কর্পোরেট পুঁজির হাতে বন্দি বিনোদন

আহমদ বাসির

বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের জন্য কর্পোরেট পুঁজি নানাভাবে দেশের বিনোদন মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করছে। এ ক্ষেত্রে তারা ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক মূল্যবোধ কোন কিছুরই তোয়াক্কা করছে না। ইতোমধ্যেই দেশের সাংস্কৃতিক জগতে কর্পোরেট পুঁজির অনুপ্রবেশ সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। বিশেষ করে একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন, বৈশাখী উৎসব, জাতীয় কবিতা উৎসব উদযাপন ইত্যাদি বিষয়ে বহুজাতিক কোম্পানীগুলো পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে অনেকেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় কর্পোরেট পুঁজির হাত পড়েছে এবার টিভি নাটকেও। একটি বহুজাতিক বাণিজ্যিক ব্যাংকের নতুন ব্র্যান্ড প্রচারণার অংশ হিসেবে সম্প্রতি নির্মিত হয়েছে একটি নাটক। আর এই নাটকটিই ব্যাংকটির নতুন ব্র্যান্ডকে দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে সাহায্য করছে। নাটকটি শীঘ্রই প্রচার হবে একটি টিভি চ্যানেলে।
আবুল কালাম আজাদ রচিত ‘একা অথবা কয়েকজন’ নামের এই নাটকটি নির্মিত হয়েছে প্রখ্যাত অভিনেত্রী আফসানা মিমির পরিচালনায়। আর যে ব্যাংকটি তাদের নতুন ব্র্যান্ডের প্রচারণার অংশ হিসেবে নাটকটি নির্মাণে উদ্যোগী হয়েছে সেটি হচ্ছে এইচএসবিসি (দি হংকং এন্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন)। সম্প্রতি হোটেল শেরাটনের উইন্টার গার্ডেনে নাটকটির প্রিমিয়ার শো অনুষ্ঠিত হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে এইচএসবিসি গ্রুপের বিশ্বব্যাপী চলমান ‘ডিফারেন্ট পয়েন্টেস অব ভ্যালু’ নামক নতুন ব্র্যান্ড ক্যাম্পেনের অংশ হিসেবেই নাটকটি নির্মিত হয়েছে।
ব্যাংকটি মনে করে আলাদা আলাদা মানুষের কাছে জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের অগ্রাধিকার বিভিন্ন। সুতরাং মানুষভেদে বিভিন্ন মূল্যায়নকে স্বীকৃতি দেয়া আর সেভাবেই গ্রাহক ও সমাজকে সেবা দেয়াই তাদের উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য পূরণে তারা নাটকের এমন একটি প্লট নির্বাচন করেছে যা এ দেশের সামাজিক মূল্যবোধের সাথে মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নাটকটির তিনটি মূল চরিত্র- তুহিন, মুনিয়া ও শামস্। তুহিন ও মুনিয়া স্বামী-স্ত্রী, আর শামস্ তুহিনের বন্ধু। নাটকটিতে দেখা যায় চা বাগানের সবুজের সমারোহে তুহিন ও মুনিয়ার নিভৃত সংসার। বিবাহপূর্ব জীবনে তুহিন মুনিয়ার দীর্ঘ দুই বছরের প্রেমের সম্পর্ক। কিন্তু সংসার গড়ার পর দেখা যায় চা-বাগানই তুহিনের ধ্যান-জ্ঞান। বেশিরভাগ সময়ই কাটে তার চা বাগানে। এ রকম পরিস্থিতিতে মুনিয়া দারুন নিঃসঙ্গতা অনুভব করে। আর এ সময়ই দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয় তুহিনের বন্ধু শামস। পেশায় সে একজন ফটোগ্রাফার। তুহিনের নির্লিপ্ততার মাঝে সামস্ এর হঠাৎ উপস্থিতি মুনিয়ার একাকী জীবনে পরিবর্তন এনে দেয়। মুনিয়া নিজেকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। শামস্কে মুনিয়া তার ভাবনার কথা জানায়। সে ঢাকায় ফিরতে চায় এবং নিজের জন্য কিছু একটা করতে চায়। মুনিয়ার এই ইচ্ছার কাছে তুহিন আত্মসমর্পণ করে।
এই হচ্ছে নাটকটির প্রথম পর্বের কাহিনী। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নাটকটির প্রথম পর্ব দেখে দ্বিতীয় পর্বে কী হবে সেটা জানিয়ে দর্শক এসএমএস করবেন, আর সেই এসএমএস এর ভিত্তিতেই দ্বিতীয় পর্বের সমাপ্তি বেছে নেয়া হবে। অর্থাৎ দর্শক কি তুহিনের কাছে মুনিয়ার প্রত্যাবর্তন দেখাতে চান নাকি মুনিয়ার নতুন জীবনের গল্প দেখতে চান? দর্শকের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েই কাহিনীর সমাপ্ত ঘটানো হবে। নাটকটির কাহিনীতে তেমন কোন নবীনতা না থাকলেও দর্শকদের সাথে এক স্তর উন্নত সম্পর্ক গড়ে তোলার এই পদ্ধতি নিঃসন্দেহে অভিনব।
প্রিমিয়ার শোতে মাত্র পনের মিনিটের প্রদর্শনী থেকে আমরা দু’টি দৃশ্য এখানে তুলে ধরবো। এর প্রথমটি নাটকের প্রথম দৃশ্য। শুরুতেই কোন একটি বিমান বন্দর অথবা রেলওয়ে স্টেশনে মুনিয়ার সাথে তুহিনের আকস্মিক সাক্ষাৎ ঘটে। তুহিন একা। মুনিয়ার সাথে একটি বাচ্চা। দু’জন পরস্পরকে দেখে রুদ্ধবাক হয়ে পড়ে। কিছু সময় পরে তাদের ঠোঁটে বাক ফুটে ওঠে। তুহিন উচ্চারণ করে মুনিয়া। আর মুনিয়া উচ্চারণ করে তুহিন। তুহিন মুনিয়াকে জানায়, চা বাগানে তার আর ভালো লাগেনি। সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিদেশে চলে গিয়েছে। এখানেই প্রথম দৃশ্যের সমাপ্তি। এরপর শুরু হয় মূল গল্প- মুনিয়া ও তুহিনের ছেড়ে আসা সংসারের। সে সংসারের একটি দৃশ্যও পাঠকদের অবগতির জন্য জানানো জরুরি। এই দৃশ্যে দেখা যায়, শামস তুহিনের বাংলো ছেড়ে অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যলীলা ধারণ করছে ক্যামেরার ফ্রেমে। মুনিয়া শামস এর ছবি তোলা দেখছে আর তার যেন উড়তে ইচ্ছে করছে। এ রকম সময় কোন এক মুহূর্তে মুনিয়া শামস এর উল্কি অাঁকা সুঠাম নগ্ন বাহু ছুঁয়ে দিয়ে বলে, এই কী? শামস জবাব দেয়) ছোটবেলার অভ্যেস।
বর্ণিত দৃশ্য দুটি নিয়ে অনিবার্য কারণেই কিছু কথা বলতে হবে। প্রথম দৃশ্যটি থেকে প্রতীয়মান হয় মুনিয়া তুহিনের সংসার ছেড়ে সত্যি সত্যিই চলে গিয়েছে এবং নাটকের যে কোন দর্শক এক বাক্যে বলে দেবেন মুনিয়ার সাথে যে বাচ্চাটিকে একটি ছোট্ট ট্রলিতে ঠেলে আসতে দেখা গেছে সে বাচ্চাটি মুনিয়ার সন্তান। তাহলে তো দেখাই যাচ্ছে যে নাটকের সমাপ্তি আগেই ঠিক করে রাখা হয়েছে। অতএব দর্শকদের সাথে এটা একটা চাতুরির খেলা হচ্ছে। দর্শকের জন্য নাটকটির প্রথম পর্ব দেখে এসএমএস করার জন্য দুটি ‘অপশন’ রাখা হয়েছে। এর একটির নাম ‘ট্রাডিশন’ অন্যটির নাম ‘আইডেনটিটি’। যদি মুনিয়া তার জীবনকে নতুন করে শুরু করতে চায় তাহলে লিখতে হবে ‘আইডেনটিটি’ আর যদি তুহিনের সংসারেই থাকতে চায় তাহলে লিখতে হবে ‘ট্রাডিশন’। পাঠক লক্ষ্য করুন- দর্শকদের জন্য অপশন রাখা হয়েছে বটে কিন্তু নাটকের সমাপ্তি শুরুতেই ঘটিয়ে দেয়া হয়েছে। নির্মাণের ক্ষেত্রে এটাও নিশ্চয়ই অভিনবত্বের দাবি রাখে। কিন্তু সে দিকে না গিয়ে আমরা ‘আইডেনটিটি’ ও ‘ট্রাডিশন’ এ নিয়ে কয়েকটি কথা বলতে চাই।
জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে বাংলাদেশের নারীদের আইডেনটিটি হচ্ছে তাদের স্বামী। তাদের সংসার, আর ট্রাডিশন হচ্ছে অজ্ঞতা ও কুসংস্কার। কিন্তু নাটকটিতে সংসার ও স্বামীকেই দেখানো হচ্ছে ট্রাডিশন হিসেবে। এ এক অতি অদ্ভুত কল্পনা। আর আইডেনটিটি দেখানো হচ্ছে পশ্চিমা ভোগবাদী সমাজের অনুসরণকে। এ এক অতি আজব চিন্তা। যে মেয়ে দু’টি বছর ধরে প্রেম করেছে, অতপর সেই প্রেমিককে বিয়ে করেছে সেই মেয়ে তার প্রেমিক স্বামীকে ছেড়ে যাবে সামান্য অজুহাতে। কী সেই অজুহাত? নিঃসঙ্গতা। তার স্বামী তাকে যথেষ্ট সময় দেয় না। কিন্তু এই অজুহাতেরও কি কোন ভিত্তি আছে? যে বাগানের ম্যানেজার হিসেবে তার স্বামীর একটু অতিরিক্ত ব্যস্ততা থাকতেই পারে। স্ত্রীটি তার নিঃসঙ্গতা ঘোঁচানোর জন্য সেই চা-বাগানেই কোন একটি কাজে নিজেকে জড়িয়ে নিতে পারে অথবা পারে, চা বাগান শ্রমিকদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সে সন্তান ধারণ করতে পারে। সে সন্তান গর্ভে থেকেই জননীর নিঃসঙ্গতা ঘুঁচিয়ে দিতে পারে। সন্তান ধারণের আনন্দে জননীরা অনেক কঠিন দুঃখও ভুলে যায়। কিন্তু নাটকটি প্রকৃতপক্ষে সংসার গড়ার কোন আয়োজন নয় বরং এটি সংসার ভাঙ্গারই আয়োজন। আর এই আয়োজনের সাথে আমাদের শিল্পী সমাজ জড়িয়ে পড়ছে হয়তো তাদের অলক্ষ্যেই।
নাটকের বর্ণিত দ্বিতীয় দৃশ্যটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের বৈরী। এ অংশের উপস্থাপনা সর্বাত্মকভাবেই প্রমাণ করে মুনিয়া শামসের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে যদিও এক্ষেত্রে শামসের নির্লিপ্ততা তুহিনের চাইতেও বেশি মনে হয়। আসলে তা ভান- বন্ধুর বউ বলেই। এ ধরনের ঘটনা যে আমাদের সমাজে ঘটে না, তা নয়। তবে এ ধরনের ঘটনা যে উদ্দেশ্যে, যে নিমিত্তে শিল্পরূপ লাভ করার চেষ্টা করেছে তা ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক মূল্যবোধকে কটাক্ষই করে।
কেন এমন হয়? হ্যাঁ, সেই কথাতেই আমরা এসে গেছি। নাটকটির প্রিমিয়ার শো উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পরিচালক আফসানা মিমি’র কথাতেই লুকিয়ে আছে এ প্রশ্নের উত্তর। তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমি একটু ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম। ব্যাংকের সাথে নাটকের সম্পর্কটা খুঁজতে একটু ঝামেলাই হয়ে গেল।’ এ রকমই তিনি বলেছেন, যা পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। মিমি শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের সাথে নাটকের কোন সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন কিনা, সেটা আমাদের প্রশ্ন। তবে এটা অনুধাবন করতে আমাদের কোনই কষ্ট হয় না যে, ব্যাংকের সাথে নাটকের সম্পর্ক দুনিয়ার একটিমাত্র স্থানেই খুঁজে পাওয়া যাবে যে স্থানটির নাম বাণিজ্য। তাহলে এতদিন যে আমরা বলে এসেছি নাটক সমাজের দর্পণ, সমাজ বিপ্লবের হাতিয়ার, সমাজ বদলের বীজ সবই ডাহা মিথ্যা কথা। বরং বলতে হবে নাটক পুঁজির দর্পণ, বাণিজ্য বিপ্লবের হাতিয়ার, ভোগবাদী জীবনের বীজ।
এটাই যদি নাটক হয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে নাটক কোন শিল্প নয়, এটা এক ধরনের প্রচারণা যা পুঁজিকে পবিত্রতার সাথে উপস্থাপন করে। আর নাটক যদি শিল্প হয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে সেটা কোন নাটক নয়, এটা এক ধরনের ব্যভিচার যা শিল্পচর্চাকে অপবিত্র কলুষিত করে। আমরা জানি নাটক পারফর্মি আর্টের অতীব গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এবং চিরকাল মানুষ দেখে এসেছে আর্টের মূল ভিত্তিভূমি আর্টিস্টের হার্ট। কিন্তু আমরা এই নাটকে দেখতে পাচ্ছি নাট্যকার ও পরিচালকের অনুর্বর মগজ পুঁজির পলিতে উর্বর হয়ে উঠেছে যেখানে সুস্পষ্ট শস্যবীজের অভাবে লকলকিয়ে বেড়ে চলেছে আগাছা। কেননা সেখানে আর্টিস্টের হার্ট নয় পুঁজির ইচ্ছাই হয়ে উঠেছে মুখ্য।
আমরা শংকিত এ কারণেই যে, একে একে আমাদের সুকুমারবৃত্তিগুলো বিক্রিত হতে হতে আমাদের গোটা সমাজটাই কবে না জানি বিকৃত হয়ে যায়।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

নিব

:উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তনের একটি শোভন ছড়াপত্র

বাঙলা

আফসার নিজাম সম্পাদিত : চিন্তাশীল পাঠকের মননশীল সৃজন

%d bloggers like this: