ইউরোপ-আমেরিকার পথে-জনপদে

মুহম্মদ মতিউর রহমান

প্রসঙ্গ কথা
অজানাকে জানার প্রবল বাসনা মানুষের একান্ত সহজাত। অসংখ্য উপাদানে নির্মিত বৈচিত্র্যময় এ বিশ্ব অনন্ত রহস্যে পূর্ণ। পৃথিবীতে অসংখ্য প্রাণী, প্রাণী-জগতের নানা বৈচিত্র্য এবং সৃষ্টিকুলের মধ্যে রয়েছে নানা রূপ, রং ও ধরন। প্রকৃতির মধ্যেও রয়েছে সীমাহীন রহস্য ও নানা বৈচিত্র্য। যুগ যুগ ধরে মানুষ পৃথিবীর এ অনন্ত রহস্য উদ্ঘাটনে ও অপার সৃষ্টি বৈচিত্র্য নিরীক্ষণে সদা তৎপর রয়েছে। এ রহস্য ও বৈচিত্র্য মানুষের মনে বিপুল আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা সৃষ্টি করেছে। এ আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা মানুষকে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে নিয়ে গেছে। পৃথিবীর অনন্ত রহস্য ও সীমাহীন বৈচিত্র্য যেমন স্রষ্টার অপরিসীম কুদরতের নিদর্শন, তেমনি তা জানা ও অনুধাবণ করার মধ্যেও অফুরন্ত জ্ঞানের সন্ধান মেলে। তাই আল-কুরআনে একাধিকবার উল্লিখিত হয়েছে  ‘সিরুফিল আরদ’ তোমরা দুনিয়ায় বিচরণ কর (এতে অনেক জ্ঞানের সন্ধান পাবে)।
আল্লাহর নির্দেশ মানার নামই ইবাদত। সে অর্থে পৃথিবীতে বিচরণ করা এক ধরনের ইবাদত। তবে সব কাজেরই একটি উদ্দেশ্য থাকে। উদ্দেশ্য যদি হয় মহৎ, তাহলে সেটা যেমন ইবাদত হিসাবে গণ্য হতে পারে, তেমনি তার দ্বারা মানুষ হয় নানাভাবে উপকৃত। মূলত পৃথিবীতে যখন মানুষ অনুসন্ধিৎসূ দৃষ্টিতে বিচরণ করে, তখন এ পৃথিবী তার সামনে এক রহস্যময় মহাগ্রন্থ হয়ে ধরা দেয়। সে গ্রন্থ পাঠে অনেক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। অজানাকে জানার এবং পৃথিবীতে বিচরণ করে স্রষ্টার বৈচিত্র্যময় জগৎ দেখে কিঞ্চিৎ জ্ঞান ও আনন্দ অনুসন্ধানে আমি বিভিন্ন সময় পৃথিবীর প্রায় ২০টি দেশ পরিভ্রমণ করার প্রয়াস পেয়েছি। এজন্য মহান স্রষ্টাকে জানাই অশেষ শুকরিয়া। আমার ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা অন্যদের মধ্যে সঞ্চারিত করার উদ্দেশ্যে তা লিপিবদ্ধ করে রাখার গরজ অনুভব করেছি। এ গ্রন্থটি সে গরজ থেকেই প্রণীত ও প্রকাশিত।
আমি যতগুলো দেশ পরিভ্রমণ করেছি, সে সকল দেশ সম্পর্কে নয়, বরং শুধুমাত্র ইউরোপের কয়েকটি দেশ ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র সফরের অভিজ্ঞতাই এ গ্রন্থে বর্ণনা করেছি। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও বিত্ত-বৈভবের দিক দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকা সর্বোচ্চে। তাই স্বভাবতই এসব দেশ ও তাদের জনমণ্ডলীর জীবনধারা সম্পর্কে আমাদের জানার আগ্রহ ও কৌতূহল অধিক। আশাকরি, পাঠকের সে আগ্রহ ও কৌতূহল কিছু পরিমাণে হলেও এ গ্রন্থ নিবৃত্ত করতে সক্ষম হবে।
বলতে দ্বিধা নেই যে, যেসব দেশ সফরের অভিজ্ঞতা এ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, তা নানা দিক দিয়ে সীমাবদ্ধ। সেসব দেশ সম্পর্কে আমার জানা-শোনা ও ধারণা খুবই কম। শুধুমাত্র চলতে-ফিরতে মনের আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসার বশবর্তী হয়ে যা দেখেছি ও অনুধাবণ করেছি, কেবল সেটাই বর্ণনা করার প্রয়াস পেয়েছি। তাই এ গ্রন্থ পাঠ করে সেসব দেশ সম্পর্কে কেউ পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করবেন, সেটা দাবি করতে পারি না। তবে আমার দৃষ্টি ও অনুভূতির সাথে মিলিয়ে যদি কেউ এ গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন, তাহলে তিনি সেসব দেশ সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা লাভে সক্ষম হবেন বলে আশা করি।

 গোড়ার কথা
১৯৭৭ সনের ১২ ফেব্রয়ারি থেকে ১৯৯৭ সনের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আমি সংযুক্ত আরব আমিরাতের সুপ্রসিদ্ধ বাণিজ্য- নগরী দুবাইতে প্রবাস-জীবন যাপন করি। সেখানে প্রথম দিকে কয়েক মাস বেকারত্ব, কখনো বেসরকারি চাকরি আবার কখনো ছোট-খাট ব্যবসা ইত্যাদি নানা টানাপড়েনের মধ্যে বিপর্যস্ত অনিশ্চিত জীবন নানা দুঃখ-কষ্ট অতিবাহিত হয়। এরপর ১৯৭৮ সনের ১ মে তারিখে আমি  দুবাই চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিতে প্রকাশনা বিভাগে সম্পাদক হিসাবে কাজে যোগদান করি। দীর্ঘ প্রায় ঊনিশ বছর অর্থাৎ আমার প্রবাস-জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি শেষ চাকরিতে বহাল থাকি। পরিবার-পরিজনসহ আমি দুবাইতে বসবাস করেছি। সেখানে চাকরি করা ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক-শিক্ষা-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। বাংলাদেশী ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য আমি ১৯৮১ সনে ‘বাংলাদেশ ইসলামিক ইংলিশ স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করি। স্কুল প্রতিষ্ঠার সময় প্রথম দিকে দু’এক বছর আমি প্রবাসী কতিপয় বাংলাদেশীর সহযোগিতা পেলেও পরবর্তীতে সম্পূর্ণ এককভাবে আমাকে স্কুলের দায়-দায়িত্ব বহন করতে হয়। স্কুলটি হয়ে ওঠে আমার স্বপ্ন এবং প্রবাসী জীবনের সকল কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র। সরকারি চাকরি, সংসার পরিচালনা ইত্যাদি ব্যক্তিগত কাজের পর আমার বাকি সব সময়টুকু কাটে স্কুলের কাজে। স্কুলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। প্রতি বছর দুবাইতে বাংলা সাহিত্য সম্মেলন ও বাংলা পুস্তক প্রর্দশনীর ব্যবস্থা করি। সাহিত্য সম্মেলনে বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ ও বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিকদের আমন্ত্রণ করে সেখানে নিয়ে যাই। এছাড়া, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন সহ প্রবাসী বাংলাদেশীদেরকে বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করার প্রয়াস পাই। নানা দিক থেকে দুবাইতে আমার বিশ বছরের প্রবাস-জীবন ছিল অত্যন্ত বর্ণময় ও আনন্দঘন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

নিব

:উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তনের একটি শোভন ছড়াপত্র

বাঙলা

আফসার নিজাম সম্পাদিত : চিন্তাশীল পাঠকের মননশীল সৃজন

%d bloggers like this: