেবদাস।
আমার বক্তব্য হচ্ছে, কথা সাহিত্যে আমাদের পদচারণা তুলনামুলক কম, এ ব্যাপারে আমি আপনার সাথে সম্পুর্ণ দ্বিমত পোষণ করছিনা। তার কারণও তো সুস্পষ্ট। সাহিত্যের এই শাখাটিতে সাহিত্যিকদের আবির্ভাব বেশ দেরীতে, মুসলমানদের আবির্ভাব আরো দেরীতে। কাজেই এ ব্যবধান শতবর্ষী বছরের ব্যবধানই তো পরিলক্ষিত হয়েছে । অধুনা সেই ব্যবধান ঘুচছে বটে তবে বৈশিষ্ট্যের দিক বিচারে পার্থক্যটা প্রায় অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পরানুকরণের দুর্বার স্পৃহা স্বকীয়তার বিকাশে ভয়ানক বাধার সৃষ্টি করছে। তবে আমার বিশ্বাস এটা দীর্ঘদিন থাকবে না। সৎ জীবনবাদী সাহিত্যে একটা শক্তিধর অভ্যুথ্থানের আমি পুর্বাভাস লক্ষ করছি তখন ঐ সব পরজীবি লক্ষহীন শুন্য গর্ভ সাহিত্যের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। সেই শুভদিন সামনে আসছে।
প্রশ্ন ঃ একটা বিশেষ শ্রেণীর ভিতর পাঠক গ্রাহ্যতা লাভ করেছেন আপনি অন্য কোথাও পারেননি কথাটা
কতটুকু সত্য?
উত্তর ঃ একটা বিশেষ শ্রেণীর মধ্যেই আমার পাঠকদের দেখা যাচ্ছে বলে আমারও কিছুটা ধারনা ছিল। তাঁর অবশ্যই কারণও আছে। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে কোনদিনই উচ্চ কন্ঠ নই। সাহিত্য কর্মের অভিলাষ আমার মনে শৈশবে অঙকুরিত হলেও আপনি দেখতে পাচ্ছেন অতি স¤প্রতি হাটি হাটি পা পা করে এই অঙ্গনে পদার্পন করছি। আগে তো মফস্বলে থাকতাম সেখানে খেয়াল হলেই একটা কিছু লিখে ফেলতাম। তা আবার কষ্ট করে কপি করে পত্র পত্রিকায় পাঠাতাম। কোন কোন পত্র পত্রিকার সম্পাদক দ্রুত সেটি প্রকাশ করে আমাকে উৎসাহিত করতেন । আমিও সংগে সংগে আবার একটা লেখা পাঠাতাম। দেখা গেছে পরবর্তীকালে সে পত্রিকা একেবারে চুপ। আর ঐ নিরবতা দেখে আমার মেজাজ বিগড়ে যেত। সেখানে আরও লেখা না পাঠানের ব্যাপারে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে বসতাম। আমার তখন জানা ছিল না লেখা ভাল হলেও একটি পত্রিকায় পর পর সংখ্যাগুলোতে একজন লেখকের লেখা প্রকাশ করা হয় না। এই রকম করে সেই সময় আজাদ, ইত্তেহাদ, পাকিস্থানী খবর, পয়গাম প্রভৃতি পত্রিকার সাথে আমার ছাড়াছড়ি হয়ে যায়। অন্যান্য অনেক পত্র পত্রিকা ছিল যাদের পরিচিতির গন্ডির বাইরে নতুন লেখকদের লেখা এক চোটে ছাপানোর রেওয়াজই ছিল না। তাদের কাছে লেখা পাঠিয়ে আবার সেই লেখাটি হারিয়ে লেখার প্রতি আমার অনিহা সৃষ্টি হয়ে যেত। আমার মত আলসে লেখকের উৎসাহ শেষ পর্যন্ত মিইয়ে পড়ত। কিন্তু মফস্বল ছেড়ে শহরে আসবার পর ব্যাপারটা অন্য রকম হয়ে যায়। দীর্ঘ দিন পর যখন আবার নতুন করে লিখতে শুরু করি এবং পত্র পত্রিকায় যখন লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করে তখন এ সব পত্রিকায় সাংবাদিকগণ আমাকে চিনে ফেললেন, তারা আমাকে ভালবেসে অনেক সময় কাটাকুটা পাঠোদ্ধার অসম্ভব পান্ডুলিপি তো আমার কাছ থেকে প্রায় কেড়েই নিতে শুরু করেন। ফলে অন্যান্য পত্র পত্রিকার জানা শোনা করা সুযোগও কমে যায়। আর তার ফলে একটি বিশেষ শ্রেণীর ভিতর আমার পাঠকদের পাওয়া যাচ্ছে। কিনতু তার অর্থ এটা নয় যে, অন্যান্য পাঠক আমার বই পড়ছেন না, কিংবা পড়ে রসাস্বাদন করতে পারছেন না। বরং আমি তো দেখছি, সর্ব স্তরের পাঠকই আমার বই গুলো পড়ছেন। সব বই সব সময় সবারই ভাল লাগবে এমনতো আশা করা যায় না। আমার বইয়ের বিক্রয় খাতটি দেখে মনে হচ্ছে শুধু মাত্র এক শ্রেণীর পাঠকই যদি বই গুলো গ্রহণ করতেন তাবে তার বিক্রয়টা আরোও মন্থর হতো। কিন্তু কার্য ক্ষেত্রে তো বিপরীতটাই দেখা যাচ্ছে।
প্রশ্ন ঃ সাহিত্যের কোন মাধ্যম পাঠকের মনকে বেশী স্পর্শ করতে পারে?
উত্তর ঃ সেটা কিন্তু পাঠকের মন মানসিকতার উপর নির্ভর করে। কিছু কিছু পাঠক আছেন যারা গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ
জাতীয় জিনিস পড়তে ভালবাসেন, আবার কিছু পাঠক আছেন যারা গল্প উপন্যাস পছন্দ করেন। আর এক শ্রেণীর পাঠক আছেন যারা কবিতা নিয়েই ডুবে থাকতে ভালবাসেন। এছাড়াও আর একটি শ্রেণীর পাঠক আছেন যারা সাহিত্যের সব মাধ্যম গুলির প্রতিই অনুরক্ত। কোন মাধ্যম বেশী স্পর্শ করে এ প্রশ্নের দ্বারা যদি আপনি বলতে চান যে, কোন ধরনের রচনার পাঠক সংখ্যা বেশী, তাহলে আমি বলব গল্প উপন্যাসের পাঠক সংখ্যা বেশী। কারণ [আমার ধারনা অনুযায়ী] বর্তমান সময়ে কাব্য পাঠক এবং তার রসাস্বাদন সাধারণ পাঠকের কাছে আর চাট্টিখানি ব্যাপার নাই। অস্পষ্টতা এবং দুর্বোধ্যতা কবি ও তার পাঠকদের মাঝে ব্যবধানের মস্ত বড় দেওয়াল খাড়া করে দিয়েছে। আর প্রবন্ধ তো চিরদিনই বিদগ্ধ জনের বিচরণ ক্ষেত্র। এখন বাকী রইল গল্প উপন্যাস। এই মাধ্যম দুটি সাধারণ পাঠকের কাছে এখনও দুর্বোধ্য হয়ে ওঠেনি। তাই তাদের আবেদন ও নিঃশেষিত হয়ে যাইনি। আমার তো মনে হয়, কথা সাহিত্যের এই দুইটি মাধ্যমেই তাদের সহজবোধ্যতা ও হৃদয় গৃহীতার কারণে বেশীর ভাগ পাঠকের মন স্পর্শ করতে পারে।

প্রশ্ন ঃ আপনার লেখায় গ্রামীণ দৃশ্যাবলীর পটভুমি একের পর এক আসতে থাকে। গ্রাম জীবনের ঐ প্রেক্ষাপটের বাস্তব অভিজ্ঞতা কী আপনার আছে? না ড্রয়িং রুমে বসে ঐ সব দৃশ্যের বর্ণনা কল্পনায় আকেন?
উত্তর ঃ আমি গ্রামেরই ছেলে। আপনার এ প্রশ্ন শুনবার আগে আপনি যখন আমার সাহিত্যের উন্মেষ কালের কথা জিজ্ঞেসা করেছিলেন, তাতে বোধ করি আপনার মনে করার কোন কারণ থাকে না যে, আমি শুধু ড্রয়িং রুমে কল্পনায় ভর করে ঐ সব লেখা লেখি করি। বরং আমারে মনে হয় কি জানেন? মনে হয় পল্লী প্রকৃতির এবং তার নৈর্সগিক সৌন্দর্যে যে সঞ্চয় আমার বুকের মধ্যে জমা হয়ে আছে, তা প্রকাশের শক্তি যদি আমার থাকতো, কত যে ভাল হত! আমার দশা ঠিক কবির ঐ কাতরানীর মত, যেমন তিনি বলেছিলেন ‘পঙ্গু আমি আরব সাগর লঙ্ঘি কেমন করে?’
প্রশ্ন ঃ কোন ধরনের সাহিত্য আপনাকে আকর্ষণ করে বেশী?
উত্তর ঃ আমার ইচ্ছা ছিল সাহিত্যের সব শাখাতেই আমি সাধ্যমত কাজ করব। কিন্তু সব ইচ্ছাই তো আর মানুষের পূর্ণ হয় না। পরে তো এক সময় ধারনা হয়েছিল, আমার দ্বারা কিছুই হল না। কিন্তু তারপরও আল্লাহর মেহেরবানীতে কথা সাহিত্যের এই শাখাটিতে আজ কাল যৎ সামান্য কাজের সুযোগ আমার হচ্ছে। তাই এটি নিয়েই আমি ভাবনা চিন্তা করছি বেশী বেশী। কাজেই আকর্ষণও বর্তমানে আমার কথা সাহিত্যে প্রতিই সবচাইতে বেশী।
প্রশ্ন ঃ আপনি পেশাগতভাবে একজন হোমিও ডাক্তার। এই জটিল পেশা আপনার লেখার জন্য কতটুকু সহায়ক?
উত্তর ঃ দেখুন, আমার মতে লেখা ছাড়া আর কোন পেশাই লেখকের জন্য সহায়ক নয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে লেখকরা মুক্ত বিহঙ্গের মতন স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারেন। তাঁদের চিন্তা চেতনা স্বাধীন এবং স্বত:স্ফুর্তভাবে গড়ে ওঠে। আনন্দের জন্য লিখবেন এবং পেটের ভাতের জন্য অন্য একটা পেশার কাছে আত্বসমর্úন করবেন। এমন দুর্ভাগ্য আমাদের এই দেশ ছাড়া আর কোথাও দেখা যাই কি? আমার পেশা যে আমার লেখার জন্য সহায়ক তা আমার মনে হয় না। আমি আর কিছু না করে যদি কেবল মাত্র লেখা লেখি নিয়ে থাকতে পারতাম, তাহলে আমি বিশ্বাস করি আমার লেখা লেখির ব্যাপারে দক্ষতা আরও বাড়ত। অন্যভাবেও আমার অভিজ্ঞতা জন্মাত সেই অভিজ্ঞতার পুজি থেকে হয়তো আরও কোন সুন্দর চিত্রাকর্ষক পংকজ ফুটতে পারতো। আমার পেশা যে আমার চিকিৎসার ব্যাপদেশে গল্প উপন্যাস লেখার কিছু কিছু রসদ যোগায়নি তা নয়। আমার ‘বুদ্ধুদ’ এবং ‘কালোদাগ’ গল্প দুটির প্রয়াস পাঠক কেবল তাদের কাছেই এই প্রশ্নটির জবাব পাওয়া যেতে পারে অন্য কোথাও নয়।
প্রশ্ন ঃ পারিবারিক ব্যাপারে লেখকরা প্রায় দায়িত্বহীন উদাসীন এই প্রচলিত কথার পরিপ্রেক্ষিতে আপনার
বক্তব্য কি? আপনার গৃহিনী আপনার প্রসঙ্গে কী ধারনা পোষণ করেন।
উত্তর ঃ দায়িত্বহীন বা উদাসীন বলেতো আমার মনে হয় না। মানুষের সাধ্যের তো একটা সীমা আছে। লেখকরাও সেই সাধ্যের সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে বাধ্য। কিন্তু ব্যাপার হয় কী, সাহিত্য সাধনা এমনই একটি সাধনা যা লেখকের কাছে অখন্ড মানসিক নিবিষ্ঠতার দাবি করে এবং তার পরিবারের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে। আর তাই বোধ করি উল্লেখযোগ্য ব্যাতিক্রম ছাড়া, মহান ব্যাক্তিদের উত্তরসূরীদের মধ্যেও ঐ রকম পর্বত প্রমান প্রতিভার আবির্ভাব হয় না। গৃহিনীর ধারনাতো ভাল বলেই মনে হয়। কিন্তু তার পরেও তো কথা থেকে যায়। জানেন না, সেই যে একজন সংস্কৃত মহাপন্ডিত ঝামেলায় পড়ে বেহাল হয়ে বলেছিলেন স্ত্রীয়াশ্বচরিত্রম, দেবন জানতি কুতঃ মনুষ্যা?
প্রশ্ন ঃ আপনার সন্তান সন্ততির মধ্যে কেউ কি আপনার লেখক সত্তার উত্তরাধিকার পাবে? পেলে কে?
উত্তর ঃ আমার মেঝ ছেলেটি আমার লেখা টেখার ব্যাপারে বড় আগ্রহী দেখছি। এখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে।
আমার প্রায় লেখার খোজ খবর নেয়। শুনি বই টই গুলো না কী সে পড়ে শেষ করেছে এরই মধ্যে।
প্রশ্ন ঃ আপনার লেখা আপনার পরিবারের কেউ পড়ে কি?
উত্তর ঃ তাতো পড়েই শুনি । আমার দুটি মেয়ে এ ব্যাপারে আগ্রহী শুনেছি এক একটা বই তারা দুই তিনবার
করে শেষ করেছে। খুব নাকী ভাল লাগে। বাপের লেখা বলেই নাকি, কে জানে?
প্রশ্ন ঃ লেখার সময় পাঠকের কথা কতটুকু ভাবেন?
উত্তর ঃ পাঠকের একমাত্র পাঠকের কথাইতো ভাবি। পাঠকের কথা না ভাবলে তো সর্বনাশ। পাঠকের গ্রাহ্যতার
উপরইতো লেখকের লেখার ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল। সুতরাং তা না ভাবলে কি চলে? আমি বরং একটু বেশীই ভাবি, বরং লেখার সময় শুধু একদল পাঠকই নয়, তাদের রুচি অরুচি, মানসিক যোগ্যতা, সদাসতের একটা মানদন্ড ঠিক করি, তারপর তাদের সামনে রেখে আমি লেখার কাজ চালিয়ে যাই। অবশ্য তা সব সময় পারি না। যখন পারি তখনি কাজটা ভাল হয়। আর এই কারণেই কোন সাহিত্য সভায় সুযোগ পেলে আমি নতুন লেখা বিজ্ঞ সদস্যদেরকে পড়ে শুনাই। তাদের আলোচনা শুনি এবং সে সবের যথেষ্ট গুরুত্ব দিই। তবে এও কখন ঘটে যে, নিম্নমানের আলোচক যদি অর্বাচিনতার কারণে ভুল মন্তব্য করেন তবে আমি ঐসব আলোচকের আলোচনায় মোটেই কান দিই না।
প্রশ্ন ঃ বিশ্বের কোন কোন লেখক আপনার প্রিয় কথা শিল্পী।
উত্তর ঃ এই ব্যাপারে আমার একটু রিজার্ভেশন আছে। বিশ্বের মহান লেখকদের পড়ে আমি কতটুকুই বা
বুঝতে পারি যে, একজনকে প্রিয় ভাবা আর অন্য জনকে অপ্রিয়? একবার আমি একজন বন্ধুকে বিনয়ের সাথে বলেছিলাম, আমি ভাই বিশ্ব সাহিত্য পড়ি নাই। তিনি উৎসাহ বশে আমার একটি বই আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, লোকটির পড়া শুনাই নাই তো লিখবে কি। সেটাতো বরং সত্যের কাছাকাছি বলে মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু যথাসাধ্য পড়ার কথা বলতে গেলে কেউ যদি আবার বিশ্ব সাহিত্যে দিগগজ ভেবে বসেন সেটা তো ভাল কথা নয়। ধ্র“পদ সাহিত্যিকদের মধ্যে মার্কিন মুলুকের আর্নেস্ট হেমিংওয়ের আমি গুণমুুগ্ধ। ব্রিটিস সাহিত্যিকদের মধ্যে জেন অস্টিন [এক যুগে তাকে পড়েছি] টমাস হাডি, গলস ওয়ার্দির রচনা আমার পছন্দ। ফরাসি ও রুশ ভাষা আমার জানা নেই। ফরাসি সাহিত্যে ছোট গল্পের দিক পাল মোপাসা আমাকে আলোড়িত করেছেন। রুশ চিরায়ত সাহিত্যিক নিকলাই গোগল, লেভ তলস্তয়কে আমি লোভাতুর হয়ে পড়তে গিয়েছি, কিন্তু গোগলের ইংরাজী অনুবাদ ভাল লাগলেই সাহিত্য বলতে কি মহান তলস্তয়ের স্বাদ গ্রহণে আমি অপারগ হয়েছি। আমার মনে হয় বাংলা তর্জমা তার জন্য দায়ী। বর্তমানে আমি রুশ সাহিত্যের চিরায়ত ও আধুনিক ছোট গল্প নিয়ে পড়াশুনা করছি। মিখাইল শলোকভ,সের্গেই আন্তোলভ, ইউরি নাগিবিন, ভালেরি ও সিপভ এরা আমার কাছে ভাল লাগছেন।
প্রশ্ন ঃ পারিবারিক পরিবেশ সাহিত্য চর্চার জন্য কতটুকু অনুকুল?
উত্তর ঃ আমার তো সাধারণ মধ্য বিত্তের সংসার। এখানে সাহিত্য চর্চা অনেকটা বিলাসির মতোন। সমস্ত কিছু
উপেক্ষা করেও মানুষ কখনো কখনো কোন কোন বিলাসির কাছে আত্বসমর্পন করে বসে। ঐ রকম বিলাস আমার আর একটি আছে। তাকে জন্মত আমার দুজন রোগ দেখেই। আপনি যদি একটু খেয়াল করেন তবে আমার মুনিরা উপন্যাসের কোন কোন খন্ড চিত্রে আমার পেশার এক এক ঝলক প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবেন। আর এটা হওয়া তো খুবই স্বাভাবিক।
প্রশ্ন ঃ কি কি বিষয় থাকলে একটা উত্তীর্ণ গল্প হয়?
উত্তর ঃ দুই আর দুইয়ে যেমন চার হয় একটি গল্পের উত্তীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে সে রকম কোন বৈজ্ঞানিক কলা
কৌশল ও নিয়মের আমি সমর্থক নই। গল্প বলুন আর উপন্যাসই বলুন সব কিছুই তো আমাদের জীবনের ব্যাখ্যা। জীবনের জটিলতা যেমন বাড়বে তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ধারাও তেমনি পালটে যাবে। আর তার ফলেই গল্পের আঙ্গিক, উপস্থাপনা প্রনালী, ভাষা শৈলী, জীবনের গভীর তম প্রদেশে প্রবেশের পদ্ধতি সবই বদলে যাচ্ছে। তা হলে কি কি জিনিসের নাম করব, যা দিয়ে আপনি একটি উত্তীর্ণ গল্পকে চিহ্নিত করার মানদন্ড তৈরী করবেন? তবে এটা ঠিক যে একটি গল্পকে পাঠক মনে নাড়া দেওয়ার মত শক্তি অর্জন করতেই হবে। উত্তীর্ণ গল্প সেটিই হওয়া উচিৎ যা পাঠককে না পড়িয়ে ছাড়ে না। তার সাসপেন্স এবং আকর্ষণে আকৃষ্ট হয়ে পাঠক সামনের দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য হয়। গল্পটি শেষ হলে নতুন অভিজ্ঞতা ও আস্বাবাদে পাঠক মন আপ্লুত হয়ে ওঠে। এমন একটি গল্পকেই উর্ত্তীণ গল্প বলে মনে করি। আমার মতে একজন কথাশিল্পীর শিল্প কর্মের প্রতিটি পংক্তিতেই এক একটি শিল্প কলা ফুটে ওঠা উচিত। তবেই তা রসিক পাঠকের মনোরঞ্জন করবে, এবং তাকে আবিষ্ট করে রাখবে। যে রচনার প্রতিটি লাইনে দুরে থাক, প্রতিটি পৃষ্ঠাতেই পাঠক শিল্পে চমৎকারিত্ব খুজে না পান, তেমন রচনা নিঃসন্দেহে ব্যর্থ, এ ধরনের শিল্প কর্ম স্রেফ পন্ডশ্রম ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রশ্ন ঃ আপনার লেখার ভবিষৎ পরিকল্পনা জানাবেন কি?
উত্তর ঃ ভবিষৎ পরিকল্পনার না জানানোই ভাল। কারণ, চেয়েছিলাম হতে আমি মস্ত বড় কবি শেষে দেখি উলট
পালট হয়ে গেল সবি।
তবে যদি নাছোড়বান্দা হন তো বলতেই হয়, ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা উত্তর পটভুমির উপর একটি বাস্তব ভিত্তিক বড় ধরনের উপন্যাস লেখার ইচ্ছা আমার আছে। কাজটি আমি শুরুও করেছি। দোওয়া করবেন আল্লাহপাক যেন আমাকে সাহায্য করেন।
প্রশ্ন ঃ আপনি ইসলামী আন্দোলনরেই একজন সহযাত্রী কিন্তু আন্দোলন এবং সাহিত্য চর্চা কি সমানভাবে চালানো সম্ভব। দুটির সমন্বয় কিভাবে করেছেন?
উত্তর ঃ কেন নয়? আমার সাহিত্য চর্চা তো সেই উদ্দেশ্যই নিবেদিত আমি যখন এই মহান কাফেলায় শরীক হই, তখন আমার হাতে এক গাদা পান্ডুলিপি। কিন্তু এই আন্দোলনের স্বার্থেই সেগুলোকে আমি পরিত্যাগ করি। প্রায় বার বছর পরে যখন আমি জানতে পারি সাহিত্য চর্চা তো বিপরিথ ধর্মী নয় বরং সহায়ক, তখন আবার আমি কলম তুলে নিই। যে সত্যকে আমি জেনেছি তার উজ্জ্বীবনের আকাঙ্খাতেই তো আমার এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। সুতরাং বিষয় ভিত্তিক সময়ের কথা যদি তোলেন, তাহলে আমি বলবে তার জন্যে আমার কোন সমস্য নেই। আর সময়ের সমস্যার কথা যদি বলেন তবে বলব, সময়ের ব্যাপারে সমস্যা আমাদের আছে। আর সব সমস্যা সমাধার সর্বশক্তিমান আল্লাহতালার হাতে।
প্রশ্ন ঃ আপনি কি আপনার ধারারই কথা শিল্পী গড়ে উঠুক এটা চান? এব্যাপারে কি করছেন?
উত্তর ঃ নিশ্চয়! একজন কেন, শত শত জন গড়ে উঠুক, আমি তো তাই চাই। এ ব্যাপারে আমার মতো ক্ষুদ্র ব্যক্তির কি করার আছে বলুন। তবে এটুকু বলতে পারি আমরা কয় ভাই একটি সাহিত্য ফোরাম খুলেছি, সেখানে শুধু কথা শিল্পীই নয়, সাহিত্যের অন্যান্য বিষয়ও চর্চা হচ্ছে। এমনকি শিল্প সংস্কৃতি নিয়েও আমাদের চিন্তা ভাবনা জারি আছে। আমি আশাবাদী এখান থেকে শক্তিশালী কলমের আবির্ভাব হবে।
প্রশ্ন ঃ আপনি লিখতে গিয়ে কোনটির উপর বেশী গুরুত্ব দেন? কাহিনী, ভাষা না আদর্শ?
উত্তর ঃ এ প্রশ্নের জবাবটি বোধ করি আমি ঠিক ঠিক দিতে পারবো না। আমি যখন লিখি তখন কোনটার উপর
বেশী গুরুত্ব দিচ্ছি বা দেব, এসব চিন্তা ভাবনা আমার মাথায় আসে না। আমার মনে একটা আদর্শবাদ বাসা বেধে আছে, আমার ভাষারও একটা সীমিত সাধ্য আছে তারপর কাহিনীও তো যে কোন গল্পের জন্য দরকারী জিনিস। কখনো কখনো এসব উপকরণের উপর গুরুত্বের ব্যাপারে কিছুটা হেরফের তো হয়ই। সত্যি বলতে কি এটা আমি হিসেব নিকেশ করে কখনো দেখিনি। যারা আমার বই এর সিরিজ, তাদেরকে আপনি চা বিলাস বলতে পারেন। সারাদিনে আমি কাপ দুই চা খাই। আর তার জন্য উৎকৃষ্ট জাতের চা-পাতি সংগ্রহে আমার কি যে প্রাণান্ত তদবির । পারিবারিক পরিবেশ আমার সাহিত্য চর্চার প্রতিকূলে নয় কিন্তু তাই বলে খুব যে অনুকূলে তাও তো বলতে পারি না।
প্রশ্ন ঃ যে যে পত্রিকায় আপনার সম্পর্কে লেখা হয়েছে তার বিস্তারিত বর্ণনা জানতে চাই?
উত্তর ঃ পত্র পত্রিকায় আমার লেখা সম্পর্কে বেশ খিছু আলোচনা হয়েছে। আবার আমার সাহিত্যিক জীবন সম্পর্কেও একটি প্রবন্ধ আমার চোঁখে পড়ছে। এ দুটো জিনিস আলাদা বলে মনে হয়। তবে এটাও ঠিক যে এ দুটোর মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সাহিত্যের পুস্পিত কাননে আমি যদি টোকাইয়ের মত ঢুকে না পড়তাম, তাহলে আমার তো কারুর চোঁখে পড়ার কথা নয়। সে হিসেবে আমার ব্যক্তি জীবন নিয়েও আলোচনা করেছেন কেউ কেউ। এই যেমন আপনি আমার সাক্ষাতকার নিচ্ছেন। দু’কলম না লিখলে আপনি কি আমাকে চিনতেন। না এত কষ্ট করে আমার কাছে আসতেন? আমার মনে হয় সাহিত্য কর্মীরাই মানুষের সব চাইতে প্রিয়ভাজন লোক। তাদের সবার ধনভাগ্য না থাকতে পারে কিন্তু মানুষের ভালবাসার কমতি তাদের কখনোই হয় না। এটাও কি কম পাওয়া? আমার লেখা সম্পর্কে দৈনিক সংগ্রামে আলোচনা হয়েছে, আলোচনা করেছেন খ্যাতনামা সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় ডঃ আশরাফ সিদ্দিকী। বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা নজরুল গবেষক সাহাবুদ্দিন আহমদ, কবি মোশারফ হোসেন খান সচিত্র বাংলাদেশ এবং দৈনিক ইত্তেফাকে ডঃ আশরাফ সিদ্দিকী, সোনার বাংলায় স্নেহাস্পদ কবি ও সাংবাদিক সোলাইমান আহসান, ইনকিলাবে মাসিক কলমে তরুন সাহিত্যিক ইসমাইল হোসেন দিনাজী, মাসিক পৃথিবীতে সুখ্যাত কলামিস্ট জয়নুল আবেদিন আজাদ। কলমে মুনিরার উপর আলোচনা করেছেন মোঃ শফি, পরিজনে আহম্মদ মতিউর রহমান এগুলোই আমার চোখে পড়েছে। এর বাইরে যদি কোথাও এর আলোচনা থাকে, আমার চোখে না পড়ার কারণে তাদের নাম দিতে পারলামনা বলে দুঃখিত। আমার ব্যক্তিগত জীবনের একটা দিক উন্মোচন করে সাহিত্য কর্মের উপর প্রথম সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন সু-লেখক মাহমুদ হাফিজ। তাদের সবাইকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

নিব

:উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তনের একটি শোভন ছড়াপত্র

বাঙলা

আফসার নিজাম সম্পাদিত : চিন্তাশীল পাঠকের মননশীল সৃজন

%d bloggers like this: