মৌলভি আবদুল হালিম মাষ্টারের অনুজীবনী

মাহমুদ বিন হাফিজ

আদি বৃত্তান্ত

পিতৃদত্ত নাম আবদুল হালিম। চাঁদপুর জিলার ফরিদগঞ্জ থানাধীন ঝাউকাঠালী গ্রামের বিখ্যাত ব্যাপারী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বংশানুসারে তার নাম হয় আবদুল হালিম ব্যাপারী। পিতার নাম আবদুর রহিম ব্যাপারী, মাতার নাম রসিমন বিবি। অনেক আগেই এ মহামূল্যবান মনিষির জীবনী গ্রন্থাকারে প্রকাশ হওয়ার প্রয়োজন ছিলো। কালান্তরে অনেক মূল্যবান বিষয়াদি সময়ের গভীরতা থেকে উদ্ধার করা সহজ হবে বলে মনে হয় না। আমাদের পণ্ডিতগণের অবহেলার দরুণ গ্রাম-গ্রামান্তরের কত মূল্যবান মনিষির মহামূল্যবান কত কত আদর্শময় জীবনীগ্রন্থ হতে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম বঞ্চিত হচ্ছে। এর জন্য তারা অবশ্যই আল্লাতালার কাছে দায়ী থাকবেন। আমরা আপাতত তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী ও তাঁর বিশেষ বিশেষ চিন্তা চেতনার কিছু কথা উল্লেখ করেই ক্ষান্ত দিবো।

 

শিশুকাল থেকে যৌবনকাল ও পড়াশোনা

তাঁর শিশুকাল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়নি। জন্মের সময় তাঁর মুখখান ছিলো চাঁদের মতোন। শৈশবে তিনি পিতা-মাতা ও ভাই-বোনদের খুব আদর পেতেন। অনেকে মনে করেন তিনি ছোট ছিলেন বলে সাবাই তাঁকে এত আদর করতো। তাঁর পিতার খুব নাম ডাক ছিল এলাকার মধ্যে। সেই সূত্র ধরে তিনি পাড়া-প্রতিবেশীরও আদরের পাত্র ছিলেন। সবচে বেশী আদর করতেন তাঁর দাদাজান। তিনি বড় হয়েও তাঁর দাদাজানকে ভুলতে পারেননি। (তাঁর দাদাজানের নামটি লেখক এমুহূর্তে স্মরণ করতে পারছেন না বলে দুঃখিত)। তিনি সবসময়ই সেসব আদর আপ্পায়নের জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। লোকে বলে তিনি চার বছর বয়সে বর্ণমালা শিখতে সমর্থ হয়েছিলেন আর পাঁচ বছর বয়সে আমসিপারা শেষ করেছিলেন। এখান থেকে তার অসাধারণ মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। ছয় বছর বয়স থেকে তিনি কিছু কিছু দুষ্টুমি করা শুরু করেন। তিনি কোন পাখির বাসা ভাংতেন কিনা তা জানা যায়নি। তবে শৈশব হতেই তিনি যে খেলাধুলায় মনোযোগী ছিলেন তার পারিচয় মেলে। তিনি দাবি করতেন, ছোটকালে তিনি কারো কোন কিছুতে বিনা অনুমতিতে হাত দিতেন না। এর জন্য তিনি সবসয়ই সাক্ষী হিসাবে এলাকাবাসীদের সম্মানের সাথে স্মরণ করতেন। অবশ্য এবিষয়ে কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করা বাঞ্ছনিয় মনে করেনি।

 

পল্লীর আর সব ধার্মিক পিতা-মাতার মত তাঁর পিতা-মাতাও চেয়েছিলেন তাদের পুত্রসকল টাইটেল পাশ করে বড় বড় আলেম হবেন। শর্শিনার পীর হুজুর কিবলা বলেছিলেন, আওলাদ যদি ধার্মিক ও আলেম হয় তবে পিতা-মাতার বেহেস্ত নসীব হয়। তাঁদের পুত্রসকলের বদৌলতে যদি তাঁদের বড়-ছোট গুনাহখাতা ক্ষমা হয়ে যায়, তাদের বেহেস্তে যাওয়া সহজ হবে। তারা তাঁদের কবরের আজাব মাপের জন্য দোয়া করতে পারবে। তাই তাঁরা তাঁদের পুত্রসকলকে একে একে মাদরাসায় ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু খোদাতালা সবাইকে দিয়ে আশা পূর্ণ করেন না। তাই চোখ-কান ফোটার পর পরই বড়, মেঝো ও সেঝো ছেলে এলেমের রাস্তা ছেড়ে দিয়ে বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী ‘ব্যাপারী’ পেশা ধরলো। আর তাঁদের সকল আশা-ভরসা পুঁঞ্জিভূত হলো তাঁদের ছোট ছেলের উপর। তাঁদের দোয়া, আশা-ভালোবাসার জোরে তিনি আলিয়া মাদ্রাসায় ফাজিল পর্যন্ত পড়তে পারলেন। এভাবে তিনি মৌলভি হলেন। তাঁর নামটির সাথে তখন থেকে মৌলভি যুক্ত হলো। তিনি হলেন মৌলভি আবদুল হালিম। যেহেতু তিনি মৌলভী হলেন তাই তিনি নাম হতে ‘ব্যাপারী’ শব্দটি মুছে দিলেন। তার ভায়রা ভাইয়ের ছেলে তার বিষয়ে জানালেন, “তিনি শপথ করে বলতেন, তিনি কখনো তার আগের ক্লাশের বই বিক্রি করে চকলেট কিংবা চা-দোকানে চা খাননি। কিংবা সে বই বিক্রি করে নতুন বই কেনেননি। পুরনো বই তিনি আল্লার ওয়াস্তে দিয়ে দিতেন কোন গরীব তালেবে এলেমকে। তিনি তাঁর ছেলে-মেয়েদের বইও কখনো বিক্রি করেননি।” বলতেই হয় এটা তার একটা মহৎ গুণ। যৌবনকালে তিনি কোন প্রকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন না। তাঁর এসময়ের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো ফাজিল পাশ করা। তাই এ পর্যায়ে তাঁর বিবাহ ছাড়া আর অন্য কোন বিষয়ে প্যাঁচাল পারা ঠিক হবে না।

 

বিবাহ ও তৎসংলগ্ন সময়

বিবাহপূর্ব সময় হতে তিনি ফরিদগঞ্জ বাজারের অল্পদূরে মতিপুর গ্রামে লজিং থাকতেন। তখনকার সময়ে এখনকার মতোন পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে মাদরাসা ছিলো না। এমনকি সকল থানা শহরেও ছিল না। এ ব্যাপারে ফরিদগঞ্জ থানাকে ভাগ্যবান বলতে হয়। সঙ্গত কারণে তখন মাদরাসা পড়–য়া ছাত্রদেরকে দূর-দূরান্তে পড়তে যেতে এবং লজিং থাকতে হতো। মৌলভি আবদুল হালিম মতিপুর গ্রামে লজিং থাকতেন কিনা সে বিষয়ে পণ্ডিতগণের মতবিরোধ আছে। তবে তার বৈবাহিক জীবন এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ড হিসাব-নিকাশ করলে এটা প্রমাণ মেলে যে তিনি এ গ্রামেই লজিং ছিলেন। তিনি এ গ্রামের কোন্ বাড়িতে লজিং থাকতেন তা নিয়েও ছয়জনের মধ্যে নানা রকম মতবিরোধ আছে। প্রমাণাদি বিশ্লেষণ করে এ লেখক স্থির হতে পেরেছেন যে তিনি পশ্চিম তরপদার বাড়ির দক্ষিনে, পাটওয়ারী বাড়ির উত্তরে, ডাকাতিয়া নদীর পুর্বপাড়ে অবস্থিত মসজিদওলা বিখ্যাত মুন্সিগাজীর বাড়িতে লজিং ছিলেন। এবাড়ির একজন বাসিন্দা স্বনামধন্য মুন্সি মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম গাজী যিনি এখন অবস্থান করছেন মৃত্যুর ওপারে। এ মুন্সিগাজী পরিবারের সাথে গভীর সম্পর্ক বিরাজ করছিলো তরপদার বাড়ির মাওলানা আবু নাসের মুহাম্মদ ঈসা খাঁ সাহেবের পরিবারের সাথে। স্বাভাবিক ভাবেই এ দুপরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক যাওয়া-আসা ছিলো। এখান থেকেই মাওলানা ঈসা খাঁ সাহেবের বড় মেয়েকে দেখে পছন্দ করে ফেলেন মৌলভি আবদুল হালিম। এরপর প্রস্তাব তারপর মঞ্জুর অবশেষে বিয়ে। কিছু দিন পর তার ফাজিল পরীক্ষার ফলাফল বের হলে তাকে পড়ালেখা শেষ করতে হলো, কারণ এখন আর তিনি একা নন। তাঁর এখন একটি পরিবার আছে। তার ভোরন-পোষন তাঁকে করতে হবে। ইতিমধ্যে তাঁর একটা চাকরিও হয়ে গেলো। একটা সম্মানজনক চাকরি। নিজ গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের সাধারণ শিক্ষক হিসাবে নিয়োগকৃত হলেন। এ মহান পেশায় আত্মনিয়োগ করতে পেরে তিনি খোদার কাছে শোকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য দুরাকাত নামাজ পড়েছেন কিনা তা জানা যায়নি। তবে এ চাকরীর কথা উঠলেই তিনি একবার আলহামদুলিল্লাহ পড়তেন অত্যন্ত আবেগ ভরে। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মাস্টার হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। তখন থেকেই তিনি হয়ে গেলেন মৌলভি আবদুল হালিম মাস্টার।

বলছিলাম তাঁর পরিবারের কথা। সহজ-সরল-পরিশ্রমী হাসনা বেগমকে সঙ্গি করে তাঁর সাংসারিক জীবন অতিব সুখের সাথে অতিবাহিত হতে থাকলো। তাঁরা দুটি সন্তানের বাবা-মা হলেন। বড়টি মেয়ে এবং ছোটটি ছেলে। মেয়েটি একেবারে পরীর মত  খুবসুরত আর ছেলেটি সন্দেহাতীত রাজপুত্তুর। এ সময় কিম্বা তার কিছু আগে বা পরে তাঁর ডান হাতটি অকেজো হয়ে যায়। তাঁর ছোট ভাইয়ের সাক্ষাতকার হতে জানা যায়, তিনি যখন খেরের পালা দিচ্ছিলেন তখন প্রায় দুহাত উপর হতে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে ফেললেন। হাতটি পরে কাঠির মত চিকন হয়ে গেলো এবং হাঁটলে সরল দোলকের মত সরল ছন্দিত স্পন্দনে ঝুলতে থাকতো। এটি দিয়ে তিনি কিছুই করতে পারতেন না। তারপর হতে তিনি বাম হাতে লেখতে শেখেন। তাঁর বাম হাতের লেখা তার ডান হাতের লেখার চেয়ে কঠিন রকম সুন্দর। তিনি খেতেনও বাম হাতে। তাঁর একটা হাত ভাঙা থাকলেও হাসনা বেগম পাশে থাকায় তিনি হাতটির অভাব বোধ করেননি কখনো।

 

প্রথম বউয়ের মৃত্যু ও দ্বিতীয় বিয়ে

তাঁর সুখ বেশি দিন টিকলো না। তিনি ঠিক বুঝতে পারেননি যে খুব সামনেই তাঁর জন্য বিরাট একটা পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। আল্লাতায়ালা হাসনা বেগমকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য মনোনিত করলেন। তাই অল্প কয়দিন হাসনা বেগম কোন অজ্ঞাত রোগে ভুগে পরপারে আল্লাতায়ালার কাছে গমন করলেন। দুই শিশু সন্তান নিয়ে মৌলভী আবদুল হালিম মাষ্টার অকুল পাথারে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। এ শিশু সন্তান দুটিকে পেলে পুষে বড় করতে হবে। এটাতো তাঁর কাম নয়। এটা একজন মায়ের কাম। তা ছাড়া তিনি তখনো একজন কমবয়েসী যুবক মাত্র। একটা বউ ছাড়াতো তাঁর চলতে পারে না। এদিকে সন্তান দুটির দিকে তাকিয়ে যেন তেন একটা মেয়েকে বউ করে নিয়ে আসবেন, সেটাইবা কি করে পারেন। তাছাড়া দ্বিতীয় বিয়েতে সলিড মেয়েতো আর কেউ দিতে চায় না। চিন্তায় যখন তিনি খাবি খাচ্ছিলেন তখন হঠাৎ তাঁর মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। তাঁর একটি খুবসুরত শ্যালিকা আছে। যদি তাকে বিয়ে করা যায় তবে সাপও মরে লাঠিও ভাঙে না। সে নিশ্চয়ই আপন বোনের ছেলে-মেয়েকে নিজের মনে করে লালন-পালন করবে। তার উপরে বোনাস হিসাবে সে কুমারী। যেই মত ভাবা সেই মত কাজ। তিনি নিজে গিয়ে নানাভাবে কৌশল করে তার শাশুড়িকে বোঝাতে সমর্থ হলেন। তার শাশুড়ি সুচতুর এবং উঁচু মানের একজন উদার মেয়েমানুষ ছিলেন। তিনি বাস্তবতা বুঝতে পেরে ইতিবাচক রায় দিলেন। সুতরাং তের কি চৌদ্দ বছর বয়সের সুরাইয়া বেগমকে তিনি বউ করে ঘরে উঠালেন। এ বিয়েতে সুরাইয়া বেগমের মতামত কিংবা চিন্তা-ভাবনা কি ছিলো তা এখানে অপ্রাসঙ্গিক বিধায় বিস্তারিত আলোচনা করা সঙ্গত নয়। তবে লেখক যখন সুরাইয়া বেগমের সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন, “আমি তাদের (বোনের ছেলে-মেয়ে) জন্য সোনার যৌবন কালি করছি”। এ থেকে বোঝা যায় ওরা না থাকলে তিনি কখনো এ বিয়ের পিড়িতে বসতেন না। অবশ্য এটাও বিবেচনার বিষয় যে তের-চৌদ্দ বছরের একটি কিশোরী কতটুকুইবা বোঝে। তখন গ্রাম-বাংলার মেয়েরা বাবা-মায়েদের কাছে এ ব্যাপারে একেবারেই অসহায় ছিলো। তাদের পছন্দ-অপছন্দের কোন গুরুত্বই ছিলো না। তা ছাড়া এতো অল্প বয়সে তাদের বিয়ে দেয়া হতো যে তাদের কি পছন্দ করা উচিৎ আর কি উচিৎ নয় তাই বুঝতো না। এখনো যে এ অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে তা নয়। তবে অবস্থার উন্নতি হয়েছে এটা সত্য। সুরাইয়া বেগম তার সংসারে লক্ষি হয়ে প্রবেশ করেন। তাঁর সংসারে অর্থনৈতিক উন্নতির ধারা বয়ে যেতে থাকে। জমিতে বেশি বেশি ফসল ফলতে থাকে। আঙ্গিনায় অধিক পরিমাণে তরিতরকারি উৎপাদন হতে থাকে। ফলফলাদির গাছ তরতর করে বড় হতে থাকে এবং তাতে বেশি বেশি ফল ধরতে থাকে। কালাধিক্রমে মৌলভি আবদুল হালিমের মাস্টারের বেতন-ভাতাও বাড়তে থাকে। তার দোচালা বাঁশের ঘরটি চৌচালা শূন্যঘরে (খুটি মাটিতে পোঁতা নেই এমন বড় ঘর) পরিণত হয়। তাঁর সাংসারিক সুখ গুণত্তর প্রগমনের মত অসীম ধারায় বইতে থাকে যা এখন পর্যন্ত তাঁর উত্তর পুরুষেও সমানভাবে বহমান। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে তাঁর আরও চার সন্তান আছে যার মধ্যে দুজন ছেলে আর দুজন মেয়ে। সবচে বড়টি আর সবচে ছোটটি মেয়ে। তাঁর সবকটি মেয়েকেই তিনি শরিয়তের বিধি মোতাবেক চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন। শরিয়তের বিষয়ে তিনি কোন প্রকার ক¤প্রমাইজ করতে রাজি নন যদিও ইসলাম সমর্থিত কোন রাজনৈতিক দলকে তিনি দুচক্ষেও দেখতে পারতেন না। সর্বপরি তিনি একজন আলেম মানুষ। টাইটেল পাশ করলে এবং তৎপরে জ্ঞান অর্জন অব্যহত রাখলেই যে আলেম হবে এ ধারণা তাঁর মতে ঠিক নয়। ফাজিল পাশ করলেই তাকে আলেম বলা উচিৎ। কিতাব পড়েই আলেম হতে হবে এমনটা কোন্ কিতাবে আছে? বড় বড় আলেদের কথা শুনেওতো আলেম হওয়া যায়। তিনি ফুরফুরার হুজুর কিবলার একজন ভক্ত ছিলেন। ফুরফুরার হুজুরের কোন ওয়াজের জলসা তিনি যেহেতু বাদ দেন না সেহেতু ধরতে হয় তার জ্ঞান চর্চা অব্যহত আছে। সেই হিসাবে তিনি অবশ্যই একজন আলেম ছিলেন। তাঁর এ ধারণার দার্শনিক মূল্য অনেকেই দিতে চান না। দেশের আইনে আছে মেয়েদের আঠারো বছর আর ছেলেদের বিশ বছর হলেই কেবল তাদের বিয়ে দেয়া যাবে। কিন্তু অন্য অনেক আইনের মত এ আইনের বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কোন প্রকার পদক্ষেপ নেই। তিনি অনৈসলামিক সরকারকে মনে মনে অনেক ধন্যবাদ জানাতেন এ ধরণের বাজে আইন বাস্তবায়নের কোন প্রকার পদক্ষেপ না নেয়ার জন্য। এসব সরকারের জন্যই দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে স্ব-স্ব ধর্ম পালন করতে পারছে। তিনি বলতেন, “ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো বুঝতে চাইতেছে না যে, এখন আর রাস্ট্রিয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা যাইবোনা।”

 

অধিক সন্তান সম্পর্কে তার ভাবনা

আল্লার অশেষ মেহেরবানিতে তাঁর ছয় সন্তান। আরো দুটি সন্তান হলে তাঁর আপত্তি থাকতো না। সন্তান-সন্ততি হলো খোদার অন্যসব নেয়ামতের মত একটি নেয়ামত। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবকিছুই আল্লার হাতে। তিনি বলতেন “আল্লাতালা পূর্বেই সব আদম সন্তানের রূহ বানাইয়া ফালাইছেন। রূহ যহন আছে, দুনিয়ায় তার অবস্থান যদি না থাহে তাইলে এ রূহ থাহোনেরতো কোন মানিই অয় না। দুনিয়াতে কে কহন আইবো তাও আল্লাহ ঠিক করইয়া রাখছেন। তাইলে আমরা চাই আর না চাই যে আইবার হে আইবোই। হে যদি আমার ঘরে আইবার কথা থাহে তবে আমার ঘরেই আইবো, আপনার ঘরে কহনো আইবো না। আর আপনার ঘরে যে আইবার কথা হে কহনো আমার ঘরে আইবো না। যে আইবার হেরে আপনি হাজারবার জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খাইয়াও বাধা দিয়া রাখতে পারতেন না। যারে ঠেহাইতে পারতাছেন না তার জন্য খামাখা ট্যাহা পয়সা খরচ করাডাই অপচয়। যারা এসব জাইন্নাও জন্মনিয়ন্ত্রণ নেয় হেরা যে কাফের কোন সন্দহ নাই।”

তাঁকে একবার প্রশ্নকরা হয়েছিলো কে প্রশ্ন করেছিলেন তা জানা যায় নি  প্রশ্ন করা হয়েছিলো, “দেশে জমির পরিমাণ তো কম। এই হারে মানুষ বাড়তে থাকলে তাদের থাকার জায়গা অইবো কুন্ডায়? তাদের খাবার জন্য ফসল উৎপাদন করবো কুন্ডায়? বছরে একত্রিশ লাখ লোক বাড়ে। দশ বছরে বাড়ে সাড়ে তিন কুটি। দুই হাজার বিশ সালে মোট জনসংখ্যা অইবো সাড়ে একুইশ কুটি। এইডা ভয়াবহ ব্যাপার না মাস্টর সাব?”

মৌলভী আবদুল হালিম মাস্টার তখন বিচক্ষণতার সাথে জবাব দিয়েছিলেন, “আপনার মিয়া ইমানে দুর্বলতা আছে। আল্লার উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখেন। আল্লায় মানুষ পাঠাইবো আর হেইতাগো থাহনের জায়গা দিব না; এতটা অবিবেচক আল্লারে কেমনে ভাবলেন। বঙ্গোপসাগরে তিনডা বাংলাদেশের সমান একটা দ্বিপ গইড়া দিতে তার কতক্ষণ লাগে।”

তাঁর প্রাক্তন ছাত্র বিজ্ঞানমনা আবদুস সালাম বললেন, “স্যার, পৃথিবীতে পানির পরিমান নির্দিষ্ট। যে পরিমাণ ভূমি জাগবে সে পরিমাণ নিচু ভূমি পানিতে ডুবে যাবে। এর মধ্যে আমাদের বাংলাদেশও আছে। তার উপর মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে। পৃথিবীর জমা বরফ গলে যাচ্ছে। সুতরাং গড়ে তো কোন লাভ হবে না।”

মাস্টার সাব প্রথমে থমকে গেলেন প্রশ্ন শুনে। পরে অবশ্য তাঁর জ্ঞানের পরিচয় মিললো উত্তর শুনে। তিনি বললেন, “আল্লাহ হইলেন অপার ক্ষমতার অধিকারী। তিনিতো কিছূ পানিকে স্থায়ীভাবে অক্সিজেন আর হাইড্রেজেন বান্ইয়া দিতে পারেন।” তিনি সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন, “কি মিয়ারা, তিনি পারেন না?” উপস্থিত সবাই মাথা নাড়লেন।

এভাবে তিনি প্রতিদিন চা দোকানে, রাস্তাঘাটে, পারিবারিক আড্ডায়, যেখানে সুযোগ পান সেখানেই মানুষের ইমানের পাল্লা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করতেন। তার কথা শুনে অনেক লোকই অধিক সন্তান পয়দা করে পৃথিবীতে ইমানদার মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধির মহান পূন্যময় কাজে আত্মনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি মাঝে মাঝে মানুষজনকে বোঝানের চেষ্টা করেন অধিক সন্তান নেয়ার সুদুর প্রসারী ফজিলত। বর্তমানে আমাদের দেশ হতে যে হারে মানুষ পৃথিবীর নানা দেশে যাচ্ছে তাতে একসময় ঐসব দেশে আমাদের দেশের মুসলমান ছাড়া অন্য দেশের মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইউরোপ-আমেরিকায় এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার মাইনাস অবস্থায় আছে। সুতরাং ঐসব দেশে একসময় তাদের জাতির লোক একেবারে কমে যাবে। আর ঐ স্থান দখল করে নিবে আমাদের দেশের লোক। এখনই রাস্তার ঝাড়–দার হতে শুরু করে রাস্ট্রদুত কিংবা পার্লামেন্টের সদস্য পর্যন্ত ইউরোপের নানা গুরুত্বপূর্ন পদে আমাদের দেশের লোক ঢুকে গেছে। ভবিষ্যতে যে কি হবে তা কল্পনা করা যায় না। আমরা এক সময় ইংরাজের মত সারা বিশ্বে আমাদের শাসন কায়েম করতে পারবো। আমরাও হয়ে উঠবো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি। চুরি করে ইউরোপ-আমেরিকা যাওয়ার সময় দু-একজন সাগরে ডুবে কিংবা না খেয়ে মরে গেলে তাতে আর কতটুকুইবা ক্ষতি হয়। সর্বপরি বাঁচন-মরন হলো আল্লার হাতে। বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে যারা এরূপ আদম ব্যবসায় নিয়োজিত আছে তাদের দোষারোপ না করে সর্বাত্মক সাহায্য করা উচিত। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় অতিশয় বুদ্ধিমান মানুষ ছাড়া এরূপ চিন্তা করা প্রায় অসম্ভব। এখান হতে প্রমাণিত হয় মৌলভি আবদুল হালিম মাস্টার কত ধীশক্তি ও স্বচ্ছ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিলেন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

নিব

:উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তনের একটি শোভন ছড়াপত্র

বাঙলা

আফসার নিজাম সম্পাদিত : চিন্তাশীল পাঠকের মননশীল সৃজন

%d bloggers like this: