চলচ্চিত্র তথা মিডিয়ার জন্য লেখা


শেখ আবুল কাসেম মিঠুন

আমরা মাধ্যম বা মিডিয়াগুলোতে যা দেখি, শুনি বা পড়ি তা সবই একটি জাতির সংস্কৃতির প্রকাশ্য রূপ। মাধ্যম বলতে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, কমপিউটার, রেডিও, মঞ্চ, পত্র-পত্রিকা, ভিসিডি, ক্যাসেট, বই-পুস্তক, ম্যাগাজিন সবই বুঝায়। আর এসবের মাধ্যমে যে সংস্কৃতির যোগান দেয়া হয় তার উপস্থাপনা একজন লেখকের চিন্তাপ্রসূত এবং গল্পকেন্দ্রিক।

অনেক বিদেশি টিভি চ্যানেল খবর পড়ার মধ্যেই একটা বিশেষ খবরকে বিশ্বাসযোগ্য এবং আরো রসময় ও হৃদয়গ্রাহী করে তোলার জন্য গল্প দেখানোর মতো করে দেখায়। বাস্তব জীবনেও আমরা গল্প শুনতে ও বলতে ভালোবাসি।

অফিস থেকে ফিরে কেউ অফিসের গল্প বলে, দেশের বাড়ি থেকে ফিরে এসে প্রায় লোকই দেশের গল্প বলে। ছাত্ররা ছুটিতে বাড়ি গিয়ে কলেজ-ভার্সিটি এবং হোস্টেল বা মেসের গল্প বলে। দেশের বাড়ির কোনো আত্মীয় হলে মানুষ তার কাছে দেশের নানান গল্প শুনতে চায়। চিড়িয়াখানা, যাদুঘর বা সংসদ ভবনে কেউ গেলে বাড়ির লোক বা বন্ধুরা সেখানকার গল্প শোনার বায়না ধরে।

ছোটবেলায় বাবা-মা, দাদা-দাদী বা নানা-নানীর কাছে গল্প শুনতে চায়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বিদেশ থেকে কেউ এলে তার কাছে বিদেশের গল্প শোনার জন্যতো রীতিমতো ভিড় লেগে যায়। মোটকথা মানুষ সদা-সর্বদা কোনো না কোনোভাবে গল্প বলছে এবং শুনছে।

রসিয়ে রসিয়ে একটা সামান্য ঘটনাও কেউ কেউ এমনভাবে বলতে পারে যে শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শোনে। আর রসিয়ে গল্প বলার জন্য ব্যক্তির একটা বিশেষ জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় পরিচিত মহলে। গল্পের মাধ্যমে যেসব ঘটনা এবং বিষয়বস্তুর প্রকাশ ঘটে তা থেকে আনন্দের সঙ্গে মানুষ শিক্ষা, বৈধ-অবৈধ কর্মকাণ্ডের স্বরূপ এবং লাভ-ক্ষতির দিকগুলো ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে।

আর এই গল্প চলচ্চিত্র তথা মিডিয়ার মূল উপাদান। সাহিত্য, কাব্য, সংগীতের মূল উপাদানও গল্প। কোথাও তা মূর্ত কোথাও তা বিমূর্ত, কোথাও তা মূখ্য কোথাও তা গৌণ, কোথাও তা প্রত্যক্ষ কোথাও তা পরোক্ষ।

টিভি, রেডিও, পত্র-পত্রিকায় যেসব সাক্ষাৎকার, আলোচনা, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠান আমরা দেখি সেসব অনুষ্ঠানের নেপথ্যে একজন লেখক সত্তার চিন্তা-ভাবনা সক্রিয় থাকে।

বিংশ শতাব্দির সূচনাতেই চলচ্চিত্রের আগমন (টিভি, রেডিও, ভিডিও আর আজকের কমপিউটারসহ) আর এসব মাধ্যম আজ সমাজ-সংস্কৃতি ও সভ্যতার অন্যতম অনুষঙ্গ।

এসব মাধ্যমে মানুষ তার মনের চাহিদার প্রতিফলন দেখতে আগ্রহী। আজকের যুগে প্রায় প্রতিটি মানুষই গল্প (খবর, ইতিহাস, জীবনাচারণ, বক্তব্য, দেশ-বিদেশের প্রকৃতি … ইত্যাদি) পড়ার চেয়ে বা শোনার চেয়ে দেখার দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। এজন্য প্রকাশনার মাধ্যমটির সাথে যারা ব্যবসায়িকভাবে জড়িত, তারা তাদের ব্যবসা নিয়ে চিন্তিত। আর প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে যারা লেখক হিসেবে জড়িত তারা বেশিরভাগই দর্শনযোগ্য অর্থাৎ মিডিয়ার লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে আগ্রহী।

এখনতো দশ সেকেন্ডের একটা বিজ্ঞাপনচিত্রও গল্পভিত্তিক হয়ে গেছে। হয়তো সামনে এমন দিন আসবে যে বক্তারা কষ্ট করে আর জনসভায় না গিয়ে তাদের বক্তব্য কমপিউটার ও ভিসিডির মাধ্যমে বাজাজাত করবেন। আর তার পেছনেও থাকবে একজন লেখকের সক্রিয় ভূমিকা।

তাই এই মুহূর্তে চলচ্চিত্র, টিভি, ভিসিডি, ক্যাসেট, মঞ্চ ইত্যাদির জন্য লেখালেখির কর্মটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেখার কাজটি গদ্যসাহিত্য, কাব্য বা সংগীতের মাধ্যমে তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ প্রথমে লেখার কাজ তারপর চিত্রনাট্য তারপর চলচ্চিত্র … এই হলো চলচ্চিত্রের সংক্ষিপ্ত ও সামগ্রিক রূপরেখা। আর ক্যামেরা হলো চলচ্চিত্রের বাহন।

লেখার পরের কাজগুলি সবই টেকনিক্যাল, আমি শুধুমাত্র লেখালেখি করার জন্য যে প্রস্তুতি, এই প্রবন্ধে সেই বিষয়েই আলোচনা করছি বিধায় তারই মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার চেষ্টা করবো। আমরা সিনেমা, টিভি এবং কমপিউটারের পর্দায় যা কিছুই দেখি তা সবই চলচ্চিত্র। বিষয়বস্তু, বক্তব্য, সময়সীমা, উপস্থাপনা ও সামগ্রিক আঙ্গিকের বিচারে এসবের শ্রেণীভাগ করা হয়েছে। যেমন পূর্ণ দৈর্ঘ চলচ্চিত্র, স্বল্প দৈর্ঘ চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র, বিজ্ঞাপন চিত্র, সংবাদচিত্র, টেলিফিল্ম, প্যাকেজ নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি। আবার সংস্কৃতি সংক্রান্ত এসব মাধ্যমগুলোকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে:
১. শব্দজনিত : ভাষা (সংলাপ), নৃত্য, সংগীত, নাট্যকলা ইত্যাদি।
২. টেকনিক্যাল : বই পুস্তক মুদ্রণ, সংবাদপত্র, রেডিও, ভিসিডি ক্যাসেট (কারিগরিক মাধ্যম) ইত্যাদি।
৩. ছবি ও শব্দ তরঙ্গজনিত বৈজ্ঞানিক মধ্যম : কমপিউটার, টিভি ও চলচ্চিত্র। এই মাধ্যমের প্রাণকেন্দ্র হলো চলচ্চিত্র।
একমাত্র চলচ্চিত্রের গর্ভেই উক্ত সকল মাধ্যমগুলোর আবাসস্থল। অতএব, একমাত্র চলচ্চিত্রের জন্য লেখার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারলে বাকি বিষয়গুলোর জন্য লেখা সহজ হয়ে যায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে চলচ্চিত্রের লেখালেখির কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম বা পদ্ধতি নেই। শুধু মাত্র নিম্নের গুণ ও বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করতে পারলে চলচ্চিত্রের জন্য লেখালেখি করা সম্ভব। এই চারটিই একজন লেখকের জন্য মৌলিক গুণ বা বৈশিষ্ট্য।

১. সাহিত্যবোধ
প্রচুর লেখাপড়া করতে হবে। ভালো সাহিত্য ভালো সাহিত্যবোধ তৈরি করে। অন্যান্য শিক্ষার জন্য ইতিহাস, ভূগোল, ভ্রমণ কাহিনী, রাজনীতি বিষয়ক পুস্তকাদি পড়া উচিৎ। বিশ্বের বিভিন্ন জনপদ, তাদের জীবনাচারণ, পেশা এবং মানুষ ও প্রকৃতি সম্বন্ধে ধারণা অর্জন করতে হবে। আর এসব জ্ঞান থেকে সুস্থ রুচিবোধ আয়ত্ত করা কর্তব্য।
২. চলচ্চিত্রবোধ:
ভালো ভালো ছবি দেখতে হবে। দর্শকের আবেগী দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং সমালোচনামূলক চিন্তা নিয়ে ছবিগুলোর পরিবেশ প্রকৃতি, চরিত্র, সংলাপ, চরিত্রের আচার-আচরণ ও নৈতিকবোধ দেখতে হবে। চলচ্চিত্র বিষয়ে রচনা পড়তে হবে।
৩. বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি:
নিজের জ্ঞানবুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্লেষণের ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। একজন যুক্তিবাদী প্রবন্ধকারের দৃষ্টিভঙ্গি আয়ত্ত করতে হবে।
৪. মনস্তত্ত্ব
মানুষের অভিব্যক্তি, বিশেষ করে মানুষের দৃষ্টিপাতের অর্থ, মুখ ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গির অভিব্যক্তি দেখে তার মানসিক অবস্থা নির্ণয় ও অনুধাবনের চেষ্টা করতে হবে। একজন লেখকের জন্য মনস্তত্ত্ব অধ্যয়ন করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

উক্ত চারটি মৌলিক বিষয় সম্বন্ধে চর্চা করা এবং জ্ঞান অর্জন করতে পারলেই যে ভালো লেখক হওয়া যাবে তা নয়। তবে লেখক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করতে চাইলে উক্ত বিষয়গুলো আয়ত্তে থাকা চাই। এপর অনুশীলন ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়েই ক্রমে ক্রমে চলচ্চিত্রের লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সম্ভাবনা অনেক বেশি সুনিশ্চিত হয়ে ওঠে।

উক্ত চারটি বিষয়ে একজন লেখককে লেখালেখি করার প্রধান প্রধান চারটি বৈশিষ্ট্যর দিকে ধাবিত করে: ১. পরিবেশ সৃষ্টি ২. চরিত্র সৃষ্টি ৩. অপ্রধান ঘটনার সঙ্গে প্রধান ঘটনার সংযোগ স্থাপন এবং ৪. খন্ড খন্ড পরস্পর বিযুক্ত বিষয়কে প্রধানত পরস্পরের সাহায্যে একটি অর্থসুত্রে গেঁথে তোলা।

চিত্রনাট্য রচনা ও সম্পাদনার কাজেও উক্ত চারটি বৈশিষ্ট্য সমভাবে প্রযোজ্য। এখন প্রশ্ন হলো, ইসলামী আন্দোলনের একজন কর্মী কি উক্ত গুণ বা বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করতে পারলে লেখক হিসেবে তার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হবে? এর জবাব এক কথায় ‘না’। তাকে আরো কিছু অর্জন করতে হবে। কারণ একটা বিশেষ কিছু করতে গেলে বিশেষ কিছু জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা-ভাবনা মূল্যবান এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকতে হবে। বিশেষ কিছু আকিদা বিশ্বাসকে ধারণ করতে হবে, তাকে ভিত্তি করতে হবে।

ইসলাম একটি বিশেষ জীবনব্যবস্থা, একটি বিশেষ আদর্শ। এই বিশেষ আদর্শকে ভিত্তি করে যখন কেউ কোনো কর্মকাণ্ড রপ্ত করতে চাইবে তখন অবশ্যই তাকে উক্ত আদর্শ প্রসঙ্গে ভালোভাবে জানতে ও বুঝতে হবে। কর্মের স্বরূপ হিসেবে ইসলামের নানামুখি শিক্ষা বিদ্যমান।

যেহেতু কর্মটি গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমের জন্য লেখালেখি সেহেতু নিজেকে লেখক হিসেবে প্রস্তুত করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করা বাঞ্ছনীয়।

সূর্যের আলো ও রাতের কৃত্রিম আলোর মধ্যে বিস্তর তফাৎ। শুধুমাত্র ইসলামকে জেনে বুঝে গণমাধ্যমের জন্য কিছু রচনা করা, রাতের কৃত্রিম আলোর মতো। তা দিয়ে ব্যক্তি প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। কিন্তু ইসলামকে জেনে বুঝে, আত্মস্থ করে ব্যক্তিজীবনে আমল করে, নিজের জ্ঞানবুদ্ধি বিবেক-বিবেচনা দিয়ে আত্মাকে প্রসারিত ও ব্যাপক এবং পবিত্র করতে পারলে তার দৃষ্টিভঙ্গির চিন্তা-ভাবনা এবং লক্ষ ও উদ্দেশ্য হবে সর্বজনীন, মানবীয় এবং সমগ্র মানবকল্যাণে সমৃদ্ধ। তখন তার আলো হবে সূর্যের আলোর মতো। শত্র“ মিত্র সবার জন্যে। তখন লেখকের কলম যা লিখবে তা ইসলামী হবে বলেই বিশ্বাস করি। কারণ ইসলামকে জেনে বুঝে আত্মস্থ করা ও ব্যক্তি জীবনে আমল করার অর্থই হলো কুরআন ও সুন্নাহর চিরন্তন আলোক রাজ্যে অবগাহন করা। তার থেকে আলোই ঠিকরে বেরুবে, তা অন্ধকার বিলোবে না। যেমন বরফের কাছে আমরা ঠান্ডারই আশা করি। বরফের কাছে কেউ তাপ আশা করে না।

একমাত্র ইসলামেই রয়েছে ব্যাপক বিস্তৃত চিন্তার রাজ্য, আর সেই চিন্তার আলোকে অজস্র কিসিমের রচনা লেখা সম্ভব। বর্তমানে একটা ইসলামী টিভি চ্যানেল চালাবার মতো কেনো অনুষ্ঠান তৈরি করা আদৌ সম্ভব নয়। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে যে বিপুল প্রতিভাদীপ্ত তরুণদের উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, তারা যদি লেখালেখির জন্য প্রাথমিকভাবে নিজেদেরকে প্রস্তুত করেন তবে তাদের দ্বারা বিপুল সংখ্যক চলচ্চিত্রই শুধু নয়, এমন সব বিভিন্নমুখী অনুষ্ঠান নির্মাণ সম্ভব যা দিয়ে একটা মাত্র ইসলামী টিভি চ্যানেল নয়, চার পাঁচটা টিভি চ্যানেল দিবারাত্র চালানো সম্ভব। ইসলামে এতো বিপুল, ব্যাপক ও বিশাল চিন্তার অবকাশ রয়েছে, আরো রয়েছে আগ্রহী প্রতিভাধর মেধাবী সব শিল্পী ও লেখক।

ইসলামী শিক্ষা আত্মস্থ করার পর, একজন লেখক যদি কোনো সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানের প্রশ্নমালা তৈরি করেন তবে প্রশ্নের স্টাইল এবং অর্থই হবে অন্য ধরনের। প্রশ্নগুলো জাহিলীর পরিবর্তে হয়ে উঠবে মানবিক, সর্বজনীন এবং পূর্ণাঙ্গ ঐতিহ্যমাখা। এমনিভাবে কোনো আলোচনা অনুষ্ঠান, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, বিজ্ঞাপন চিত্রের ভাষা এমনকি খবর পাঠের ভাষা, রঙ, রূপও বদলে যাবে। জাহেলিয়াত ও ইসলামের পার্থক্য শুধু সামান্য কতোগুলো মোটা দাগের চিন্তা ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ পার্থক্য শোয়া, ঘুমানো, উঠাবসা, পানি খাওয়া থেকে শুরু করে আলাপচারিতা, সম্বোধন, ভাষা ও শব্দবিন্যাসে এবং শেষমেষ যুদ্ধ, সন্ধি সবকিছুতেই সেই পার্থক্যই ফুটে উঠবে, একজন লেখকের কলমের ডগায়। কিন্তু ইসলামকে সঠিকভাবে না জেনে না বুঝে না গ্রহণ করে যদি কেউ কিছু লেখেন তবে তার লেখা দেখে মনে হবে তিনি মডেল হিসেবে জাহেলিয়াতকে সামনে রাখছেন, জাহেলিয়াতকে তিনি মানদন্ড হিসেবে স্থির করেছেন। তাই তার লেখাগুলো জাহেলিয়অতের ট্রাজেডি, কমেডি ও রোমান্টিকতায় পূর্ণ হতে পারে।

‘নাÑ ইসলাম তা নয়। আর তা যে নয় তা বুঝতে গেলে প্রথমে যা দরকার তা হলো মন-মস্তিষ্ক থেকে সমস্ত জাহেলি দৃশ্যপট ও চিন্তা ঝেড়ে ফেলতে হবে। পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত পরিবেশের সমস্ত লোকজন ও বন্ধু-বান্ধব সম্পূর্ণ ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ ও ইসলামী চেতনায় উদ্দীপ্ত হতে হবে। তা না হলে তা বর্জন করতে হবে। চোখের মধ্যে গুঁজে কিছু দেখা যায় না। বস্তুকে একটু দূরে রাখলেই তা দেখা যায়। তদ্রুপ জাহেলিয়াতের বায়ুমন্ডলে ডুবে থেকে জাহেলিয়াতকে চেনা সম্ভব নয়। ঈমানের সমুদ্রে ডুবে থেকে দূর থেকে জাহিলিয়াতকে দেখতে হবে। জাহেলি সংস্কৃতি যে কোনো মডেল বা মানদন্ড নয়, ইসলাম যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির আধার এই সত্যটিকে স্পষ্ট দৃঢ়মূল ধারণা ও বিশ্বাসে যুক্তিসহ প্রথিত করতে হবে। যুক্তিসহ এই কারণে যে একজন লেখককে যুক্তি প্রদর্শন করতে হয়। একজন লেখককে যুক্তিবিষয়ক জ্ঞান লাভ করতে পারবেন যদি তিনি মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর রহ. এর রচনাগুলো গভীর অর্ন্তদৃষ্টিসহকারে পাঠ করেন। সঙ্গে সঙ্গে শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী রহ. এর হুজাতুল্লাহিল বালিগাহ এবং অনুষঙ্গ হিসাবে মাওলানা আকরম খাঁ রচিত মোস্তফা চরিত, সাহাবা কেরাম রা.দের জীবনী ইত্যাদি।

পৃথিবীর সবকিছুই নির্দিষ্ট বন্ধনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় এবং কার্যকরী ও কল্যাণময় হয়ে ওঠে। পূর্ণ স্বাধীনতা কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না। মানুষের চিন্তাকেও নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে থেকে ধাবিত করতে হয়। যতো বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসাবিদ, অঙ্কবিধ, যতো শ্রদ্ধাভাজন নেতা, সমাজসেবক সবাই চিন্তা করেছেন নির্দিষ্ট গন্ডিতে এবং সেই বন্ধনেই সফল হয়েছেন। যারা চিন্তার কোনো বন্ধন মানে না তারা নিজেরা যেমন বিভ্রান্ত, অন্যকেও ভ্রান্ত পথে তারা চালাবার চেষ্টা করে। আসলে তারা মানবতার জন্য অক্যাণকর। বিক্ষিপ্ত মাটি তখনই কার্যকরী হয় যখন তা একটা নির্দিষ্ট বন্ধনের খাপে ভরে ইট তৈরি হয়। আমরা যা কিছু দেখি ব্যবহার করি তার সবই নির্দিষ্ট বন্ধনে আবৃত। চিন্তাকেও একটা সত্য ও সঠিক বন্ধনের আওতায় লালন করলেই তা কার্যকরী, কল্যাণকর ও সৃজনশীল হয়ে ওঠে। আর সেই সত্য ও সঠিক বন্ধনটি হলো ইসলাম। পবিত্র কুরআন ও রসুল সা.-এর হাদিস।

উপরোক্ত আলোচনার যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে এটুকু নিশ্চিন্তে ও নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, চিন্তা-ভাবনা, অনুভব, উপলব্ধি, অনুধাবন ক্ষমতা ও মন-মস্তিষ্ক ও হৃদয়াবেগকে জাহেলিয়াতের বিক্ষিপ্ততা, বিশৃঙ্খলা ও সঙ্কীর্ণ থেকে মুক্ত এবং পবিত্র করে ঈমানের চিরন্তন পবিত্র বন্ধনে বন্দি হতে হবে। ঈমানের ওপর ভিত্তি করেই পৃথিবীকে, মানুষকে, প্রাণী জগৎকে এবং বস্তুকে দেখতে হবে, ভাবতে হবে।

আপাতত দৃষ্টিতে জাহেলিয়াতে কোনো কর্মপদ্ধতিকে ভালো বা কল্যাণময় মনে হতে পারে, কিন্তু সেই ভালো ও কল্যাণের সঙ্গে ইসলামের ভালো ও কল্যাণময় পদ্ধতির আকাশ-পাতাল পার্থক্য।

ছোট্ট একটা মাত্র উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টির সঠিকরূপ ধরা পড়ে যেমন নায়ক কোনো বস্তিতে গিয়ে খাদ্য বস্ত্র অর্থ বিলিয়ে দেয় গরিবদের মধ্যে (বাস্তবে রাজনীতিবিদরা যেমনটি করেন) এর পরিণামে দেখা যায় দর্শকরা নায়কটিকে ভালোবেসে ফেলে, তার কান্নায় কাঁদে, তার হাসিতে হাসে, তার কষ্টে কষ্ট অনুভব করে। এমন কি নায়কের এমনসব কর্মে নায়িকাও তাকে ভালোবেসে ফেলে।

জাহিলী দৃষ্টিতে নায়কের এই কাজটি ভালো কাজ নিঃসন্দেহে। কারণ জাহিলি বুদ্ধিজীবী ও নেতারা বলেন, মানুষ এতে গরিবদের সেবা করতে প্রেরণা পাবে। গরিবরাও উপকৃত হবে, এই ধরনের নানাবিধ যুক্তি দেখিয়ে জাহিলি দার্শনিক বুদ্ধিজীবী ও শাসক নেতাদের মতামত পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। জীবনের সকল দিক এমনকি শিশু থেকে তাবৎ মানুষের মন-মস্তিষ্ক, চিন্তাধারার রঙ, রূপ, রস, আর্বতন ইত্যাদি নিয়ে যে মনোবিজ্ঞান নামক পুস্তকাদি রচিত হয়েছে যা কলেজ ভার্সিটিতে পড়ানো হয় তার মধ্যে মানুষের আনন্দ, বেদনা, দুঃখ, বিরক্তি, রাগ, হিংসা-বিদ্বেষ প্রসঙ্গে মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা বিস্তারিত মতামত পেশ করেছেন, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। এমনিভাবে, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি বিষয়ক পুস্তকাদি এক কথায় মানুষের মানবিক নৈতিক ও আদর্শিক বিষয়ে যতো দিক আছে যা ঐসব পুস্তকাদির মাধ্যমে ভালো, কল্যাণময় হিসেবে সর্বজনগ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা চলছে বিগত তিন শতাব্দি থেকে। আপাতত দৃষ্টিতে তার কল্যাণকারিতা বিশেষ কিছু শ্রেণীর মধ্যে বিচরণ করলেও পৃথিবীর কোনো অংশেই বৃহৎ মানবগোষ্ঠীর মধ্যে তার কল্যাণকারিতা চোখে পড়েনি। মানুষ শুধু আশায় থাকে হয়তো তাদের ভাগ্যেও কল্যাণকারিতা জুটবে। কিন্তু গভীরভাবে ইসলামী মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি বিষয়ক পুস্তকাদি অধ্যয়ন করলে বোঝা যাবে জাহেলী সমস্ত মতবাদ ও নিয়ম-প্রথা, রসম- রেওয়াজ ভুল এবং ব্যর্থ। আজও ইসলামী মতবাদ, সভ্যতা-সংস্কৃতি, আইন-কানুন সফল এবং কেয়ামত পর্যন্ত সর্বশ্রেণীর সমাজে তা সফলতাই বয়ে আনবে।

নায়কের উদাহরণটিতে আবার ফিরে আসা যাক নায়ক যে ভালো কাজ করলো তার ফলে কিছু দর্শক খুশি হলো, নায়িকা তাকে ভালোবাসলো। অর্থাৎ সবাই প্রত্যক্ষ বা পরক্ষভাবে নায়কটির মতো হতো চাইলো। নায়কটি পার্থিব স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিলো অর্থাৎ নায়িকাকে পেতে চেয়েছিলো তা সে পেলো।  এখন কেউ যদি বলে ‘কই নায়কতো কোথাও বলেনি যে সে এইকাজ করে নায়িকাকে পেতে চায়, কিন্তু সে রকম উদ্দেশ্য তার ছিলো না।’ কিন্তু যদি প্রশ্নকর্তাকে উল্টো প্রশ্ন করা হয় তাহলে নায়ক এমন দান-খয়রাত করলো কেনো?  গরিবরা উপকৃত হবে বলে? সে নিজে তৃপ্তি পাবে বলে? প্রশ্নকর্তা হয় তো বলবেন হ্যাঁ। যদি হ্যাঁ অথবা না যাই ধরে নেয়া যায় তার শেষমেষ ফল হবে এই যে, এতে দর্শক ও নায়িকার মনে জন্মাবে শিরক। কোনো বিশেষ মানুষের নিজস্ব আদর্শের ওপর অগাধ ভক্তি-শ্রদ্ধা, যা পার্থিব স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করবে মানুষ এবং মাকড়সার জালের মতো ফিতনা জন্ম নেবে মানুষের অন্তরে। সমাজে তার প্রকাশ ঘটবেই। শিরকবাদী মানুষ শিরক উদ্ভুত ফ্যাসাদে লিপ্ত হবে। নেতাপূজা, ব্যক্তিপূজা, মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি, সঙ্কীর্ণ চিন্তার প্রসার মানুষকে সফলতার মাপকাঠিতে শ্রদ্ধাভাজন করে তোলা, বিচার করা হয় না মানুষটি কোনো পথে কিভাবে সফল হলো … আদি রসাত্মক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরকে আদর্শ মনে করা তাদের মতো ইন্দ্রিয়পূজারী হতে চাওয়া, মানুষের অবাধ স্বাধীনতা স্বীকার করা, … এর ফলশ্র“তিতে সমাজে অস্থিরতা ও হিংস্রতার ব্যপ্তি ঘটানো এসবই জাহিলি ভালো ও কল্যাণময়তার প্রকাশ্য রূপ এবং ফসল।

তাই হাজার রকমের লোক হাজার ধরনের ভালো ভালো কথা বললেও বা ভালো ভালো কাজ এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তার ফল দাঁড়ায় এমন যে, পাত্র একদিকে ভরলে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে যায়, সেদিকে চাপলে এদিক দিয়ে উপচে পড়ে যায়। কোনোদিকেই সামাল দেয়া যায় না। বহুজাতিক কোম্পানির অষুধের মতো এক রোগ সারলেও অন্যরোগ ধরে।

জাহেলী মানুষের ভালোবাসার মধ্যেও কোনো কল্যাণকারিতা নেই। কারণ জাহেলিয়তের সব ভালো ও কল্যাণকারিতা ঈমানহীন। উল্লিখিত নায়ক যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য দান খয়রাত করতো তবে নায়িকা এবং দর্শকরাও আল্লাহ আকবর বলে ধ্বনি তুলতো। তারা আর শিরকে লিপ্ত হতো না এবং সবার মনে এই আগ্রহই জন্মাতো যে তারা আল্লাহর জন্যই দান-খয়রাত করবে। তখন ব্যক্তি নায়ক পূজনীয় হতো না আল্লাহই যে একমাত্র মালিক একথাই প্রতিষ্ঠিত হতো। আর এই কর্মের জন্য নায়ক নায়িকার রিপু তাড়িত ভালোবাসাকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতো। নায়িকা ভালোবাসতো আল্লাহকে ভালোবাসা এক ব্যক্তিকে দান খয়রাত করা কোনো ব্যক্তিকে নয়। এমনিভাবে সমস্ত দুনিয়ায় ঈমানের সঙ্গে সৎকাজ শুধু কল্যাণই ছড়ায়। ফিতনা ফ্যাসাদ দূরীভূত হয়। তখন হাজার কোটি লোকের হাজার কোটি ভালো কথা ও ভালো পদক্ষেপ নেবার দরকার হয় না তখন একজন আবু বকর রা. অথবা একজন হযরত ওমর রা. এর একটি কথাই ডালপালা বিস্তার করে সমস্ত পৃথিবীতে কল্যাণের শীতল বৃষ্টিপাত ঘটাতো। এবং আজও ঘটাবে ইনশাআল্লাহ। জাহেলিয়াতের প্রতিটি ভালোকে গভীরভাবে চিন্তা করলে তার ভিতরের সমস্ত অকল্যাণকারিতা স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়বে।

আমাদের বুদ্ধি বিবেচনা আর জ্ঞানের বাইরেও বহুবিদ মন্দ এবং অকল্যাণ রয়েছে যার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও আমাদের জ্ঞানের বাইরে, এখনো উদঘাটিত হয়নি এমন বহু ভালোর মধ্যে খারাপ রয়েছে। তাই এমন সব বিষয় নিয়ে লিখতে হলে সেখানে অন্ধভাবে ঈমান সহযোগে তা লিখতে হবে, যা আল্লাহপাক হুকুম করেছেন। তাহলে অবশ্যই সেইসব রচনার কল্যাণকারিতা প্রতিটি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ  ও রাষ্ট্রে চিরন্তন স্পর্শ ফেলবে। শুধুমাত্র লেখককে চারটি বিষয় আস্থা রাখতে হবে।
১. আল্লাহ আখেরাত ও রিসালাতের প্রতি পূর্ণ ঈমান
২. আল্লাহর সঙ্গে লেখকের নিজস্ব সম্পর্ক দৃঢ়তর করা
৩. রচনায় বা গল্পে, পরিবেশ, চরিত্র, ঘটনা ও সংলাপ রচনায় নীতিগত বৈশিষ্ট্য রক্ষায় আল্লাহর প্রতি ভয় পোষণ। যেমন : পুত্র কখনো পিতার কাঁধে হাত রেখে বলবে না হ্যালো ড্যাড, আমি ঐ মেয়েকে ভালোবাসি। ইসলাম পিতাপুত্রের বন্ধুত্ব সম্পর্ক রক্ষার কথা বললেও সেখানে নৈতিকতার বন্ধন আছে। পুত্র পিতাকে সম্মান করবে, ভয় করবে, মান্য করবে এবং লজ্জা করবেÑ এটাই ইসলামী নৈতিকতা। জাহেলিয়াত এই নৈতিকতাকে অনুসরণ করে এসেছে দীর্ঘকাল। এখন জাহেলিয়াতের চাকচিক্যে সবকিছু ভুলে গিয়ে এই অনৈতিকতাকে ইসলাম অনুসরণ করতে পারে না। এ ধরনের অনৈতিকতায় পরিবার ও সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
৪. চরিত্রগুলির আচার-আচরণ, লেন- দেন, কথা-বার্তা সংযোজনে পরকালকে সামনে রাখতে হবে। মোটকথা আল্লাহর আইনকে মান্য করা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা, তাকে সমর্থন করা অনুসরণ করা একজন লেখকের অবশ্যই ফরজ। (রাসুলুল্লাহ সা. আল্লাহর প্রতিটি আইনের সামনে মাথা নত করে দিয়েছেন এবং মান্য করেছেন, প্রতিষ্ঠা করেছেন।)

উক্ত বিষয়গুলি অধ্যবসায়, অনুশীলন ও সাধনার মাধ্যমে নিজের জীবনে প্রতিফলিত করতে পারলেই তার রচনার বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকে তা লক্ষ্য করা যাবে বা ফুটে উঠবে। লেখক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য উপরোক্ত বিষয়গুলি একান্ত প্রয়োজন। এতোক্ষণ যে যে বিষয়ের ওপর আলোচনা হলো যেমন সংস্কৃতি সংক্রান্ত গণমাধ্যম চারটি মৌলিক গুণ ও বৈশিষ্ট্য, চারটি প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য ও চারটি বিষয় ভালো করে রপ্ত করা বুঝা, অনুধাবন ও আত্মস্থ করার পর লেখককে ভাবতে হবে এই আদর্শকে তিনি প্রতিটি ব্যক্তিজীবনে, পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। কারণ আল্লাহপাকের ঘোষণা অনুযায়ী তিনি মানবজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার মূলমন্ত্র অর্থাৎ আল্লাহর দীন পৌঁছে দিয়ে তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্বের পথে ডাক দেবার দায়িত্বে তিনি নিয়োজিত।

মনে মস্তিস্কে এই বিশ্বাস গেঁথে নেবার পর লেখার জন্য পঁচটি মৌলিক উপাদান তাকে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে বুঝে নিতে হবে।
১. পার্থিব জীবন সম্পর্কে লেখকের ধারনা
২. লেখকের জীবনের চরম লক্ষ্য
৩. লেখকের বুনিয়াদী আকীদা ও চিন্তাধারা
৪. সংগঠনিকভাবে লেখক প্রশিক্ষিত কি না
৫. সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে লেখকের সম্যক ধারণা
দুনিয়ার প্রত্যেক সংস্কৃতি এই পাঁচটি মৌলিক উপাদান দিয়েই গঠিত হয়েছে। বলা বাহুল্য ইসলামী সংস্কৃতিরও সৃষ্টি হয়েছে এই উপাদানগুলোর সাহায্যই। (মাওলানা মওদূদী রহ. ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা।)

প্রবন্ধের প্রথম থেকে আলোচিত গুণ বৈশিষ্ট্যগুলো এবং উপরোক্ত পাঁচটি উপাদানকে সমন্বয় ঘটিয়ে এক একজন লেখক যদি নিজেকে প্রস্তুত করেন তবে চলচ্চিত্র ও মিডিয়া ইসলামী সংস্কৃতির জোয়ার আনতে পারবে, যে জোয়ারে ভেসে যাবে জাহেলীয়াতের সমস্ত সংস্কৃতির শয়তানি খেলা।

আগ্রহী পাঠকদের সুবিধার্থে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, উপরোক্ত পাঁচটি মৌলিক উপাদানের তিনটি উপাদানের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ জানার জন্য তারা মাওলানা মওদূদী রচিত ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা’ বইটি পড়তে পারেন। বাকি দুইটি উপাদান যথা ‘ব্যক্তি সংগঠন’ যা আমি ‘সাংগঠনিকভাবে লেখক প্রশিক্ষিত কিনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছি এবং সমাজব্যবস্থা’ সম্পর্কে জনার জন্য মাওলানা তাঁর রচিত ‘হাকীকত সিরিজ’ এবং ‘ইসলামের জীবন পদ্ধতি’ পুস্তকের নাম উল্লেখ করেছেন।

যার চলচ্চিত্র বা মিডিয়ার জন্য লিখতে আগ্রহী তারা এই প্রবন্ধের অন্যান্য গুণ ও বৈশিষ্ট্য অর্জনের পাশাপাশি অবশ্যই ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা, হাকীকত সিরিজ এবং ইসলামী জীবন পদ্ধতি পড়বেন, বারবার পড়বেন।

একজন লেখক যদি যথার্থ জ্ঞান লাভ করতে পারে তবে মিডিয়ার জন্য তার লেখার মধ্যে কোনো বিকৃতি থাকবে না। আর  যথার্থ জ্ঞান বলতে একমাত্র আল্লাহপাকের কুরআনের জ্ঞান। কুরআনের জ্ঞান ছাড়া অন্য কোনো উৎসের জ্ঞান ত্র“টিযুক্ত। ত্র“টিযুক্ত শিক্ষা ও সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বলেই তার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। কল্যাণ থাকলে ইসলামী জ্ঞানের প্রয়োজন হতো না। অতএব লেখককে কুরআন ও হাদিস বারবার অর্থসহ বুঝে পড়তে হবে।

আগেই বলেছি জাহিলি চলচ্চিত্র বা মিডিয়ার প্রদর্শন ইসলামী মিডিয়ার মডেল বা মানদন্ড হতে পারে না। ইসলাম একটি আদর্শ একটি চিরন্তন জীবনব্যবস্থা। অন্ধকার নেমে এলে যেমন আলো জ্বালাতে হয়, জাহিলি সমাজে তেমনি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হয়। আর ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা লিপ্ত তারা যা কিছু প্রচেষ্টা চালাবে তা ঐ ইসলামী আদর্শ মোতাবেক। ভিন্ন আদর্শে ইসলাম প্রতিষ্ঠা চলে না। অতএব আদর্শটিকে আমাদের ভালোভাবে বুঝতে হবে। আর শুধু বুঝলে হবে না পূর্ণাঙ্গ ঈমানের সাথে বুঝতে হবে। মেনে নিতে হবে। পালন করতে হবে।

আন্দোলনে শরিকদের শুধু প্রতিভা থাকাটাই যথেষ্ট নয় বরং ঈমানের সঙ্গে জেনে বুঝে প্রতিভার বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন। এজন্য তাফহীমুল কুরআন, ইসলামী সাহিত্য, রসূল সা.-এর জীবন ও সংগ্রাম, সাহাবা রা.দের জীবন ও কর্ম গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। এছাড়াও নিম্নের বইগুলো পড়া যেতে পারে।
১. আল জিহাদ
২. উপমহাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন ও মুসলমান
৩. ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলন
৪. ইসলমের রাজনৈতিক মতবাদ
৫. শান্তিপথ
৬. ইসলামের মুক্তির উৎস
৭. ইসলাম ও জাহেলিয়াত
৮. মুসলমানদের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মসূচি
৯. ইসলামে নৈতিক দৃষ্টিকোণ
১০. পলাশী থেকে বাংলাদেশ
১১. পর্দা একটি বাস্তব প্রয়োজন
১২. ইসলামী বিপ্লবের পথ
১৩. সত্যের সাক্ষ্য
১৪. নির্বাচিত রচনাবলী
১৫. রাসায়েল মাসায়েল
অন্যান্য রচনাবলীর মধ্যে শেখ সাদী রাহ.-এর গুলিস্তা, বোস্তা এবং ইমাম গাজ্জালী রা. রচিত পুস্তকাদি লেখকের জন্য উপকারী গ্রন্থ। (যদিও ইমাম গাজ্জালী রা. রচিত পুস্তকাদীতে বর্ণিত কিছু হাদিস বিতর্কিত)

মহান আল্লাহ পাকের কাছে সাহায্য চেয়ে উক্ত বিষয় এবং পুস্তকগুলো পড়ে যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম হবে সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে চলচ্চিত্র ও মিডিয়ার জন্য লেখালেখি করলে সেই লেখাগুলো লেখাগুলো ইসলাম সমর্থিত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আল্লাহই একমাত্র সাহায্যকারী ও জ্ঞানদাতা এবং আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

নিব

:উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তনের একটি শোভন ছড়াপত্র

বাঙলা

আফসার নিজাম সম্পাদিত : চিন্তাশীল পাঠকের মননশীল সৃজন

%d bloggers like this: