মুহম্মদ মতিউর রহমান : জীবন ও কর্ম


ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ

মুহম্মদ মতিউর রহমান পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ১৯৬০ সনে বি.এ পাস করে ঐ বছর জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে এম. এ প্রিলিমিনারী ক্লাশে ভর্তি হয়। আমি তখন পিএইচডি করার জন্য লন্ডনে ছিলাম। পরের বছর ১৯৬১ সনের জুন মাসের শেষের দিকে লন্ডন থেকে এসে পুনরায় আমার কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগদান করি। ঐ সময় একদিন আমার কলাবাগানের বাসায় হালকা-পাতলা শ্যামলা রঙের এক তরুণ এসে আমার সন্ধান করে। মিরপুর রাস্তার পাশে তখন আমি আমার টিনের ঘরের বাসায় থাকি। বাড়ির চারপাশে কলার বাগান। ঘন কলাগাছের সবুজ পাতায় আচ্ছাদিত আমার বাড়ি। আমি তখন ঘরে ছিলাম না। বাড়ির এক পাশে নির্মাণ কাজ চলছিল, আমি তা দেখাশোনা করছিলাম। ছেলেটি আমাকে ঘরে না পেয়ে আমার খোঁজে সেখানে যায়। সেখানেই তার সাথে আমার প্রথম দেখা ও পরিচয়।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আমি তার সাথে কথা বলছিলাম। ছেলেটি নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র হিসাবে পরিচয় দিয়ে আমার সঙ্গে কিছু কথা বলার অনুমতি চাইল। আমি তার নাম ও পরিচয় জিজ্ঞাসা করলাম। সে বলল, তার নাম মতিউর রহমান এবং সে ‘পাক সাহিত্য সংঘ’-এর সাধারণ সম্পাদক। সংঘের উদ্যোগে তারা তিনদিন ব্যাপী এক সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করতে চায়। সেখানে আমাকে এক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার দাওয়াত দিতে এসেছে। আমাকে যে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার দাওয়াত দেয়া হয়, সে অধিবেশনের বিষয়বস্তু ছিল ‘ইসলামী সংস্কৃতি’। আমি মতিউর রহমান ও তার সংগঠন সম্পর্কে আগে কিছুই জানতাম না। তার সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের সেমিনারের বিষয়বস্তু ও সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত হয়ে আমি তার দাওয়াত কবুল করলাম।

সেমিনারটি খুবই প্রাণবন্ত হয়েছিল। তাতে বিশিষ্টজনদের মধ্যে যাঁরা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ঃ অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, মওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম, অধ্যাপক গোলাম আযম, শাহ আব্দুল হান্নান প্রমুখের নাম মনে আছে। ইসলামি একাডেমীর পরিচালক বিশিষ্ট ইসলামি    চিন্তাবিদ আবুল হাশিমও সেমিনারে উপস্থিত থেকে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এরপর থেকে মতিউর রহমানের সাথে আমার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হয়ে ওঠে।
পরের বছর ১৯৬২ সনে আমি হজ্জ্ব করতে যাই। তখন মাস দেড়েক ছুটি ভোগ করি। তাই নিয়মিত পাঠদানে কিছুটা বিরতি ঘটে। যাহোক, মক্কা শরীফ থেকে এসে আর কোন ছুটি না নিয়ে এক নাগাড়ে ক্লাস করা শুরু করি। তখন আমার ছাত্র হিসাবে মতিউর রহমান-এর সাথে ক্লাসে ও ক্লাসের বাইরে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হতো। এম.এ পাস করে বেরিয়ে গেলেও মতিউর রহমানের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি।
 আমার এ সংক্ষিপ্ত জীবনে এমন সব ঘটনা ঘটে, যা আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ মনে হলেও জীবনের বৃহত্তর পরিধির পরিমাপে সে ত্চ্ছু ঘটনাও তাৎপর্যময় হয়ে সময় সময় জীবনে পুঞ্জীভূত হয়ে স্মরণীয় চিহ্ন রেখে যায়। ছাত্র হিসাবে মতিউর রহমানের সঙ্গে খুব বেশী সাক্ষাতের সুযোগ হয় নি। শ্রেণী কক্ষের বাইরে মাঝে মধ্যে দেখা হয়েছে, সালাম-কালাম হয়েছে, কুশল বিনিময় হয়েছে, লেখা-পড়া কেমন চলছে, এ পর্যন্তই। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ছাত্রদের ব্যক্তিগত খবর নেয়া আমার চিরকালের অভ্যাস। তবে অনেকের তুলনায় মতিউর রহমান বিশেষভাবে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করত। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং তৎসহ অনানুষ্ঠানিক ক্রিয়া-কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে তার সাথে সময় সময় আমার আলোচনা হত। শিক্ষা-ধর্ম-সাহিত্য-সংস্কৃতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে তার আগ্রহ তার দিকে আমাকে আকৃষ্ট করে। মাঝে মধ্যে আমি পাঠ্যতালিকার বাইরে আমার ছাত্রদের মধ্যে সমাজ-সংস্কৃতি প্রসঙ্গে কথা উঠলে আমি তাতে উৎসাহবোধ করি। মতিউর রহমানের এসব বিষয়ে ঐকান্তিক আগ্রহ দেখে তার সঙ্গে আমার নৈকট্য বেড়ে যায়।
এম. এ পাস করার পরে আমার সঙ্গে তার দেখা-সাক্ষাৎ অনেকটা কমে যায়। কিন্তু যখনই দেখা হয়েছে, তার বিভিন্ন বিষয়ে জানার আগ্রহ আমাকে তার অন্তরের কাছাকাছি টেনে নিয়েছে। ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী নৈশ কলেজে অধ্যাপনাকালীন সে ফ্রাঙ্কলিন বুক প্রোগ্রামসের নিয়মিত বিভাগ ও বিশ্বকোষ প্রকল্পে যথাক্রমে সহকারী সম্পাদক ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করে। তদানীন্তন ডি.পি.আই খান বাহাদুর আব্দুল হাকীম সাহেব ছিলেন বিশ্বকোষের প্রধান সম্পাদক।
কর্মজীবনে মতিউর রহমান দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কায়েম ও পরিচালনা করে আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে দুই কুড়িরও বেশি প্রতিষ্ঠান কায়েমে তার অসামান্য অবদান রয়েছে। সভাপতি, সম্পাদক ও উপদেষ্টা হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় মতিউর রহমান সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এখনও করে চলেছেন। শিশু-কিশোরদের জন্য ইসলামী আদর্শভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন পরিচালনায়ও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
শাহজাদপুরে হযরত আবু বক্কর সিদ্দিক (রা) এর নামানুসারে একটি মসজিদ ও কুরআন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সিরাজগঞ্জ তেলকুপিতে হযরত ওমর ফারুক (রা) এর স্মরণার্থে আরও একটি মসজিদ নির্মাণ, নিজ গ্রাম চর বেলতৈলে আবু মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী ও মোসাম্মৎ আসুদা খাতুন হাফিজিয়া ফোরকানিয়া মাদ্রাসা এবং চর  বেলতৈলে মুন্সী ওয়াহেদ আলী ও মোসাম্মৎ রমিছা খাতুন স্মৃতি পাঠাগার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলাকাবাসীর ধর্মীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি অনুশীলনী ও চর্চার ব্যবস্থা করে এলাকাবাসীর বিশেষ করে সে এলাকার শিশু-কিশোরদের দীনি কার্যকলাপ ও শিক্ষার ব্যাপারে ইসলামী আদর্শ-ভিত্তিক সমাজ গঠনে মতিউর রহমান উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এছাড়া, দুবাই ও সংযুক্ত আরব-আমিরাতে বসবাসকালে মতিউর রহমান বহু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাহায্য-সহযোগিতা ও সেবামূলক কাজেও তার প্রশংসনীয় ভূমিকা রয়েছে।
মুহম্মদ মতিউর রহমান ১৯৩৭ সনের ১৮ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার   অন্তর্গত শাহজাদপুর থানার চরনরিনা গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আবু মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী, মাতার নাম মোসাম্মৎ আসুদা খাতুন। মুহম্মদ মতিউর রহমানের পূর্ব পুরুষ এলাকায় শিক্ষাদানের ব্যাপারে সুখ্যাতি অর্জন করেন। সে সুবাদে তাদের বাড়িটি ‘পণ্ডিত বাড়ি’ হিসাবে পরিচিত। মতিউর রহমান পিতা-মাতার তিন পুত্র ও নয় কন্যার মধ্যে ষষ্ঠ সন্তান। তার স্ত্রীর নাম বেগম খালেদা রহমান। তাদের দুই পুত্র ও দুই কন্যা রয়েছে।
মতিউর রহমান গ্রামের স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ১৯৫০ সনে নরিনা মধ্য ইংরাজি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। সেখানে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে ১৯৫৪ সনে স্থানীয় পোতাজিয়া হাইস্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে ১৯৫৬ সনে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মতিউর রহমান ১৯৫৬ সনে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে ১৯৫৮ সনে আই. এ ও ১৯৬০ সনে বি.এ পাশ করেন। এরপর ১৯৬০ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে ১৯৬২ সনে বাংলায় এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন।
১৯৬২ সনের নভেম্বরে মতিউর রহমান ঢাকা সিদ্ধেশ্বরী নৈশ কলেজে অধ্যাপনার কাজে নিয়োজিত হন। এখানে ১৯৭৭ সন পর্যন্ত যথাক্রমে অধ্যাপক, ভাইস-প্রিন্সিপাল এবং ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। মাঝখানে তিনি ১৯৬৫ সনে চার মাসের জন্য করটিয়া সা’দত কলেজে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। সিদ্ধেশ্বরী কলেজে থাকাকালীন সময়ে ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত প্রায় ৭ বছর ঢাকাস্থ আমেরিকান প্রকাশনা সংস্থা ‘ফ্রাংকলিন বুক্স প্রোগ্রামস’ এ সহকারী সম্পাদক ও প্রথম বাংলা বিশ্বকোষ প্রকল্পে অন্যতম সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৭০ সনের জানুয়ারিতে দৈনিক সংগ্রাম প্রকাশিত হলে মতিউর রহমান সেখানে সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৭৭ সনের ১২ ফেব্র“য়ারি মতিউর রহমান সংযুক্ত আরব-আমিরাতে চলে যান এবং সেখানে ১৯৯৬ সনের ডিসেম্বর পর্যন্ত দুবাই চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রকাশনা বিভাগে সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পাশাপাশি সমাজ, শিক্ষা, সাহিত্য ও  সংস্কৃতি বিষয়ে লেখালেখি ও সাংগঠনিক কাজে বিশেষভাবে আত্মনিয়োগ করেন। এ সময় মতিউর রহমান একনিষ্ঠভাবে চিন্তা-চেতনায় ও কর্মে স্বদেশ, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ইতিহাস- ঐতিহ্যের ভাবনাগুলি সংহত করে প্রকাশ করার বিশেষ উদ্যোগ নেন।
মতিউর রহমান ১৯৯৭ সনের জানুয়ারিতে দেশে ফিরে এসে বর্তমানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর বাংলা বিভাগের প্রধান হিসাবে কর্মরত থেকে তাঁর চিন্তা ও কর্মের সমন্বিত রূপ প্রকাশে সচেষ্ট রয়েছেন।
মতিউর রহমান মূলত একজন সাহিত্যিক। দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত থেকেও তার সাহিত্য-কর্ম সর্বদা অব্যাহত থেকেছে। তিনি এখনও সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে নিরলসভাবে গবেষণা ও লেখালেখি করে চলেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে এ যাবৎ তার প্রকাশিত গ্রন্থের একটি তালিকা নিচে দেয়া হলোঃ 
সাহিত্য কথা (১৯৭০), ভাষা ও সাহিত্য (১৯৭০), সমাজ-সাহিত্য সংস্কৃতি (১৯৭১), মহৎ যাদের জীবন কথা (১৯৮৯), ইবাদতের মূলভিত্তি ও তার তাৎপর্য (১৯৯০), ফররুখ প্রতিভা (১৯৯১), বাংলা সাহিত্যের ধারা (১৯৯১), বাংলা ভাষা ও ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন (১৯৯২), আযান সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য প্রসঙ্গে (১৯৯২), ইবাদত (১৯৯৩) মহানবী (স) (১৯৯৪), ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি (১৯৯৫), মহানবীর (স) আদর্শ সমাজ (১৯৯৭), ছোটদের গল্প (১৯৯৭), ঋৎববফড়স ড়ভ ডৎরঃবৎ (১৯৯৭), বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য (২০০২), মানবাধিকার ও ইসলাম (২০০২), ইসলামে নারীর মর্যাদা (২০০৪), রবীন্দ্রনাথ (২০০৪), স্মৃতির সৈকতে (২০০৪), মানবতার সর্বোত্তম আদর্শ মহানবী (স) (২০০৫), মাতা-পিতা ও সন্তানের হক (২০০৬), ফররুখ প্রতিভা (পরিবর্তিত দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০০৮), ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার (২০০৮), সংস্কৃতি (২০০৮), বাংলাদেশের সাহিত্য (২০০৮) ও সাহিত্য চিন্তা (২০০৯)।
অনুবাদঃ ইরান (১৯৬৯), ইরাক (১৯৬৯), আমার সাক্ষ্য (১৯৭১)।
সম্পাদিত গ্রন্থঃ প্রবাসী কবিকণ্ঠ (১৯৯৩), প্রবাসকণ্ঠ (১৯৯৪), ভাষা সৈনিক সংবর্ধনা স্মারক (২০০০)।
প্রকাশিতব্য গ্রন্থঃ সমকালীন বাংলা সাহিত্য, কিশোর গল্প, আরব উপসাগরের তীরে, বাঙালি মুসলমানের নবজাগরণে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভূমিকা, নানা প্রসঙ্গ, মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্য-রতœ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, আশির দশকের কবি ও কবিতা ইত্যাদি।
শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মুহম্মদ মতিউর রহমানকে ১৯৯৬ সনে ‘বাংলাদেশ ইসলামিক ইংলিশ স্কুল’ দুবাই-এর পক্ষ থেকে  স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। 
১৯৯৭ সনে বাংলাদেশে ফিরে এসে মতিউর রহমান ফররুখ একাডেমী (২০০৬ সনে রেজিস্ট্রিকৃত নামঃ ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন) প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে তিনি উক্ত প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও ‘ফররুখ একাডেমী পত্রিকা’র সম্পাদক।
এখানে মতিউর রহমানের কয়েকটি গ্রন্থ সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোচনা করার প্রয়াস পাব। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আমার স্নেহভাজন কৃতি ছাত্র আমার প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতাবশত তার প্রণীত ‘সংস্কৃতি’ নামক গ্রন্থখানি আমার নামে উৎসর্গ করেছেন। সংস্কৃতি গ্রন্থে মোট ১১টি নিবন্ধ স্থান পেয়েছে। গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করা হয়েছেঃ
“সংস্কৃতি একটি ব্যাপক তৎপর্যপূর্ণ শব্দ। এককথায় এর অর্থ প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তাই বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন শব্দে এর অর্থ প্রকাশে সচেষ্ট হয়েছেন। ইংরেজি ঈঁষঃঁৎব-এর প্রতিশব্দ হিসাবে বাংলায় সংস্কৃতি, কৃষ্টি, তমদ্দুন ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিভিন্ন মনীষী এসব শব্দের বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা প্রদান করে এর অর্থ বুঝাবার প্রয়াস পেয়েছেন। তবে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটিই অধুনা সর্বাধিক প্রচলিত ও ব্যবহৃত মনে হওয়ায় উক্ত শব্দটিই এখানে গ্রহণ করা হলো।”
এদিক থেকে বিবেচনা করে মুহম্মদ মতিউর রহমান বলেছেন, যে শব্দ জনগণের নিকট সহজবোধ্য ও দৈনন্দিন জীবনে কোন বিশেষ এলাকার মানুষ যেসব শব্দ ব্যবহার করে থাকে সেটাই প্রকৃতপক্ষে সে এলাকার জনগণের নিজস্ব শব্দ। হতে পারে সে শব্দের মূল হয়ত বিদেশী ভাষার মধ্যে গ্রন্থিত থাকতে পারে। মতিউর রহমান সংস্কৃতি ও সভ্যতার (ঈঁষঃঁৎব ধহফ ঈরারষরুধঃরড়হ) মধ্যে যে সূক্ষè পার্থক্য রয়েছে, তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে নিরূপণ করেছেন । তাহজিব-তমদ্দুন প্রভৃতি শব্দের অর্থ বিশেষ করে সংস্কৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষীর চিন্তা-প্রসূত ধ্যান-ধারণা ও জীবনানুশীলন-কর্মে প্রযুক্ত ধ্যান-ধারণা মোটামুটি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তার বিশ্বাস, সংস্কৃতি বলতে যেমন, সভ্যতা বলতেও তেমনি ভদ্রতা, শিষ্টতা, উৎকর্ষ, পরিমার্জন, সুরুচি, শিক্ষা, সাহিত্য, স্থাপত্য ইত্যাদি বুঝায়। তার কথায় যে ব্যক্তি সভ্য সে ব্যক্তি অবশ্যই সংস্কৃতিবান। অন্যকথায় পরিশ্র“ত, পরিশীলিত, মার্জিত, রুচিসম্পন্নœ, সংস্কৃতিবান ব্যক্তিকেই সভ্য মানুষ হিসাবে গণ্য করা হয়। প্রসঙ্গত লেখক একথাও স্বীকার করেছেন যে, এসবের পার্থক্য নিরূপণ করা দূরূহ। এ প্রসঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা ও মনীষীর সুচিন্তিত প্রজ্ঞার আলোকে প্রবন্ধকার তার নিজস্ব মত প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করেছেন।
প্রবন্ধকার সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। স্থান, কাল, আবহাওয়া, ঋতু পরিবর্তন, ভাষা, খাদ্য, জীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, সংগীত-নৃত্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য-ভাস্কর্যস্থাপত্য, ধর্মীয় বিশ্বাস বা জীবনদৃষ্টি-এসবকে প্রবন্ধকার সংস্কৃতির প্রধান উপকরণ মনে করেন। বস্তুত মানুষের জীবনে দৈহিক ও মানসিক চেতনা এবং ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে তা যেভাবে কর্মে ও চিন্তায় প্রযুক্ত হয় এরই পরিণত রূপ সংস্কৃতি। স্থানিক, কালিক, ভৌগোলিক, আদর্শিক কারণে সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে ও বিবর্তিত হয়, আবার একই কারণে সংস্কৃতির উৎকর্ষ ও স্বাতন্ত্র্য সৃৃষ্টি হয়।
বাংলা ভাষায় ধর্ম-সংস্কৃতি-কৃষ্টি-সভ্যতা বিষয়ে যে সব প্রবন্ধ-নিবন্ধ এ পর্যন্ত রচিত হয়েছে নিঃসন্দেহে তার মধ্যে মতিউর রহমানের এ গ্রন্থখানি উল্লেখযোগ্য স্থান করে নেবে। বিশেষ করে ‘ইসলামী সংস্কৃতি’ শিরনামে লেখা তার প্রবন্ধটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী সংস্কৃতি সম্বন্ধে বাংলা ভাষায় খুব কমই লেখা হয়েছে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা। জীবনের সকল দিক ও বিভাগ সম্পর্কে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (স) সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা ইসলামের অন্যান্য দিক সম্পর্কে কম-বেশি অবহিত হলেও ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুবই সীমিত। আর একারণে অন্য সংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতির আগ্রাসনের শিকার হই আমরা সহজেই। মতিউর রহমান তার এ প্রবন্ধে ইসলামী সংস্কৃতির রূপ ও সংজ্ঞা সম্পর্কে কুরআন-হাদীসের আলোকে যথাসম্ভব বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এখানে লেখকের ইসলামী জ্ঞান ও আধুনিক চিন্তা-চেতনা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটেছে। নিঃসন্দেহে এটি এ গ্রন্থের শ্রেষ্ঠ রচনা এবং সকল অনুসন্ধিৎসূ তরুণ পাঠকের এটা পড়া কর্তব্য বলে আমি মনে করি।
এ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘ইসলাম বনাম সভ্যতা সংস্কৃতি ও প্রগতি’, ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘আমাদের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য’ ইত্যাদি প্রবন্ধের বক্তব্য গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধেরই সবিস্তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। তবে বিষয় ও উপযোগিতার কারণে এ প্রবন্ধগুলির যথেষ্ঠ গুরুত্ব রয়েছে বলে, আমি মনে করি।
‘বাংলা সনের উৎপত্তি ও বিকাশ’, ‘বাংলা নববর্ষ ও আমাদের সংস্কৃতি’, ‘ঈদ উৎসব : ইসলামী সংস্কৃতির প্রাণসত্তা’, ‘কুরবাণী: আত্মত্যাগ ও আত্মসমর্পণের মহত্তম শিক্ষা’ ও ‘ইসলামী সংস্কৃতি ও ঈদ’ এগুলি মূলত গ্রন্থের দ্বিতীয় প্রবন্ধ-‘ইসলামী সংস্কৃতি’-এর সবিস্তার বিশ্লেষণ। বাস্তব জীবনে ইসলামী সংস্কৃতির প্রায়োগিক দিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে কীভাবে ফুটে উঠেছে, গ্রন্থকার এসব প্রবন্ধে তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।
‘শব্দ সংস্কৃতি’ প্রবন্ধের মূল বক্তব্য হলো বাংলা ভাষা যে সংস্কৃতের দুহিতা নয়, সে কথা প্রমাণের উদ্দেশ্যেই রচিত। সংস্কৃত ভাষার ধারকদের পক্ষপাতিত্বের যথাবিহিত উত্তর স্বরূপ প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পটভূমিকা পর্যালোচনা করে গ্রন্থকার তার মতামত প্রকাশের চেষ্টা করেছেন। প্রবন্ধের উল্লেখযোগ্য দিক হলো এই যে, এখানে লেখক বলতে চেয়েছেন যে, প্রত্যেক ভাষায়ই এমন বিশেষ কিছু শব্দ বিদ্যমান, যার মধ্যে সে ভাষাভাষী লোকদের ধর্মাচার, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটে। বাংলা ভাষায়ও এরূপ অসংখ্য শব্দ রয়েছে, যার মধ্যে হিন্দুধর্ম, জীবনাচার ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটেছে। অনুরূপভাবে বাংলা ভাষায় এরূপ অসংখ্য আরবি-ফারসি শব্দ আত্মীকৃত হয়েছে, যা ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম সংস্কৃতির ধারক-বাহক। অতএব, শব্দ যে সংস্কৃতি বিনির্মাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ, লেখক এখানে তা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন।
চর্চা ও অনুশীলনীর মাধ্যমে বাংলা ভাষা যে সমৃদ্ধি লাভ করেছে, তারই বিশদ বর্ণনা এ নিবন্ধের আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে। এমনকি, পরবর্তীতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ, ভাষা ও সাহিত্য অনুশীলনকারীদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান। এ কথাগুলি যথাযোগ্য প্রমাণ ও যুক্তিসহ গ্রন্থকার বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন।
‘শব্দ সংস্কৃতি’ নিবন্ধে ভাষার গঠন-প্রকৃতি এবং উদ্ভব ও বিকাশ সম্বন্ধে লেখক প্রচলিত মতকে সরাসরি গ্রহণ না করে তার নিজস্ব ভিন্ন মত প্রকাশের চেষ্টা করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে বাংলার সাধু ও চলিত রীতি সম্বন্ধে আলোচনা করে আধুনিক কাল পর্যন্ত এসে ১৯৪৭ সনে দেশ বিভাগের পর এবং ১৯৭১ সনে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলা ভাষার শব্দ-সম্পদ সম্পর্কে লেখক তার বক্তব্য পেশ করেন।
বাহান্নর ভাষা আন্দোলন এবং মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা আদায়ের লক্ষ্যে সর্বাত্মক সংগ্রাম ও চরম আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সনের নভেম্বরে জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো কর্তৃক ২০০০ সন থেকে ২১ ফেব্র“য়ারীকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে ঘোষণা দেওয়ায় বাংলার মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আরো বেড়ে  গেছে। বাংলা ভাষা এখন পনের কোটি বাংলাদেশীর নিরলস সংগ্রাম, সীমাহীন আত্মত্যাগ, জাতীয় গৌরব ও আত্মমর্যাদার মহত্তম প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শব্দ অনেক সময় বিশেষ সংস্কৃতির দ্যোতক। এ প্রসঙ্গে লেখক উল্লেখ করেন যে, ‘আল্লাহ’ শব্দের কোন প্রতিশব্দ, অনুবাদ বা বিকল্প হতে পারে না। এভাবে ইসলামের পরিভাষামূলক অনেকগুলি শব্দ সমন্ধে ইসলামী বিশ্বাস ও সংস্কৃতির যে বলিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে তার উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত ইসলামী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে আমাদের যে আত্মপরিচয় আমাদের ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে, তা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে গৃহীত হয়েছে। এর বিপরীত চিন্তা আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যকে বিকৃত করে মাত্র। একথাটির মর্ম সম্যক উপলব্ধি করলে ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র দোহাই দেবার কোন অবকাশ থাকে না। আধুনিক চিন্তা-চেতনায় সমৃদ্ধ শিক্ষিত সমাজ বিশেষত তরুণদের এ কথাটি বিশেষভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
‘শব্দ সংস্কৃতি’ ও ‘ঈদ উৎসবঃ ইসলামী সংস্কৃতির প্রাণসত্তা’, ‘কুরবানীঃ আত্মত্যাগ ও আত্মসমর্পণের মহত্তম শিক্ষা’ এবং ‘ইসলামী সংস্কৃতি ও ঈদ’-এ প্রবন্ধগুলোতে সংস্কৃতি, বিশেষভাবে ইসলামী সংস্কৃতি সম্বন্ধে গ্রন্থকার আমাদের তাহজীব ও তমদ্দুন বিষয়ে পরিচ্ছন্ন ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছে। আগ্রহশীল পাঠক মনোযোগ সহকারে পাঠ করলে এটা সহজেই উপলব্ধি করবেন যে, এ প্রবন্ধগুলির মধ্যে গন্থকার সংস্কৃতি ও ইসলামী সংস্কৃতি, ঈঁষঃঁৎব ধহফ ঈরারষরুধঃরড়হ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছেন এবং দৃঢ় বিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সংস্কৃতির বিচিত্র রূপ ও পরিচয় সুস্পষ্ট করে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন। আন্তরিক বুদ্ধি-বিবেচনা ও বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি সহকারে বিচার্য-আচার-আচরণ তথা ভাষা-সাহিত্য, নৃত্য-সংগীত, স্থাপত্য ও ভাস্কর্য ইত্যাদির মত সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কীভাবে ও কী পরিবেশে, সর্বোপরি কী ধর্মীয় ও নৈতিক পরিবেশে জীবনের বিচিত্র মানসিকতায়, কর্মে ও আচরণে প্রস্ফূটিত হয়ে ওঠে তার সহজ ব্যাখ্যা এ লেখাগুলোর মধ্যে বিধৃত হয়েছে। এ কথা অস্বীকার করার জো নেই যে, ঈমান বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে আমাদের আচরণাদি বিভিন্নমুখী হয়ে গড়ে ওঠে। আর তা-ই আমাদের জীবনে বিকশিত হয়ে ওঠে সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিচিত্র অভিব্যক্তির মাধ্যমে। এসব উপাদানের মধ্যে ধর্মীয় আকিদা বিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ সম্পর্কে গ্রন্থকারের উক্তিঃ “এ বিশ্বাস কখনো উদ্ভূত হয় ধর্ম থেকে, কখনো প্রথাগতভাবে, কখনো সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে আবার কখনো কোন বিশেষ দর্শন থেকে।”
আর এর সাথে আমাদের জীবনের ধ্যান-ধারণা-কল্পনা এবং কর্ম-প্রেরণা প্রযুক্ত হয়ে বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে। সুনির্দিষ্ট আচরণের মাধ্যমে বিকশিত জীবনবোধ ও তওহীদ ভিত্তিক সর্বজনীনতায় পরিব্যপ্ত যে জীবন তা-ই মানুষের কাম্য। বিশ্বাসগত এ আদর্শই ধর্মীয় জীবনবোধের মূল উদ্দেশ্য। মানুষ মানুষেরই জন্য। কবি বলেনঃ  
পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
পরের কারণে মরণেও সুখ
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
ধর্ম ও সংস্কৃতির মূল কথা মানবতার উপলব্ধি এবং মানব কল্যাণে আত্মোৎসর্গ। এ গ্রন্থের মূল ভাব ও বিষয়ও তাই। গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধগুলি সাধারণভাবে ‘ছাকাফাহ’ বা সংস্কৃতি এবং ইসলামী সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে বিশেষভাবে পাঠকদের ধারণা সুস্পষ্ট করার ব্যাপারে সহায়ক হবে সন্দেহ নেই।
‘বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য’ মুহম্মদ মহিউর রহমানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। ২৫০ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থে ১৪টি প্রবন্ধে বিশিষ্ট কয়েকজন মুসলিম কবি-সাহিত্যিক সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তাছাড়া, গ্রন্থের শুরুতে ও শেষে ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য’ ও ‘সা¤প্রতিক বাংলা সাহিত্য’ শিরনামে দু’টি প্রবন্ধ রয়েছে। উল্লেখ্য যে, এ গ্রন্থে বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিক ইতিহাস আলোচনা করা হয়নি। ১৪ জন কবি-সাহিত্যিক নিয়ে, একেকটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। প্রথমে বলে রাখা ভাল, বইখানিতে ধারাবাহিক ইতিহাস না পাওয়া গেলেও নিবন্ধ হিসাবে প্রত্যেকটি নিবন্ধেরই আলোচনা স্বয়ংসম্পূর্ণ। গবেষক ও আগ্রহী পাঠক ছাড়াও গ্রন্থখানি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সহায়ক হিসাবে বিশেষ উপকারে আসবে।
এ গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎপত্তি ও বিকাশ সমন্ধে আলোচনা প্রসঙ্গে গোড়ার দিকে এর মূলে প্রতিবন্ধকতা ও এর নবজন্ম এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্ম-স¤প্রদায়, জাতিগোষ্ঠী ও শাসনামলের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পেশ করে আমাদের সাহিত্যে প্রতিফলিত মুসলিম ঐতিহ্য সমন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। আলোচনার সুবিধার্থে তদানীন্তন বাংলার মুসলিম ঐতিহ্যকে লেখক নিম্নোক্ত ৪ ভাগে বিভক্ত করে আলোচ্য বিষয় বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন।
১. ভাষা, ২. বিষয়বস্তু, ৩. ভাবানুভূতি বা অনুপ্রেরণা এবং ৪. আঙ্গিক ও প্রকরণগত বিভিন্ন দিকের সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে।
আলোচনা প্রসঙ্গে লেখক বলেন, বাংলা ভাষা শব্দ-সম্ভারের দিক থেকে অতিশয় সমৃদ্ধ। যে ভাষার স¤প্রসারণতা ও আত্মীকরণ ক্ষমতা যত বেশি সে ভাষা তত সমৃদ্ধ ও উন্নত। বাংলা ভাষা তার জন্মকাল থেকেই দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ভাষা থেকে অসংখ্য শব্দ সংগ্রহ করে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। বাংলা ভাষার ভাণ্ডারে রয়েছে অনার্য, আর্য, দেশীয়, বিদেশী ইত্যাদি নানা ভাষার বিভিন্ন শব্দরাজি যার মূল উৎস প্রধানত দেশীয়, বিদেশীয়, সংস্কৃত (তৎসম) পালি, প্রাকৃত, অপভ্রংশ, আরবি, ফার্সি, হিন্দি, উর্দু, ইংরাজি, পর্তুগীজ, ওলন্দাজ ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষার শব্দ।
গ্রন্থকার উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের পরে যে ভাব-বিপ্লব সংঘটিত হয় বিশেষত মুসলিম রাজত্ব কায়েমের ফলে যে সাহিত্য সৃষ্টি হয়, তা-ই মুসলিম ঐতিহ্যমণ্ডিত বাংলা সাহিত্য। মধ্যযুগে শাহ মোহাম্মদ সগীর, সৈযদ সুলতান, সৈয়দ হামজা, কাজী দৌলত, আলাওল, উনবিংশ শতকের মীর মশাররফ হোসেন, কায়ককোবাদ, মোজাম্মেল হক, মুন্সী মেহেরউল্লাহ, বিংশ শতকে মোহাম্মদ নজিবর রহমান, কাজী ইমদাদুল হক, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, শাহাদাৎ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, কাজী নজরুল ইসলাম, মোহা¤মদ বরকতুল্লাহ, জসীমউদ্দীন, বেগম সুফিয়া কামাল, বন্দে আলী মিয়া, ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন, সৈযদ আলী আহসান, শাহেদ আলী, মোফাখ্খারুল ইসলাম, মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ, আব্দুস সাত্তার, আল মাহমুদ প্রমুখ বাংলা সাহিত্যের সেই বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ধারাকেই সমুন্নত ও সমুজ্জ্বল রেখেছেন।
 দেশি-বিদেশী নানা প্রভাবের ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পরবর্তীকালে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে এবং আমাদের সাহিত্যে নতুন স্বতন্ত্র ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। মুসলিম আমলের আগে একমাত্র চর্যাপদ ছাড়া বাংলা সাহিত্যের আর কোন উল্লেখযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায় না। প্রধানত মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় সংস্কৃত সাহিত্য ও আরবি-ফারসি এ তিনটি সমৃদ্ধ সাহিত্যের আদর্শ সামনে রেখে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সাহিত্যের যে নবজীবন আরম্ভ হয় তার ফলে সংস্কৃত ভাষার রামায়ণ-মহাভারত, কালিদাসের মেঘদূত, কুমার সম্ভব এবং জায়দেবের গীত গোবিন্দের ন্যায় ভক্তি-ভাবাপন্ন ধর্মীয় কাব্য এবং প্রেম ও হৃদয়বৃত্তিমূলক মানবীয় কাব্যধারার বৈষ্ণব পদাবলী ইত্যাদি এবং পাশাপাশি আরবি-ফারসি ভাষার বহু বিশ্ব-বিখ্যাত গ্রন্থের আদর্শে সাহিত্য সৃষ্টির প্রাচুর্যে বাংলা সাহিত্য ভাবে ও গানে উল্লেখযোগ্য সমৃদ্ধি লাভ করে।
তাই বলা যায়, মুসলিম আমল থেকে প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের ভাষার নবজন্ম ও সাহিত্য বিকাশে সার্থক অভ্যুদয় ক্রমান্বয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এ ধারায় মুসলিম এবং অমুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের অবদান স্বীকার করেই বলতে হয ঐতিহ্য অনুসরণ করেই ক্রমে নব নব রূপায়ণের মাধ্যমে প্রাণস্পর্শী ও কালজয়ী সাহিত্যের সৃষ্টি হয়েছে। তাই এ উপলব্ধি থেকেই আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের গৌরবময় ঐতিহ্যকে ধারণ ও লালন করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পরিচর্যা ও অনুশীলনী এগিয়ে চলেছে। গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধটিতে আমাদের সাহিত্যে বিধৃত ঐতিহ্য সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরা হয়েছে এবং মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যখন পূনর্জন্ম ঘটে, তখন থেকেই হিন্দুদের রচিত সাহিত্যে তাদের ধর্মীয় আদর্শ-ঐতিহ্য যেমন প্রতিফলিত হয়েছে, মুসলিম রচিত সাহিত্যেও তেমনি ইসলামী ভাবাদর্শ ও ঐতিহ্য সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
এ গ্রন্থের শেষে ‘সা¤প্রতিক বাংলা সাহিত্য’ শীর্ষক নিবন্ধে প্রথম নিবন্ধেরই উপসংহার টানা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, আমাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যে নানাদিক থেকে বিরোধিতার বীজ রোপিত হয়েছে। আমাদের শিক্ষা- সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঝড়-ঝঞ্ঝার আক্রমণে তথাকথিত সমন্বয়বাদী ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারা প্রবলভাবে আঘাত হানে। অর্থাৎ যে প্রেরণায় পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়, সে প্রেরণা ১৯৭১ সনে এসে বাধা প্রাপ্ত হয়। বরং ইসলাম-বিরোধী ভাবধারা প্রবলভাবে আমাদের জাতিসত্তার ভিৎ নাড়িয়ে দেয়। গণতন্ত্রহীন একদলীয় একনায়কত্বের কবলে স্বাধীন সুস্থ চিন্তা-চেতনা ও মতামত প্রকাশের সুযোগ রহিত হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। পঁচাত্তরের আগস্ট বিপ্লব ও ৭ নভেম্বর সিপাহী বিপ্লব জাতীয় চৈতন্যকে এক প্রত্যয়ী ও ইতিবাচক ভাবধারায় নতুনভাবে উদ্বুদ্ধ করে। শাসনতন্ত্রে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে ‘বিসমিল্লাহ’ এবং ‘আল্লাহর সার্বভৌমত্ব’, ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ ইত্যাদি ইতিবাচক জাতীয় আদর্শ ও বিশ্বাসের কথা সংযোজিত হয় এবং একদলীয় শাসনব্যবস্থার স্থলে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশপ্রেমিক নাগরিকরা পুনরায় সুস্পষ্ট ইতিবাচক মাত্রা যোগ করে।
ফলে সত্তর ও আশির দশকে লক্ষণীয়ভাবে জাতীয় আদর্শের চেতনা সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আবার উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। যদিও এর বিপরীত স্রোতধারাও প্রবাহিত হয়। বিগত শতাব্দীর শেষের দিকে প্রবল পরাক্রান্ত রাশিয়ার বাহাত্তর বছর বয়সের কমিউনিজ্যম কবরস্থ হয়। এতে ইউরোপের সর্বত্র তথাকথিত সমাজতন্ত্রের পরাজয়ে এবং শেষের দিকে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত রাশিয়া পরাজিত হয়ে পশ্চাৎপসরণ করার ফলে বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ইসলাম-বিরোধী সুবিধাবাদী চক্র নিজেদের আদর্শ ও লক্ষ্য সম্পর্কে হতাশ হয়ে বিভিন্ন সরকারের ছত্রছায়ায় তাদের ইসলাম-বিরোধী ভূমিকা নানাভাবে অব্যাহত রাখে। এ নেতিবাচক বিদ্বিষ্ট ভূমিকা আমাদের সমাজে বিশেষভাবে সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বিভাজন, পরস্পরের প্রতি পরস্পরের অবিশ্বাস এবং জাতীয় আদর্শ ও মূল্যবোধের প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টির প্রয়াস পায়। বিশেষত তরুণ সমাজ এতে বিভ্রান্ত হয় এবং আমাদের সংস্কৃতির প্রতি তাদের অনেকের মনে সংশয় সৃষ্টি হয়। এ সম্বন্ধে ধারাবাহিক আলোচনায় মুহম্মদ মতিউর রহমান বালেন, নব্বই দশকে মূলধারা, সমন্বয়বাদী ধারা এবং সে সাথে বর্ণচোরা বামপন্থী সমাজতন্ত্রী ধারা আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নব্বই দশকের শুরু থেকেই একটি নৈরাশ্য ও নৈরাজ্যের কালো মেঘ আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জাতীয় চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রকে দারুণভাবে আছন্ন ও বিভ্রান্ত করে তোলে। এ জন্য প্রধানত দায়ী আদর্শহীন, লক্ষ্যহীন, দূরদৃষ্টিহীন ব্যর্থ রাজনৈতিক নেতৃত্ব। এরা জাতীয়তাবাদের দোহাই দিলেও জাতীয় আদর্শ, জাতীয় চেতনা ও ভাবধারা সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন অথবা অজ্ঞ। ফলে নব্বই দশকের প্রথম থেকেই তথাকথিত জাতীয়তাবাদী সরকারের ছত্র-ছায়ায়, কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের প্রত্যক্ষ মদদে হঠাৎ করে বিজাতীয় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বিদেশী সাহায্যপুষ্ট হয়ে অসংখ্য দৈনিক, সাপ্তাহিক ও সাময়িক পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আদর্শহীন নৈরাজ্য সৃষ্টির ব্যাপক প্রয়াসে লিপ্ত হয়। মিডিয়াগুলি রেডিও, টি.ভি, নাট্যমঞ্চ, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, শিক্ষাঙ্গন প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রে এক শ্রেণীর তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিসেবী, শিক্ষাবিদ, কবি-সাহিত্যিক সুকৌশলে জাতীয় আদর্শ-ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালায়।
‘উনবিংশ শতকের প্রেক্ষাপট ও মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্য সাধনা’, ‘মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্য-রতœঃ জীবন ও সাহিত্য’, ‘কবি গোলাম   মোস্তফা’, ‘আবুল মনসুর আহমদের ভাষা-চিন্তা’, ‘গদ্যশিল্পী মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ’, ‘নজরুলের বিদ্রোহী-সত্তার স্বরূপ’, ‘ফররুখ আহমদ’, ‘সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতা’, ‘কথাশিল্পী শাহেদ আলী’, ‘সাংবাদিক-সাহিত্যিক সানাউল্লাহ নূরী’, ‘মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ’, ‘আল মাহমুদ ও তাঁর নিজস্ব কাব্য ভুবন’, ‘আব্দুল মান্নান তালিব’ এবং ‘আশির দশকের কবি মোশাররফ হোসেন খান’ প্রভৃতি প্রবন্ধে উল্লেখিত কবি-সাহিত্যিকদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এসব আলোচনায় মতিউর রহমান তার নিজস্ব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সাহিত্যের আলোচনা সাধারণত দু’রকম-তুলনা ও বিশ্লেষণমূলক। মতিউর রহমান এ উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে এসব প্রবন্ধে আলোচনা করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাই তাঁর এ গ্রন্থখানি বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
মতিউর রহমানের সম্ভবত সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থটি হলো ‘ফররুখ প্রতিভা’। বাংলা সাহিত্যের অসামান্য মৌলিক প্রতিভাধর কবি ফররুখ আহমদ। তার সাথে মতিউর রহমানের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। তাঁর একক প্রচেষ্টায় কবির নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দীর্ঘ তিন দশক কাল থেকে মতিউর রহমান ফররুখ- চর্চার সাথে জড়িত। তার রচিত ৪৩২ পৃষ্ঠার এ বিশাল গ্রন্থে ফররুখ আহমদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা স্থান পেয়েছে। এতে মোট ২১টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলির বিষয়বস্তুর দিকে তাকালে তার আলোচনার পরিধি ও ব্যাপ্তি সম্পর্কে সহজেই উপলব্ধি করা যায়। প্রবন্ধগুলি হলোঃ
ফররুখ আহমদ ঃ ব্যক্তি, ফররুখ আহমদের কাব্য প্রতিভা, ফররুখের কাব্য-সাধনার পটভূমি, ফররুখ আহমদের কাব্যালোচনা প্রসঙ্গে, ফররুখ আহমদের রচনাবলী, ফররুখ প্রতিভার স্বরূপ, ফররুখ আহমদের কাব্য-ভাষা, ঐতিহ্যের কবি ফররুখ আহমদ, ফররুখ-কাব্যে রোমান্টিকতা, ভাষা আন্দোলনে ফররুখ আহমদ, হে বন্য স্বপ্নেরা, কাফেলা, ফররুখ আহমদের ‘বৈশাখ’ , সাত সাগরের মাঝি, আজাদ করো পাকিস্তান, সিরাজাম মুনীরা, মুহূর্তের কবিতা, ফররুখ আহ্মদের কাব্য-নাট্য নৌফেল ও হাতেম, ফররুখ আহ্মদের ‘হাতেম তা’য়ী’, অনুস্বার, ফররুখ আহমদের শিশু-কিশোর কবিতা। এছাড়া, পরিশিষ্টে কবির সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি ও ফররুখ-চর্চা বিষয়ক বিস্তারিত তথ্যাবলী গ্রন্থশেষে সংযোজিত হয়েছে। এ গ্রন্থে লেখকের গভীর নিষ্ঠা, পঠন-পাঠন ও জ্ঞান-গবেষণার পরিচয় পাওয়া যায়। ফররুখ-চর্চার ক্ষেত্রে আগ্রহী পাঠকের জন্য এ গ্রন্থ অত্যন্ত উপকারী। শিক্ষার্থীদের জন্য এ গ্রন্থটি অবশ্য পাঠ্য। ফররুখ আহমদের জীবনদৃষ্টি, কবি-প্রতিভা ও তার বিভিন্ন কাব্য সম্পর্কে মতিউর রহমান এ গ্রন্থে তত্ত্ব ও তথ্যপূর্ণ আলোচনা করেছে। আমি এ গ্রন্থখানিকে তার একটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ রচনা বলে গণ্য করি। ফররুখ-অনুরাগী ও গবেষকদের জন্য এটি একটি অবশ্য পাঠ্য গ্রন্থ।
মুহম্মদ মতিউর রহমানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম ‘সাহিত্য চিন্তা’। শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে আধুনিক আলংকারিকদের বিভিন্ন ধারণা রয়েছে। কিন্তু এ সম্পর্কে ইসলামী ধারণা কী, তা অনেকেরই জানা নেই। মতিউর রহমান কুরআন-হাদীসের আলোকে তা সুস্পষ্ট করে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন। গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করা হয়েছেঃ
“যুগে যুগে পৃথিবীর সব দেশেই আলংকারিকগণ সাহিত্যের সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে স্বভাবতই কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। এ পার্থক্যে যেমন ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে, তেমনি যুগ-পরিক্রমায়ও ভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। কেউ বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে, কেউ নৈর্ব্যক্তিক, কেউ পুঁজিবাদী, কেউ সমাজতান্ত্রিক ইত্যাদি নানা দৃষ্টিকোণ থেকে সাহিত্য-শিল্পকলার বিচার-বিশ্লেষণ ও নানা মাপকাঠি নির্ধারণ করেছেন। সাহিত্য-সমালোচনার ক্ষেত্রেও এধরনের পার্থক্য চোখে পড়ে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে সাহিত্যের সংজ্ঞা কী, সাহিত্য সমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গি কীরূপ, সে সম্পর্কে প্রাচীন অথবা আধুনিক কোন আলংকারিকের নিকট থেকেই কোনরূপ ধারণা পাওয়া যায় না।
 “ইসলাম আল্লাহ-প্রদত্ত এক পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা। জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগ সম্পর্কে ইসলামের সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা রয়েছে। আল-কুরআনে সূরা আশ-শূয়ারার ২২৪-২২৭ সংখ্যক আয়াতে সাহিত্য ও শিল্পকলা সম্পর্কে আল্লাহতা’য়ালা সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছেন। এর ব্যাখ্যাস্বরূপ রাসূলুল্লাহর (স) বহু সংখ্যক হাদীস রয়েছে। আল কুরআনের এ নীতিমালা ও হাদীসের আলোকে ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাহাবা কবিগণ এক বিশাল সাহিত্যের ভাণ্ডার নির্মাণ করেছেন। ইসলামি সাহিত্যের উদাহরণ খুঁজতে হলে আমাদের সে সাহিত্যের দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে। ইসলামি সাহিত্য আর অনিসলামি সাহিত্যের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে হলে আরবি সাহিত্যে জাহিলী-কবিদের রচিত সাহিত্য আর সাহাবা-কবিদের রচিত সাহিত্যের মধ্যকার পার্থক্যটা উপলব্ধি করতে হবে।”
 ‘সাহিত্য চিন্তা’ গ্রন্থে মোট ১০টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। প্রবন্ধের শিরনাম থেকে বিষয়বস্তু সম্পর্কে সম্যক ধারণা করা চলে। শিরনামগুলো নিম্নরূপঃ সাহিত্য চিন্তা, সাহিত্যে সুনীতি, রোমান্টিকতার স্বরূপ, ইসলামি সাহিত্যের রূপ ও সংজ্ঞা, সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় মহানবী (স), আমাদের ভাষা-চিন্তা, আমাদের ভাষার স্বাতন্ত্র্য, আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের পরিচয় সন্ধানে, আমাদের সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য, বাংলা কবিতার ঐতিহ্যিক প্রেক্ষাপট।
 ইসলামী সাহিত্য সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই তেমন কোন ধারণা নেই। তাই মুসলিম কবি-সাহিত্যিকরাও সাধারণ মানুষের মতোই সাহিত্য-চর্চা করে থাকেন। কিন্তু মুসলিম হিসাবে সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে ইসলামী ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে আমাদের সকলেরই অবহিত হওয়া অত্যাবশ্যক। বিশেষত যারা তরুণ, তাদের সামনে সাহিত্য সম্পর্কে ইসলামের ধ্যান-ধারণা তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব। মতিউর রহমান এ গুরুদায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে পালনের চেষ্টা করেছেন। আমি মনে করি, এক্ষেত্রে তিনি এক অসাধারণ কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। এ গ্রন্থখানি আমাদের সকলেরই পাঠ করা কর্তব্য। বিশেষত কবি-সাহিত্যিকদের জন্য এবং সাহিত্য নিয়ে যারা চিন্তা-গবেষণা করেন, তাদের জন্য এ গ্রন্থটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমি মুহম্মদ মতিউর রহমানের সব গ্রন্থ পাঠ করার সুযোগ পাইনি। তবে যেটুকু পড়ার সুযোগ পেয়েছি, তা থেকে আমার ধারণা, তার লেখা উপরোক্ত যে চারটি গ্রন্থ সম্পর্কে আমি সংক্ষেপে আলোচনা করার প্রয়াস পেলাম, সে কয়টি গ্রন্থ তাকে বাংলা সাহিত্যে তথা বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত করবে এবং নিঃসন্দেহে এ গ্রন্থগুলি তাকে বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের নিকট স্মরণীয় করে রাখবে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

নিব

:উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তনের একটি শোভন ছড়াপত্র

বাঙলা

আফসার নিজাম সম্পাদিত : চিন্তাশীল পাঠকের মননশীল সৃজন

%d bloggers like this: