অপরিহার্য রক্ত

মাহমুদ বিন হাফিজ

বাজ পড়ার মতই কাজটা তার মাথায় এসে পড়ল। তার কাঁধে এ কাজটা না এসে মাথায় একটা বাজ পড়লেও এর চেয়ে ভাল হত। কাজটা অবশ্যই তাকে করতে হবে। আকষ্মিক এ পরীক্ষার পিছনে খোদার কি উদ্দেশ্য খোদ তিনিই জানেন। ইসহাকের বিক্ষিপ্ত চিন্তার এক অসহায় অংশ এটা। শাহেদ যদি তার মুখমণ্ডলের তীব্র পর্যবেক্ষণ করত তাহলে সে বুঝতে পারত, প্রশান্ত মহাসাগরে ভয়ঙ্কর এক নিুচাপের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ইসহাকের মুখাবয়ব তাকে শাহেদের কাছে স্বাভাবিক রাখে। তারা একজন আরেক জনের হাত ধরে পাশাপাশি হাঁটছে বেড়ি-বাঁধের উপর দিয়ে।
আচমকা শাহেদ দাঁড়িয়ে পড়ে। কিছু একটা দেখছে সে। একটা গুল্মের ওপর একটা ঘাস-ফড়িং বসে আছে। তার মুখে আরেকটা ঘাস-ফড়িং। দেখতে একই রকম কিন্তু আকারে ছোট। বড়টি ছোটটিকে খেয়েই চলছে।
“যখন ছোট ছিলাম” শাহেদ বলল, “একই রকম ফড়িং ধরে একটা আরেকটাকে খাওয়াতাম। খুব আনন্দ পেতাম। আজ সে জিনিসটা দেখে অবাক হলাম।”
“রহস্যময় সৃষ্টির জন্য স্রষ্টার এক অমোঘ বিধান।” ইসহাক বলল, “তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিই চিন্তায় হতবাক করে দেয়।”
“কিন্তু আমি হতবাক হয়েছি এই ভেবে, আমার সামনে Survival of the Fittest এর কত বড় প্রমাণ! এখানে টিকে থাকে সেই যে শক্তিশালী আর যে অভিযোজিত হতে পারে।”
ইসহাকের মুখে কথা এসেও থেমে যায়। খামাখা একটা তর্কের সৃষ্টি করে লাভ কি। তর্ক করে কে নিশ্চিত করে বলতে পেরেছে যে সে জিতেছে? এটা বিজ্ঞান নয় যে চাক্ষুস প্রমাণ দেখিয়ে জিতে যাবে। এটা দর্শন। এর যেমন পক্ষের জবাব আছে তেমনি বিপক্ষেও জবাব আছে। প্রত্যেকের যুক্তিই নিজের দৃষ্টিতে সঠিক। এখানে তাই ইসহাক ঝোপ বোঝার আগে কোপ মারে না।
কিন্তু প্রকৃত ব্যপার যেটা, চরম টেনশন ইসহাককে প্রায় মাতাল করে রেখেছে। কোন রকমে সে নিজেকে সামাল দিচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে তারা প্রায় এক কিলোমিটার চলে এসেছে। এখানে তেমন লোকজনের ভীড় নেই। গার্ডেনের এদিকটায় বাঁধের উপর বিকেল বেলা অনেকে বেড়াতে আসে। ছুটির দিনে তো একেবারে ভিড় লেগে যায়। ছুটির দিন নয় বলে আজ তেমন একটা ভিড় নেই। ইসহাক শাহেদকে নিয়ে পশ্চিমমুখী হয়ে বসে পড়ে।
তাদের সামনে বিশাল প্রান্তর পানিতে টইটুম্বুর। পানির ওপর দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক হতে প্রবল বাতাস ধেয়ে এসে তাদের দেহে ঝাপটা মারছে। দু’কানের পাশে অনবরত শো শো শব্দে কে যেন বাঁশি বাজিয়েই চলছে। পানির বিশাল বিশাল ঢেউগুলো একটা কোণে তীরে এসে ঘুরতে ঘুরতে পাথরের পাটাতনের ওপর কাঁচভাঙ্গা শব্দে আছড়ে পড়ছে। অন্যসময় হলে ইসহাক এ ঢেউয়ের চঞ্চলতায় হারিয়ে যেত। অশান্ত বাতাস তাকে মাতাল করে তুলত। সৌন্দর্যের মোহমায়া একসময় তাকে অদৃশ্যের মায়াবী পদতলে নুয়ে ফেলত। কিন্তু আজ তার মন সমস্ত সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে বিষাদের মহাশূন্যে জমিন হাতড়ে বেড়াচ্ছে। কুণ্ডলী পাকানো ঢেউগুলোর ওপর ইসহাকের চোখদু’টি নিবদ্ধ কিন্তু আদৌ তার দৃষ্টি পানির ওপর নেই। তার দৃষ্টি এখন কাজ করছে না। যদিও তার চোখদু’টি খোলা। সমস্ত মস্তিষ্কই একযোগে বিক্ষিপ্ত চিন্তায় মগ্ন। একসময় চোখজোড়া শাহেদের ওপর নিবদ্ধ হয়।
শাহেদ যেন আজ নিরবতায় সংক্রমিত। পশ্চিমাকাশের অপার সৌন্দর্য দেখায় সে ব্যস্ত। ফালি ফালি পাতলা মেঘের নিচে সূর্যটি ঢাকা পড়ে আছে। মহাসাগরের ওপর কাছাকাছি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপের মত মেঘের খণ্ডগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদের কোনটি সাদা, কোনটি আবার কালচে। শাহেদ এগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে চিত্র-শিল্পীর মত। নেশায় অভ্যস্ত তার লাল চোখদু’টিকে মনে হয় আটলান্টিকের মত গভীর।
শাহেদের এ লাল চোখদু’টি রুমমেটদের কাছে তার মন মেজাজের পরিচয় দেয়। যেদিন তার চোখ টকটকে লাল ও উ™£ান্ত থাকত সেদিন তার সাথে আর কেউ কথা বলত না। চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি খাওয়ার সম্ভবনা কেউ ইচ্ছা করে ঘাড়ে তুলে নিত না। মাঝে মধ্যে রাতে রুমে ঢুকার সময় হাতে থাকত দামী মদের বোতল। দেখা যেত একটি বোতলের অর্ধেক কিংবা পুরোটাই খালি। তখন কিছু বলার অধিকার থাকত কেবল ইসহাকের। কখনো কখনো সে অবশিষ্ট পানিটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিত। শাহেদ কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত।
কখনো কখনো কড়া পানীয় অতিরিক্ত গিলে ফেলত। ফলে পেটে সইত না। টয়লেটে গিয়ে সব উগলে দিত। নেশায় ভারী শরীরটা নিয়ে আর উঠে আসতে পারত না। ইসহাক উঠিয়ে এনে শুইয়ে দিত। মশারিটা টানিয়ে দিত। টয়লেটটাও পরিষ্কার করে দিতে সে কার্পণ্য করত না। ভাইয়ের মতই যতœ করত বন্ধুটির।
এ সম্পর্ক একদিনের নয়। তারা উচ্চবিদ্যালয়ের পাঁচটা বছর একসাথে ছিল। একসাথে এস এস সি পাশ করে ইসহাক সরকারি কলেজে এইচ এস সি শেষ করে। শাহেদের বাবা ধনীলোক। ছেলেকে বেসরকারি কলেজে পড়িয়েছে বেশি খরচ দিয়ে। আবার ভাগ্য তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এক করে দেয়। কিন্তু দু’বছর পর ইসহাক আর বাল্যকালের বন্ধুকে খুঁজে পায় না। কোন শিল্পী যেন শাহেদের ইচ্ছেমত সংস্কার সাধন করেছেন। বাইরের খোলসটাকে ঠিক রেখে ভিতরের সমস্ত অস্তিত্বকে একটা নতুন সত্তায় দ্রবীভূত করে দিয়েছেন। সেই দ্রবণের প্রতিক্রিয়ায় খোলসের মাত্র রঙ পরিবর্তন হয়েছে। এককালের সহজ সরল ধার্মিক সেই খোলসের ভিতর থেকে এখন উৎপন্ন হয় ভারি ভারি পাথর যা গড়িয়ে পড়ার সময় গতিপথের সব সত্তাকে আন্দোলিত করে দিয়ে যায়। একটা নতুন নিয়মে বেড়ে ওঠার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করে। তাদের এক ভিন্নদৃষ্টি দিয়ে যায় জগৎকে ভিন্নভাবে দেখার জন্য। আর কথিত আগাছাগুলো সে বার্তা পেয়ে সকল অদৃশ্য অস্তিত্বে লাথি মেরে বাস্তবতার অস্তিত্বে তর তর করে বেড়ে ওঠে।
বরাবরই শাহেদ প্রকৃতির মনোযোগী দর্শক। সে যেন প্রতিটি সুন্দরকে তীক্ষèভাবে পর্যবেক্ষণ করে। সে কি শুধু মনোযোগের সাথে সুন্দরকেই দেখে নাকি এর মধ্যে অন্যকিছু খোঁজ করে তা কেবল সেই জানে। দেখলে মনে হবে সে যেন সকল অপরূপ শিল্পকর্মের এক সফল শিল্পীকে খুঁজছে যার তুলির ছোঁয়ায় প্রতিটি রঙ পেয়েছে তার আপন সত্তায় জীবন্ত বাস্তবতা।
“দেখ ইসহাক” বিস্ময়াভিভূত কণ্ঠে বলে, “পশ্চিমাকাশে একটা অপরূপ চিত্র ফুটে উঠেছে!”
ততক্ষণে পশ্চিমাকাশের সূর্যটা দিগন্তের মাঝে লুকিয়ে গেছে। কিন্তু তারই বিচ্ছুরিত লাল আভা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মেঘের ওপর পড়েছে। কোন বিক্ষিপ্ত আঁচড়ে যেন একটা চার রঙা ইমেজ ফুটে উঠেছে।
“এত সুন্দর যে শিল্পীর চিত্রকর্ম” ইসহাক প্রতিউত্তরে বলল, “সে শিল্পির তুলি কত মসৃণ এবং তার রঙ কত খাঁটি! কত বিস্ময়কর তার স্বপ্ন-কল্পনা!”
ইসহাক উঠে যায়। একটা ব্লকের ওপর বসে ঢেউয়ের পানিতে ওযু করে। তারপর ঘাসের ওপর নামাজ পড়তে দাঁড়ায়। নামাজে সে মনকে স্থির রাখতে পরে না। ভুল হয়ে যায়। দু’রাকাত পড়েই সে সালাম ফেরায়। পুনরায় সে নামাযে দাঁড়ায়। শুধু কেবল ফরজ তিন রাকাত পড়ে। এরূপ বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে নামাজ পড়া যায় না। সুন্নত না পড়েই ফিরে আসে।
“কিরে সুন্নত পড়লি না যে!” শাহেদ বিস্ময় প্রকাশ করল।
“না এমনি। নামাজে মন বসাতে পারছিলাম না। ভুল হচ্ছিল বারবার। মনোযোগ না থাকলে নামাজ পড়ে লাভ কি।”
ইসহাক কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায়। একবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নেয়। তখনো রাতের অন্ধকার পুরোটা নামেনি। বাঁধের ওপর কিছু লোক এখনো এখানে সেখানে বসে আছে। তবে পুরো অন্ধকার নামলে এখানে কেউ আর থাকবে না। এ বিজন এলাকায় একমাত্র প্রাণের মায়া না থাকলেই কেউ থাকতে সাহস করে। শহরতলীর এসব যায়গা সবসময়ই খারাপ।
রাত তার নিজের গতিতে নেমে এলেও ইসহাকের মনে হয় সময়ের চাকা কে যেন জ্যাম করে রেখেছে। সময় যতই যাচ্ছে তার বুকের ভিতরে কারো দুরমুশ পিটানোর শব্দ ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তপ্ত ইস্পাতের ওপর একের পর এক ঘা পড়ছে। কঠিন ইস্পাত ক্রমশ পাতলা হচ্ছে। ইস্পাত খণ্ডটিকে বার বার গরম করতে হচ্ছে না। কোন অদৃশ্য অগ্নিকুণ্ডে সেটি তপ্ত হচ্ছে। আর সেটির ওপর সশব্দে আঘাত পড়ছে। জোরালো ঘায়ের শব্দগুলো ইসহাক খুব স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছে। একটা নির্দিষ্ট তালে বেজে চলছে তার বুকের ভেতর। তার মনে হয় শাহেদ যেন হাতুড়ি পিটানোর শব্দগুলো শুনতে পাচ্ছে।
শাহেদের দিকে ইসহাক একবার তাকিয়ে দেখে। তার চেহারা সে স্পষ্ট দেখতে পায়। সেখানে কোন ভাবান্তর নেই।
“শাহেদ, একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছিস? দ্রিম দ্রিম! একটানা! শুনতে পাচ্ছিস?”
“কই না তো, আমি কেবল ঢেউ ভাঙ্গার শব্দ শুনতে পাচ্ছি।”
“তাইতো তোর তো শুনতে পাওয়ার কথাও না। কারো বুকের শব্দ কি কেউ শুনতে পায়? সে যত জোরেই বাজুক।”
“তোর কি হয়েছে বলত। খারাপ লাগছে কোন।”
“না না, খারাপ লাগছে না। এমন সুন্দর জায়গায় কি খারাপ লাগতে পারে? অসম্ভব সুন্দর লাগছে স্থানটা। সামনে তাকিয়ে দেখ, বিশাল প্রান্তর, মনে হচ্ছে কেউ ছাই রঙের চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। অপর প্রান্ত থেকে কেউ যেন এর উপর বাতাস বহাচ্ছে আর চাদরটিতে ঢেউ খেলে যাচ্ছে।”
শাহেদের চোখে ইসহাক একটা কল্পনা ধরিয়ে দিলেও আসলে কি তার কাছে এ সন্ধাটি অতটা সুন্দর? আজকের সন্ধার সৌন্দর্য উপলব্ধি করার তার ফুরসত কোথায়? সময়ের চাকা বেয়ে অন্ধকার যতই নামছে ততই ইসহাকের মনের ভিতর একটা টেনশন তীব্রতর হচ্ছে। এই সময় তার মাথার ডান দিকে একটা চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়। সময় যতই যেতে থাকে ততই ব্যথা তীব্রতর হতে থাকে।
স্থানটি প্রচন্ড নিরব হলে তার আজ ভাল লাগত। কোন কৃত্রিম শব্দ না থাকলেও স্থানটি সম্পূর্ণ নিরব নয়। ঢেউগুলো অনবরত তীরে এসে আছড়ে পড়ছে। বেশ জোরালো শব্দে ঢেউভাঙ্গা পানি কলকল করছে। অসহ্য লাগছে ইসহাকের কাছে এসব। মনে হচ্ছে প্রতিটি ঢেউ ভাঙ্গার শব্দ কানের কাছে কাঁচভাঙ্গার শব্দ। মাঝে মাঝে অকারণে চমকে ওঠে। অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। কিন্তু যতটা অন্ধকার হওয়ার কথা ততটা নয়। যদিও রাতটি অমাবস্যার রাত। শহরের মানুষ অমবস্যা-পূর্ণিমার হিসাব রাখে না। তবুও কখনো কখনো কারো চোখে পড়ে যায়। ইসহাক হিসাব করে দেখে আজ অমাবস্যার রাত। কিন্তু অন্ধকার কোথায়? একশো মিটার দূরের সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঐতো দু’জন লোক এখনো বসে আছে। কিন্তু ইসহাকের আজ খুব অন্ধকারের প্রয়োজন। যে অন্ধকারে সে নিজের রক্ত রঞ্জিত হাতকে দেখতে পাবে না। দেখতে পাবে না কোন যন্ত্রণা কাতর মুখাকৃতি। এখন ঢাকা শহরের আলো তার কাছে অনাবশ্যক হয়ে যায়। শুধু অনাবশ্যকই নয়, এখন আলোই তার একমাত্র শত্র“। চারদিকটা দেখার জন্য ইসহাক আবার উঠে দাঁড়ায়। লোক দু’জনের এখনো উঠার নাম গন্ধ নেই। তাদের তো আর জোর করে উঠিয়ে দেয়া যায় না। উ™£ান্তের মত ডান হাতের আঙ্গুলগুলো একবার মাথার চুলের ভিতর চালান করে।
“কিরে, উঠবি এখনই।” শাহেদ জানতে চায়।
চমকে উঠে ইসহাক, “না না আমার অত তাড়া নেই।”
“আমার আসলে উঠতে ইচ্ছে করছে না। খুব ভালো লাগছে। আমি সারারাত এখানে কাটিয়ে দিতে পরব। আরো কিছুক্ষণ থাকি কি বলিস?”
“ঠিক আছে আমার কোন আপত্তি নেই। আমিও তাই চাচ্ছি।”
ইসহাক বসে পড়ে আবার। লোকদু’টি তখনো উঠেনি। ধৈর্যের একটা সীমা থাকে। তার ইচ্ছে করে এখান থেকে পালিয়ে যেতে। কিন্তু সে পারে না। কর্তব্যের বঁাঁধনে সে আষ্টে-পৃষ্টে বাঁধা। শাহেদের দিকে একবার তাকায় সে। আবছা অন্ধকারে তার মুখ মোটামুটি দেখা যাচ্ছে। শাহেদের মুখে কোন ভাবলেশ নেই। অতটা ভাবলেশহীন তাকে সাধারণত দেখা যায় না। শাহেদ যা করে তা সবাই জানে। শুধু এটা জানে না যে, সে কত বড় খুনি। জানলেও কেউ রা করে না। ইসহাকও জানে এবং তা ভাল করেই জানে। কর্তব্যের খাতিরে তাকে সব জানতে হয়। কোন এক অদৃশ্য হাতের ছোঁয়ায় সে আইনের কাছে সবসময় নির্দোষ। তার বিরুদ্ধে মামলাকারী স্বয়ং খুনের আসামী হয়ে যায় কোন এক যাদুবলে। খুন করে শাহেদ হঠাৎ করে খুব শান্ত হয়ে যায়। এমন কি মদও স্পর্শ করে না কিছুদিন।
সময় অতিক্রমণের সাথে সাথে ইসহাকের শরীর ঘামতে থাকে আরো বেশী করে। সে ক্রমাগত গোসল করে যাচ্ছে ঘামের সাগরে। এখন সম্পূর্ণ জনশূন্য এলাকা। ঘড়ির দিকে তাকায় সে। রাত পৌনে ন’টা।
তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা লাশ। রক্তে লাল হয়ে যাওয়া একটা লাশ। গলাটি তার ধড়ের সাথে ঝুলে আছে। নির্মমভাবে আঁকা তার শরীর ব্লেড দিয়ে। চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠেছিল সবাই। সেদিনই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, খুনের বদল খুন।
“শাহেদ” ইসহাক মৃদু উচ্চারণে ডাকে।
“হু।”
“একটা প্রশ্নের জবাব দিবি?”
“বল।”
“খুন করার পূর্বমুহূর্তে খুনির কাছে কেমন মনে হয়?”
না, শাহেদ চমকে উঠেনি বরং আনমনে তাকিয়ে আছে পানির দিকে। কোন কিছু তাকে আবিষ্ট করে রেখেছে। অনেক্ষণ পর  সম্মোহীত কণ্ঠ ভেসে এল যেন অনেক দূর থেকে, “জানি না”।
“কিন্তু আমি জানি।”
ইসহাকের দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে শাহেদ। সামনে দাঁড়ানো ইসহাকের কঠোরতা সে উপলব্ধি করতে পারে না। বলল, “ঠিক আছে তুই বল”।
“কষ্ট, প্রচণ্ড কষ্ট, হারানোর কষ্টের মত।”
হো হো করে হেসে ওঠে শাহেদ। হাসির প্রচণ্ড ধমকে নিরবতা খান খান ভেঙ্গে যায়। সে শব্দকে ছাপিয়ে একটা কর্কশ যান্ত্রিক উচ্চশব্দ ক্ষণিকের জন্য বেজে ওঠে। তারপর সব নিরব।
ইসহাক ধীরে ধীরে হেঁটে আসে। বাতাসের তীব্রতার সারা শরীর থেকে থেকে কাঁটা দিয়ে ওঠে। হঠাৎ পৃথিবী নিকষ অন্ধকারে ঢেকে যায়। তারপর আবার আবছা আলোতে ভরে যায়। চোখ খুলে দেখে একটা ছায়াপুরুষ দাঁড়িয়ে। তার হাত ধরে ইসহাক উঠে দাঁড়ায়।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

নিব

:উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তনের একটি শোভন ছড়াপত্র

বাঙলা

আফসার নিজাম সম্পাদিত : চিন্তাশীল পাঠকের মননশীল সৃজন

%d bloggers like this: