ইসলামী সংস্কৃতি, উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

ড. মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

 

ইসলামী সংস্কৃতি তার আপন বৈশিষ্ট্য ও মহিমায় ভাস্বর। যেহেতু ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শন। তাই মানব জীবনের কল্যাণকর সকল কর্মকান্ডই এ সংস্কৃতির আওতাভুক্ত। পবিত্র কুরআনে এ সংস্কৃতির বিস্তারিত রূপ উদ্ভাসিত হয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ সা. এর মহান শিক্ষা  ও জীবনাচরণের মাধ্যমে তা পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়েছে। এ নিবন্ধে আমরা ইসলামী সংস্কৃতির স্বরূপ তুলে ধরার প্রয়াস পাবো ইনসশাআল্লাহ।

 

সংস্কৃতি

ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে সংস্কৃতি বলতে কি বুঝায় ? সে সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করা প্রয়োজন। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি গঠিত হয়েছে ‘সংস্কার’ শব্দ থেকে ‘সংস্কার’ অর্থ শুদ্ধি, পরিষ্করণ, মার্জন, ব্যাকরাণাদির শুদ্ধি, ভুল সংশোধন, মেরামত, ব্যুৎপত্তি, কর্ম ও স্মৃতিজ মনোবৃত্তি, স্বভাবসিদ্ধ স্থায়ীভাব। আর ‘সংস্কৃতি’ অর্থ সংস্করণ, সংস্কারকরণ, বিশুদ্ধিকরণ, অনুশীলন লব্ধ দেহ-মন-হৃদয় ও আÍার উৎকর্ষ। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির আরেকটি অর্থ ‘কৃষ্টি’। এ শব্দটির ‘বৃষ’ ধাতু নিষ্পন্ন। এর অর্থ ভূমি কর্ষণ, হালচাষ, কৃষিকর্ম, অনুশীলন, মানবতার সর্বাঙ্গীন উৎকর্ষের সাধনা ইত্যাদি। এ দিক থেকে বিচার করলে সংস্কৃতি ও কৃষ্টি প্রায় সমার্থবোধক হলেও সাধারণ্যে সংস্কৃতিই বহুল প্রচলিত। বাংলায় ‘কৃষ্টি’ শব্দটি সংস্কৃতির চাইতে বেশি অর্থবোধক। কিন্তু শব্দটিতে যেহেতু কর্ষণ ও কৃষি অর্থ জড়িত তাই অনেকেই এর প্রতি বিমুখ।১

 

সংস্কৃতি মূলত সংস্কৃত২ ভাষার শব্দ। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো কালচার ঈঁষঃঁৎব এটি জার্মান কুলটুর কঁষঃড়ৎ শব্দ থেকে আতগত। এর আরবী প্রতিশব্দ হলো আস সাকাফা।৩ এর সাধারণ বোধগম্য অর্থ হলো, মার্জিত রুচি ও উত্তম স্বভাব। ভদ্রজনিত আচার আচরণের অর্থেও শব্দটি ব্যবহার করা হয়। যেমন অশিক্ষিত ও অমার্জিত স্বভাবের লোকদেরকে টহপঁষঃঁৎবফ এবং সুশিক্ষিত, সুরুচি সম্পন্ন ও ভদ্র আচরণ বিশিষ্ট মানুষকে ঈঁষঃঁৎবফ গধহ বলা হয়। আসলে এ তিনটি (সংস্কৃতি, কালচার ও সাকাফাহ) শব্দেই ঠিকঠাক করা, সংশোধন করা ও পরিশুদ্ধ করার অর্থ নিহিত রয়েছে। এর পারিভাষিক সংজ্ঞাতেও এ অর্থটি পুরোপুরি রক্ষিত হয়েছে।৪

 

পরিভাষায় বিশ্বাসলব্ধ মূল্যবোধে উদ্ভাসিত, পরিশীলিত ও পরিমার্জিত মন-মানসিকতাকেই সংস্কৃতি বলা হয়। প্রখ্যাত দার্শনিক কবি ঞ.ঝ ঊষরড়ঃ এর মতে সংস্কৃতি ও ধর্ম সমার্থবোধক না হলেও ধর্ম সংস্কৃতিরই উৎস। সংস্কৃতি রাষ্ট্র-শাসন পদ্ধতি, ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এবং দর্শনমূলক আন্দোলনেও প্রভাবিত হতে পারে। মি. ফিলিপ বাগবী তাঁর ঈঁষঃঁৎব ধহফ ঐরংঃড়ৎু নামক গ্রন্থে ঈড়হপবৎঃ ড়ভ ঈঁষঃঁৎব শীর্ষক এক নিবন্ধে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন: সর্বপ্রথম ফরাসী লেখক ভলটেয়ার ও ভ্যানভেনার্গাস এ শব্দটির ব্যবহার করেছেন। এদরে মতে মানসিক লালন ও পরিশুদ্ধ করণেরই নাম হচ্ছে কালচার। অনতিবিলম্বে উন্নত সমাজের চাল-চলন, রীতি-নীতি, শিল্প-সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিক্ষা ইত্যাদিও এ শব্দের আওতায় গন্য হতে লাগল। অক্সফোর্ড ডিকশনারীর সংজ্ঞা মতে বলা যায়, ১৮০৫ সন পযর্ন্ত ইংরেজী ভাষায় এ শব্দটির কোন ব্যবহার দেখা যায়না। সম্ভবত ম্যাথু আর্ণল্ড ক্যালচার পরিভাষাটি প্রথম ব্যবহার করেছন।৫ সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত এ শব্দটি অস্পষ্ট রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা নিজ নিজ রুচি অনুযায়ী এর সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। তবে মি. ফিলিপ বাগবী এর একটি চমৎকার সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। তাঁর মতে কালচার বলতে যেমন চিন্তা ও অনুভূতির সকল দিক বুঝায়, তেমনি তা কর্মনীতি, কর্ম পদ্ধতি এবং চরিত্রের সকল দিককে ও পরিব্যাপ্ত করে।৬ কালচার বা সংস্কৃতি শব্দের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করায় সবচেয়ে বেশি অসুবিধা দেখা দেয় এই যে, তার পূর্ণ চিত্রটি উদঘাটন করার জন্য মন ঐকান্তিক বাসনা বোধ করে বটে, কিন্তু তার বাস্তব অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য বিশেষজ্ঞরা খুব বেশী বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সংস্কৃতির বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতাকে নাম দেয়া হয়েছে কালচার বা সংস্কৃতি। আসলে এগুলো সংস্কৃতি নয় সংস্কৃতির বাহন মাত্র। তবে উল্লেখিত সংজ্ঞার আলোকে সংক্ষেপে আমরা বলতে পারি যে, মানব জীবনের সার্বিক কার্যক্রমের পরিমার্জিত রূপই হচ্ছে সংস্কৃতি।

 

ইসলামী সংস্কৃতি

 

ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সংস্কৃতিই ইসলামী সংস্কৃতি। পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহই হলো এর মূল ভিত্তি। কুরআন-সুন্নাহর ভাবধারার সাথে সাংঘর্ষিক কোন সংস্কৃতিই ইসলামী সংস্কৃতি হতে পারেনা। ইসলামের দৃষ্টিতে মানবতা বিরোধী সব কিছুই অপসংস্কৃতি। প্রখ্যাত চিন্তাবিদ জনাব ফায়যী ইসলামী সংস্কৃতির পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন: ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। আর এ জীবন ব্যবস্থার চিন্তামূলক দিকই ইসলামী সংস্কৃতি। তাই ইসলামী সংস্কৃতি বলতে নিুোক্ত তিনটি জিনিস বুঝায়।

উন্নততর চিন্তার মান, যা ইসলামী রাষ্ট্রে কোন এক যুগে বাস্তবায়িত হয়েছিল।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে সাহিত্য ও বিজ্ঞান এবং শিল্পের ক্ষেত্রে ইসলামের অর্জিত সাফল্য।

মুসলমানদের জীবনধারা, ধর্মীয় কাজকর্ম, ভাষার ব্যবহারও সামাজিক নিয়ম-প্রথার বিশেষ সংযোজন।৭

এম.জেড. সিদ্দীকী বলেন: ইসলামী সংস্কৃতির দুটি অর্থ : একটি হলো তার চিরন্তন দিক। আর অপরটি হলো সাহিত্য, বিজ্ঞান, ভাষা ও সমাজ সংস্থা। কিন্তু আমরা প্রথমটিকেই সংস্কৃতি মনে করি। কারণ সংস্কৃতি হলো এক বিশেষ ধরনের মানসিক অবস্থা, যা ইসলামের মৌল শিক্ষার প্রভাবে গড়ে ওঠে। যেমন মহান আল্লাহর একত্ব, মানুষের উচ্চ মর্যাদা এবং মানব সমাজের ঐক্য ও  সাম্যসংক্রান্ত বিশ্বাস।৮

 

আসলে সংস্কৃতির সংজ্ঞা নিরূপণ করা একটি জটিল বিষয়। তাই ইসলামী সংস্কৃতির সংজ্ঞা ও স্বরূপ নিরূপণ করতে গিয়ে অনেকেই বিভ্রন্তি সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এ ক্ষত্রে উপমহাদেশের প্রখ্যাত দার্শনিক সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী র. যথাযর্থ মতামত ব্যক্ত করেছেন। তিনি অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় সংস্কৃতির আসল তত্বটি আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন: লোকেরা মনে করে যে, সংস্কৃতি বলতে বুঝায় কোন জাতির জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-দর্শন, শিল্প-কারিগরী, ললিতকলা, সামাজিক রীতি, জীবন পদ্ধতি, রাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এগুলো সংস্কৃতির আসল প্রাণ-সত্তা নয়, তার ফলাফল ও বহি:প্রকাশ মাত্র। সংস্কৃতির ভিতর প্রথমে যে জিনিসটি তালাশ করতে হবে তা হচ্ছে এই যে, পার্থিব জীবন সম্পর্কে তার ধারনা কি ? এই দুনিয়ায় সে মানুষকে কি মর্যাদা প্রদান করে ? তার দৃষ্টিতে দুনিয়াটা কি ? এই দুনিয়ার সাথে মানুষের সম্পর্ক কি ? মানুষ এই দুনিয়াকে ভোগ-ব্যবহার করবে কিভাবে ? বস্তুত জীবন-দর্শন সম্পর্কিত এ প্রশ্নগুলো এমনি গুরুত্বপূর্ণ যে, মানব জীবনের সকল কর্ম-কান্ডের ওপরেই এগুলো গভীরভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে থাকে। এ দর্শন বদলে গেলে সংস্কৃতির গোটা স্বরূপই বদলে যায়।৯

 

মাওলানা মওদুদী র. আরো বলেন: ইসলামী সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য প্র¯ত্তত করা। এই সাফল্য অর্জন মানুষের নির্ভুল আচরণের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণেই এই সংস্কৃতি জীবনের সকল বিষয়ে মহান আল্লাহর নির্দেশিত পন্থা অনুসরণ করার ও নিজের কর্ম-স্বাধীনতাকে আল্লাহর শরীআহ দ্বারা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত করার জন্য মানুষের কাছে দাবি জানায়। অনুরূপভাবে এ সংস্কৃতি হচ্ছে দ্বীন ও দুনিয়ার মহত্তম সমন্বয়। একে প্রচলিত সংকীর্ণ অর্থে ধর্ম নামে অভিহিত করা চলেনা। এটি হচ্ছে একটি ব্যপাক জীবন ব্যবস্থা, যা মানুষের চিন্তা-চেতনা, স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার, পারিবারিক কাজ-কর্ম, সামাজিক ক্রিয়াকান্ড, রাজনৈতিক কর্মধারা, সভ্যতা ও সামাজিকতা সবকিছুর ওপর পরিব্যপ্ত। আর এ সব বিষয়ে যে, পদ্ধতি ও আইন-বিধান মহান আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন তারই সামষ্টিক নাম হচ্ছে দ্বীন ইসলাম বা ইসলামী সংস্কৃতি।১০ তিনি আরো বলেন: ইসলামী সংস্কৃতি কোন জাতীয় বংশীয় বা গোত্রীয় সংস্কৃতি নয়। বরং সঠিক অর্থে এটি হচ্ছে মানবীয় সংস্কৃতি। যে ব্যক্তি তাওহীদ, রিসালাত, কিতাব ও আখিরাতে বিশ্বাস করে তাকেই সে নিজের চৌহদ্দির মধ্যে গ্রহণ করে। এমনিভাবে এ সংস্কৃতি এক বিশ্বজনীন  উদার জাতীয়তা গঠন করে যার মধ্যে বর্ণ-গোত্র-ভাষা নির্বেশেষে সকল মানুষই প্রবেশ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে সমগ্র দুনিয়ার বুকে বি¯তৃত হবার মত অনন্য যোগ্যতা।১১

 

সীমাহীনতা ও বিশ্বজনীনতার সাথে এ সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রচন্ড নিয়মানুবর্তিতা উরংপরঢ়ষরহব এবং শক্তিশালী বন্ধন। এর সাহায্যেই সে নিজের অনুসারীদেরকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক দিক থেকে নিজস্ব বিধানের অনুগত করে তোলে।১২ এ সংস্কৃতি পৃথিবীতে একটি নির্ভুল সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে চায়। গড়ে তুলতে চায় একটি সৎ ও পবিত্র জনসমাজ। কিন্তু এর অন্তর্ভুক্ত লোকেরা উত্তম চরিত্র ও সৎগুণাবলীতে বিভূষিত না হওয়া পর্যন্ত এরূপ সমাজ গঠন সম্ভবপর নয়। এ কারণেরই এর সভ্যদের ব্যক্তি চরিত্র ও ঈমান-আকীদাহ পরিশুদ্ধ হওয়া একান্ত প্রয়োজন। এ ঈমানের বলেই সে মানুষের মধ্যে সততা, বিশ্বস্ততা, সচ্চরিত্র, আÍানুশীলন, সত্যপ্রীতি, আÍসংযম, সংগঠন, বদান্যতা, উদারদৃষ্টি, আÍসম্ভ্রম, বিনয়-নম্রতা, সৎসাহস, আÍত্যাগ, কর্তব্যবোধ, ধৈর্যশীলতা, দৃঢ়চিত্ততা, আনুগত্য, আইনানুবর্তিতা, ইত্যকার উৎকৃষ্ট গুণরাজি সৃষ্টি করে। এর মধ্যে মানুষের কর্মশক্তিকে সুসংহত করার এবং তাকে সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করার মত প্রচন্ড শক্তি বর্তমান রয়েছে।১৩

 

এ আলোচনা থেকে পরিষ্কার হলো যে, সংস্কৃতি বলতে আমরা যা বুঝি তা মূলত পাঁচটি মৌলিক উপাদান দ্বারা গঠিত। যথা: ক. বুনিয়াদী আকীদাহ-বিশ্বাস ও চিন্তাধারা, খ. জীবন সম্পর্কে ধারনা গ. জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ঘ.ব্যক্তি প্রশিক্ষণ/নৈতিকতা ঙ. সমাজ ব্যবস্থা।

 

ব¯ত্তত কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক মানবীয় সকল কর্ম-কান্ডই ইসলামী সংস্কৃতির আওতাভক্ত। ইসলাম জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, রীতি-নীতি, জীবন পদ্ধতি ইত্যাদি কোন কিছু চর্চাকেই নিরুৎসাহিত করেনা। তবে ইসলামের লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো উল্লিখিত বিষয়গুলো ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সম্পন্ন হচ্ছে কি না ? এর মৌল উপাদান ও ভিত্তিগুলো ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কি না ? সাংঘর্ষিক না হলে তা গ্রহণ করা যাবে। আর সাংঘর্ষিক  হলে তা কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য হবে না।

উৎপত্তি ও বিকাশ:

 

জীবন চর্চাই সংস্কৃতি। আর জীবন যেহেতু গতিশীল তাই সংস্কৃতিও সবসময় গতিশীল। জীবনের শুরু যেখান থেকে সংস্কৃতির সূচনা বিন্দুও সেখানেই। পৃথিবীতে মানুষের প্রথম জীবন চর্চা যেহেতু মহান আল্লাহর হিদায়াত ও আনুগত্য দিয়েই শুরু। তাই এ প্রথম জীবন চর্চাই ছিল ইসলামী সংস্কৃতির সূতিকাগার। সুতরাং নিশ্চিতভাবেই এ কথা বলা যায় যে, আদম আ. এর দ্বারাই ইসলামী সংস্কৃতির গোড়াপত্তন হয়। এবং যুগে যুগে নবী রাসূলগণের মাধ্যমে তা বিকশিত হয়ে শেষ নবী মুহাম্মদ স. এর যুগে এসে পূর্ণতায় পৌঁছায়। নবী করীম স. বলেছেন : উন্নত সংস্কৃতি জীবনধারাকে পূর্ণতাদান করার জন্য আমি প্রেরিত হয়েছি। (ইবন মাজাহ)

 

কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে: আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম। এবং আমি ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত  করলাম।১৪

মানুষের বিগত হাজার হাজার বছরের ইতিহাস তার সংস্কৃতিরই ইতিহাস। কারণ প্রথম থেকেই সে সভ্য ছিল। কাজেই সে ছিল একটি সুন্দর রুচিশীল সাংস্কৃতিক জীবনের অধিকারী। একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক জীবন ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে এর যাত্রা শুরু। আল্লাহ তাকে এ জ্ঞান দিয়েছেন। কুরআন মাজীদে বলা   হয়েছে: এবং আল্লাহ আদম আ. কে সকল ব¯ত্তুর নাম শিখিয়েছেন।১৫ এর অর্থ হচ্ছে সকল বস্তুর তাৎপর্য, ব্যবহার বিধি এবং অনুসঙ্গ তিনি আল্লাহর কাছ থেকে শিখেছেন। যাকে পরিপূর্ন জ্ঞান  বলে তা এ ভাবে তিনি আহরণ করেছিলেন। পার্থিব কারো নির্দেশ তিনি কোন মূহুর্তেই পাননি। মহান আল্লাহর নির্দেশে চালিত হয়ে সত্যের প্রবর্তনায় তিনি পার্থিব জীবন যাপন করেছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতাআলা আদম আ. কে জ্ঞান দান করে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তির মধ্যে এর পরিচালনা উন্নয়ন ও বিকাশের ক্ষমতা রেখে দিয়েছেন। যুগে যুগে দেশে দেশে তিন এর প্রয়োগ করেছেন। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জাতির মধ্যে এর ভিন্ন ভিন্ন রূপ হয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধান করলে সবার মর্মমূলে একটি অভিন্ন মৌল সাংস্কৃতিক কাঠামো লক্ষ্য করা যাবে।১৬

 

মানুষের সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে একটি উল্টো ধারা। শয়তানের প্ররোচনা, বিদ্রোহ ও অবিশ্বাসই এ ধারার উৎস। সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তি, সাংস্কৃতিক বিকার ও অপসংস্কৃতি এ সবই এ উৎস থেকে উৎসারিত। ইসলামী সংস্কৃতির পাশাপাশি এ শয়তানের অপসংস্কৃতির চর্চাও আবহমান কালের। আদম ও হাওয়া আ. অন্যায় করে চলে এলেন এ মাটির পৃথিবীতে। স্বাভাবিকভাবে তাদের সাথে এসে গেলে শয়তান। দ্বন্দ শুরু হলো সত্য ও মিথ্যার, হক ও বাতিলের, ন্যায় ও অন্যায়ের। এখানে একদিকে হিদায়াত অন্যদিকে গোমরাহী। প্রতিযোগিতা সমানতালে। যেখানে ফেরাউন সেখানে মূসা। যেখানে নমরুদ সেখানে ইবরাহীম আ.। নমরুদ ভীষণ শক্তিধর। কিন্তু ইবরাহীম অসীম সাহসী। সংস্কৃতির সূচনা বিন্দুতে কোন বুদ্ধিভ্রষ্টতা-কোন জড়তা নেই, আছে প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত সত্যনিষ্ঠা। মানুষ কোন দিন অসভ্য, অমানুষ বা অপমানুষ ছিল না। সে প্রথমেও মানুষ, মাঝেও মানুষ, শেষেও মানুষ। স্থান ও কাল তার বুদ্ধির সাথে যুক্ত হয়ে বিচিত্র ও নিত্য নতুন রূপ নিয়েছে। জ্ঞানই মানুষকে বৈশিষ্ট মন্ডিত করেছে। জ্ঞান থেকেই তার যাত্রা শুরু। তার জ্ঞানই শয়তানকে তার চির শত্র“র সারিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শয়তানের আছে বুদ্ধির অহংকার, মানুষের আছে বুদ্ধি ও জ্ঞানের সম্পদ। জ্ঞানের অভাবেই শয়তান পথভ্রষ্ট। বুদ্ধির অহংকার ও ঔদ্ধত্যের কারণেই শয়তান চিরকালের জন্য অভিশপ্ত হলো। আসলে জ্ঞান ছাড়া, বুদ্ধি একটা পাগলা হাতি বৈ আর কিছু নয়। তাইতো শয়তানের কোন সৃষ্টি নেই, শুধু ধ্বংস, ধ্বংসু আর ধ্বংস। মানুষের সৃষ্টিতে ভাঙার কাজে তার ভূমিকা সক্রিয়। আর আদম আ. বিদ্রোহে শামিল হয়েও নতুন প্রথিবীর সম্রাট। কারণ তাঁর মধ্যে লজ্জাবোধ ছিলো, ছিল অনুশোচনা। আমরা জানি আদম আ. সব সময় শরমিন্দা ছিলেন যে, তিনি আল্লাহর আদেশকে অমান্য করে জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছিলো। আল্লাহর প্রতিনিধি ও প্রেরিত পুরুষ হিসেবে আদম আ. এর প্রধান দায়িত্ব ছিল এ দুনিয়ায় আল্লাহর খিলাফত (রাজত্ব ) কায়েম করা এবং পৃথিবীকে মানুষের বাসোপযোগী করে গড়ে তোলা। এ ভাবে আদম আ. এর মাধ্যমে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম দ্বীন ইসলাম তথা ইসলামী সংস্কৃতির ভিত্তিমূল রচিত হলো।১৭

 

আদম আ. এর পর যে পয়গম্বরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তিনি হচ্ছেন নূহ আ.। তিনি আল্লাহর দ্বীন তথা ইসলামী সংস্কৃতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। মানুষের অবিশ্বাস, অবিবেবচনা এবং পরস্পর পরস্পরের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ পুথিবীকে অপরিচ্ছন্ন করেছিল। তখন প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল দ্বীনকে পরিশুদ্ধ ও যুযেগাপযোগী করবার। আল্লাহ তাআলা নূহ আ. কে প্রেরণ করেছিলেন তাঁর স¤প্রদায়ের অপরিচ্ছন্ন লোকদেরকে পরিচ্ছন্ন ও সংস্কৃতিবান করার জন্য। কুরআনের ভাষায় নূহ আ. তাঁর স¤প্রদায়ের লোকদেরকে বলেছিলেন: তোমরা যদি ন্যায়পথে চল এবং বিশুদ্ধতা অর্জন তথা সংস্কৃতিবান হওয়ার চেষ্টা করো তা হলে আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে তারা তাঁর কথায় কর্ণপাত করলো না।

 

নূহ আ. এর সময় ইসলামের যে রূপটি প্রস্ফুটিত হয়েছিল সেটি ইসলামী সংস্কৃতির পূর্ণরূপ নয়। আদম আ. থেকে অনেকটা অগ্রসর, কিন্তু পূর্ণারূপে প্রতিষ্ঠিত নয়। মানুষ তখনো পার্থিব ঐশ্বর্যকে একমাত্র কাম্য মনে করতো এবং তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের অনুশোচনা ছিলনা। সুতরাং পয়গম্বর তাদের ধ্বংস কামনা করলেন। এখানেই নূহ আ. এর অসম্পূর্ণতা। তিনি অধৈর্য হয়েছিলেন এবং পাপীদের ধ্বংস চেয়েছিলেন।১৮

 

নূহ আ. এর পরে উল্লেখযোগ্য নবী হলেন ইবরাহীম আ.। তিনি ছিলেন সত্যানুসন্ধ্যানী এবং সত্য সাধক। সুস্পষ্টভাবে দ্বীনের কার্যক্রমের গণনা আমরা ইবরাহীম আ. থেকেই করে থাকি। ইবরাহীম আ. এর পিতা আজর ছিলেন মূর্তিপূজক এবং তার ব্যবসা ছিল মূর্তি নির্মাণ। আজর নিয়মিত মূর্তি নির্মাণ করতেন এবং দক্ষ মূর্তি নির্মাতা হিসেবে তার খ্যাতি ছিল। সংস্কৃতিবান ব্যক্তি হিসেবে শৈশব থেকেই ইবরাহীম আ. মূর্তিপূজার প্রতি বিরূপ ছিলেন। তিনি কোন দিন মূর্তিপূজা করেননি। ইবরাহীম আ. বহুবিধ জিজ্ঞাসা ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সত্যকে আবিস্কার করেছিলেন এবং বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কুরআন মজীদে বিশদভাবে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

 

ইবরাহীম আ. এর পরে যে নবীর নাম ইতিহাসের ক্রমধারায় উল্লেখযোগ্যতা পেয়েছে, তিনি হচ্ছেন মূসা আ.। মূসা আ. কে ইহুদীরা তাদের আইন প্রণেতা হিসেবে মনে করে। যথার্থই তিনি পার্থিব জীবন ব্যবস্থাপনায় এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অনুশাসন প্রবর্তন করেছিলেন, যেগুলো এখনো প্রাচীনপন্থী ইহুদীরা মেনে চলে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন ধীরে ধীরে ইসলামী আইন ও সংস্কৃতি গড়ে উঠছিল তখন অনেক অনুশাসনের ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসুল মূসা আ. এর আইনকে অবলম্বন করেছিলেন। বনী কুরায়যা যখন বিশ্বাসঘাতকা করেছিল তখন তার শাস্তি দেয়া হয়েছিল ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত এর আইনানুসারে। ইসলামে খাদ্যাভাসে হারাম-হালালের যে নির্দেশাবলী আছে, সেগুলো মূসা আ. এর অনুশাসনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। মূসা আ. নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, কোন দেবমূর্তির উদ্দেশ্যে নিহত প্রাণী হারাম, চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে গৃহীত প্রাণীও হারাম। চতুষ্পদ জন্তুগুলোর মধ্যে যে প্রাণী তৃণভোজী এবং যাদের পায়ে ক্ষুর আছে এবং যে ক্ষুর দ্বিধা বিভক্ত সেই প্রাণী হালাল। কিন্তু আল্লাহর নামে জবাই না করলে তা হারাম হবে। রক্ত হারাম এবং শুকর হারাম। আমরা এ অনুশাসন ও সংস্কৃতির সবকটি গ্রহণ করেছি। তবে আমাদের মধ্যে নতুন কিছু অনুশাসন ও সংস্কৃতি এসেছে এবং খাদ্য বিষয়ে অতিরিক্ত কিছু বিচার বিবেচনাও এসেছে।১৯

 

ইসলামী সংস্কৃতির পূর্ণতা এলো মহানবী সা. এর মাধ্যমে। ইসলাম যেমন সকল দ্বীনের সর্বশেষ সংস্করণ রাসূলুল্লাহ সা. ছিলেন তেমনি সর্বশেষ ঐশী বাণীবাহক। তাই দেখা যায়, ইসলামই একমাত্র দ্বীন যেখানে সকল দ্বীনের সুন্দরতম গুণগুলোর পূর্ণতা বিকাশ সম্ভবপর হয়েছে। আর মুহাম্মদ সা. এর চরিত্র বৈশিষ্ট্যেও সকল নবী-রাসূল ও মহাপুরষের শ্রেষ্ঠ গুণগুলোর অভূতপূর্ব সমাবেশ ঘটেছে। তাঁর মধ্যে আদম আ. এর মহত্ত্ব, নূহ আ. এর প্রচারনিষ্ঠা, সালেহ আ. এর বিনীত প্রার্থনা, ইবরাহীম আ. এর একত্ববাদ, ইসমাঈল আ. এর আত্মত্যাগ , মূসা আ. এর পৌরুষ, হারুন আ. এর কোমলতা, ইউসুফ আ. এর সৌন্দর্য, ইয়াকুব আ. এর ধৈর্য, আইউব আ. এর সহনশীলতা, দাউদ আ. এর সাহসিকতা, সুলায়মান আ. এর বিচারজ্ঞান ও ঐশ্বর্য, ইয়াহইয়া আ. এর সরলতা, ইউনুস আ. এর অনুশোচনা, ঈসা আ. এর অমায়িকতা ইত্যাদি সকল সুমহান গুণের পূর্ণ সমন্বয় ঘটেছিল। তাঁর প্রচারিত দ্বীনে যেমন সকল দ্বীনের সার-সংস্কৃত হয়ে বিকাশ লাভ করেছে, তেমনি তাঁর জীবন বিকাশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে সকল প্রেরিত পুরুষের চারিত্রিক-বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে। তাই বলা হয়, তাঁর প্রচারিত আদর্শই মানব জাতির জন্য পূর্ণ আদর্শ।২০ কুরআন মজীদে বলা হয়েছে: নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ।২১ আরো বলা হয়েছে: রাসূল সা. তোমাদেরকে যা প্রদান করেন তা গ্রহণ কর এবং তিনি যা নিষেধ করেন  তা থেকে বিরত থাক।২২ বস্তুত তিনি মানবমন্ডলীকে নিছক পরলৌকিক মুক্তির পথ দেখাননি। তিনি সকল মানুষেরই ইহজগত থেকে পরজগত পর্যন্ত অখন্ড সুন্দর জীবনের সন্ধান ও পূর্ণস্বাদ পাওয়ার পথ দেখিয়েছে।

 

একজন সংস্কৃতিবান মানুষের যেসব গুণ থাকা প্রয়োজন শৈশব থেকেই মহানবী সা. এর মধ্যে তা বিদ্যমান ছিল। আরবে সে যুগে এটা ছিল একটি দুর্লভ মহিমা। এই মহিমায় বিভূষিত যে পরিচ্ছন্ন পুরুষ তাঁকেই আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা নির্বাচিত করেছিলেন তাঁর, প্রতিনিধিরূপে। শৈশব থেকেই মহানবী স. সত্যবাদী এবং ন্যায়নিষ্ঠ ছিলেন। তাই সকলে তাঁকে বলতো আল-আমীন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মধ্যে সত্যের প্রেরণা এসেছিল। কোনরূপ অপসংস্কৃতি তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। আরবের লোকেরা দীর্ঘ রাত জেগে গল্পের আসর বসাতো। এসব গল্পের আসরে পান-ভোজন চলতো। বালক মুহাম্মদ সা. এর একবার ইচ্ছা হয়েছিল এরকম একটি গল্পের আসরে যোগ দেয়ার। কিন্তু তাঁর যোগ দেয়া হয়নি। যে গৃহে গল্পের আসর বসেছিল সে গৃহ পর্যন্ত আসতে আসতে তাঁর নিদ্রা আসে। এবং নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে তিনি পথিমধ্যে শুয়ে পড়েন।২৩

 

আর একটি ঘটনার কথা আমরা বলতে পারি। যখন কাবাঘর সংস্কারের সময় বালক মুহাম্মদ সা. নিযুক্ত হয়েছিলেন। সে সময়কার প্রথামত নির্মাণ কাজে যারা নিযুক্ত হতো তারা উলঙ্গ হয়ে নির্মাণের উপকরণ বহন করে আনতো। যখন বালক মুহাম্মদ সা. কেও উলঙ্গ হতে বলা হলো। তখন তিনি চৈতন্য হারিয়ে ফেললেন। এর ফলে তাঁকে আর উলঙ্গ হতে হয়নি। দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিটি অবস্থায় আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে পবিত্র রেখেছিলেন। কোন প্রকার অন্যায় কর্ম তাঁর দ্বারা সংঘটিত হয়নি। এবং আরবের অপসংস্কৃতি তাকে গ্রাস করতে পারেনি। যেহেতু তিনি আল্লাহ কর্তৃক নিয়োজিত ছিলেন কল্যাণের আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য, সে জন্য আল্লাহ কখনো অকল্যাণ ও অপবিত্রতার স্পর্শ তাঁর দেহে এবং মনে লাগতে দেননি।২৪

শৈশব থেকে মহানবী সা. তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদের পরিপন্থী কোন প্রথা অনুসরণ করেননি। আল্লাহ তাআলা সব সময় তাঁকে পরিচ্ছন্ন রেখেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, নবুওয়াত প্রাপ্তির ফলেই নানাবিধ বিষয়ে তাঁর ধ্যান-ধারনার পরিবর্তন সাধিত হয়নি। নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বেই তাঁর মধ্যে মূর্তিপূজার বিরোধিতা ছিল। তাছাড়া তিনি কুরাইশ বংশের বিভিন্ন দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত খাদ্য কখনো গ্রহণ করেননি।  আরবের লোকেরা মরুভূমির বালুর মধ্যে বিচরণকারী এক ধরনের চতুষ্পদ জন্তু আহার করতো।  এই জন্তু গুলো দাঁতালো এবং ইঁদুরের সমগোত্রীয় ছিল। নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে বাল্যে ও যৌবনে রাসূলুল্লাহ সা. কখনো এ ধরনের ইঁদুরের গোশত ভক্ষণ করেননি।

 

সৈয়দ আলী আহসান তাঁর ‘সংস্কৃতির উজ্জীবনের ক্ষেত্রে মহানবী’ শীর্ষক প্রবন্ধে একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। মক্কা বিজয়ের পর বিভিন্ন লোক রাসূলুল্লাহ সা. এর হাতে হাত রেখে শপথ গ্রহণ করেন। মহিলারাও শপথ গ্রহণ করেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা. মহিলাদের হাত স্পর্শ করেননি। তার সামনে পানি ভরা একটি পাত্র ছিল। তিনি সেই পানিতে নিজের ডান হাত ডুবিয়ে তুলে নেন এবং মহিলারা একে একে সেই পানিতে হাত রেখে আল্লাহর রাসূল সা. এর কাছে বাইআত বা দীক্ষা গ্রহণ করেন। পানিতে হাত রাখবার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এ পানিতে যেহেতু রাসূলুল্লাহ সা. হাত রেখেছিলেন, সুতরাং যারাই এ পানিতে হাত রেখেছেন তারাই আল্লাহর রাসুলের সা. হাতের স্পর্শ পেয়েছেন এটাই ধরে নিতে হবে। এভাবে পানি ব্যবহারের ফলে সমগ্র ঘটনাটি একটি কাব্য মর্যদা পায়। পৃথিবীর কোন ধর্মের ইতিহাসে এহেন মধুর দীক্ষা গ্রহণ পদ্ধতি কখনো ঘটেনি। তিনি যে সংস্কৃতিবান পুরুষ ছিলেন এবং তাঁর যে কাব্যিক অনুভূতি ছিল এতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

 

একটি রিওয়াতে আছে যে, মদীনা শরীফে একদিন রাসূলুল্লা সা. পথ হেঁটে যাচ্ছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন যে, সামনে রাস্তার পাশে একটি খেজুর গাছের আড়ালে আবেদনপত্র নিয়ে একটি হাত বেরিয়ে এসেছে। তিনি থমকে দাঁড়ালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন ‘এ হাতটি কার- পুরুষের না মহিলার ?’ খেজুর গাছের আড়াল থেকে উত্তর এলো, ‘মহিলার’। রাসূলুল্লাহ স. তখন মন্তব্য মন্তব্য করলেন, ‘মহিলার হাত-তা হলে মেহিদী নেই কেন ? এ কাহিনীতে বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সা. কেমন সৌন্দর্যপ্রিয় ছিলেন। এ ঘটনার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর রাসূল সা. সকল বিষয়ে সঙ্গতি খুঁজতেন। আরবের প্রতিটি মানুষকে তিনি একই সঙ্গে বিশ্বাসে এবং সৌন্দর্য চেতনার উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।২৫

 

সংস্কৃতির নান্দনীক প্রকাশ ঘটে মানুষের আচরণে। প্রাত্যহিক কর্মব্যবস্থাপনায়, পোশাক পরিচ্ছদে, পর্যটনে এবং পরিচ্ছন্ন ইচ্ছার বিকাশে। এসব কিছু সাধারণভাবে একজন মানুষের চরিত্রে ধরা পড়া কঠিন। কোন না কোন ক্ষেত্রে কোন বিষয়ে মানুষের খর্বতা থাকতে পারে এবং তা থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহর রাসূল সা. এমন একজন পূর্ণাঙ্গ পুরুষ ছিলেন যে, কোন ক্ষেত্রেই তাঁর খর্বতা ছিলনা। তিনি পরিচ্ছন্ন পুরুষ ছিলেন এবং তাঁর পরিচ্ছন্নতা সকল কর্মে প্রকাশ পেত। তাঁর  কর্মে কোন ভারসাম্যহীনতা ছিলনা। তিনি তাঁর প্রতিটি কর্ম সুনির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন করতেন। আল্লাহর রাসূল সা. একজন পূর্ণাঙ্গবোধের মানুষ ছিলেন। আর এই পূর্ণাঙ্গবোধই হচ্ছে সংস্কৃতির পৃষ্ঠভূমি। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একজন মানুষের চিন্তাধারা, জীবন যাপন প্রণালী এবং আকীদাহ-বিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাসূলুল্লাহ সা. এর চিন্তাধারা ছিল স্বচ্ছ এবং সংশয়মুক্ত। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে শুদ্ধতা এবং পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সংশয়মুক্ততা প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর দৈনন্দিন জীবন ধারার মধ্যে পরিমিতিবোধ, বিবেচনাবোধ এবং বিচার-বুদ্ধি সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়েছিল। মলিন পোশাক তিনি পরিধান করতেন না, খাদ্যাভ্যাসে তিনি ছিলেন স্বল্পাহারী। অতিথি আপ্যায়নে তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান। এক কথায় তিনি ছিলেন সকল কিছু নিয়ে সমাবত অথচ সকল কিছুর উর্দ্ধে। কবি-সাহিত্যিকরা যুগ যুগ ধরে বিচিত্র শব্দ সম্ভারে তাঁর গুণাবলী ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন, কিন্তু কখনো পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। তিনি ছিলেন মানুষের পরম হিতৈষী বন্ধু এবং আল্লাহর গুণে গুণান্বিত ইনসান-ই-কামিল। তিনি যখন পৃথিবীতে এলেন সে সময় পৃথিবী অপসংস্কৃতি ও পাপ-পঙ্কিলতায় পরিপূর্ণ ছিল। তিনি এসে পৃথিবীকে সংস্কার ও পরিচ্ছন্ন করলেন। ফতেহ মক্কার পর রাসূলুল্লাহ সা. আল্লাহর নির্দেশে বলেছিলেন: সত্য এসে গেছে, মিথ্যা নির্মূল হয়েছে, নি:সন্দেহে মিথ্যা নির্মূল হবারই বিষয়।২৬ মক্কা বিজয়ের পর সমগ্র আরবের জন্য এবং পরবর্তীতে গোটা বিশ্বের জন্য এমন একটি সাংস্কৃতিক ধারা প্রতিষ্ঠিত হলো যা অদ্যাবধি বিদ্যমান রয়েছে। এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। এভাবে আদম আ. এর দ্বারা ইসলামী সংস্কৃতির যে ভিত রচিত হয়েছিল যুগে যুগে নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে তা বিকশিত হয়ে মহানবী সা. এর যুগে এস পূর্ণতা লাভ করলো।

 

সভ্যতা ও সংস্কৃতি

 

সভ্যতা ঈরারষরুধঃরড়হ মানবীয় কৃষ্টির ঈঁষঃঁৎব আদর্শ অবস্থা। এর বৈশিষ্ট্য হলো বর্বরতা ও অযৌক্তিক আচরণের সম্পূর্ণ নিরসণ আর প্রাকৃতিক, সাংস্কৃতিক, আত্মিক ও মানবীয় সম্পদসমূহের সর্বাধিক ব্যবহার। সভ্যতা কথাটি মানব সমাজের প্রতি প্রযোজ্য এবং এর দ্বারা বস্তুগত ও সামাজিক সমৃদ্ধির উন্নত অবস্থা বুঝায়।

 

পক্ষান্তরে কৃষ্টি বা সংস্কৃতি কথাটি সমাজের প্রতি আরোপিত হলে এর দ্বারা সভ্যতার মননশীলতার দিকটার প্রতি জোর দেয়া হয়। আবার কৃষ্টি কথাটি ব্যক্তিদের প্রতি আরোপিত হলে এর দ্বারা সভ্য জীবনের শ্রেষ্ঠ অংশের সঙ্গে মেলামেশার ফলে যে আলোক সম্পাত সম্ভব হয় তার প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়। রুচির মাধুর্য ও আচার ব্যবহারের সমীচীনতার মাধ্যমে এর বিশেষ প্রকাশ ঘটে।২৭

 

এম.জেড সিদ্দিকী কালচার বা সংস্কৃতি এর যথার্থ সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। তিনি শুধু সংস্কৃতির সংজ্ঞাই প্রদান করেননি, সেই সঙ্গে তামাদ্দুন বা সভ্যতা এর সাথে তার তুলনাও করেছেন। তাঁর মতে- সংস্কৃতি দ্বারা চিন্তার বিকাশ ও উন্নয়ন বুঝায় আর সভ্যতা সামাজিক উন্নতির উচ্চতম পর্যায়কে প্রকাশ করে। কাজেই বলা যায়, সংস্কৃতি মানসিক অবস্থাকে প্রকাশ করে আর সভ্যতা তারই সমান প্রকাশ ক্ষেত্রকে তুলে ধরে। সংস্কৃতির সর্ম্পক চিন্তাগত কর্মের সাথে আর সভ্যতার সর্ম্পক বৈষয়িক ও বস্তুকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে। প্রথমটি একটি আভ্যন্তরীন ও ভাবধারাগত অবস্থা আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে বাহ্যিক জগতে তার কার্যকারিতার নাম।২৮

 

বস্তু ব্যক্তির সার্বিক সুস্থতা, সঠিক লালন ও বর্ধন লাভের জন্যে যেমন দেহ ও প্রাণের ভারসাম্যপূর্ণ উৎকর্ষ একান্তই আবশ্যক। তেমনি একটি জাতির সংস্কৃতি ও সভ্যতার পুরোপুরি লালন একান্তই জরুরী সে জাতির সঠিক উন্নতির জন্যে। বলা যায় সভ্যতা হচ্ছে দেহ আর সংস্কৃতি হচ্ছে তার জীবন বা প্রাণ।

 

মানব জীবনের দুটি দিক। একটি বস্তগত আর দ্বিতীয়টি আধ্যাত্মিক। এ দুটিরই রয়েছে বিশেষ বিশেষ চাহিদা। সে চাহিদা পরিপূরণে মানুষ প্রতি মুহুর্তে থাকে গভীর ভাবে নিমগ্ন। একদিকে যদি দৈহিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে তাকে টানে জীবিকার সন্ধানে, তা হলে তার আত্মার দাবি পূরণের জন্যে তার মন হয় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তাই মানুষের বস্তুনিষ্ঠ বৈষয়িক প্রয়োজন পূরণের জন্যে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তার সহায়তা করে। আর ধর্ম-বিশ্বাস, শিল্পকলা, সৌন্দর্যবোধ ও দর্শন নিবৃত্ত করে তার আত্মার বিকাশ। অন্য কথায়, ব্যক্তির সূক্ষ্ম ও সুকোমল আবেগ-অনুভূতি এবং হৃদয় ও আত্মার দাবিও পূর্ণ করে যে সব উপায়-উপকরণ তাই হচ্ছে সংস্কৃতি। সঙ্গীত, কবিতা, চিত্রাংকণ, সাহিত্য, ধর্ম-বিশ্বাস, দার্শনিক চিন্তা প্রভৃতি এক-একটা জাতির সংস্কৃতির প্রকাশ মাধ্যম। কোন বাহ্যিক ও বৈষয়িক উদ্দেশ্য লাভের জন্য এসব তৎপরতা সংঘটিত হয় না। আত্মিক চাহিদা পূরণই এগুলোর আসল লক্ষ্য। এসব সৃজনধর্মী কাজেই অর্জিত হয় মন ও হৃদয়ের সুখানুভূতি আনন্দ ও উৎফুল্লতা। একজন দার্শনিকের চিন্তা ও মতাদর্শ, কবির কাব্য ও কবিতা, সুরকার ও বাদ্যকারের সুর-ঝংকার এসব ব্যক্তির হৃদয়-বৃত্তির বহি:প্রকাশ। এসব মুল্যবোধ হৃদয়ানুভূতি ও আবেগ-উচ্ছাস থেকেই হয় সংস্কৃতির রূপায়ন। কিন্তু সভ্যতার রূপ এ থেকে ভিন্নতর। বস্তুনিষ্ঠ জীবনের রূঢ় বাস্তব ও প্রকৃত উন্নতির স্তর ও পর্যায় সমষ্টি হচ্ছে সভ্যতা। বিশেষ-নির্বিশেষ সকলের পক্ষেই তা মূল্যায়ন করা সহজ এবং হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব।২৯ যেমন- গ্রীক সভ্যতা, আর্য সভ্যতা, সেমিটিক সভ্যতা ইত্যাদি।

 

সভ্যতা মানুষের বাহ্যিক জীবন নিয়ে আলোচনা করে। বস্তুগত প্রয়োজনাবলী তার লীলাক্ষেত্র। বৈজ্ঞানিক আবিস্কার, বিভিন্ন শৈল্পিক দুর্লভ উপকরণ ও প্রতিষ্ঠান সভ্যতার মহাকীর্তি। কিন্তু সংস্কৃতি হচ্ছে আভ্যন্তরীণ জীবন কেন্দ্রিক। অন্তর্নিহিত জীবনই হচ্ছে সংস্কৃতির লীলাক্ষেত্র। অর্থাৎ সংস্কৃতি মন ও মগজ-কেন্দ্রিক-আবর্তন-বিবর্তনের স্বত:স্ফূর্ত ও উন্মুক্ত বহি:প্রকাশ। এ কারণে সংস্কৃতি স্বাধীন-মুক্ত পরিবেশেই যথার্থ উৎকর্ষ লাভ করতে পারে।৩০

 

অনেকেই সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে এক মনে করেন। সভ্যতা ঈরারষরুধঃরড়হ কালচার বা সংস্কৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট, কিন্তু সংস্কৃতি ঈঁষঃঁৎব নয়। তবে এ দুয়ের মাঝে সাদৃশ্য অনস্বীকার্য। সভ্যতা আকাশচুম্বী প্রাসাদ নির্মাণ করেছে; সংস্কৃতি সে প্রাসাদকে মহিমামন্ডিত ও সুশোভিত করে দিয়েছে। বস্তুত সভ্যতা ও সংস্কৃতি দুটিই মানব জীবনের মৌল প্রয়োজন। সভ্যতা একটা জাতিকে বস্তুনিষ্ঠ শক্তিতে মহিমাময় করে আর সংস্কৃতি তাকে গতিবান করে নির্ভুল পথে।

 

ইসলাম সংস্কৃতি ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি

 

ইসলামী সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করা। অর্থাৎ মানুষ মহান আল্লাহর খলীফা হিসেবে এ পৃথিবীতে কুরআন সুন্নাহর নির্দেশানুযায়ী তার সকল কর্মকান্ড পরিচালনা করবে। এবং এরই আলোকে মানবাত্মার সার্বিক উৎকর্ষ ও উন্নতি সাধন করে পরকালের মুক্তি অর্জন করবে। কুরআনের ভাষায়, একেই ‘তাযকিয়া’ বলা হয়েছে। আর তাই ইসলামী সংস্কৃতি।

 

পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মূল দর্শন হলো, এ জীবন কয়েকটি মৌল উপাদানের উদ্দেশ্যহীন সংমিশ্রণের ফলে অস্তিত্ব লাভ করেছে। এর কোন লক্ষ্য নেই নেই কোন পরিণতি। এসব মৌল উপাদানের পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ারই নাম মৃত্যু। এবং মৃত্যুর পর কিছুই নেই- আছে শুধু অন্তহীন শূণ্যতা।

 

ইসলামী সংস্কৃতি সমাজের ব্যক্তিদের মাঝে এমন শৃংখলা গড়ে তোলে, যাতে ব্যক্তি চরিত্র ও সমাজ সংস্থায় আল্লাহর ভারসাম্যপূর্ণ গুণাবলীর প্রতিফলন ঘটে। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে জীবন যেহেতু একটা আকস্মিক ঘটনা মাত্র। এ জন্য দুনিয়ার যেমন স্থায়ী মুল্যমান নেই। নেই প্রতিফল পাওয়ার কোন ব্যবস্থা। সুতরাং খাও-দাও ফুর্তি করো। এটিই এ সংস্কৃতির প্রকৃত দর্শন।

 

ইসলামী সংস্কৃতিতে বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, স্রষ্টার একত্ব ও মিল্লাতের অভিন্নতার ভিত্তিতে এক ব্যাপকতর ঐক্য ও সম্মিলিত ভাবধারা গড়ে ওঠে। এর ফলে মানব সমাজ থেকে সবরকমের জোর-জবরদস্তি, স্বেচ্ছাচারিতা, যুলুম-শোষণ ও হিংসা-বিদ্বেষ দূরীভুত হয়ে যায় এবং পরস্পরের আন্তরিক ও নি:স্বার্থ ভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে।

 

পশ্চিমা সংস্কৃতি যেহেতু ব্যক্তি স্বার্থ ও সুখবাদী দর্শনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেছে, সেজন্যে এরই ফলে বিশ্বের ব্যক্তি ও বিভিন্ন জাতির মাঝে পারস্পরিক দ্বন্দ-সংগ্রাম, হিংসাদ্বেষ, রক্তারক্তি ও কোন্দল-কোলাহল অনবিার্য হয়ে ওঠে। ফলে চারদিকে চরম বিপর্যয় ও অশান্তি বিরাজমান থাকে। শাসক ও শাসিত এবং বিজয়ী ও বিজিতের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণী মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।৩১

 

পাশ্চাত্যের বস্তবাদী দর্শনে সংস্কৃতি নিছক চিত্ত-বিনোদনের উপায় ও মাধ্যম বলে বিবেচিত। আর এর প্রাথমিক উপকরণ হলো অশ্লীল গান-বাজনা ও নৃত্য। পরবর্তীতে এর সাথে যোগ হলো যুবক-যুবতীর প্রেমাভিনয়। শুধু এখানেই এর শেষ নয়। এ সংস্কৃতিতে নির্লজ্জতা ও নগ্নতা প্রদর্শন শিল্প-সৌকর্যেরই পরাকাষ্ঠা হয়ে দাঁড়ালো। যে যত বেশি নির্লজ্জতা প্রদর্শন করতে পারবে সেই হবে তত বেশি সার্থক শিল্পী। সংস্কৃতি জগতে সেই হবে একজন বিরাট হীরো।

 

কিন্তু ইসলামী সংস্কৃতি তার আপন মহিমায় ভাস্বর। এ সংস্কৃতির অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলোই তাকে এ স্বাতন্ত্র্য মর্যাদা দান করেছে। ইসলামী সংস্কৃতিতে বেহায়পনা ও নিলর্জ্জতার কোন স্থান নেই। এতে লজ্জা-শরমকে ঈমানের অঙ্গ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতিকে সম্মানের মানদন্ড নিরুপণ করা হয়েছে। এ সংস্কৃতির লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে পরিচ্ছন্ন, সুস্থ, মার্জিত, ভদ্র এবং আদর্শবান ও সুরুচিসম্পন্ন চরিত্রবান রূপে গড়ে তোলা। যাতে মানুষ আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাহ হিসেবে তার খিলাফতের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম হয়। শুধু চিত্ত বিনোদনই ইসলামী সাংস্কৃতির লক্ষ্য নয়। আবার একে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষাও করা হয়নি, বরং যে সব চিত্ত বিনোদনে শরীআতের সীমা লংঘিত হয় এবং যা মহান আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়, তাই ইসলামে নিষিদ্ধ।

 

আসলে সংস্কৃতি একটি প্রবাহমান নদীর মত। সংস্কৃতি-অসংস্কৃতি একাকার হয়ে আজ ঐ নদীর স্রোতে প্রবাহিত হচ্ছে। বর্তমান মুসলিম সমাজেও পাশ্চাত্য তথা পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র ও পৌত্তলিকতার ভাবধারায় গড়া সংস্কৃতি বিরাজমান। বিদেশী ও বিজাতীয় ভাবধারার প্রভাবে মুসলিম সংস্কৃতি আজ পংকিলতাময়। আজ আমাদের সংস্কৃতিকে বিদেশী ও বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাব থেকে মুক্ত করে ইসলামী আদর্শের মানে উত্তীর্ন এক নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ইসলামী আদর্শবাদীদের সংগ্রাম চালাতে হবে। এ সংগ্রাম কঠিন ও দু:সাধ্য। এ পথে পদে পদে নানাবিধ বাধা বিপত্তি, প্রতিবন্ধক ও অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু পরিপূর্ণ নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সাথে এ সংগ্রাম চালাতে পারলে এর জয় হবেই ইনশাআল্লাহ। বর্তমান বিশ্ব এমনি ভারসাম্যপূর্ণ, মানবতাবাদী ও সকল মানুষের জন্য কল্যাণকর এক সংস্কৃতির প্রতীক্ষায় উদগ্রীব।

 

 

তথ্যসূত্র:

 

১.    কাজী দীন মুহম্মদ, ডক্টর, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশে রাসূল্লাহ্ সা. এর অবদান (প্রবন্ধ), ঈদে মিলাদুন্নবী সা. স্মরণিকা, ই: ফা: বা: ঢাকা, ১৪২০ হি: পৃ.৫৫

২.    আসলে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি অসংস্কৃত বা অপরিচ্ছন্ন শব্দেরই পরিচ্ছন্ন বা বিশুদ্ধরূপ। এতে একটা নেতিবাচকভাব প্রকাশ পায়। অর্থাৎ যা ছিল অপরিচ্ছন্নতাকে বা পরিচ্ছন্ন করার ক্রীয়াশীলতা বুঝা যায়। ১১শ শতাব্দীতে সেনরাজাগণ বঙ্গদেশ অধিকার করার পরে এদেশে উচ্চকোটী মহলে প্রবর্তিত ভাষার বিকৃতি সহ্য করতে না পেরে সে ভাষাকে সংস্কৃত করেছিলেন। এ জন্যই এ অঞ্চলে তা সংস্কৃত ভাষা বলে প্রচলিত। (দেখুন: দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, রসূলুল্লাহ সা. এর দৃষ্টিতে সংস্কৃতির রূপরেখা (প্রবন্ধ), অগ্রাপথিক ১০ম বর্ষ, ৮ম সংখ্যা, ই: ফা: বা: ঢাকা আগষ্ট ১৯৯৫, পৃ: ১৭)

৩.    ঐধহং বিযৎ, অ উরপঃরড়হধৎু ড়ভ গড়ফবৎহ ৎিরঃঃবহ অৎধনরপ গধপফড়াধ ….

৪.    মুহাম্মদ আবদুর রহীম, শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি, খায়রুন প্রকাশানী, ঢাকা, ২০০২, পৃ. ২৫০-২৫২ (আরবীতে তাহযীব শব্দটি ও সাকাফাহ অর্থে ব্যবহৃত হয়। যার অর্থ গাছের শাখা-প্রশাখা কেটে ঠিকঠাক করা, পবিত্র-পরিচ্ছন্ন করে তোলা, পরিশুদ্ধ ও সংশোধন করা)।

৫.    মুহাম্মদ আবদুর রহীম, প্রাগুপ্ত, পৃ. ২৫২-২৫৩

৬.    চযরষরঢ় ইধমনু, ঈঁষঃঁৎব ধহফ ঐরংঃড়ৎু  ঢা. বি পৃ. ৮০

৭.    ঋধরুবব, ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈঁষঃঁৎব ঢা. বি. পৃ. ৬

৮.    আবুল কালাম আজাদ, ইসলামী সংস্কৃতির রূপায়ন, অপ্রকাশিত, পৃ. ৪-৫

৯.    আবুল আ’লা মওদূদী, সাইয়েদ্য, ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা (অনুবাদ-মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান) আধুনিক প্রকাশনী, ঢাকা, ৭ম সং, ১৯৯৮, পৃ. ১৪

১০.   প্রাগুত্ত, পৃ. ২৩৪

১১.   প্রাগুত্ত,

১২.    প্রাগুত্ত, পৃ. ২৩৫

১৩.   প্রাগুত্ত, পৃ. ২৩৫-২৩৬

১৪.   আল-কুরআন, সূরা আল-মায়িদাহ: ৩

১৫.   আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারাহ্: ৩১

১৬.   আবদুল মান্নান তালিব, আধুনিক যুগরে চ্যালেঞ্জ ও ইসলাম, আধুনিক প্রকাশনী, ঢাকা, ১ম সং, ২০০১, পৃ. ৮৮

১৭.   আদম (আ:) এর পৃথিবীতে অবতীর্ণ হওয়াটি যথার্থরূপে শাস্তিরূপ ছিল না। যদিও শাস্তির কথা উল্লেখ আছে। জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতরণ প্রাথমিক বিবেচনায় শাস্তিই মনে হবে, কিন্তু মানুষের পৃথিবীতে আগমনের ফলে সমগ্র বিশ্বে মহান আল্লাহর খিলাফরেত পূর্ণতা সাধন ঘটলো। (সৈয়দ আলী আহসান, ইসলামের আরম্ব ও ক্রমধারা (প্রবন্ধ), অগ্রপথিক, ১০ম বর্ষ, ৮ম সংখ্যা, ই. ফা. বা. ঢাকা ১৯৯৫, পৃ. ১০-১১)

১৮.   প্রাগুত্ত, পৃ. ১২

১৯.   প্রাগুত্ত, পৃ. ১৩-১৪

২০.   ড: কাজী দীন মুহম্মদ, প্রাগুপ্ত, পৃ. ৫৬-৫৭

২১.   আল-কুরআন, সূরা আল- আহযাব: ২১

২২.   আল-কুরআন, সূরা আল-হাশর: ৭

২৩.   সৈয়দ আলী আহসান, সংস্কৃতির উজ্জীবনের ক্ষেত্রে মহানবী (সা:) (প্রবন্ধ), ঈদে মিলাদুন্নবী (স:) স্মরণিকা, ই. ফা. বা. ঢাকা ১৪২০ হি:, পৃ. ৫০

প্রাগুত্ত, পৃ. ৫০-৫১

প্রাগুপ্তত্ত, পৃ. ৫৩

আল কুরআন, সূরা বণী ইসরাঈল:৮১

সম্পাদনা পর্ষদ, বাংলাবিশ্বকোষ, মুক্তধারা, ঢাকা,১ম সং, ১৯৭৫,৪র্থ খ. পৃ.৫৩৩

গ.ত ঝরফফরয়ঁব, ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈড়ষষড় য়ঁরঁস ঢা. বি. পৃ. ২৬

মুহাম্মদ আবদুর রহীম, প্রাগুত্ত, পৃ. ১৯৬-১৯৭

প্রাগুত্ত পৃ ১৯৮

প্রাগুত্ত পৃ ২৪০

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

নিব

:উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তনের একটি শোভন ছড়াপত্র

বাঙলা

আফসার নিজাম সম্পাদিত : চিন্তাশীল পাঠকের মননশীল সৃজন

%d bloggers like this: